নদীটা গ্রামের পাশ দিয়ে অনেকটা পথ বয়ে গেছে। বর্ষাকালে তার বুক ফুলে উঠত, শীতকালে জল কমে গিয়ে চর জেগে উঠত। নদীর নাম ছিল ময়ূরাক্ষী। নদীর সঙ্গে গ্রামের মানুষের সম্পর্ক ছিল বহু পুরোনো। কেউ মাছ ধরত, কেউ নৌকায় করে ওপারের হাটে যেত, আবার কেউ নদীর ঘাটে বসে বিকেলের বাতাস উপভোগ করত।
কিন্তু নদীর সঙ্গে সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক ছিল নিতাই মিস্ত্রির।
সত্তর ছুঁইছুঁই নিতাই মিস্ত্রি ছিলেন গ্রামের শেষ নৌকা-কারিগর।
তার ছোট্ট কর্মশালাটা ছিল নদীর ঘাটের কাছেই। টিনের চাল, সামনে কয়েকটা পুরোনো কাঠের গুঁড়ি, দেওয়ালে ঝোলানো করাত, বাটালি, হাতুড়ি আর নানা রকমের মাপের কাঠের ছাঁচ।
সকাল হলেই সেখানে শোনা যেত—
ঠক… ঠক… ঠক…
কাঠের ওপর হাতুড়ির শব্দ।
একসময় এই শব্দেই গ্রামের সকাল শুরু হতো।
কিন্তু এখন আর কেউ নৌকা বানাতে চাইত না।
প্লাস্টিকের নৌকা, ফাইবারের নৌকা, ইঞ্জিনচালিত নৌকা—সব এসে পুরোনো কাঠের নৌকাকে প্রায় সরিয়ে দিয়েছিল।
নিতাই মিস্ত্রি তবু কাজ ছাড়েননি।
প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে তিনি কাঠের গায়ে হাত বোলাতেন।
তারপর ধীরে ধীরে কাজ শুরু করতেন।
একদিন তার নাতি অয়ন শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে এল।
অয়ন পড়াশোনা করত কলকাতায়। আধুনিক জিনিসের প্রতি তার ভীষণ আগ্রহ। হাতে সবসময় মোবাইল, কানে হেডফোন, চোখে নতুন কিছু দেখার কৌতূহল।
দাদুর কর্মশালায় ঢুকে সে চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—“দাদু, তুমি এখনও এসব বানাও?”
নিতাই হেসে বললেন,
—“এসব নয় রে, নৌকা।”
—“কিন্তু এখন তো সবাই ফাইবারের নৌকা ব্যবহার করে।”
—“জানি।”
—“তাহলে তুমি এখনও কাঠের নৌকা বানাও কেন?”
নিতাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর একটা পুরোনো কাঠের টুকরো হাতে নিয়ে বললেন,
—“কারণ কাঠকে আমি শুধু কাঠ হিসেবে দেখি না। এর মধ্যে একটা গাছের জীবন থাকে।”
অয়ন হেসে বলল,
—“তুমি এসব নিয়ে খুব আবেগী হয়ে যাও।”
নিতাইও হাসলেন।
—“বয়স হলে মানুষ একটু আবেগী হয়।”
পরদিন সকালে অয়ন দেখল, দাদু একটা পুরোনো নৌকা মেরামত করছেন।
নৌকাটার নাম লেখা—‘মাধবী’।
অয়ন জিজ্ঞেস করল,
—“এটা কার?”
নিতাই বললেন,
—“তোর ঠাকুমার নামে বানিয়েছিলাম।”
অয়ন অবাক হয়ে তাকাল।
—“ঠাকুমার নামে?”
—“হ্যাঁ। তখন তোর বাবা ছোট। নদীর ওপারের স্কুলে যেতে প্রতিদিন নৌকা লাগত। এই নৌকাতেই তাকে নিয়ে যেতাম।”
অয়ন নৌকার গায়ে হাত রাখল।
পুরোনো কাঠ। কোথাও কোথাও দাগ পড়েছে। তবু অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা ছিল।
নিতাই বললেন,
—“এই নৌকায় শুধু কাঠ নেই। তোর বাবার ছোটবেলার অনেক সকাল আছে।”
অয়ন আর কিছু বলল না।
সেদিন বিকেলে গ্রামের কয়েকজন যুবক কর্মশালার সামনে এসে দাঁড়াল।
তাদের একজন বলল,
—“নিতাই কাকা, আর কতদিন এই কাজ করবেন?”
নিতাই মাথা তুললেন।
—“যতদিন হাত চলে।”
ছেলেটা হেসে বলল,
—“এখন আর কাঠের নৌকার দিন নেই কাকা। আপনি চাইলে দোকানটা ভেঙে অন্য কিছু করতে পারেন।”
নিতাই কোনো উত্তর দিলেন না।
অয়নের কথাটা খারাপ লাগল।
সে দাদুকে বলল,
—“ওরা ভুল বলছে না দাদু। সময় বদলেছে।”
নিতাই বললেন,
—“সময় বদলেছে ঠিকই। কিন্তু সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে হয় না।”
অয়ন বলল,
—“তাহলে কী করবে?”
নিতাই কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—“জানি না।”
সেই রাতেই অয়নের মাথায় একটা ভাবনা এল।
সে দাদুর পুরোনো নৌকাগুলোর ছবি তুলতে শুরু করল। প্রতিটি নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পও দাদুর কাছ থেকে শুনে লিখে রাখল।
কোন নৌকায় কোন পরিবার নদী পার হয়েছে।
কোন নৌকায় বন্যার সময় মানুষকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
কোন নৌকা দিয়ে কৃষকরা বাজারে ধান নিয়ে যেত।
কোন নৌকায় বসে অয়নের বাবা প্রথম স্কুলে গিয়েছিলেন।
অয়ন সব ছবি নিয়ে একটা ছোট ভিডিও বানাল।
ভিডিওর নাম দিল—
‘নদীর বুকের স্মৃতি—নিতাই মিস্ত্রির নৌকা’
ভিডিওটা সে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করল।
প্রথমে কেউ বিশেষ গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু দুদিন পর হঠাৎ ভিডিওটা অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে গেল।
শহরের একজন পরিবেশকর্মী ফোন করলেন।
—“নিতাইবাবু, আপনি কি ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা বানান?”
নিতাই অবাক হয়ে বললেন,
—“হ্যাঁ, তবে এখন আর তেমন কাজ নেই।”
লোকটি বললেন,
—“আমরা গ্রামীণ পর্যটনের জন্য কয়েকটা ঐতিহ্যবাহী নৌকা চাই। আপনার নৌকা আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে।”
নিতাই কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না।
তারপর বললেন,
—“কতগুলো লাগবে?”
—“প্রথমে পাঁচটা। পরে আরও লাগতে পারে।”
অয়ন দৌড়ে এসে দাদুকে জড়িয়ে ধরল।
নিতাইয়ের চোখে জল।
তিনি শুধু বললেন,
—“দেখলি? পুরোনো জিনিসেরও কখনও কখনও নতুন ঠিকানা হয়।”
কাজ শুরু হল।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়।
নিতাই একা পাঁচটা নৌকা বানাতে পারবেন না।
অয়ন গ্রামের কয়েকজন তরুণকে ডেকে বলল,
—“দাদুর কাছ থেকে কাজটা শিখবে?”
প্রথমে সবাই হাসল।
কেউ বলল,
—“নৌকা বানিয়ে কী হবে?”
অয়ন বলল,
—“জানি না। কিন্তু শিখলে অন্তত একটা দক্ষতা থাকবে।”
শেষ পর্যন্ত তিনজন রাজি হল।
রবি, সঞ্জয় আর মিঠুন।
নিতাই তাদের প্রথম দিন শুধু কাঠ চিনতে শেখালেন।
কোন কাঠ জলে বেশি টেকে।
কোন কাঠ সহজে বাঁকানো যায়।
কাঠের শিরা কোন দিকে।
কোথায় কতটা চাপ দিতে হয়।
তিনি বললেন,
—“নৌকা বানানো মানে শুধু কাঠ জোড়া দেওয়া নয়। জলের স্বভাব বুঝতে হয়।”
তরুণরা ধীরে ধীরে শিখতে লাগল।
ঠক… ঠক… ঠক…
আবার কর্মশালায় হাতুড়ির শব্দ ফিরল।
কয়েক মাস পরে পাঁচটি নৌকা তৈরি হল।
প্রথম নৌকাটা নদীতে নামানোর দিন গ্রামের মানুষ ভিড় করল।
নিতাই নিজে নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
অয়ন বলল,
—“দাদু, নাম কী দেব?”
নিতাই কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“‘ফিরে আসা’।”
নৌকাটা জলে নামল।
প্রথমে একটু দুলল।
তারপর ধীরে ধীরে নদীর বুক চিরে এগিয়ে গেল।
নিতাইয়ের চোখে তখন শুধু নৌকা নয়—তার নিজের জীবনের বহু বছর ভেসে উঠছিল।
অয়ন পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—“দাদু, তুমি কি খুশি?”
নিতাই মৃদু হেসে বললেন,
—“খুব।”
—“কেন?”
—“কারণ আমার কাজ শুধু বেঁচে রইল না। তোদের হাতেও চলে গেল।”
সেদিনের পর কর্মশালার সামনে একটা নতুন সাইনবোর্ড লাগানো হল—
‘নিতাই নৌকা কর্মশালা — ঐতিহ্য থেকে ভবিষ্যৎ’
রবি এখন নতুন ছেলেদের শেখায়।
সঞ্জয় নৌকার নকশা তৈরি করে।
মিঠুন কাঠ বাছাই করে।
আর অয়ন শহরে বসে তাদের কাজের ছবি, ভিডিও এবং গল্প মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
নিতাই এখন আগের মতো সারাদিন কাজ করেন না।
কর্মশালার এক কোণে বসে তরুণদের কাজ দেখেন।
মাঝে মাঝে ভুল হলে বলেন,
—“ওভাবে নয়, কাঠের কথাটা আগে শুনতে হবে।”
একদিন অয়ন দাদুকে জিজ্ঞেস করল,
—“কাঠ আবার কথা বলে?”
নিতাই হাসলেন।
—“যে মন দিয়ে শোনে, তার কাছে সবকিছুই কথা বলে।”
নদীর ওপর তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
দূরে নতুন নৌকাগুলো একে একে ঘাটে ফিরছে।
জলের ওপর শেষ সূর্যের আলো পড়েছে।
অয়ন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হল, দাদু শুধু নৌকা বানাননি।
তিনি সময়কে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে থাকার নাম ঐতিহ্য নয়।
পুরোনো জ্ঞানকে নতুন সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে দেওয়াই আসল ঐতিহ্য।
নদীর বুক দিয়ে তখন ‘ফিরে আসা’ নৌকাটা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছিল।
নিতাই মিস্ত্রি উঠে দাঁড়ালেন।
তার হাতে আর আগের মতো জোর নেই।
কিন্তু চোখে এখনও সেই পুরোনো আলো।
ঠক… ঠক… ঠক…
কর্মশালার ভেতর আবার হাতুড়ির শব্দ উঠল।
আর সেই শব্দে মনে হল—
একটি পুরোনো গল্প শেষ হয়নি।
বরং নতুন করে শুরু হয়েছে।













Leave a Reply