
সোনাঝুরি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট একটি টিনের ঘর। ঘরটির দেওয়ালে একসময় নীল রং করা হয়েছিল, কিন্তু বছরের পর বছর বৃষ্টি, রোদ আর ধুলোয় সেই নীল রং প্রায় মুছে গিয়েছিল।
দরজার ওপরে কাঠের একটি বোর্ডে লেখা ছিল—
“সোনাঝুরি গ্রাম পাঠাগার”
একসময় এই পাঠাগারে বিকেল হলেই ভিড় জমত। স্কুলের ছেলেমেয়েরা বই নিতে আসত, কৃষকেরা খবরের কাগজ পড়ত, চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া যুবকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত।
কিন্তু এখন?
ঘরটির দরজা বেশিরভাগ দিনই বন্ধ থাকত।
কারণ গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে বই পড়া ভুলে যাচ্ছিল।
মোবাইল ফোন এসে সবার হাতে জায়গা করে নিয়েছিল।
পাঠাগারের বৃদ্ধ গ্রন্থাগারিক ছিলেন হরিপদবাবু। বয়স প্রায় সত্তর। প্রতিদিন বিকেলে তিনি তালা খুলে ঘর ঝাড়ু দিতেন, পুরোনো বইগুলোর ধুলো পরিষ্কার করতেন, তারপর চুপচাপ একটি চেয়ারে বসে থাকতেন।
কেউ আসত না।
একদিন বিকেলে হরিপদবাবু একটা পুরোনো বই হাতে নিয়ে বললেন,
—“তোমাদের জন্য এতদিন অপেক্ষা করছি। তোমরা কি আর ফিরবে না?”
বই তো কথা বলতে পারে না।
তবু হরিপদবাবুর মনে হল, বইগুলো যেন তার কথার উত্তর দিচ্ছে।
সেদিনই প্রথম পাঠাগারে এল বারো বছরের একটি ছেলে।
তার নাম অর্ক।
অর্কের বাবা ছিলেন ভ্যানচালক। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। সংসারে বই কেনার মতো অতিরিক্ত টাকা ছিল না।
অর্ক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ঘরের ভেতর তাকিয়ে রইল।
হরিপদবাবু বললেন,
—“ভেতরে এসো।”
অর্ক একটু ইতস্তত করে বলল,
—“আমি কি বই পড়তে পারি?”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন,
—“এই ঘরটাই তো বই পড়ার জন্য।”
অর্ক একটা বই হাতে নিল।
তারপর আরেকটা।
তারপর একটা গল্পের বই নিয়ে কোণের বেঞ্চে বসে পড়ল।
হরিপদবাবু অবাক হয়ে দেখলেন, ছেলেটা এত মন দিয়ে পড়ছে যে চারপাশের পৃথিবী যেন তার কাছে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় অর্ক বাড়ি ফিরতে দেরি করল।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
—“কোথায় ছিলি?”
অর্ক বলল,
—“বই পড়ছিলাম।”
মা অবাক হয়ে বললেন,
—“বই? কোথা থেকে পেলি?”
অর্ক বলল,
—“গ্রামের পাঠাগারে।”
পরদিন অর্ক আবার গেল।
তারপর তার বন্ধু রাহুল গেল।
তারপর মিতা।
তারপর আরও দুজন।
এক সপ্তাহের মধ্যে পাঠাগারের বেঞ্চগুলোতে আবার শিশুদের দেখা যেতে লাগল।
হরিপদবাবুর মুখে অনেকদিন পর হাসি ফুটল।
কিন্তু সমস্যাও শুরু হল।
একদিন গ্রামের কয়েকজন বলল,
—“এই পাঠাগার রেখে লাভ কী? কেউ তো আসে না।”
আরেকজন বলল,
—“জায়গাটা যদি অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভালো হয়।”
হরিপদবাবু চুপ করে শুনলেন।
সেদিন রাতে তিনি পাঠাগারের সমস্ত বই গুনলেন।
পুরোনো উপন্যাস, গল্পের বই, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, কৃষিবিষয়ক বই, অভিধান—সব মিলিয়ে কয়েক হাজার বই।
তিনি জানতেন, এই বইগুলো শুধু কাগজ নয়।
এগুলো বহু মানুষের স্বপ্ন।
পরদিন অর্ক পাঠাগারে এসে দেখল হরিপদবাবু খুব চিন্তিত।
—“কী হয়েছে?”
হরিপদবাবু বললেন,
—“পাঠাগারটা হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।”
অর্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—“কেন?”
—“মানুষ মনে করছে, এর আর দরকার নেই।”
অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“আমরা কি কিছু করতে পারি?”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন,
—“তোমরা যদি প্রমাণ করতে পারো যে এই পাঠাগারের দরকার আছে, তাহলে হয়তো পারবে।”
সেদিন অর্ক একটা সিদ্ধান্ত নিল।
সে বাড়ি বাড়ি যেতে শুরু করল।
প্রথমে গেল রাহুলদের বাড়ি।
বলল,
—“কাকু, আপনার বাড়িতে পুরোনো বই থাকলে পাঠাগারে দেবেন?”
রাহুলের বাবা বললেন,
—“পুরোনো বই দিয়ে কী হবে?”
অর্ক বলল,
—“যে বই আপনার কাছে পুরোনো, অন্য কারও কাছে সেটাই নতুন হতে পারে।”
কথাটা শুনে রাহুলের বাবা চুপ করে গেলেন।
পরদিন তিনি পাঁচটি বই এনে দিলেন।
তারপর মিতার বাড়ি থেকে এল আটটি বই।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দিলেন পঁচিশটি বই।
একজন ডাক্তার দিলেন স্বাস্থ্যবিষয়ক বই।
একজন কৃষক দিলেন কৃষিকাজের পুরোনো বই।
ধীরে ধীরে পাঠাগারের তাকগুলো আবার ভরে উঠল।
অর্ক এবার আরও বড় পরিকল্পনা করল।
সে গ্রামের চায়ের দোকানের সামনে একটি ছোট পোস্টার লাগাল—
“প্রতিদিন এক ঘণ্টা বই পড়ুন।”
তার নিচে লেখা—
“বই কিনতে না পারলে পাঠাগারে আসুন।”
এই কথাটা গ্রামের মানুষের মনে দাগ কাটল।
একদিন সন্ধ্যায় পাঠাগারে এলেন গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক নিতাই কাকা।
তিনি বললেন,
—“আমার ছেলে চাষাবাদ করতে চায় না। শহরে চলে যেতে চায়। কৃষির নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো বই আছে?”
হরিপদবাবু তাক থেকে একটি বই বের করে দিলেন।
নিতাই কাকা বইটি নিয়ে বাড়ি গেলেন।
কয়েক সপ্তাহ পরে তিনি আবার এলেন।
হাতে কিছু সবজি।
হাসতে হাসতে বললেন,
—“বই পড়ে নতুন পদ্ধতিতে চাষ করেছি। ফলন আগের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে।”
হরিপদবাবুর চোখ চকচক করে উঠল।
অর্কও হাসল।
এরপর গ্রামের মহিলারা পাঠাগারে আসতে শুরু করলেন।
কেউ রান্নার বই নিলেন।
কেউ স্বাস্থ্যবিষয়ক বই।
কেউ সেলাই শেখার বই।
কেউ সন্তান পালনের বই।
পাঠাগার ধীরে ধীরে শুধু বইয়ের ঘর রইল না।
এটি হয়ে উঠল গ্রামের শেখার জায়গা।
একদিন গ্রামের পঞ্চায়েতের কয়েকজন সদস্য পাঠাগারে এলেন।
তাঁরা দেখলেন, ঘরের ভেতর প্রায় ত্রিশজন মানুষ বসে আছে।
কেউ পড়ছে।
কেউ লিখছে।
কেউ আলোচনা করছে।
একজন সদস্য হরিপদবাবুকে বললেন,
—“আমরা ভাবিনি এখানে এত মানুষ আসে।”
হরিপদবাবু বললেন,
—“মানুষ বই থেকে দূরে যায়নি। শুধু বইয়ের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
অর্ক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সেদিন সিদ্ধান্ত হল, পাঠাগার বন্ধ হবে না।
বরং ঘরটি সংস্কার করা হবে।
কয়েক মাস পর পাঠাগারের চেহারা বদলে গেল।
নতুন জানালা হল।
দেওয়ালে নতুন রং হল।
নতুন টেবিল-চেয়ার এল।
আর দরজার ওপরে পুরোনো বোর্ডটির পাশে নতুন একটি ছোট বোর্ড লাগানো হল—
“এই পাঠাগার সবার জন্য।”
উদ্বোধনের দিন হরিপদবাবু অর্ককে সামনে ডাকলেন।
বললেন,
—“আজ এই পাঠাগারকে বাঁচিয়েছে যে মানুষটি, সে কোনো বড়লোক নয়, কোনো নেতা নয়, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নয়।”
সবাই অর্কের দিকে তাকাল।
হরিপদবাবু বললেন,
—“সে শুধু একজন পাঠক। কিন্তু সে বিশ্বাস করেছে—একটা বই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।”
অর্ক লজ্জায় মাথা নিচু করল।
সেদিন সন্ধ্যায় পাঠাগারের আলো জ্বলে উঠল।
জানালার বাইরে তখন অন্ধকার।
কিন্তু ঘরের ভেতর একসঙ্গে বসে পড়ছিল গ্রামের ছোট-বড় সবাই।
হরিপদবাবু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি তাকিয়ে দেখলেন, একসময় যে ঘরে ধুলো জমত, সেখানে আজ জ্ঞানের আলো জ্বলছে।
অর্ক একটি বই হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসেছিল।
হরিপদবাবু কাছে গিয়ে বললেন,
—“কী পড়ছ?”
অর্ক বইয়ের পাতা থেকে চোখ না তুলে বলল,
—“আগামী দিনের কথা।”
হরিপদবাবু হেসে বললেন,
—“তা বইয়ে লেখা আছে?”
অর্ক বলল,
—“না। বই পড়ে সেটা নিজেরাই লিখতে হয়।”
হরিপদবাবু আর কিছু বললেন না।
শুধু ছেলেটার মাথায় হাত রাখলেন।
বাইরে তখন সোনাঝুরি গ্রামের রাত।
আর গ্রামের ছোট্ট পাঠাগারে জ্বলতে থাকা আলো যেন বলে দিচ্ছিল—
যে গ্রামে বই বেঁচে থাকে, সেই গ্রামের স্বপ্নও বেঁচে থাকে।












Leave a Reply