ঘুড়ি তৈরি, মাঞ্জা, বাঁশের কাঠি, গ্রামীণ উৎসব এবং বদলে যাওয়া আকাশ নিয়ে ঘুড়ি-শিল্প গবেষক অরিন্দম মাইতির সঙ্গে মুখোমুখি
বিশেষ সাক্ষাৎকার | সম্পূর্ণ কাল্পনিক
একসময় শীতের নীল আকাশ কিংবা শরতের মেঘমুক্ত বিকেল মানেই ছিল রঙিন ঘুড়ির মেলা। গ্রামের বাড়ির ছাদ, স্কুলের মাঠ, পুকুরপাড় কিংবা খোলা ধানজমির পাশে দেখা যেত কিশোরদের দল। কারও হাতে লাটাই, কারও হাতে সুতো, কেউ আবার মন দিয়ে ঘুড়ির বাঁশের কাঠি ঠিক করছে। একটু পরেই আকাশে উঠত লাল, নীল, হলুদ, সবুজ কিংবা নানা নকশার ঘুড়ি।
ঘুড়ি ছিল শুধু খেলনা নয়। অনেক পরিবারের কাছে ঘুড়ি তৈরি ছিল একটি ছোট কারুশিল্প। পাতলা কাগজ, বাঁশের সরু কঞ্চি, আঠা ও সুতো দিয়ে তৈরি হতো একেকটি ঘুড়ি। দক্ষ কারিগরের হাতে একই উপকরণ থেকে তৈরি হতো বিভিন্ন আকার ও নকশার ঘুড়ি।
আজ মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা ধরনের আধুনিক বিনোদনের কারণে শিশুদের অবসরজীবন অনেকটাই বদলে গেছে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামে খোলা মাঠ ও ফাঁকা জায়গা কমেছে। ফলে ঘুড়ি ওড়ানোর পুরনো সংস্কৃতিও অনেক জায়গায় পিছিয়ে পড়েছে।
তবে ঘুড়ির প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। উৎসব, প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ অনুষ্ঠানে এখনও আকাশে রঙিন ঘুড়ি দেখা যায়।
এই পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেন কাল্পনিক ঘুড়ি-শিল্প গবেষক ও প্রশিক্ষক অরিন্দম মাইতি।
প্রশ্ন: ঘুড়িকে আপনি শুধু একটি খেলনা হিসেবে দেখেন না কেন?
অরিন্দম মাইতি:
কারণ একটি ঘুড়ির মধ্যে অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে রয়েছে—কারুশিল্প, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং মানুষের সৃজনশীলতা।
একটি ঘুড়ি তৈরি করতে হলে কাগজের ওজন, বাঁশের কাঠির ভারসাম্য, আকৃতি এবং সুতো বাঁধার জায়গা বুঝতে হয়। ঘুড়ি আকাশে ওঠার পর বাতাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়।
অন্যদিকে ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কও তৈরি হয়। আগে পাড়ার ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে ঘুড়ি ওড়াত। বড়রা ছোটদের শেখাতেন। ফলে এটি ছিল প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞান আদান-প্রদানেরও একটি মাধ্যম।
প্রশ্ন: গ্রামবাংলায় ঘুড়ি তৈরির পুরনো পদ্ধতি কেমন ছিল?
অরিন্দম:
খুব সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করা হতো। পাতলা কাগজ, সরু বাঁশের কাঠি, সুতো এবং আঠা—এই কয়েকটি জিনিসই মূলত যথেষ্ট।
প্রথমে ঘুড়ির আকৃতি অনুযায়ী বাঁশের কাঠি তৈরি করা হতো। তারপর কাঠিগুলি নির্দিষ্টভাবে বাঁধা হতো। তার ওপর কাগজ লাগানো হতো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারসাম্য। কাগজ একদিকে বেশি ভারী হলে বা কাঠি সঠিকভাবে না বসলে ঘুড়ি ভালো উড়ত না।
অনেক পুরনো কারিগর শুধু ঘুড়ি দেখেই বুঝতে পারতেন কোথায় সমস্যা হয়েছে।
প্রশ্ন: ঘুড়ির বিভিন্ন আকৃতি কি শুধু সৌন্দর্যের জন্য?
অরিন্দম:
না। আকৃতির সঙ্গে উড়ার ধরনও বদলে যায়।
কিছু ঘুড়ি দ্রুত ওঠে, কিছু বেশি স্থির থাকে, কিছু বাতাসে বেশি দুলতে থাকে। আকার ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ঘুড়ির আচরণ পরিবর্তিত হয়।
তাই ঘুড়ি তৈরি আসলে একটি ব্যবহারিক জ্ঞান। যারা বহু বছর ধরে তৈরি করেছেন, তাঁদের হাতে এই জ্ঞান অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এসেছে।
প্রশ্ন: শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্যে কি বিজ্ঞান শেখার সুযোগ রয়েছে?
অরিন্দম:
অসাধারণ সুযোগ রয়েছে।
ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে শিশুরা বুঝতে পারে বাতাস কীভাবে কাজ করে, টান কী, ভারসাম্য কী, ওজনের পার্থক্য কীভাবে আচরণ বদলে দেয়।
একটি ঘুড়ি কেন মাটিতে পড়ে গেল, কেন হঠাৎ ওপরে উঠে গেল, কেন বাতাসের দিক বদলালে ঘুড়ির অবস্থাও বদলে গেল—এসব প্রশ্ন থেকেই বিজ্ঞান সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হতে পারে।
শিক্ষকরা যদি ঘুড়িকে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে শিশুরা খেলতে খেলতেই অনেক কিছু শিখতে পারে।
প্রশ্ন: আগে কি গ্রামবাংলায় ঘুড়ি তৈরির আলাদা কারিগর ছিলেন?
অরিন্দম:
কিছু এলাকায় ছিলেন। আবার অনেক পরিবার নিজেরাই ঘুড়ি তৈরি করত।
যেসব অঞ্চলে ঘুড়ি ওড়ানোর সংস্কৃতি বেশি ছিল, সেখানে ছোট আকারের ঘুড়ির ব্যবসা তৈরি হয়েছিল। বাজারে বিভিন্ন মাপ ও নকশার ঘুড়ি বিক্রি হতো।
কারও দোকানে শুধু ঘুড়ি, সুতো, লাটাই ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী পাওয়া যেত।
প্রশ্ন: ঘুড়ি তৈরির সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সম্পর্ক কতটা ছিল?
অরিন্দম:
ছোট হলেও সম্পর্ক ছিল।
ঘুড়ির জন্য কাগজ লাগত, বাঁশ লাগত, সুতো লাগত, আঠা লাগত। ফলে একাধিক পণ্যের চাহিদা তৈরি হতো।
আবার উৎসবের সময় বিক্রি বেড়ে যেত। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করত।
আজও যদি ঘুড়িকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উৎসব, প্রতিযোগিতা এবং কারুশিল্পের বাজার তৈরি করা যায়, তাহলে ছোট উদ্যোক্তারা উপকৃত হতে পারেন।
প্রশ্ন: আধুনিক রেডিমেড ঘুড়ি কি হাতে তৈরি ঘুড়ির জায়গা নিয়ে নিয়েছে?
অরিন্দম:
অনেকটাই। বাজারে এখন বিভিন্ন ধরনের তৈরি ঘুড়ি পাওয়া যায়।
এর সুবিধা হলো দ্রুত কিনে ওড়ানো যায়। কিন্তু হাতে তৈরি ঘুড়ির যে ব্যক্তিগত আনন্দ, সেটি আলাদা।
নিজের হাতে বাঁশ কেটে কাঠামো তৈরি করা, কাগজ লাগানো, শুকিয়ে নেওয়া—পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি অভিজ্ঞতা।
আমি মনে করি, দুটোই থাকতে পারে। রেডিমেড ঘুড়ি থাকবে, আবার হাতে তৈরি ঘুড়ির ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করা দরকার।
প্রশ্ন: মোবাইল ফোন কি ঘুড়ির জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে?
অরিন্দম:
নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলেছে।
আগে অবসর সময়ে শিশুদের হাতে অনেক সময় থাকত। এখন মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখা, গেম খেলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার—এসবের কারণে বাইরে খেলার সময় কমেছে।
তবে প্রযুক্তিকে শত্রু হিসেবে দেখলে হবে না। মোবাইলের মাধ্যমেই এখন ঘুড়ি তৈরির ভিডিও, প্রতিযোগিতার খবর, নতুন নকশা এবং প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
অর্থাৎ প্রযুক্তি ঘুড়িকে শেষও করতে পারে, আবার নতুনভাবে জনপ্রিয়ও করতে পারে।
প্রশ্ন: ঘুড়ির সঙ্গে পারিবারিক স্মৃতির সম্পর্ক কী?
অরিন্দম:
খুব গভীর।
অনেক বাবা এখনও বলেন—“ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতাম।” কেউ বলেন—“দাদুর কাছ থেকে লাটাই ধরতে শিখেছি।”
ঘুড়ি এমন একটি জিনিস যা প্রজন্মের স্মৃতি বহন করে।
একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের হাতে লাটাই তুলে দেন, তখন আসলে শুধু খেলা শেখান না; নিজের শৈশবের একটি অংশও সন্তানের হাতে তুলে দেন।
প্রশ্ন: ঘুড়ি ওড়ানোর সামাজিক দিকটি একটু ব্যাখ্যা করবেন?
অরিন্দম:
আগে ঘুড়ি ওড়ানো অনেক সময় দলগত আনন্দের বিষয় ছিল।
একজন ঘুড়ি উড়াতেন, আরেকজন সুতো সামলাতেন, কেউ লাটাই ধরতেন। আশেপাশে আরও অনেকে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
সেখানে প্রতিযোগিতা থাকলেও বন্ধুত্বও থাকত। ছোটরা বড়দের কাছ থেকে শিখত।
আজকের একাকী ডিজিটাল বিনোদনের তুলনায় এই দলগত অভিজ্ঞতার সামাজিক মূল্য অনেক বেশি।
প্রশ্ন: ঘুড়ি তৈরিতে বাঁশের গুরুত্ব কতটা?
অরিন্দম:
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাঁশ হালকা এবং নমনীয় হওয়ায় ঘুড়ির কাঠামো তৈরিতে উপযোগী। তবে সব বাঁশ সমান নয়। সরু, হালকা এবং উপযুক্তভাবে শুকনো বাঁশ দরকার।
কাঠির পুরুত্ব ও নমনীয়তা ঠিক না হলে ঘুড়ির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
অভিজ্ঞ কারিগর বাঁশের গুণ বুঝে নিতে পারেন। নতুনদের সেই দক্ষতা অর্জন করতে সময় লাগে।
প্রশ্ন: হাতে ঘুড়ি বানানো শেখাতে গেলে প্রথমে কী শেখানো উচিত?
অরিন্দম:
প্রথমে নিরাপদভাবে উপকরণ ব্যবহার শেখানো উচিত। তারপর বাঁশের কাঠামো তৈরি, মাপ নেওয়া এবং কাগজ লাগানোর কৌশল শেখানো যায়।
শিশুদের ক্ষেত্রে খুব ধারালো সরঞ্জাম ব্যবহার না করাই ভালো। বড়দের সহায়তায় কাজ শেখানো উচিত।
এরপর ধীরে ধীরে ভারসাম্য ও উড়ানোর কৌশল বোঝানো যায়।
প্রশ্ন: ঘুড়ি তৈরিকে কি স্কুলের কারুশিল্প শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব?
অরিন্দম:
খুব সহজেই সম্ভব।
স্কুলে বিজ্ঞান ও শিল্পকলাকে একসঙ্গে শেখানোর জন্য ঘুড়ি একটি চমৎকার প্রকল্প হতে পারে।
শিক্ষার্থীরা প্রথমে ঘুড়ির নকশা আঁকবে। তারপর তার কাঠামো তৈরি করবে। শেষে বাতাসে পরীক্ষা করবে।
এখানে গণিত, পদার্থবিদ্যা, শিল্প এবং দলগত কাজ—সবকিছুই যুক্ত করা যায়।
প্রশ্ন: ঘুড়ির নকশায় কি স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায়?
অরিন্দম:
অবশ্যই। বিভিন্ন অঞ্চলে রঙ ও নকশার পছন্দ আলাদা হতে পারে।
কেউ ফুলের নকশা পছন্দ করেন, কেউ জ্যামিতিক নকশা, কেউ আবার বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করেন।
এভাবে ঘুড়ি একটি ছোট আকারের লোকশিল্পে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন: এখনকার ঘুড়িতে কী ধরনের নতুনত্ব এসেছে?
অরিন্দম:
নতুন ধরনের কাগজ, নকশা এবং আকার এসেছে। কেউ কেউ বিশেষ প্রদর্শনী বা উৎসবের জন্য বড় আকারের ঘুড়ি তৈরি করছেন।
অনেকে আবার ঐতিহ্যবাহী নকশাকে আধুনিক রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন ডিজাইন করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ির নকশাও এখন মানুষ সহজে দেখতে পাচ্ছেন।
প্রশ্ন: ঘুড়ি প্রতিযোগিতা কি এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে?
অরিন্দম:
অবশ্যই।
স্থানীয় স্তরে ঘুড়ি উৎসব হলে কারিগররা ঘুড়ি বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। শিশুরা অংশ নেবে, পরিবার আসবে, স্থানীয় ব্যবসাও উপকৃত হবে।
তবে প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের চলাচল, বিদ্যুৎ লাইন এবং পাখির নিরাপত্তার বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
প্রশ্ন: ঘুড়ি ওড়ানোর ক্ষেত্রে পাখিদের নিরাপত্তা নিয়ে কী বলবেন?
অরিন্দম:
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পাখি চলাচল করে এমন এলাকায় দায়িত্বহীনভাবে সুতো ব্যবহার করা উচিত নয়। ব্যবহারের পর সুতো যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা ঠিক নয়।
বিশেষ করে এমন সুতো ব্যবহার করা উচিত নয় যা পাখি বা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
ঘুড়ি আনন্দের জিনিস। সেই আনন্দ যেন অন্য প্রাণীর ক্ষতির কারণ না হয়।
প্রশ্ন: ঘুড়ির সুতো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কী ধরনের সতর্কতা নিতে পারেন?
অরিন্দম:
প্রথমত, মানুষের চলাচলের রাস্তা বা বিদ্যুৎ লাইনের কাছে ঘুড়ি ওড়ানো উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, ঘুড়ি ওড়ানোর পর অব্যবহৃত সুতো সংগ্রহ করে যথাযথভাবে ফেলে দিতে হবে।
তৃতীয়ত, ছোট শিশুদের একা ঘুড়ি ওড়াতে না দিয়ে বড়দের নজরদারি থাকা উচিত।
খেলাধুলার আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও থাকা দরকার।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন ঘুড়ি শিল্পকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব?
অরিন্দম:
অবশ্যই।
কোনো অঞ্চলে যদি ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি তৈরির ইতিহাস থাকে, তাহলে সেখানে ঘুড়ি উৎসব করা যায়। পর্যটকেরা ঘুড়ি তৈরি দেখতে পারেন, নিজের হাতে ঘুড়ি বানাতে পারেন এবং স্থানীয় কারিগরের কাছ থেকে কিনতে পারেন।
এতে কারিগর সরাসরি অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাবেন।
লোকশিল্পের বাজার তৈরি করতে হলে শুধু পণ্য বিক্রি নয়, অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশ্ন: ঘুড়ি তৈরির কারিগরদের জন্য কী ধরনের সহায়তা দরকার?
অরিন্দম:
প্রথমত বাজার দরকার। ভালো ঘুড়ি তৈরি করেও যদি বিক্রি না হয়, তাহলে কারিগর পেশা ধরে রাখতে পারবেন না।
দ্বিতীয়ত প্রশিক্ষণ ও নতুন ডিজাইনের সঙ্গে পরিচয় দরকার।
তৃতীয়ত স্থানীয় উৎসব ও মেলার মাধ্যমে সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি করা দরকার।
আর চতুর্থত, এই কাজের ইতিহাস নথিবদ্ধ করা দরকার। কারণ অনেক পুরনো কারিগর তাঁদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান নিয়ে চলে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মকে ঘুড়ির প্রতি আকৃষ্ট করতে কী করা যায়?
অরিন্দম:
ঘুড়িকে শুধু “পুরনো খেলা” হিসেবে উপস্থাপন করলে হবে না।
এটিকে বিজ্ঞান, শিল্প, প্রতিযোগিতা এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
স্কুলে ঘুড়ি তৈরির কর্মশালা হতে পারে। পাড়ায় ছোট ঘুড়ি উৎসব হতে পারে। শিশুরা নিজের নকশা তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তাদের হাতে বাস্তব কাজ দিতে হবে।
নিজের হাতে তৈরি একটি ঘুড়ি যখন আকাশে উঠবে, সেই আনন্দ মোবাইলের পর্দায় সহজে পাওয়া যায় না।
প্রশ্ন: ঘুড়ি কি গ্রামীণ সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ হতে পারে?
অরিন্দম:
নিশ্চয়ই।
একজন কারিগর যদি সুন্দর নকশার ঘুড়ি তৈরি করেন, সেটি স্থানীয় বাজারের বাইরে বিক্রি করা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দিয়ে অর্ডার নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ উৎসবের জন্য থিমভিত্তিক ঘুড়ি তৈরি করা যায়। শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক ঘুড়ি তৈরি করা যায়।
অর্থাৎ ছোট একটি কারুশিল্পও সঠিক পরিকল্পনায় ক্ষুদ্র উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন: আপনার মতে ঘুড়ির সবচেয়ে বড় শক্তি কোথায়?
অরিন্দম:
এর সরলতায়।
আজ আমরা এমন বিনোদনে অভ্যস্ত যেখানে অনেক টাকা খরচ হয়, বিদ্যুৎ লাগে, প্রযুক্তি লাগে। ঘুড়ির জন্য এত কিছু দরকার নেই।
কাগজ, বাঁশ, সুতো আর বাতাস—এই কয়েকটি জিনিস দিয়েই একজন মানুষ আকাশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন।
এটাই ঘুড়ির সৌন্দর্য।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। আপনি যদি আজকের শিশুদের উদ্দেশে কিছু বলতে চান, কী বলবেন?
অরিন্দম:
আমি বলব—মোবাইল ব্যবহার করুন, প্রযুক্তি শিখুন, কিন্তু আকাশের দিকে তাকানো ভুলবেন না।
নিজের হাতে কিছু বানানোর আনন্দ অনুভব করুন। একটি কাগজের ঘুড়ি তৈরি করুন। ভুল হলে আবার বানান। বাতাস বুঝুন। অপেক্ষা করুন। তারপর একদিন যখন দেখবেন আপনার নিজের হাতে তৈরি ঘুড়ি আকাশে উঠেছে, তখন বুঝবেন সৃজনশীলতার আনন্দ কতটা গভীর।
আর বড়দের বলব—শিশুদের শুধু পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে আটকে রাখবেন না। তাদের মাঠে যেতে দিন, প্রকৃতি দেখতে দিন, হাতে কাজ করতে দিন।
একটি ঘুড়ি হয়তো পৃথিবী বদলাবে না। কিন্তু একটি শিশুর আকাশ দেখার অভ্যাস বদলে দিতে পারে।
সাক্ষাৎকার-পরবর্তী কথা
ঘুড়ি হয়তো আজ আর প্রতিটি বিকেলের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী নয়। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি, কারিগরি দক্ষতা এবং সামাজিক আনন্দ এখনও মূল্যবান।
একটি ঘুড়ি তৈরির মধ্যে রয়েছে সরল উপকরণ দিয়ে কিছু সৃষ্টি করার শিক্ষা। ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্যে রয়েছে বাতাসকে বোঝার চেষ্টা। আর একসঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্যে রয়েছে বন্ধুত্ব ও সামাজিকতার অনুভূতি।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ঘুড়ির রূপ বদলাতে পারে। কিন্তু আকাশের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বদলায় না।
তাই ঘুড়িকে শুধুই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি হিসেবে না দেখে নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানচর্চা, কারুশিল্প, সৃজনশীলতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এই পুরনো ঐতিহ্য নতুন জীবন পেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ঘুড়ি আমাদের একটি সহজ কথাই মনে করিয়ে দেয়—মাটিতে দাঁড়িয়েও মানুষ আকাশ ছুঁতে পারে, যদি তার হাতে থাকে একটু কাগজ, কিছু সুতো আর উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন।













Leave a Reply