
এক সময় গ্রামের মেঠো পথ, স্কুলের মাঠ কিংবা বাড়ির উঠোনে ছোট ছোট কাচের গুলি নিয়ে শিশুদের খেলতে দেখা যেত। রঙিন গুলির ঝলক, মাটিতে ছোট গর্ত তৈরি করা এবং নিখুঁত নিশানায় প্রতিপক্ষের গুলিকে আঘাত করার আনন্দ—সব মিলিয়ে এই খেলা ছিল শৈশবের এক পরিচিত ছবি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই খেলাকে ‘কানচা’, ‘কঞ্চে’ কিংবা মার্বেল খেলা বলা হয়।
বাংলায় কাচের গুলি খেলা নামেও এটি পরিচিত। তবে এই খেলা আগেই আমাদের ধারাবাহিকের একটি পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাই পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে আজকের লেখায় অন্য একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা তুলে ধরা হল—‘নবকাঙ্করি’ নয়, এবার ‘পাল্লাঙ্কুঝি’।
পাল্লাঙ্কুঝি কী?
পাল্লাঙ্কুঝি দক্ষিণ ভারতের, বিশেষত তামিলনাড়ু অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী গুটি-ভিত্তিক খেলা। এটি সাধারণত কাঠের তৈরি বিশেষ বোর্ডে খেলা হয়। বোর্ডে একাধিক ছোট গর্ত থাকে, যেখানে বীজ, কড়ি বা ছোট গুটি রাখা হয়। খেলোয়াড়রা পালা করে গর্ত থেকে গুটি তুলে নির্দিষ্ট নিয়মে অন্য গর্তগুলিতে বণ্টন করেন।
খেলাটির মূল আকর্ষণ হল গুটি বণ্টনের হিসাব, পরবর্তী চালের পরিকল্পনা এবং প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সুযোগ বোঝা। এই কারণে পাল্লাঙ্কুঝি শুধু বিনোদন নয়, গণনা ও কৌশলের অনুশীলন হিসেবেও পরিচিত।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
পাল্লাঙ্কুঝি দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী গৃহস্থালি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষত নারীদের মধ্যে এই খেলার প্রচলনের কথা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিবরণে পাওয়া যায়। বাড়িতে অবসর কাটানোর সময়, পারিবারিক সমাবেশে কিংবা উৎসবের পরিবেশে এই ধরনের গুটি-খেলা খেলা হতো।
এই খেলায় ব্যবহৃত বোর্ড অনেক সময় কাঠের তৈরি হলেও স্থানীয়ভাবে মাটিতে গর্ত করেও অনুরূপ খেলা খেলার রীতি থাকতে পারে। বোর্ডের গর্তের সংখ্যা, ব্যবহৃত গুটির পরিমাণ এবং গুটি সংগ্রহের নিয়ম অঞ্চলভেদে বদলায়। তাই পাল্লাঙ্কুঝির সব সংস্করণকে এক নিয়মে বেঁধে দেখা যায় না।
কীভাবে খেলা হয়?
পাল্লাঙ্কুঝির একটি পরিচিত সংস্করণে দুই সারিতে সাতটি করে গর্ত থাকে। অর্থাৎ বোর্ডে মোট চোদ্দোটি গর্ত থাকে। প্রতিটি গর্তে সমান সংখ্যক বীজ বা গুটি রাখা হয়। তবে নির্দিষ্ট সংস্করণ অনুযায়ী গুটির সংখ্যা ও খেলার নিয়ম আলাদা হতে পারে।
প্রথম ধাপ: বোর্ড সাজানো
বোর্ডের প্রতিটি গর্তে নির্দিষ্ট সংখ্যক বীজ বা গুটি রাখা হয়। দুই খেলোয়াড় সাধারণত বোর্ডের বিপরীত দিকে বসেন।
দ্বিতীয় ধাপ: গুটি তোলা
নিজের পালায় খেলোয়াড় একটি গর্ত থেকে সমস্ত গুটি তুলে নেন। এরপর নির্ধারিত দিক অনুসারে পরবর্তী গর্তগুলিতে একে একে একটি করে গুটি রাখতে থাকেন।
তৃতীয় ধাপ: পরবর্তী চালের হিসাব
গুটি বণ্টনের সময় কোন গর্তে কতটি গুটি থাকবে এবং শেষ গুটিটি কোথায় পড়বে, তা গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে শেষ গুটির অবস্থান থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হয়।
চতুর্থ ধাপ: গুটি সংগ্রহ
কোন অবস্থায় গুটি সংগ্রহ করা যাবে, তা পাল্লাঙ্কুঝির নির্দিষ্ট সংস্করণের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। খেলোয়াড়দের শুরুতেই এই নিয়ম স্থির করে নেওয়া উচিত।
পঞ্চম ধাপ: খেলার ফলাফল
খেলার শেষে যে খেলোয়াড় বেশি গুটি সংগ্রহ করতে পারবেন, প্রচলিত অনেক সংস্করণে তাঁকেই বিজয়ী ধরা হয়। তবে স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী ফলাফল নির্ধারণের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
পাল্লাঙ্কুঝির আকর্ষণ কোথায়?
এই খেলায় দৌড়ঝাঁপ নেই, কিন্তু প্রতিটি চালের মধ্যে রয়েছে হিসাব ও পরিকল্পনা। কোন গর্ত থেকে গুটি তোলা হবে, গুটিগুলি কোথায় বণ্টিত হবে এবং সেই চালের ফলে প্রতিপক্ষ কী সুবিধা পেতে পারে—সবই ভেবে দেখতে হয়।
এখানে দ্রুত চাল দেওয়ার চেয়ে সঠিক চাল দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একটি ছোট সিদ্ধান্ত পরবর্তী কয়েকটি চালের ফল বদলে দিতে পারে। তাই খেলাটি ধৈর্যশীল ও মনোযোগী খেলোয়াড়দের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
শিশুদের জন্য সম্ভাব্য উপকারিতা
পাল্লাঙ্কুঝি শিশুদের গণনা, পরিকল্পনা এবং মনোযোগের অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে।
- গণনার দক্ষতা: গুটি তোলা ও বণ্টনের সময় সংখ্যা গুনতে হয়।
- পরিকল্পনা: পরবর্তী চালের সম্ভাব্য ফল নিয়ে ভাবতে হয়।
- মনোযোগ: বোর্ডের প্রতিটি গর্তে কত গুটি আছে, তা মনে রাখতে হয়।
- ধৈর্য: নিজের পালা এবং প্রতিপক্ষের চালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
- সামাজিক যোগাযোগ: মুখোমুখি বসে খেলায় নিয়ম মানা ও সৌজন্য বজায় রাখার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
তবে এই খেলাকে শিশুর বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর নিশ্চিত উপায় বলা যায় না। এটি শেখা ও বিনোদনের একটি সহায়ক মাধ্যম।
আধুনিক সময়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণ
বর্তমানে ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তার ঘটলেও পাল্লাঙ্কুঝির মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাকে সহজেই নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করানো সম্ভব। কাঠের বোর্ড না থাকলে কাগজে গর্তের নকশা এঁকে এবং ছোট বীজ বা বোতামের ঢাকনা ব্যবহার করেও প্রাথমিকভাবে খেলা শেখানো যায়।
বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকসংস্কৃতি প্রদর্শনী এবং পারিবারিক মিলনমেলায় এই ধরনের খেলা রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রবীণদের কাছ থেকে স্থানীয় নিয়ম সংগ্রহ করে নথিভুক্ত করলে ঐতিহ্যের বিভিন্ন রূপ সংরক্ষণ করা সম্ভব।
উপসংহার
পাল্লাঙ্কুঝি এমন একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা, যেখানে অল্প কয়েকটি গুটি দিয়েই তৈরি হয় হিসাব, কৌশল ও ধৈর্যের আকর্ষণীয় লড়াই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ ভারতের লোকসংস্কৃতি ও পারিবারিক বিনোদনের ইতিহাস।
ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু স্মৃতিচারণ নয়, নিয়ম শেখানো এবং বাস্তবে খেলার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। পরিবার, বিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এগিয়ে এলে পাল্লাঙ্কুঝির মতো খেলাগুলি নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী বোর্ড গেম পাল্লাঙ্কুঝি সম্পর্কে প্রকাশিত সাংস্কৃতিক বিবরণ ও প্রচলিত খেলার নিয়ম। অঞ্চলভেদে নিয়মে পার্থক্য থাকতে পারে।












Leave a Reply