
ভারতের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার ইতিহাসে এমন কিছু খেলা রয়েছে, যেখানে আধুনিক ক্রীড়া-সরঞ্জামের পরিবর্তে প্রকৃতির সাধারণ উপকরণই হয়ে উঠেছে দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যম। কোথাও বাঁশের লাঠি, কোথাও মাটির পাত্র, আবার কোথাও পাথর ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় ক্রীড়া-সংস্কৃতি। কর্ণাটকের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রচলিত ‘কল্লাটা’ (Kallata) বা ‘কল্লু গুন্ডু এত্তুভুদু’ (Kallu Gundu Ettuvudu) এমনই একটি শক্তিনির্ভর ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়াচর্চা।
কন্নড় ভাষায় ‘কল্লু’ বলতে পাথর এবং ‘গুন্ডু’ বলতে গোলাকার পাথর বা পাথরের বল বোঝানো হয়। ‘এত্তুভুদু’ শব্দটির অর্থ তোলা। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই খেলায় বিভিন্ন আকার ও ওজনের গোলাকার পাথর তোলার দক্ষতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। কর্ণাটকের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা নিয়ে প্রকাশিত আঞ্চলিক বিবরণে এই ক্রীড়ার উল্লেখ রয়েছে। তবে সব অঞ্চলে একই নিয়ম, একই ওজনের পাথর বা একই ধরনের প্রতিযোগিতা প্রচলিত ছিল—এমন প্রমাণ নেই।
খেলার আঞ্চলিক পরিচয়
কল্লাটা কর্ণাটকের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি শক্তিপরীক্ষামূলক খেলা। কৃষিকাজ, শারীরিক পরিশ্রম এবং গ্রামীণ উৎসবের পরিবেশে মানুষের শারীরিক সক্ষমতার বিশেষ মূল্য ছিল। এই সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে পাথর তোলার মতো কাজ কখনো দক্ষতা প্রদর্শন, কখনো প্রতিযোগিতা এবং কখনো বিনোদনের রূপ নিতে পারে।
কর্ণাটকের বিভিন্ন অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার ধরন আলাদা। কোথাও কাবাডি, কোথাও লাঠি বা কাঠিনির্ভর খেলা, আবার কোথাও পাথর তোলার মতো শক্তিনির্ভর অনুশীলন দেখা যায়। কল্লাটার বিশেষত্ব হলো, এখানে পাথরের ওজন এবং সেটিকে নিরাপদে তুলে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
এই খেলাটির উৎপত্তির নির্দিষ্ট সাল, প্রথম উদ্ভাবক কিংবা প্রাচীনতম প্রতিযোগিতার নির্ভরযোগ্য বিবরণ সহজলভ্য নয়। তাই একে কোনো নির্দিষ্ট রাজা, রাজবংশ বা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা সমীচীন নয়।
কীভাবে খেলা হতো?
কল্লাটার পরিচিত বিবরণ অনুযায়ী, বিভিন্ন আকারের গোলাকার পাথর ব্যবহার করা হতো। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী পাথর তোলার চেষ্টা করতেন। পাথরের আকার ও ওজন যত বেশি হতো, সেটি তোলা ও নিয়ন্ত্রণ করা তত কঠিন হয়ে উঠত।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। আধুনিক ভারোত্তোলনের মতো কল্লাটার সর্বজনস্বীকৃত ওজনশ্রেণি, নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রচেষ্টা কিংবা সর্বত্র অনুসৃত বিচারব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায় না। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী খেলার পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
ঐতিহ্যবাহী খেলাটিকে বুঝতে এর কয়েকটি মৌলিক দিক বিবেচনা করা যায়।
১. পাথর নির্বাচন
খেলার জন্য গোলাকার বা তুলনামূলকভাবে মসৃণ পাথর ব্যবহারের কথা জানা যায়। পাথরের ওজন, আকৃতি এবং ধরার সুবিধা অংশগ্রহণকারীর কাজকে প্রভাবিত করে।
প্রাকৃতিক পাথরের আকার একরকম হয় না। ফলে দুটি পাথরের ওজন কাছাকাছি হলেও সেগুলি তোলার অসুবিধা আলাদা হতে পারে। পাথরের পৃষ্ঠ মসৃণ হলে হাত ফসকে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে।
২. পাথর তোলার দক্ষতা
পাথর তোলার সময় শুধু বাহুর শক্তি নয়, পা, কোমর, পিঠ এবং শরীরের সামগ্রিক সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারী বস্তু তোলার ক্ষেত্রে শরীরের অবস্থান ভুল হলে পেশি বা মেরুদণ্ডে আঘাত লাগতে পারে।
অতীতে স্থানীয় মানুষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পাথর তোলার কৌশল শিখে থাকতে পারেন। তবে ঐতিহাসিক কল্লাটায় ঠিক কোন ভঙ্গিতে পাথর তুলতে হতো, তার বিস্তারিত নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
৩. শক্তি প্রদর্শন ও প্রতিযোগিতা
পাথর তোলার মতো খেলায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পান। স্থানীয় প্রতিযোগিতায় কে কতটা ভারী পাথর তুলতে পারেন, অথবা নির্দিষ্ট পাথর কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তা দর্শকদের আগ্রহের কারণ হতে পারে।
তবে এই বর্ণনাকে কল্লাটার সর্বজনীন প্রতিযোগিতার নিয়ম বলে ধরে নেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট এলাকার মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করলে খেলার বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব।
কল্লাটা কোন কোন দক্ষতার পরীক্ষা নেয়?
কল্লাটার মতো পাথর তোলার খেলায় কয়েকটি শারীরিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
পেশির শক্তি: পাথরের ওজন শরীরের বিভিন্ন পেশির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সঠিকভাবে তোলার জন্য হাত, পা, কোমর এবং শরীরের কেন্দ্রের পেশিগুলির সমন্বয় দরকার।
শরীরের ভারসাম্য: ভারী পাথর তোলার সময় শরীরের ভরকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। ভারসাম্য নষ্ট হলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ধরার ক্ষমতা: পাথরকে শক্ত করে ধরে রাখতে হাত ও আঙুলের গ্রিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনোযোগ: পাথরের অবস্থান, শরীরের ভঙ্গি এবং তোলার পদ্ধতির দিকে মনোযোগ না দিলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে শুধু কল্লাটা খেলার ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট পরিমাপ বা স্বাস্থ্যগত ফলাফল নির্ধারণ করা যায় না।
গ্রামীণ সমাজে এমন খেলার গুরুত্ব
গ্রামীণ সমাজে খেলাধুলা শুধু অবসর কাটানোর মাধ্যম নয়। স্থানীয় মানুষকে একত্রিত করা, উৎসবের পরিবেশ তৈরি করা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র হিসেবেও লোকখেলার গুরুত্ব রয়েছে।
কল্লাটার মতো শক্তিনির্ভর খেলা স্থানীয় মানুষের কাছে শারীরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায় হয়ে থাকতে পারে। গ্রামের মানুষ এমন প্রদর্শনী দেখতে জড়ো হলে সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতো। তবে খেলাটির সঙ্গে নির্দিষ্ট উৎসব, ধর্মীয় আচার বা সামাজিক অনুষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এই ধরনের খেলাকে বোঝার সময় স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রাখা জরুরি। সব অঞ্চলের ঐতিহ্যকে একই ছাঁচে ফেলে বিচার করলে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যেতে পারে।
আধুনিক ভারোত্তোলনের সঙ্গে পার্থক্য
কল্লাটাকে আধুনিক ভারোত্তোলনের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। আধুনিক ভারোত্তোলনে নির্দিষ্ট নিয়ম, প্রশিক্ষণ, ওজনশ্রেণি, সরঞ্জাম এবং বিচারব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিযোগীদের নির্ধারিত পদ্ধতিতে ওজন তুলতে হয় এবং তাঁদের প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করা হয়।
অন্যদিকে, কল্লাটা প্রাকৃতিক পাথরনির্ভর একটি আঞ্চলিক শক্তিপরীক্ষামূলক খেলা। পাথরের আকার ও ওজন সমান না-ও হতে পারে। স্থানীয়ভাবে কীভাবে প্রতিযোগিতা হতো, তা অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে।
দুই ক্ষেত্রেই শক্তি ও কৌশলের গুরুত্ব থাকলেও তাদের ইতিহাস, উপকরণ এবং নিয়মের কাঠামো আলাদা।
কেন এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা দরকার?
বর্তমান সময়ে অনেক আঞ্চলিক লোকখেলার পরিচয় সীমিত হয়ে পড়েছে। এর একটি কারণ হলো, পুরোনো খেলাগুলির বিস্তারিত নিয়ম ও ইতিহাস সব সময় লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়নি।
কল্লাটার মতো খেলাকে নথিবদ্ধ করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
প্রবীণদের সাক্ষাৎকার: স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে খেলার নাম, পাথরের ধরন, পুরোনো প্রতিযোগিতার বিবরণ এবং প্রচলিত নিয়ম সংগ্রহ করা যেতে পারে।
ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ: নিরাপদ প্রদর্শন এবং উপকরণের ছবি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান নথি হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় ভাষায় নথি তৈরি: কন্নড় ভাষায় প্রচলিত নাম, শব্দের অর্থ এবং স্থানীয় উচ্চারণ সংরক্ষণ করলে খেলাটির পরিচয় আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
বিদ্যালয়ে পরিচিতি: শিক্ষার্থীদের স্থানীয় ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রকল্পে এই ধরনের খেলার পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ পাথর তোলার অনুশীলন করানোর পরিবর্তে ছবি, সাক্ষাৎকার এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনা ব্যবহার করা উচিত।
নিরাপত্তা: পাথর তোলার ঝুঁকি
ভারী পাথর তোলা বিপজ্জনক হতে পারে। পাথর হাত থেকে পড়ে পায়ে আঘাত লাগতে পারে, আবার ভুল ভঙ্গিতে তোলার ফলে কোমর, পিঠ, কাঁধ কিংবা কবজিতে চোট লাগতে পারে।
তাই ঐতিহ্যবাহী খেলাটির বর্ণনা পড়ে নিজে থেকে ভারী পাথর তোলার চেষ্টা করা উচিত নয়। বিশেষত শিশু, কিশোর এবং অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। কোনো প্রদর্শনী আয়োজন করা হলে উপযুক্ত প্রশিক্ষক, নিরাপদ স্থান, স্থিতিশীল পাথর এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।
ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজকে উৎসাহিত করা উচিত নয়। খেলাটির সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরাই হতে পারে সংরক্ষণের প্রথম পদক্ষেপ।
উপসংহার
কর্ণাটকের ঐতিহ্যবাহী পাথর তোলার খেলা কল্লাটা ভারতের আঞ্চলিক ক্রীড়া-সংস্কৃতির একটি আকর্ষণীয় দৃষ্টান্ত। গোলাকার পাথরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই খেলায় শারীরিক শক্তি, ভারসাম্য এবং দক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে।
যদিও এর ইতিহাস ও নিয়মের সব দিক এখনও বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ নয়, তবু খেলাটির উল্লেখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের লোকখেলার জগৎ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। অনেক খেলাই আধুনিক ক্রীড়া-পরিকাঠামোর বাইরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিকশিত হয়েছিল।
কল্লাটার মতো খেলাকে সংরক্ষণ করতে হলে স্থানীয় মানুষের স্মৃতি সংগ্রহ, নির্ভরযোগ্য গবেষণা এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিচিতি তৈরি করা জরুরি। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভারতের বিস্মৃত ক্রীড়া-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবে।












Leave a Reply