হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘নবকাঙ্করি’: গুটির চালে বুদ্ধি ও কৌশলের লড়াই।।

আগেকার দিনে অবসর কাটানোর জন্য সব সময় মাঠে দৌড়ঝাঁপের প্রয়োজন হতো না। বাড়ির উঠোনে, বারান্দায় কিংবা গাছের ছায়ায় বসে ছোট ছোট গুটি দিয়েই জমে উঠত বুদ্ধির খেলা। প্রতিটি চালের সঙ্গে বদলে যেত খেলার পরিস্থিতি। কখনও প্রতিপক্ষকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা, কখনও নিজের গুটি বাঁচানো—এভাবেই চলত জয়ের লড়াই।

এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী কৌশলভিত্তিক খেলাগুলির মধ্যে একটি হল ‘নবকাঙ্করি’, যা আন্তর্জাতিকভাবে Nine Men’s Morris নামে পরিচিত। তবে এই নামের খেলাটির সঙ্গে ভারতীয় স্থানীয় খেলাগুলির সম্পর্ক এবং অঞ্চলভেদে নিয়মের পার্থক্য বুঝে নেওয়া জরুরি। এখানে নবকাঙ্করির পরিচিত বোর্ড-সংস্করণকে কেন্দ্র করে খেলার নিয়ম ও গুরুত্ব তুলে ধরা হল।

নবকাঙ্করি কী?

নবকাঙ্করি একটি দুই খেলোয়াড়ের কৌশলভিত্তিক বোর্ড গেম। এর প্রচলিত আন্তর্জাতিক সংস্করণে প্রতিটি খেলোয়াড়ের কাছে থাকে নয়টি করে গুটি। বোর্ডে আঁকা রেখা ও সংযোগস্থল ধরে গুটিগুলি বসানো এবং সরানো হয়।

এই খেলায় মূল লক্ষ্য হল নিজের তিনটি গুটিকে একই সরলরেখায় এনে একটি ‘মিল’ তৈরি করা। নির্দিষ্ট নিয়মে মিল তৈরি করতে পারলে প্রতিপক্ষের একটি গুটি সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। প্রতিপক্ষের গুটি কমিয়ে তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়াই কৌশলের অংশ, যেখানে সে আর কার্যকরভাবে চাল দিতে পারে না।

খেলাটি দেখতে সহজ হলেও প্রতিটি চালের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়। শুধু নিজের মিল তৈরি করলেই হয় না; প্রতিপক্ষকে একই সুযোগ দেওয়া যাবে কি না, সেটিও ভাবতে হয়।

খেলার ইতিহাস

নয়টি গুটি ও রেখাবিশিষ্ট বোর্ডের এই ধরনের খেলা ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে এই ধরনের বোর্ডের চিহ্ন পাওয়া যাওয়ার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট বোর্ডের উৎপত্তি, সময়কাল এবং বিস্তার নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশেও গুটি ও রেখার সাহায্যে নানা কৌশলভিত্তিক খেলা প্রচলিত ছিল। মাটিতে রেখা টেনে বা কাগজে বোর্ড এঁকে এমন খেলা খেলার রীতি বহু সমাজে দেখা যায়। তবে সব স্থানীয় গুটি-খেলাকে নবকাঙ্করি বা Nine Men’s Morris-এর একই সংস্করণ বলা ঠিক নয়। বোর্ডের নকশা ও নিয়মে পার্থক্য থাকতে পারে।

কীভাবে খেলতে হয়?

এখানে Nine Men’s Morris-এর প্রচলিত নিয়মের সহজ রূপ তুলে ধরা হল।

প্রথম ধাপ: বোর্ড তৈরি

বোর্ডে তিনটি পরস্পরের মধ্যে থাকা বর্গাকার রেখা এবং নির্দিষ্ট সংযোগরেখা থাকে। রেখাগুলির সংযোগস্থলগুলি গুটি বসানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাগজে বোর্ড এঁকে নেওয়া যায় অথবা মাটিতে রেখা টেনেও তৈরি করা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: গুটি বসানো

দুই খেলোয়াড়ের কাছে নয়টি করে গুটি থাকে। খেলোয়াড়রা পালা করে বোর্ডের খালি সংযোগস্থলে একটি করে গুটি বসায়। এই পর্যায়ে এমন জায়গা বেছে নেওয়া জরুরি, যেখান থেকে ভবিষ্যতে মিল তৈরি করা সম্ভব।

তৃতীয় ধাপ: মিল তৈরি

একজন খেলোয়াড়ের তিনটি গুটি বোর্ডের নির্দিষ্ট সরলরেখায় পাশাপাশি বসলে একটি মিল তৈরি হয়। প্রচলিত নিয়মে মিল তৈরি করতে পারলে প্রতিপক্ষের একটি গুটি সরানোর সুযোগ পাওয়া যায়। তবে প্রতিপক্ষের গুটি আগে থেকেই মিলে থাকলে, সাধারণত অন্য গুটি সরানোর চেষ্টা করতে হয়—যদি না অন্য কোনও গুটি সরানোর সুযোগ না থাকে।

চতুর্থ ধাপ: গুটি সরানো

সব গুটি বসানো হয়ে গেলে খেলোয়াড়রা পালা করে নিজেদের গুটি সংযুক্ত রেখা ধরে পাশের খালি সংযোগস্থলে সরান। এই পর্যায়ে নতুন মিল তৈরি করা, আগের মিল ভেঙে আবার তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য চাল বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চম ধাপ: জয় নির্ধারণ

প্রচলিত নিয়মে কোনও খেলোয়াড়ের গুটি কমে তিনটির নিচে নেমে গেলে, অথবা তার আর বৈধ চাল দেওয়ার সুযোগ না থাকলে সে পরাজিত হতে পারে। কিছু সংস্করণে তিনটি গুটি অবশিষ্ট থাকলে বিশেষভাবে গুটি সরানোর নিয়ম থাকে। তাই খেলা শুরু করার আগে কোন নিয়ম ব্যবহার করা হবে, তা ঠিক করে নেওয়া উচিত।

জয়ের কৌশল

নবকাঙ্করিতে সাফল্যের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল: সব সংযোগস্থলের গুরুত্ব সমান নয়। কিছু জায়গা থেকে একাধিক দিকে চাল দেওয়া যায়। সেই জায়গাগুলির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে সুবিধা হয়।

দুটি সম্ভাবনা তৈরি: এমন অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করতে হয়, যাতে পরবর্তী চালগুলিতে একাধিক মিলের সুযোগ থাকে। প্রতিপক্ষ একটি পথ বন্ধ করলেও অন্য পথ খোলা থাকতে পারে।

প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বোঝা: প্রতিপক্ষ কোথায় তৃতীয় গুটি বসিয়ে মিল তৈরি করতে পারে, তা আগে থেকে অনুমান করতে হয়। প্রয়োজনে সেই সংযোগস্থল দখল করে তার পরিকল্পনা আটকানো যায়।

গুটি রক্ষা: মিল তৈরি করার জন্য নিজের গুটিগুলিকে এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রতিপক্ষের আক্রমণের সুযোগ না তৈরি হয়।

শিশুদের জন্য কী উপকার হতে পারে?

নবকাঙ্করির মতো বোর্ড গেম শিশুদের পরিকল্পনা ও যুক্তির অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে।

  • মনোযোগ: বোর্ডের গুটি ও খালি স্থানগুলির দিকে নজর রাখতে হয়।
  • পরিকল্পনা: একটি চালের পর কী হতে পারে, তা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
  • ধৈর্য: নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা এবং প্রতিপক্ষের চাল মন দিয়ে দেখা জরুরি।
  • সমস্যা সমাধান: প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা আটকানোর জন্য বিকল্প চাল খুঁজতে হয়।
  • সৌজন্যবোধ: নিয়ম মেনে খেলা, জয়-পরাজয় গ্রহণ করা এবং প্রতিপক্ষকে সম্মান করার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে কোনও একটি বোর্ড গেম খেললেই বুদ্ধিমত্তা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যায়, এমন দাবি করা ঠিক নয়। এটি যুক্তি ও মনোযোগের চর্চার একটি আনন্দদায়ক উপায়।

আধুনিক সময়ে এই খেলাকে ফিরিয়ে আনার উপায়

বর্তমানে অনেক শিশু ডিজিটাল গেমের সঙ্গে পরিচিত হলেও মুখোমুখি বসে বোর্ড গেম খেলার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম পায়। নবকাঙ্করির মতো খেলা সহজ উপকরণ দিয়ে শেখানো সম্ভব। একটি কাগজ, পেনসিল এবং দুই রঙের গুটি থাকলেই শুরু করা যায়।

বিদ্যালয়ের গণিত ক্লাব, গ্রন্থাগার কিংবা পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কৌশলভিত্তিক বোর্ড গেমের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও অংশ নিতে পারেন। তবে স্থানীয় কোনও খেলা নবকাঙ্করি নামে পরিচিত হলে তার নিজস্ব বোর্ড ও নিয়মও নথিভুক্ত করা জরুরি।

উপসংহার

নবকাঙ্করি একটি কৌশলভিত্তিক বোর্ড গেম, যেখানে গুটির সংখ্যা নয়, বরং সঠিক অবস্থান নির্বাচন ও প্রতিপক্ষের চাল বোঝার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। অল্প উপকরণে খেলা যায় বলে এটি সহজেই ঘরে বা বিদ্যালয়ে শেখানো সম্ভব।

ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হলে শুধু খেলার নাম জানলেই চলবে না; তার সঠিক নিয়ম, স্থানীয় রূপ এবং ইতিহাসও নথিভুক্ত করা দরকার। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ একসঙ্গে উদ্যোগ নিলে এমন কৌশলভিত্তিক খেলাগুলি নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যসূত্র: Nine Men’s Morris-এর প্রচলিত বোর্ড ও নিয়মাবলি এবং ঐতিহ্যবাহী কৌশলভিত্তিক গুটি-খেলা সম্পর্কিত প্রকাশিত বিবরণ। ভারতীয় স্থানীয় সংস্করণে নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *