
নবগ্রাম নামের ছোট্ট একটা গ্রামে প্রতি বছর শীতের শেষে লোকনাট্যের আসর বসত।
গ্রামের মাঠে বাঁশের মঞ্চ তৈরি হত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত নাটক দেখতে।
কখনও রাজা-রানির গল্প, কখনও রাক্ষস-দানব, কখনও পুরাণের কাহিনি।
আর সেই নাটকের জন্য মুখোশ বানাতেন মহাদেব কর্মকার।
বয়স তাঁর প্রায় পঁয়ষট্টি।
মাটির সঙ্গে খড়, কাগজ আর প্রাকৃতিক রং মিশিয়ে তিনি এমন মুখোশ বানাতে পারতেন, যেগুলো দেখলে মনে হত সত্যিই যেন মুখের মধ্যে প্রাণ আছে।
কিন্তু এবারের সমস্যা অন্যরকম।
নাটকের আয়োজকেরা শহর থেকে তৈরি প্লাস্টিকের মুখোশ আনতে চাইছিল।
সেগুলো সস্তা।
রঙিন।
চকচকে।
মহাদেবের হাতে তৈরি মুখোশের দাম তার তুলনায় অনেক বেশি।
একদিন তিনি তাঁর ছোট্ট ঘরে বসে একটা রাক্ষসের মুখোশ বানাচ্ছিলেন।
নাতনি ঝিলিক এসে বলল,
—দাদু, এবার কি তোমার মুখোশ নাটকে ব্যবহার হবে না?
মহাদেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—হয়তো হবে না।
ঝিলিক মুখ ভার করল।
—কেন?
—মানুষ এখন দ্রুত জিনিস চায়। হাতের কাজের জন্য অপেক্ষা করতে চায় না।
ঝিলিক একটা অসমাপ্ত মুখোশ হাতে তুলে নিল।
—এটা কি কথা বলতে পারে?
মহাদেব হেসে বললেন,
—মুখোশ কথা বলে না।
—তাহলে?
—যে মানুষ মুখোশ পরে, তার মুখ দিয়ে কথা বলে।
ঝিলিক কিছুক্ষণ মুখোশটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন ঝিলিক নাটকের মহড়া দেখতে গেল।
মঞ্চে অভিনেতারা প্লাস্টিকের মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে আছে।
দেখতে সুন্দর।
কিন্তু মুখগুলো প্রায় একই রকম।
রাক্ষসের মুখ, রাজদূতের মুখ, সৈনিকের মুখ—সবকিছু যেন একই ছাঁচে তৈরি।
ঝিলিক বাড়ি ফিরে দাদুকে বলল,
—তোমার মুখোশ আলাদা।
—কীভাবে?
—প্রতিটা মুখের চোখ আলাদা।
মহাদেব হেসে বললেন,
—কারণ মানুষ আলাদা।
—তুমি কি প্রত্যেক মুখোশ বানানোর সময় মানুষকে ভাবো?
মহাদেব বললেন,
—হ্যাঁ।
—কেন?
—যে মুখোশ যে মানুষ পরবে, তার অভিনয়ও সেই মুখোশের সঙ্গে বদলাবে।
ঝিলিকের মাথায় একটা ভাবনা এল।
পরদিন সে স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের বলল,
—আমরা একটা নতুন নাটক করব।
বন্ধুরা বলল,
—কী নাটক?
ঝিলিক বলল,
—মুখোশের নাটক।
শিক্ষকও আগ্রহী হলেন।
ঝিলিক মহাদেবের কাছে গিয়ে বলল,
—দাদু, তুমি আমাদের মুখোশ বানিয়ে দেবে?
মহাদেব বললেন,
—কতগুলো?
—অনেক।
—কিন্তু টাকা?
ঝিলিক বলল,
—আমরা সবাই মিলে কাজ করব।
মহাদেব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
—ঠিক আছে।
কাজ শুরু হল।
মহাদেব প্রথমে ছাত্রছাত্রীদের শেখালেন কীভাবে খড়ের কাঠামো তৈরি করতে হয়।
তারপর কাগজের স্তর।
তারপর মাটি।
তারপর শুকিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা।
ঝিলিক বিরক্ত হয়ে বলল,
—এত সময় লাগে!
মহাদেব হেসে বললেন,
—যে জিনিসের ভেতর প্রাণ দিতে হয়, তাকে সময় দিতে হয়।
কয়েকদিন পরে মুখোশ শুকোল।
তারপর শুরু হল রং করা।
কেউ লাল।
কেউ নীল।
কেউ হলুদ।
কিন্তু মহাদেব প্রত্যেক মুখোশে চোখের চারপাশে আলাদা নকশা করলেন।
ঝিলিক জিজ্ঞেস করল,
—চোখ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
মহাদেব বললেন,
—মানুষ মিথ্যে বললেও তার চোখ অনেক সময় সত্যি বলে।
নাটকের দিন এল।
গ্রামের মাঠে ভিড়।
শিশুরা প্রথম সারিতে।
বৃদ্ধরা চেয়ারে।
মহিলারা পাশে।
মঞ্চের পেছনে ঝিলিকরা প্রস্তুত।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঝামেলা হল।
বিদ্যুৎ চলে গেল।
মঞ্চের আলো নিভে গেল।
আয়োজকেরা দিশেহারা।
কেউ বলল,
—নাটক বন্ধ করতে হবে।
মহাদেব বললেন,
—আলো না থাকলে কি গল্প থাকে না?
কেউ উত্তর দিল না।
তিনি বললেন,
—পুরোনো দিনে আমরা কুপির আলোতেই নাটক করেছি।
গ্রামের মানুষ দ্রুত কয়েকটা কেরোসিন বাতি আর লণ্ঠন নিয়ে এল।
মঞ্চে আবার আলো জ্বলল।
তবে আলো কম।
মহাদেব বললেন,
—এই আলোতেই হবে।
নাটক শুরু হল।
প্রথমে ঝিলিক রাজকন্যার চরিত্রে এল।
তার মুখে ছিল সাদা-নীল মুখোশ।
তারপর রাক্ষস এল।
তার মুখোশের চোখ বড়, কপাল কুঁচকানো।
দর্শকরা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু নাটকের মাঝখানে রাক্ষসের চরিত্রে অভিনয় করা ছেলেটি মুখোশ খুলে ফেলল।
দর্শকরা অবাক।
ঝিলিক বলল,
—কেন খুললে?
ছেলেটি বলল,
—আমি আর রাক্ষস হতে চাই না।
নাটকের গল্প অনুযায়ী তাকে তখন একটা সংলাপ বলতে হয়েছিল।
সে বলল,
—‘মানুষের মুখে দাগ থাকলেই সে খারাপ হয় না। কখনও কখনও খারাপ হয়ে যায় মানুষের কাজ।’
মাঠে নীরবতা।
তারপর হাততালি।
নাটক শেষ হওয়ার পর গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি বললেন,
—আজ আমরা শুধু নাটক দেখিনি। আমরা নিজেদেরও দেখেছি।
তিনি মহাদেবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—এই মুখোশগুলো আমাদের একটা কথা মনে করিয়ে দিল—বাইরের মুখ দেখে মানুষকে বিচার করা যায় না।
মহাদেব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
একজন শহরের ব্যবসায়ীও সেদিন নাটক দেখতে এসেছিলেন।
তিনি মহাদেবের কাছে এসে বললেন,
—আপনার কাজ আমি শহরে নিয়ে যেতে চাই।
মহাদেব বললেন,
—কত দামে?
লোকটি বললেন,
—আপনি যে দাম বলবেন।
মহাদেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—একটা শর্ত আছে।
—কী?
—মুখোশ তৈরি শেখার জন্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের সুযোগ দিতে হবে।
ব্যবসায়ী হাসলেন।
—অবশ্যই।
কয়েক মাস পরে নবগ্রামে একটা ছোট কর্মশালা তৈরি হল।
নাম—
‘মুখের গল্প’।
সেখানে মহাদেব শিশুদের মুখোশ বানানো শেখাতে লাগলেন।
ঝিলিকও শেখাতে শুরু করল।
একদিন এক ছোট ছেলে একটা মুখোশ বানিয়ে মহাদেবকে দেখাল।
মুখোশটা একেবারে বেঁকে গেছে।
এক চোখ বড়।
অন্য চোখ ছোট।
নাক একদিকে বাঁকা।
মহাদেব মুখোশটা হাতে নিয়ে বললেন,
—খুব সুন্দর।
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
—এটা সুন্দর?
—হ্যাঁ।
—কিন্তু ঠিক হয়নি তো!
মহাদেব বললেন,
—সব মুখ একরকম হওয়া দরকার নেই।
ছেলেটা হাসল।
বছরখানেক পরে মহাদেবের তৈরি মুখোশ শহরের প্রদর্শনীতেও জায়গা পেল।
অনেক মানুষ তাঁর কাজ কিনতে শুরু করল।
কিন্তু তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল অন্য জায়গায়।
এক সন্ধ্যায় ঝিলিক একটা নতুন মুখোশ হাতে নিয়ে দাদুর কাছে এল।
—দাদু, দেখো।
মহাদেব জিজ্ঞেস করলেন,
—এটা কার?
ঝিলিক বলল,
—কাউকে দেখে বানাইনি।
—তাহলে?
—আমার মনের মানুষ।
মহাদেব হেসে বললেন,
—মনের মানুষ কেমন?
ঝিলিক বলল,
—যে বাইরে একরকম, কিন্তু ভেতরে আরেকরকম নয়।
মহাদেব থমকে গেলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—তাহলে তুই মুখোশ বানাতে শিখিসনি।
—তাহলে?
—তুই মানুষ চিনতে শিখেছিস।
ঝিলিক দাদুর হাত ধরল।
বাইরে তখন শীতের বাতাস।
দূরে লোকনাট্যের মঞ্চে আবার মহড়া চলছে।
একটার পর একটা মুখোশ আলোয় উঠে আসছে।
কখনও রাজা।
কখনও রাক্ষস।
কখনও সাধু।
কখনও সৈনিক।
কিন্তু মঞ্চের আলো নিভে গেলে সব মুখোশই আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়।
শুধু মানুষটা থেকে যায়।
আর সেই মানুষটার আসল পরিচয় তার মুখে নয়—
তার কাজে।
মহাদেব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বললেন,
—মুখোশ মানুষকে লুকিয়ে রাখে ঠিকই, কিন্তু ভালো কাজ কখনও মুখোশের আড়ালে থাকে না।
ঝিলিক হেসে বলল,
—তাই তো দাদু, তোমার মুখোশগুলোও কথা বলে।












Leave a Reply