নিস্কর্মার হাসি : দিলীপ রায়।

0
579

গোকুলের ভারী চেহারা । বেঢপ মোটা । এটাই তার জীবনে বড় খুঁত ! ছিরিছাঁদহীন শরীর হওয়ার জন্যে সে এখন কাছের মানুষের কাছে উপহাসের পাত্র । গোকুলের সঙ্গে একমাত্র শ্রেয়া মেশে । তাই শ্রেয়াকেই একমাত্র তার জমে থাকা মনের দুঃখ বলার সাহস পায় । বেখাপ্পা চেহারার জন্য এমনিতেই গোকুল কেমন যনো মন-মরা । শ্রেয়াকে মনঃকষ্টে একদিন বললো, “কাউকে বোঝাতে পারছি না । মোটা হওয়াটা আমার হাতে না । শরীরটা আপনা আপনি বেঢপ মোটা হলে আমার তাতে কী করণীয় ?” শ্রেয়াকে আবার বললো, “স্কুলের পি-টি স্যার যদিও সাবধান করে বলেছিলেন, তোকে রোজ সকাল বেলায় ফুটবল মাঠে অন্তত এক ঘন্টা দৌড়াতে হবে । তাতে যদি কিছুটা সুরাহা হয় ।“ কিন্তু গোকুল মাঠে দৌড়ালেই বড্ড হাঁপিয়ে যায় । যার জন্য মাঠে কয়েকদিন দৌড়িয়ে হাঁপানোর কারণে মাঠে দৌড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে । প্রচন্ড হাঁপানো ছাড়াও নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় ।
বেমানান মোটা হওয়ার কারণে কলেজে পড়ার সময় যেমন বন্ধু বান্ধবীরা তাকে বিরক্ত করতো, তেমনি এখন চায়ের দোকানদার ঘনাদা পর্য্যন্ত তাকে বিরক্ত করে । চায়ের দোকানদার বলে কিনা, “কম খেতে পারিস্‌ না ?” গোকুল মনে মনে ভাবছে, চায়ের দোকানদারের কী আস্পর্ধা ! চায়ের দোকানদারের কথামতো আমাকে খাওয়া দাওয়া মেপে করতে হবে ? তাই গোকুল রাগে গজরাচ্ছে, এরপর যদি চায়ের দোকানদার পুনরায় তাকে কিছু বলে তাহলে সে দশকথা শুনিয়ে ছাড়বে !
গাঁয়ের ভোম্বল গোকুলকে জিজ্ঞাসা করলো, “এই হাঁদারাম, শ্রেয়াটা তোর কে ?”
আমার বান্ধবী । কলেজে একসঙ্গে পড়েছি ।
দেখতে ঐরকম বিশ্রী কেন ? ঐরকম একটা বিশ্রি মেয়ের সঙ্গে তুই মেলামেশা করিস কিভাবে ? কালো কুচকুচে । সাঁওতালি, সাঁওতালি দেখতে ! তোর সঙ্গে একদম বেমানান !
এই ভোম্বল, বেশী বাড়াবাড়ি করবি না । শ্রেয়া আমার ভাল বন্ধু । একমাত্র শ্রেয়া আমার সুখ দুঃখ বোঝে । আর তোরা সব ধান্দাবাজ । মস্করা করার জন্য আমাকে ডাকলি । এবার সম্মান থাকতে থাকতে বিদায় নে, নতুবা ঝামেলায় পড়বি ?
গোকুল ! ভদ্র ভাষায় কথা বলিস্‌ ? প্রায় তিন বছর ধরে বাড়িতে বাপের হোটেলে খেয়ে তোর তেজ বেড়ে গেছে । নিজে উপার্জন করলে তবুও তেজটা মেনে নেওয়া যেতো । এভাবে আলস্যে দিন কাটালে তোর কপালে অশেষ দুঃখ আছে, বলে গেলাম । তারপর ভোম্বল সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল ।
ভোম্বলের মুখে “বাপের হোটেলে বসে বসে খাওয়ার” কথা শুনে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল গোকুল । সত্যিই তো, প্রায় তিন বছরের কাছাকাছি বাড়িতে বসা । বাবা-মা যদিও কিছু বলেন না । কিন্তু ইতিমধ্যে দুই বৌদির বলা হয়ে গেছে, “দাদাদের ঘাড় ভেঙ্গে আর কতোদিন চলবে ?” তাই ভোম্বলের কথাটা তার মনে বিশেষভাবে নাড়া দিলো । নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শ্রেয়ার সঙ্গে গোকুলের আলোচনা দরকার । শ্রেয়ার সাথে কথা বললেই একটা উপযুক্ত পথ বেরিয়ে আসবে । তাই শ্রেয়ার জন্য গোকুল অপেক্ষায় রইলো ।
কলেজে যখন ছেলেমেয়েরা মিলে গোকুলকে নিয়ে রঙ্গ তামাসা করতো, তখন একমাত্র শ্রেয়া এসে গোকুলকে সেখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতো । বলা চলে অহেতুক উপহাসের বিড়ম্বনা থেকে বাঁচাতো । গোকুলের বেঢপ চেহারা হলে কী হবে তার রাগ সাংঘাতিক । রেগে গেলে তার আবার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না । এটা শ্রেয়া ভাল জানে । তাই গোকুল যাতে বেশী উত্তেজিত হোতে না পারে এইজন্য তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া । কিন্তু গোকুলেরও অদ্ভূত চরিত্র । শ্রেয়া মেয়েটা তার জন্য এতকিছু করে, অথচ গোকুল ঘূণাক্ষরেও তার বাড়ি ঘর কিংবা কী জাতির কিছুই খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না । এর পেছনে একটাই ভয়, শ্রেয়ার পারিবারিক খবর জানার পর যদি তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় ? প্রয়োজনে গোকুল মোবাইলে শ্রেয়াকে ডাকলেই ডাকামাত্রই শ্রেয়া এসে হাজির । তাছাড়া শ্রেয়া দেখতে কেমন, এসবে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই । সে জানে শ্রেয়ার দিল বিশাল বড় মাপের । তবে গোকুল জানে, শ্রেয়া একটা প্রাইমারী স্কুলের চাকরির ইন্টার্ভিউ দিয়েছে । চাকরি হবে কিনা সে জানে না । ইন্টার্ভিউ দেওয়া প্রায় একবছর হতে চললো । কিন্তু নিয়োগের খবর নেই । আদৌ মাস্টার নেবে কিনা সে ব্যাপারেও একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ? তবে এটা ঠিক, চাকরি পেলে মেয়েটা যোগ্য সম্মান পাবে ।
গোকুলের মন মেজাজ ভাল যাচ্ছে না । বাড়িতে দাদারা যদিও এখনও কেউ কিছু বলছে না । কিন্তু তাদের কথাবার্তায় ধীরে ধীরে আন্তরিকতার অভাব প্রস্ফুটিত । আর বৌদিরা রাখঢাক না রেখে খোলাখুলি বুঝিয়ে দিয়েছে উপায়ের পথ দেখো, নতুবা দাদাদের হোটেলে আর বেশীদিন চলবে না । গোকুলের বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে । তাঁরাও এখন দাদাদের মুখাপেক্ষী । গোকুলের সাধারণ গ্রাজুয়েট ডিগ্রিতে এই মুহূর্তে চাকরি জোটানো খুব কঠিন । গোকুল তার জীবনে গভীর সঙ্কটের মধ্যে নিমজ্জিত । অতঃপর কী করণীয়, সেই ভাবনার সাগরে গোকুল সাঁতরাচ্ছে ?
“তুমি অযথা দুশ্চিন্তা করো না । রাস্তার ধারে সিঙ্গারার দোকান খুললে তোমার আয়ের একটা হিল্লে হবে ।“ আশ্বাস দিলো শ্রেয়া ।
দোকান খোলার জন্যে ঘর কোথায় পাবো ?
তোমার মাথায় সত্যিই গবর আছে । থানার সামনের রাস্তা, জনবহুল রাস্তা । প্রচুর লোকজনের যাতায়াত । আর ঐ রাস্তা দিয়েই কলেজের ছেলেমেয়েদের অনবরত যাতায়াত । সুতরাং রাস্তার ধারে ফুচকাওয়ালা দোকানের পাশে বড় ছাতা টাঙিয়ে সিঙ্গারার দোকান খোলো । সিঙ্গারার দোকান খুললে প্রচুর বিক্রিবাট্টা হবে ।
আমি কী পারবো ?
ন্যাকামী না করে কাজে নেমে পড়ো । হাঁড়ি কড়াই নিয়ে আগামীকাল দোকান খুলবে । আমি তোমাকে সব শিখিয়ে দেবো । বাড়িতে বাচ্চাদের টিউশনি পড়িয়ে ব্যাঙ্কে আমি কিছু টাকা জমিয়েছি । সেই টাকা দিয়ে হাঁড়ি, কড়াই, খুন্তি, ইত্যাদি কিনে আগামীকালই দোকান উদ্বোধন ।
সিঙ্গারা তৈরীর মাল মশলা কোথায় পাবো ?
আরে বুদ্ধু, তার জন্য তো আমি আছি । শোনো গোকুল, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইলে এছাড়া অন্য পথ নেই । শুধুমাত্র ইচ্ছেটাই মূলধন । বাড়িতে বসে থাকলে তোমার বৌদিরা এরপরে লাঠি নিয়ে তোমাকে বাড়ি থেকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করবে । তখন বুঝবে কতো ধানে কতো চাল ।
তুমি বেশী ধমকাবে না । আমার বড্ড ভয় করছে, আমি দোকান সামলাতে পারবো কিনা ?
তাহলে যাও, বাড়িতে রাজপুত্র সেজে বসে থাকো আর দাদাদের চোখ রাঙানী সহ্য করো । কাজের কথা বললেই তোমার গায়ে জ্বর আসে । আড়ষ্ঠতায় ঝিমিয়ে যাও । বারংবার বলছি এবার কাজ করে উপায় করে বাড়িতে দেখিয়ে দাও, তুমিও উপায় করতে জানো । সবাইকে বোঝাও, তুমি আর অকর্মার ঢেঁকি নও দস্তুরমতো কর্মার ঢেঁকি ?
আচ্ছা শ্রেয়া, তুমি আমার জন্যে নিরলস খাটছো কেন ?
আহাম্মকের মতো প্রশ্ন করো না । অনেক কাজ বাকী ?
অনেক কাজ বাকী মানে ? আমি তো আগামীকাল হাঁড়ি কড়াই কিনে আনছি । তাহলে আর কী লাগবে ?
তুমি একটা গবেট । সিঙ্গারা তৈরী করতে গেলে ময়দা, সর্ষের তেল, আলু, পেঁয়াজ, মটর শুটি, কাঁচা লঙ্কা, লবন, ধনে পাতা, গাজর, ঘি, ইত্যাদি লাগবে ।
এতগুলি কেনার জন্য টাকা কোথায় পাবো ?
গবেটের মতো কথা বলো না । বার বার বলছি, আমি তোমার পাশে আছি ।
আচ্ছা, তুমি এখনও তোমার গাঁয়ের নাম আমাকে বললে না । বাড়িতে কে কে আছেন জানালে না । তোমরা কোন্‌ সম্প্রদায়ের, সেটাও আমি জানি না ।
আমার সমন্ধে এতসব খবর নিতে তোমাকে কে বলেছে ? আগে সেইটা বলো । তারপর আমি সব বলছি ।
কেন আমাদের গ্রামের ভোম্বল আমার কাছে জানতে চাইছিলো ? কিন্তু আমি তাকে কিছুই বলতে পারি নি ।
বুঝেছি । এইজন্যেই তোমাকে আমি গবেট বলি । নিজের বুদ্ধি নবডঙ্কা ! পরের কথায় তোমার হুঁশ বাড়ে । এবার ওসব ছাড়ো । কাজের কথায় আসা যাক । ফর্দটা কোথায় রাখলে ? ফর্দে কিন্তু উনুনের কথা লেখা হয় নি । শুকনো কাঠ ও কয়লার কথা বলা হয়েছে । সুতরাং তোমাকে উনুন আনতে হবে । আমি বরং সিঙ্গারা বানানোর উপকরণ কিনে আনছি ।
পরেরদিন বেলা তখন আড়াইটে । ছাতা টাঙিয়ে গোকুল রাস্তার পাশে বসে পড়লো । মালপত্র নিয়ে ঠিক পেছন পেছন শ্রেয়া হাজির ।
প্রথমে ময়দা মাখিয়ে নিয়ে একটা পরিস্কার পাত্রে রাখলো । ময়দা মাখাবার কায়দাও শ্রেয়ার অন্যরকম । প্রথমে ময়দা নিয়ে তাতে পরিমান মতো লবন ও চিনি দিয়ে রিফাইন্ড তেল দিয়ে খানিকটা ডান হাত দিয়ে মাখিয়ে নিয়ে দুই ধাপে জল দিয়ে আচ্ছা করে হাতের মুষ্টি দিয়ে চেপে চেপে ময়দাটা সুন্দরভাবে মাখালো । তারপর ভিজা ন্যাকরা দিয়ে সেই মাখানো ময়দা কিছুক্ষণের জন্য ঢেকে রাখলো । সেটা অন্তত আধ ঘন্টা ভিজা ন্যাকরা দিয়ে ঢাকা থাকবে । বাজার থেকে সেরা চন্দ্রমুখি আলু কিনে এনেছে শ্রেয়া । শ্রেয়ার বক্তব্য, লাভ কম হোক, কিন্তু গুণমান সঠিক হওয়া বাঞ্ছনীয় । অন্যান্য চপ-সিঙ্গারা ব্যবসায়ীদের মতো গোকুলের ব্যবসা নয় । অন্যান্যরা সাধারণত; বাজার থেকে পরিত্যক্ত আলু কেনেন । কোনোটা পচা, আবার কোনোটা মাঝখান থেকে কাটা । আলুর বস্তা খোলার পর ভাল আলু বাছাই হয়ে গেলে যেসব পরিত্যক্ত আলু পড়ে থাকে সেগুলি যায় চপ-সিঙ্গারা তৈরী হওয়ার জন্যে । যাই হোক শ্রেয়া সেই আলুগুলি প্রথমে ছোট ছোট করে কেটে সিদ্ধ করে একটা পরিস্কার পাত্রে রাখলো । তারপর সেদ্ধ আলু, মটর শুটি, গাজর, বাদাম, পেঁয়াজ কুচি, ধনে পাতা কুচি, মশলা দিয়ে উনুনে কড়াইতে খাঁটি সর্ষের তেল দিয়ে সিঙ্গারার পুর তৈরী করতে থাকলো । এবার ময়দাটা লম্বা রুটির মতো লম্বা করে প্রথমে বেলে দুটি ভাগে ভাগ করে নিলো । মাঝখানে যে জায়গায় অর্দ্ধেক ভাগ করলো সেখানে এবং চারিদিকে একদম কিনারে খুব অল্প জল লাগিয়ে দিলো এমনভাবে যাতে সেটা সিঙ্গারা ভাঁজ করার সময় আঠার কাজ করে । তারপর সিঙ্গারার পুর দিয়ে বেলে রাখা রুটি এমনভাবে ভাঁজ করলো যার জন্য সিঙ্গারার গঠনাকৃতির রুপ নিলও । পুরটা পরিমান মতো দিতে হবে । কম দিলেও চলবে না, আবার বেশী দিলেও চলবে না । সিঙ্গারার অর্থাৎ ময়দা মাখানো মুখটা সুন্দরভাবে হাত দিয়ে চেপে লাগালো । প্রয়োজনে আবার আঙ্গুলে জল নিয়ে সিঙ্গারার মুখটা বন্ধ সুন্দরভাবে বন্ধ করলো । তারপর একটা জায়গায় পরপর সাজিয়ে রাখলো শ্রেয়া ।
কয়লার উনুন জ্বলছে । কড়াইতে শর্ষের তেল ঢাললো । তেল গরম হওয়ার পর প্রথম রাউন্ডে পনেরটা সিঙ্গারা গরম তেলে ছাড়লো । তারপর ভাজা হোলো সুন্দর ফ্রেস সিঙ্গারা । ভাজা সিঙ্গারা দেখে গোকুলের মুখে অপূর্ব এক চিলতে হাসি যেটা দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধে জয় করার হাসি ।
শীতের বিকেল । তখন চারটে । সূর্য ক্রমশঃ অস্তাচলের পথে । তাদের প্রথম খরিদ্দার কলেজের তিনটি মেয়ে ও তিনটি ছেলে । তারা প্রত্যেকে দুটি করে সিঙ্গার খেয়ে গোকুলের ভূয়সী প্রশংসা করে সেখান থেকে বিদায় নিলো । প্রশংসা পেয়ে গোকুল আনন্দে উচ্ছ্বসিত । তারপর……।
তারপর শুরু হয়ে গেল গোকুলের জীবনে উপার্জনের পথ চলা ।
গোকুলের গাঁয়ের মানুষ অবাক । নাদুস-নুদুস চেহারা অকর্মার ঢেঁকিটা কিনা সিঙ্গারার দোকান খুলেছে । তাও আবার বড় রাস্তার মোক্ষম জায়গায় । যে রাস্তায় সর্বক্ষণ বিভিন্ন পেশার মানুষের যাতায়াত । গাঁয়ের হারু খুড়ো গোকুলের দোকানে এসে সামনে রাখা দুটি টুলের মধ্যে একটিতে বসে বললেন, হ্যারে গোকুল । শুনছি তোর দোকানের সিঙ্গারা সুস্বাদু । দুটি সিঙ্গারা ভেজে খাওয়া তো গোকুল । তৃপ্তি করে সিঙ্গারা খেয়ে যাই । অনেক দিন সিঙ্গারা চপ খাওয়া হয় না । আজ অন্তত তোর দোকানের সিঙ্গারা খেয়ে বাড়ি যাই । তারপর তিনি সিঙ্গারা খেয়ে বললেন, যা শুনেছি তোর সিঙ্গারা গুণমানে একেবারে সঠিক । তোর দোকান ভাল চলবে । তুই বরং চপও ভাজ । আর সাথে মুড়ি রাখিস । পয়সা দিয়ে বললেন, চললুম গোকুল ।
এলাকায় গোকুলের সিঙ্গারার সুখ্যাতি আরও বেড়ে গেল । এখন তাকে সহযোগীতা করার জন্য একজন অল্প বয়সী ছেলে মদনকে দোকানে রাখতে হয়েছে । গোকুল সিঙ্গারার দোকান নিয়ে মেতে উঠলো । অন্যদিকে শ্রেয়ার খবর নেওয়ার গোকুলের আর সময় নেই । সিঙ্গারার দোকানে এখন মুড়িও পাওয়া যাচ্ছে । মদনকে নিয়ে গোকুলের ব্যবসা এখন রমরমা ।
দেখতে দেখতে দুটি বছর অতিক্রান্ত ?
শ্রেয়াকে বিয়ে দিতে তার বাবা-মা মরিয়া । সম্বন্ধের ব্যাপারে দূর দূর থেকে যেসব লোক আসছেন, কিন্তু শ্রেয়াকে কেউ পছন্দ করছেন না । তার একটাই নেতিবাচক দিক, শ্রেয়া দেখতে ভাল না । তাছাড়া তার এক মাথা চুল । হৃষ্টপুষ্ট চেহারা । যদিও মুখটা অতোটা আকর্ষনীয় নয় । শ্রেয়া জানে তার কপালে সহজে বিয়ে লেখা নেই । সুতরাং বিয়ে নিয়ে বেশী মাথা ঘামাচ্ছে না । যা হবার তাই হবে, এই নিয়ে মন খারাপ করে উদাস হয়ে বসে থাকার পাত্রী শ্রেয়া নয় । ছাত্র ছাত্রী পড়িয়ে তার দিব্যি সময় কাটছে । ইতিমধ্যে পাশের গাঁয়ের জেলে পাড়ার মুদিখানার দোকানদার শঙ্করের মনে ধরলো শ্রেয়াকে । শঙ্করের বাবা মা শ্রেয়াদের বাড়ি এসে তার বাবা মাকে শ্রেয়াকে একমাত্র পুত্রের বৌ করার প্রস্তাব দিলেন ।
ঠিক সেদিনই হঠাৎ গোকুলের ফোন ! গোকুল কান্নাভেজা গলায় শ্রেয়াকে বললো, “সর্বনাশ হয়ে গেছে । থানার পুলিশ এসে দোকার ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে । এখন কী করবো বুঝতে পারছি না ।“
শ্রেয়া ফোনেই উত্তর দিয়ে বললো, “বেআইনি জায়গায় দোকান চালাচ্ছো, সুতরাং পুলিশে দোকান ঘর ভাঙ্গতে পারে এটাই স্বাভাবিক । ভেঙ্গেছে তার জন্য ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই । যতোদিন স্থায়ী ব্যবস্থা না হচ্ছে ততোদিন ঐখানেই আবার দোকান মনের আনন্দে চালু করো ।“
তুমি কবে আসবে ?
আমি কিভাবে যাবো ? আমাদের জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্‌ গাঁয়ের মুদির দোকানদার শঙ্করের সাথে আমার বিয়ে ?
গলার সর্ব শক্তি দিয়ে গোকুলের চিৎকার , “না ।“
তারপর………?
——————–০————-