২০০ বছরের ঐতিহ্য আজও অমলিন, মালদার পাকুয়াহাটে নয়টি গ্রামের আরাধ্য আদি শ্যামা কালী।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:— জমিদারি প্রথা আজ ইতিহাসের পাতায় স্থান পেলেও প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য আজও অমলিন মালদহের বামনগোলা ব্লকের পাকুয়াহাটের শ্রীশ্রী আদি শ্যামা কালীপুজোয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্তি, বিশ্বাস ও নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হয়ে আসছেন জমিদার আমলের জাগ্রত আদি শ্যামা মা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই শতাব্দী আগে বর্ধমানের এক জমিদার ব্যবসার উদ্দেশ্যে পাকুয়াহাটে আসেন। পরবর্তীতে এখানেই জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে একটি বিশাল হাটের সূচনা করেন তিনি। সেই হাট থেকেই পাকুয়াহাটের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, জমিদার নন্দী চৌধুরী দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই কালীপুজোর সূচনা করেন। পরে বর্ধমানে ফিরে যাওয়ার সময় পাকুয়াহাট সংলগ্ন নয়টি গ্রামের মানুষের হাতে পুজোর দায়িত্ব অর্পণ করেন। সেই থেকে আজও নয়টি গ্রামের মানুষের উদ্যোগে ১২ সদস্যের পুজো কমিটির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই পুজো।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি মনি মণ্ডল জানান, তরণী মণ্ডল ও প্রাক্তন সম্পাদক খোকন বোসের সময়কাল পেরিয়ে বর্তমানে প্রকাশের তত্ত্বাবধানে পুজোর কাজ পরিচালিত হচ্ছে। দেবীর নিজস্ব কোনও জমিদারি বা ভূসম্পত্তি না থাকলেও ভক্তদের মানত ও দানের উপর নির্ভর করেই পুজোর আয়োজন করা হয়। মা অত্যন্ত জাগ্রত বলে বিশ্বাস করেন ভক্তরা। তাই দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ মানত করতে ছুটে আসেন মন্দিরে।

প্রতি বছর এই পুজোয় প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০টি পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভক্তদের মানতের প্রায় দেড় হাজার কালী জমা পড়ে। রাত ১২টায় শুরু হয় মূল পুজো ও প্রথম পর্যায়ের বলিদান। রাত ৩টে থেকে শুরু হয় চণ্ডীপাঠ ও বিষহরি গান। এই সময় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে বলিদান। গান ও চণ্ডীপাঠ শেষ হলে পরদিন সকাল থেকে পুনরায় শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের বলিদান।

অন্যদিকে, জমিদার আমলে শুরু হওয়া সেই হাটের ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে। শ্রীশ্রী আদি শ্যামা কালীমন্দির চত্বরকে ঘিরে প্রতি সপ্তাহে বসে সাপ্তাহিক হাট। এই হাটে কেনাকাটা করতে শুধু আশপাশের গ্রামের মানুষই নন, দূরদূরান্ত থেকেও বহু মানুষ আসেন। হাটকে কেন্দ্র করে প্রতি সপ্তাহে জমজমাট হয়ে ওঠে পাকুয়াহাটের মন্দির সংলগ্ন এলাকা। ফলে কালীমন্দির ও সাপ্তাহিক হাট—দুটিই এলাকার মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও পরিচিতির অংশ হয়ে রয়েছে।

পুজোর পরের দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয় বিসর্জন প্রক্রিয়া এবং রাত ৯টার মধ্যে সম্পন্ন হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আজও আদি শ্যামা মায়ের আরাধনায় সামিল হন নয়টি গ্রামের মানুষ। সময় বদলালেও বদলায়নি মায়ের প্রতি মানুষের ভক্তি ও আবেগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *