দুর্গাপুজোর শৈশবের স্মৃতি: হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর মায়া

দুর্গাপুজো মানেই আনন্দ, উৎসব আর ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুজোর আনন্দের রং যেন একটু একটু করে বদলে যায়। ছোটবেলায় যে পুজো ছিল অফুরন্ত উচ্ছ্বাসের, বড়বেলায় সেই পুজোই কখনও হয়ে ওঠে স্মৃতির জানালায় উঁকি দেওয়া এক মায়াময় অনুভূতি। আজও শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ালে, কাশফুলের দোল চোখে পড়লে কিংবা দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে এলে মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা। মনে হয়, আবার যদি ফিরে পাওয়া যেত সেই নির্ভার দিনগুলো!

### নতুন জামার অপেক্ষায় দিন গোনা

ছোটবেলায় দুর্গাপুজোর আনন্দ শুরু হতো পুজোর অনেক আগে থেকেই। তখন ক্যালেন্ডারের পাতায় পুজোর দিন গুনতে গুনতে মনে হতো, সময় যেন কিছুতেই এগোতে চাইছে না। স্কুলে পড়াশোনার ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা চলত—কার কী জামা হবে, কে কোথায় ঠাকুর দেখতে যাবে, আর পুজোর ছুটিতে কতটা আনন্দ করা যাবে।

নতুন জামা কেনার দিনটি ছিল বিশেষ আনন্দের। বাবা-মায়ের হাত ধরে বাজারে যাওয়া, দোকানের রঙিন পোশাকের দিকে তাকিয়ে থাকা, পছন্দের জামাটি হাতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়া—এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই ছিল শৈশবের বড় প্রাপ্তি।

অনেক বাড়িতে নতুন পোশাক কেনা হতো একসঙ্গে। কারও জন্য পাঞ্জাবি, কারও জন্য ফ্রক, কারও জন্য নতুন জুতো। বাড়ি ফিরে বারবার জামা পরে আয়নায় নিজেকে দেখা এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে কেমন লাগছে জানতে চাওয়ার মধ্যেও ছিল একরাশ আনন্দ।

আজ হয়তো আলমারি ভর্তি পোশাক, অথচ সেই শৈশবের একটি নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ আর ফিরে আসে না। কারণ তখন আনন্দের মূল্য নির্ধারিত হতো না পোশাকের দাম দিয়ে; বরং ভালোবাসা আর অপেক্ষার গভীরতা দিয়েই তৈরি হতো উৎসবের প্রকৃত সুখ।

### পাড়ার পুজোই ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ

ছোটবেলায় পুজো মানেই ছিল নিজের পাড়ার মণ্ডপ। বাঁশ, কাপড়, রঙিন কাগজ আর আলো দিয়ে তৈরি সেই মণ্ডপের সৌন্দর্য ছিল অন্যরকম। মণ্ডপ তৈরির কাজ দেখতে দেখতে দিন কেটে যেত। পাড়ার কাকু-জ্যাঠাদের ব্যস্ততা, কিশোরদের সাহায্য করা, আর শিশুদের উৎসুক চোখে সবকিছু দেখা—সব মিলিয়ে পুজোর আগেই জমে উঠত উৎসবের পরিবেশ।

তখন বড় বড় থিমের মণ্ডপ কিংবা দূরদূরান্তের বিখ্যাত পুজো দেখার সুযোগ সবার ছিল না। কিন্তু তাতে আনন্দের কোনও অভাব ছিল না। নিজের পাড়ার প্রতিমাটিই মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রতিমা।

সন্ধ্যা নামলেই মণ্ডপের চারপাশে ভিড় জমত। রঙিন আলোয় আলোকিত রাস্তা, ঢাকের শব্দ আর মাইকে ভেসে আসা গান মনকে অন্য জগতে নিয়ে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করা, পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ছিল প্রতিদিনের আনন্দ।

পাড়ার পুজো ছিল এক পরিবারের মতো। ধনী-গরিবের ব্যবধান ভুলে সবাই একসঙ্গে উৎসবে শামিল হতেন। কারও বাড়িতে অতিথি এলে প্রতিবেশীরাও তাঁদের আপ্যায়ন করতেন। আজকের ব্যস্ত জীবনে সেই সহজ আন্তরিকতা অনেক সময় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

### ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সেই উত্তেজনা

ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকে শুরু হতো ঠাকুর দেখার আসল অভিযান। বাবা-মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে পড়া, কখনও আত্মীয়দের সঙ্গে, কখনও বন্ধুদের পরিবারের সঙ্গে প্যান্ডেল ঘোরা—সবকিছুতেই ছিল নতুনত্বের স্বাদ।

তখন যানজট কিংবা দীর্ঘ লাইন নিয়ে খুব বেশি ভাবনা ছিল না। অনেক সময় পায়ে হেঁটেই একের পর এক মণ্ডপে পৌঁছে যেতাম। রাস্তার ধারে খাবারের দোকান, খেলনা বিক্রেতা, বেলুন হাতে শিশু আর মানুষের হাসিমুখ মিলিয়ে তৈরি হতো এক আনন্দময় পৃথিবী।

পছন্দের খাবার কেনার জন্য আবদার ছিল অবধারিত। কখনও ফুচকা, কখনও ঘুগনি, কখনও জিলিপি কিংবা আইসক্রিম। বাবা-মা হয়তো প্রথমে না বলতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্তানের আবদারের কাছে হার মানতেন। সেই সামান্য খাবারটুকুও তখন মনে হতো অমূল্য উপহার।

সবচেয়ে মজার ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া। সারা বছর স্কুলের পড়াশোনা, পরীক্ষা আর বাড়ির নিয়মকানুনের মধ্যে যে সময়টা পাওয়া যেত না, পুজোর দিনগুলোতে সেই সময় যেন অফুরন্ত হয়ে উঠত। কখনও দল বেঁধে হাঁটা, কখনও মণ্ডপের সামনে ছবি তোলা, কখনও আবার কে কতগুলি পুজো দেখেছে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা—এসব স্মৃতি আজও মনে হাসি ফোটায়।

### অষ্টমীর অঞ্জলি ও মায়ের স্নেহ

শৈশবের দুর্গাপুজোয় মহাষ্টমীর সকাল ছিল বিশেষ আকর্ষণের। আগের রাতেই নতুন জামা গুছিয়ে রাখা হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে মায়ের সঙ্গে পুজো মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি চলত।

অঞ্জলি দেওয়ার সময় পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের অর্থ হয়তো ছোটরা বুঝত না, কিন্তু পরিবেশের পবিত্রতা আর পরিবারের সবার সঙ্গে একত্রে দাঁড়ানোর আনন্দ অনুভব করত। ফুল হাতে নিয়ে দেবীর সামনে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল এক নিষ্পাপ অভিজ্ঞতা।

অঞ্জলি শেষ হলে মায়ের কাছে প্রসাদ চাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে প্রসাদ ভাগ করে খাওয়া এবং মণ্ডপের সামনে ছবি তোলা—এই সামান্য ঘটনাগুলোই আজ স্মৃতির পাতায় বিশেষ হয়ে রয়েছে।

মায়ের হাত ধরে পুজো দেখতে যাওয়ার মধ্যে যে নিরাপত্তা ছিল, তা জীবনের অন্য কোনও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তখন মনে হতো, মা পাশে থাকলে কোনও ভয় নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, সেই নির্ভরতার অনুভূতিই ছিল শৈশবের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

### পুজোর ছুটি, মামাবাড়ি আর আত্মীয়দের মিলন

অনেকের কাছে দুর্গাপুজো মানেই মামাবাড়ি যাওয়ার আনন্দ। ট্রেন কিংবা বাসে করে আত্মীয়দের বাড়ি পৌঁছনো, সেখানে ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং একসঙ্গে দিন কাটানো ছিল পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।

বাড়ির উঠোনে বসে গল্প, দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া, বিকেলে ঠাকুর দেখতে যাওয়া আর রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কত রকমের গল্প—সবকিছু মিলিয়ে পুজোর ছুটিগুলো হয়ে উঠত স্মরণীয়।

যেসব আত্মীয়ের সঙ্গে সারা বছর দেখা হতো না, পুজো ছিল তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সময়। ছোটরা একসঙ্গে খেলত, বড়রা পুরোনো দিনের কথা বলতেন। বাড়ির রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত নানা রকম সুস্বাদু খাবারের গন্ধ।

আজ অনেক পরিবারে কাজের ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা জীবনের নানা দায়িত্বের কারণে সেই মিলনমেলা আর আগের মতো হয় না। কেউ কর্মসূত্রে দূরে থাকেন, কেউ পড়াশোনার জন্য অন্য শহরে চলে যান। তবু পুজোর সময় পুরোনো বাড়ি, আত্মীয়দের মুখ আর শৈশবের স্মৃতি মনের মধ্যে নীরবে নাড়া দিয়ে যায়।

### দশমীর বিষণ্ণতা ও আগামী বছরের প্রতীক্ষা

দুর্গাপুজোর শেষ দিনটি ছোটবেলায় ছিল এক অদ্ভুত অনুভূতির নাম। কয়েক দিন ধরে যে আনন্দে মন ভরে ছিল, দশমী এলেই মনে হতো সবকিছু যেন হঠাৎ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সিঁদুরখেলা, মিষ্টিমুখ, প্রতিমা বিসর্জন আর মায়ের বিদায়ের দৃশ্য দেখে মন খারাপ হয়ে যেত। মনে প্রশ্ন জাগত, মা আবার কবে আসবেন? কেন এত তাড়াতাড়ি পুজো শেষ হয়ে যায়?

বাড়ি ফিরে নতুন জামা খুলে আলমারিতে তুলে রাখার সময় মনে হতো, উৎসবের আনন্দটুকুও যেন সেখানেই রেখে আসতে হচ্ছে। পরদিন থেকে আবার স্কুল, পড়াশোনা, নিয়মিত জীবন আর অপেক্ষা—পরের বছরের দুর্গাপুজোর জন্য।

কিন্তু শৈশবের সেই মনখারাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। কয়েক দিন পর আবার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে পুজোর গল্প শুরু হয়ে যেত। কে কোথায় ঠাকুর দেখেছে, কে কী খেয়েছে, কার নতুন জামা সবচেয়ে সুন্দর ছিল—এসব নিয়েই চলত আলোচনা।

এভাবেই পুজো শেষ হয়েও শেষ হতো না। স্মৃতির মধ্যে তার আনন্দ আরও অনেক দিন বেঁচে থাকত।

### সময় বদলেছে, বদলেছে পুজোর ধরন

আজকের দুর্গাপুজো অনেক বেশি আধুনিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ভাগ করে নেওয়া, অনলাইনে পুজোর খবর দেখা, নতুন নতুন থিমের মণ্ডপ ঘুরে বেড়ানো এবং নানা প্রযুক্তির সাহায্যে উৎসবকে উপভোগ করার সুযোগ বেড়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তির এই উন্নতির মধ্যেও কোথাও যেন শৈশবের সরল আনন্দকে খুঁজে বেড়াই আমরা। তখন ছবি তোলার সুযোগ সীমিত ছিল, অথচ স্মৃতির ভান্ডার ছিল ভরপুর। আজ অসংখ্য ছবি তোলা হয়, কিন্তু সব মুহূর্ত কি মনের মধ্যে সমানভাবে জায়গা করে নিতে পারে?

আগে পাড়ার মানুষ একসঙ্গে বসে পুজোর পরিকল্পনা করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যস্ততার কারণে সেই দীর্ঘ আড্ডা কমে এসেছে। তবু দুর্গাপুজোর মূল আকর্ষণ আজও একই—মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন, ভালোবাসার আদানপ্রদান এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

### শেষকথা: শৈশব ফিরে আসে স্মৃতির পথ ধরে

শৈশবের দুর্গাপুজো আর কখনও ফিরে আসবে না। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে আমাদের জীবন, বদলেছে সম্পর্কের ধরন, বেড়েছে দায়িত্ব ও ব্যস্ততা। কিন্তু কিছু অনুভূতি কখনও পুরোনো হয় না।

আজও ঢাকের শব্দ শুনলে মন ছুটে যায় সেই ছোটবেলার পাড়ায়। নতুন পোশাকের দোকান দেখলে মনে পড়ে যায় প্রথম পছন্দের জামাটির কথা। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে যাওয়ার স্মৃতি।

জীবন যতই এগিয়ে যাক, শৈশবের দুর্গাপুজো আমাদের মনের এক কোণে চিরকাল বেঁচে থাকবে। কারণ সেই পুজোয় ছিল না বড় কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ছিল ছোট ছোট আনন্দকে মন ভরে উপভোগ করার ক্ষমতা।

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে সুন্দর উপহার হয়তো নতুন পোশাক কিংবা আলোর ঝলকানি নয়; বরং সেই মানুষগুলো, সেই মুহূর্তগুলো আর সেই স্মৃতিগুলো, যেগুলো সময় পেরিয়েও আমাদের মুখে হাসি ফোটায় এবং চোখের কোণে জল এনে দেয়।

মা দুর্গা প্রতিবছর ফিরে আসেন। কিন্তু শৈশবের সেই দিনগুলো ফিরে আসে শুধু স্মৃতির দরজা খুলে। আর তাই শরতের আকাশে সাদা মেঘ দেখলেই আজও মনে হয়—আবার যদি একবার ছোট হয়ে যেতে পারতাম, আবার যদি মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরোতে পারতাম!

সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটুকুই হয়তো দুর্গাপুজোর স্মৃতিকে এত সুন্দর, এত গভীর এবং এত আপন করে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *