বৈশাখের প্রায় শেষ, হাতে গুনতি সাত বা আট দিন বাকি| বাংলা ক্যালেন্ডার নিয়ে বাঙালির মাথা ব্যাথা কম, একমাত্র পুজো পার্বন ছাড়া| কটা বাঙালি ঠিক মতো বাংলা মাস, তারিখ, এমন কি সালটা বলতে পারে? এমন কি দুর্গা পুজোর মহালয়া বা ষষ্ঠী কবে, সেটাও আমরা মনে রাখি ইংরেজি সাল ধরে | বাংলা তারিখ জানে একমাত্র পুরোহিতরা | ধ্যাৎতেরিকা, কি কচকচি আরম্ভ হলো মনে! থাকি আমি বজবজ লাইনের বাটানগরের কাছে নুঙ্গী তে | নুঙ্গী বললে সাতসতেরো প্রশ্ন, কোথায়, কি বৃত্তান্ত? তার থেকে বাটানগরের নাম অনেক পরিচিত | বাটার জুতো আমরা কিনি ও পড়ি | বাটাজুতোর কারখানা বাটানগরে | এখন অবশ্য সে কারখানা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে| তবু নাম- মাহাত্ম্য বলে একটা ব্যাপার আছে না! আমাদের গ্রামের নাম চিংড়ি পোঁতা| সময়ের সাথে সাথে অন্য সব গ্রামের মতো আমাদের গ্রামও তার গেঁয়ো খোলস খুলে নাগরিকা পোশাক পরেছে| তবু জংলা ভাব এখনও কিছু রয়েছে চিংড়িপোতায়| না, না রাগ করবেন না কেউ | খারাপ কিছু বলিনি আমি, বলেছি গ্রামের শোভা এখনো পুরোপুরি ছেড়ে যায় নি | গাছগাছালিতে ঘেরা আমাদের এই গ্রাম |আমি অফিসে কাজ করি | বেসরকারি অফিস | যা মাইনে আনি ঘরে, সেটা খুব একটা স্বস্তির অঙ্ক নয় | পেশা শেষে আমি একটা প্রকাশণ সংস্থায় প্রূফ রিডারের কাজ করি, স্রেফ দুটো পয়সা বাড়তি রোজগারের তাগিদে| বাংলায় অর্নাস নিয়ে পাশ করেছি | তার ওপর বাঙালি | ভালোবাসার মানুষ রবিঠাকুর| ভালোবাসার জায়গা শান্তিনিকেতন| বছরে একটু করে পয়সা জমিয়ে সপরিবারে যাই সেখানে, প্রতিবছর| ঘুরে বেড়াই সোনাঝুরির জঙ্গলে | খোয়াইের হাটে বৌ কে কিনে দিই পুঁথির মালা, কিংবা কাঁচের চুড়ি | কোপাইের পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করি, ” কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসী হাঁড়ি |” যেমন অধিকাংশ বাঙালি বছরে একবার পুরি যায় | আজ ফিরেছি বাড়ি, লাস্ট ট্রেনটার আগের ট্রেনে | মুখ নাড়া খেয়েছি রীতার | সত্যি এত রাত অবধি ভাতের থালাখান কোলের কাছে নিয়ে ঢুলুঢুলু চোখে আমার অপেক্ষা করতে তো তার ভালো না লাগার কথা | অপরাধী আমি, যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েছি | ছুটি পেয়ে আমার বৌ ভোঁস, ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে | আসার সময় ট্রেনের জানলার ধারে বসে ছিলাম | ট্রেন দৌড়ানোর দৌলতে যে হাওয়া পেয়েছি, তাতে পুরো পথটা ঘুমিয়েছি | সেজন্য না, গুমোট গরমে একটুও ঘুম আসছে না আমার | সস্তার সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই নিয়ে আমি ছাতে | পাঁচিলে হেলান দিয়ে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছি | আকাশে একফালি চাঁদ, মনে হচ্ছে চতুর্থীর একফালি চাঁদ, মনে হচ্ছে চাঁদের আকৃতি দেখে বোধহয় শুক্লা পক্ষ| তখনি মনে পড়েছে, গতকাল প্রকাশনে হালখাতা ছিল অক্ষয় তৃতীয়ার | তবে তো নিশ্চিত আজ চতুর্থী | বাঁশবাগান আবছা | বৈশাখী চাঁপার গন্ধ ভাসছে বাতাসে | ফুরে ফুরে হাওয়া দিচ্ছে | হঠাৎ আমার মনে হয় কোথাও থেকে যেন আসছে, যুঁথি আর বেলির গন্ধ, নিকোটিনের গন্ধকে চাপা দিয়ে | আমি অনুসন্ধিৎসু, বাগান থেকে স্বর্ন – চাঁপার, বেল- যুঁইের গন্ধ আসতেই পারে | কিন্তু নিকোটিনের গন্ধ চাপা দিয়ে এতো জোরালো ভাবে!!! সিগারেটের শেষাংশটা দূরে ছুঁড়ে ফেলেছি | পেছন থেকে ভেসে আসে সারেঙ্গীতে ছড়ের টানে ইমন কল্যাণ | মিশ্র রাগ |পিছনে ফিরে দেখি, একটা গালিচা ছাতে পাতা| তিনজন মানুষ বসে আছেন তাতে| দুজন পুরুষ, একজন নারী | পুরুষ নারী দের পোশাক আর পোশাক পরার ধরনের মধ্যে সাবেকী কোন বনেদী বাড়ির ছাপ | পুরুষদের পরণে ধুতিপান্জাবী, কাঁধে ভাঁজ করা সুতীর চাদর, একপাশে ঝুলছে | মহিলা অপরূপা, পরণে জমকালো শাড়ি, গায়ে ফুলহাতা ব্লাউজ, হাতে আর গলায় ফ্রিল দেয়া | শাড়ির আঁচল ব্লাউজের একদিকের কাঁধে রত্ন খচিত ব্রোচ দিয়ে আটকানো | গা ভর্তি গয়না| রুপোর একটা রেকাবীতে জলে ভেজা বেল- যুঁথির মালা, ভুরভুর করছে গন্ধে | অন্য রেকাবীতে পানের খিলি, রূপোর তবক দেওয়া | একটা সুরাপাত্রে সুরা নয়, বেলের শরবত | হলুদ রঙের | মহিলা যখন রূপোর গেলাসে ঢালছেন, দেখে নিয়েছি আমি | বেলের শরবত খাই না আমি, সুরা হলে, চেয়ে নিতাম এক পাত্র | আমার বাড়ির ছাদে সুরের আসর, অথচ সুরা দেবে না, এ’ আবার হয় নাকি? কিন্তু ওদের মুখ গুলো ওমন আবছা কেন? চিনি চিনি মনে হয়, অথচ ঠিক চিনতে পারছি না | মহিলা গান ধরেছেন, “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে |” জ্যোৎস্না রাত নয়, তবুও ভালো লাগছে | পরের গান সবথেকে কমবয়সী যুবার গলায়, যার মুখে হালকা দাড়ি |”তোমার গোপন কথাটি সখী রেখো না মনে, শুধু আমায়, শুধু আমায়, বলো, গোপনে|” দাড়ি বিহীন ভদ্রলোক সারেঙ্গীতে সঙ্গত করেন | চাঁদের আবছা আলোয় লজ্জার রক্তিম আভা মহিলার মুখে, বেশ দেখতে পাচ্ছি | দিব্যদৃষ্টি কিছু পরিমাণে পেলাম কি? হালকা দাঁড়ি ওলা লোকটি বোধহয় মহিলার স্বামী | নইলে অত আবেগীয় মনের প্রতিচ্ছবি তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে কেন? আমি মোহাচ্ছন্নতায় ভেসে শুনি জলসায় ওঠা সুরতরঙ্গ | মনে বাজে জল তরঙ্গ, এরা তো সব রবি ঠাকুরের গান গাইছে| ভালো লাগছে আমার, যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, এমন ভালো লাগা | মহিলা গান ধরে,
” আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্ক ভাগী |” আবার দাড়ি ওলা অপেক্ষাকৃত কমবয়সী যুবক গান ধরে, ” কৃষ্ণকলি, আমি তারে বলি…” মহিলার গান, “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান |” ভোর হয়ে আসছে, পুবাকাশে খুব হালকা কমলা আলো ফুটি ফুটি করছে | অন্ধকার এখনও যায়নি | মহিলা গাইছে,” সকাল বেলার আলোয় বাজে, বিদায় ব্যাথার ভৈরবী |” দাড়িওলা যুবক আবৃত্তি করে,” আজি হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি বসি পড়িছ আমার কবিতা খানি? ” অপেক্ষা কৃত বড়ো যুবক বলে,” তোরা আয়, আমি এগোই |” এবার মহিলা কাপড়ের কোঁচড় থেকে লোকানো কাজকরা এক জুতো বার করে, নব্য যুবকের হাতে দেয়,” ঠাকুর পো, আজ তোমার জন্মদিনে আমার নিজের হাতে করা উপহার |” “বাহ্ বৌঠান, খুব সুন্দর” |মুহূর্তে দুজনে গায়েব | ভোরের আলো ফুটেছে | আমার মনে পড়েছে আজ পঁচিশে বৈশাখ| রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন | আমার ছাদের জলসায় ছিলেন, জ্যোতিদাদা, কাদম্বরী বৌঠান আর রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং | আমি সিঁড়ি টপকে নীচে নেমেছি, কন্ঠে নিয়ে গান,” তোমার প্রকাশও হোক, কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন, সূর্যের মতো |” আমি ঠিক করেছিলাম, কাউকে বলব না এ কথা, কিন্তু ভালো জিনিস ভাগাভাগি করলে আরো ভালো লাগা বেড়ে যায় যে| তাই ভালো একটা বাস্তব বা পরাবাস্তব ঘটনা বা নিছক আমার মনের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা রবীন্দ্র প্রেম আমি সকলের সাথে ভাগ করে আমার এই প্রবন্ধের মাধ্যমে। আজ আবার আরেকটা পঁচিশে বৈশাখ ফিরে এসেছে যে।
আমার ছাদের জলসায় : ডঃ অশোকা রায়।












Leave a Reply