গল্প নয়, সত্যি : ডঃ অশোকা রায়।

0
689

আজ লেখনী ধরার কারণ আমার দুটো|
প্রথমতঃ আমার গল্প ডট কম কবিতার কমেন্ট বক্সে কারুর কারুর ভূতের গল্পের আব্দার| ভূতের সাথে আমার দেখা হয়নি কস্মিনকালেও|
না অতীতে, না বর্তমানে| তবে আমাদের বাঙালি পরিচালক অনীক দত্তের প্রথম চলচ্চিত্র ভূতের ভবিষ্যৎ দেখেছি| তবে তার পরিপ্রেক্ষিতে ভূতের গল্প পরিবেশনের হিম্মত আমার নেই| আর তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী করব, এমন এলেমও আমার নেই| এলোমেলো গল্প বলে তো লাভ নেই| তাই আমার ছেলের কাছে শোনা তার প্রত্যক্ষীভুত ভূতের গল্প তোমাদের শোনাচ্ছি| দ্বিতীয়ত, তোমাদের আমার যে কোন গল্প পড়ে মনে হয়, তাতে বুঝি আমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো ছায়া জড়িয়ে আছে| না গো, বিশ্বাস করো, আমার সব কাহিনী আর চরিত্ররা সম্পূর্ণ কাল্পনিক| তারা স্রেফ আমার অলস মস্তিষ্ক প্রসূত. তারা থাকে আমার অনুভবে| মন বেশি ভালো হলে, বা বেশি খারাপ হলে কলমের ডগায় বা খোঁচায় বেরিয়ে আসে |শুধু ব্যতিক্রম, আমার ‘চরিত্রের খোঁজে’ বইটির’ আত্মজার ঋণ’ গল্প টি| তাতে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ছায়া রয়েছে| আমার মেয়ে স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছিল এবং তার ব্যবহার শিখিয়েছিল বলে আজ তোমাদের কাছে কথা ও কাব্য পরিবেশনের সাহস পাচ্ছি| তাই তার ঋণ স্বীকার না করে আমার উপায় নেই |
যাকগে ধান ভানতে শিবের গাজন হয়ে যাচ্ছে| মূল গল্পে আসি| এটা সত্যি ঘটনা| এবং আমার ছেলের স্বচক্ষে দেখা|
রোমে শিহরণ জাগানো উপলব্ধি |
এ যেন এক ক্যানবন্দী সেলুলয়েডের নিখুঁত ভার্সন|আমার এতে কোন কৃতিত্ব নেই| আমি অনুলিপি তৈরি করেছি মাত্র|
আমার ছেলে গ্যাংটকে পোস্টেড| কর্মোপলক্ষ্যে বিদেশেও যেতে হয়| সেদিন এক শ্রাবণের শেষ রাত| রাত শেষ বা ভোর রাত যাই বলি না কেন, ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটে| স্হানীয় বন্ধুর বোনের বিয়ে| ওহো ছেলের কাছে জানা হয়নি সিকিমিজ দের বিয়ের অনুষ্ঠানের অন্যতম মাস আমাদের মতো শ্রাবণ কিনা| যাক গে সেটা ইমমেটিরিয়াল ব্যাপার| মেটিরিয়াল ব্যাপার হলো, আমার ছেলের ওপর ওর সিকিমিজ বন্ধুর বাবা পাঁঠার মাংস আনার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছেন| ছেলে আমার মাটন- বিলাসী| মাটনের উৎকৃষ্ট মান, তরিবতী রন্ধন, এবং রসিয়ে ভোজন.. সবেতেই তিনি দক্ষ| তাই তার ওপর নির্ভর করা যেতেই পারে|
ভোর তিনটে নাগাদ ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিল| পাশে আমার ছেলে| গন্তব্য সিংটম| গ্যাংটকে মাটন ভালো পাওয়া যায় না| যদিও বা পাওয়া যায়, তার জন্য বিস্তর তল্লাশির প্রয়োজন|
সিংটমের মাটন এ তল্লাটে বিখ্যাত|
গাড়ি চলেছে সার্পেন্টাইন পথ বেয়ে| প্রথমে ডানদিকের পাহাড় কিছুটা পরে গিয়ে বাঁ-দিক হয়ে যাচ্ছে| বিপরীতে তিস্তার রুমঝুম নুপূরের আওয়াজ কানে আসছে| বৃষ্টির রিমঝিমানি গানের সাথে তিস্তার নাচের যুগলবন্দী| ভোরের আকাশ তখনও সরগমে আলাপ শুরু করে নি| কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফে সূর্যের প্রথম রশ্মি আছড়ে পড়ার সময় হয় নি| চারিদিকে নিকষ কালো| কিছুটা রাত্রি শেষের অন্ধকার, কিছুটা মেঘের কালো| হেডলাইটের আলোয় পাহাড়ী রাস্তার চমকানি| চারিদিকে নিস্তবদ্ধতার মধ্যে যন্ত্র দানবের চাপা আওয়াজ|
চারটে চাকা গড়িয়ে চলার কোথাও স্পষ্ট, কোথাও অস্পষ্ট দাগ | ড্রাইভারের অখন্ড মনঃ সংযোগ| সর্তকতার মধ্যেও আমার ছেলের গহীন ভালো লাগা| মুহূর্তের অন্যমনস্কতা| স্টিয়ারিং এর দায়িত্ব তো অন্যের হাতে | হঠাৎ ড্রাইভারের ডাক.. ” সাহাব|” সম্বিত ফেরে আমার ছেলের| পাশে ড্রাইভারের পানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি| ” দেখিয়ে, ও দোনো আওরত লিফট মাঙতা|” ড্রাইভারের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখে,
নাতি- দূরে অপরূপ দুই মেয়ে বুড়ো আঙুলের বিশেষ ভঙ্গিমায় লিফট চাইছে|ড্রাইভারের প্রতি আমার ছেলের নির্দেশ, ” গাড়ি রোখো উন দোনোকে পাশ| যা‌ঁহা চাহতে হ্যায়, ছোড় দেঙ্গে| ” “সাব”! “ক্যায়া হুয়া? যো হাম বোল রহে হ্যায়, ওহি করো|” ” সাব জিন হো সকতা|”
” ফালতু মাত বলো| গাড়িমে বৈঠা লো|” ড্রাইভারের সাহস হয় না আর কথা বলার| মেয়ে দুটোর সামনে গাড়ি দাঁড় করায়|অপরূপ সৌন্দর্য ওদের| একজনের পরণে লাল স্ল্যাকস, হোয়াইট টপ| আরেকজনের পরণে সিকিমিজ পোশাক| রঙ গোলাপী|জায়গায় জায়গায় ছোপ ছোপ কাদা| হতেই পারে, যা বৃষ্টি হচ্ছে!
মেয়ে দুটি গাড়ির পিছনের সীটে| জিজ্ঞেস করা হয় ওদের গন্তব্য| জবাব আসে, ” জ্যাগা(জায়গা) কা নাম মালুম নেহী, লেকিন ট্রাক দেখনে সমঝ জায়েঙ্গে|” আমার ছেলে অবাক হয়, জায়গার নাম জানে না, অথচ ওদের গন্তব্য সেটাই| অপরিচিতাদের এ প্রশ্ন করা যায় না| তাই আমার ছেলে চুপ করে থাকে|
মেয়ে দুটোর মধ্যে লাল স্ল্যাকস বলে, ” নয়া কাম কে লিয়ে যা রহা হ্যয়| উসী লিয়ে জায়গা নেহী পাত্তা| সাথমে আদমী থা| বরসাত মে ছুট গ্যয়ে, জাঁহা উয়ো মিলেঙ্গে, উঁহা উতোর যায়েঙ্গে| হামলোগ ট্রাক মে থে| টয়লেট মে গয়ী থী| উসী লিয়ে ইসি মুসীবত|” সন্তোষজনক কৈফিয়ত, সন্দেহের কারণ নেই| ছেলে চুপ|মাঝে মাঝে চোখ যাচ্ছে রেয়ার ভিউ ফাইন্ডারে| সত্যিই বিধাতার অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি! নিছক চোখের তৃপ্তিতে অপরাধ নেই| বিবাহিত হলেও না | ওদের বাবার ক্ষেত্রেও আমার একই বক্তব্য | সুন্দর জিনিস অমলিন চোখ মেলে দেখার মধ্যে অপরাধ কোথায়? একটু ফুট- নোট জুড়ে দিলাম| এতে আমারও কোন অপরাধ নেই. হাজার হোক, এ কাহিনীর আমি অনু-লিপিকার তো বটে | এ স্বাধীনতা আমি দাবি করতেই পারি|

গাড়ি বাঁকের মুখে| বেশ কিছু মানুষের জটলা| কৌতুহল হয়| জিজ্ঞেস করে,” ক্যয়া হুয়া ইধার?” ” এক ট্রাক ফিসল গ্যয়ে বড়া খায় ( খাদ) মে| ছেলে ঘাড় ফেরায় পেছনে…” আরে মেয়ে দুটো কই!!! পেছনের সীট ফাঁকা! ভাববার সময় নেই| যদি কিছু সাহায্য করা যায় বিপদগ্রস্তদের|
নেমে পড়ে ছেলে গাড়ি থেকে| করার বিশেষ কিছু নেই| উদ্ধার কাজ প্রায় শেষ| যদি আরও কেউ খাদের আরো গভীরে পড়ে থাকে, সেটা নিয়ে হয়তো পরে চিন্তা ভাবনা হবে| আপাততঃ অন্য ট্রাকে মৃতদেহ তোলা হচ্ছে| একি! ছেলে চমকে ওঠে| ওর গাড়ির লিফট নেয়া দুটো মেয়ে! সাদা টপে চাপ লাল রক্ত, আর গোলাপী সিকিমিজ কিমানোয় কাদার দাগ কই? সেখানেও চাপ চাপ রক্ত| কখন ঘটেছে এই ঘটনা? কেউ বলতে পারে না| কাজে বেরোনো একদল শ্রমিকের প্রথম চোখে পড়ে| আমার ছেলে টলতে টলতে ফিরে আসে গাড়ির কাছে| গাড়ির চালক রাম-নাম জপছে বোধহয়| অথবা ওদের কোন নিজস্ব দেবতার নাম| গাড়ি ফিরতি পথে| ভোরের ভেজা নরম আলোতে পথ প্রায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে | ছেলে এবার স্টিয়ারিং এ | চালকের অবস্থা সঙ্গীন | ঠোঁটের কাঁপন আর দুপাটি দাঁতের ঠোক্কর|
ছেলে নিজেও স্তব্ধবাক| নিজস্ব অভিজ্ঞতা যে| ডাইরেক্ট ডাইজেস্ট করা মুশকিল| তা’ ও আবার সদ্যোজাত অভিজ্ঞতা |

… আমার ছেলে সেবার বন্ধুর বাবার দেয়া দায়িত্ব পালন করতে পারে নি| বিয়েও এ্যাটেন্ড করতে পারে নি| তার তিনদিন ধরে ধুম জ্বর|পরে শুনেছিলাম ছেলের কাছে , সেই বন্ধুর বোনের বিয়েতে মাটনের বদলে চিকেন হয়েছিল সেদিন| আর ছেলে শুনেছিল তার সেই বন্ধুর কাছে, ট্রাকে করে প্রায় দিনই মেয়ে পাচার করা হয় নেপাল বা চীনের বর্ডারে| সেদিন বোধহয় সেরকম কিছু ঘটেছিল. অঘটন আজো ঘটে| তাই আমার ছেলের সাথে অলৌকিক প্রেতাত্মার দেখা হয়েছিল |

30/4/2020
বিকেল 4:12.