মানব জীবনে ভক্তিই শক্তি – একটি পর্যালোচনা : দিলীপ রায়।

0
510

ভক্তি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি । আপনা আপনি তার বিকাশ । মানুষের নিজস্বতার অভ্যূত্থান । যদিও এটা ঘটনা যে, ভক্তির অর্থ পূজনীয় ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা । আবার ভক্তি হিন্দু ধর্মে উপাসনা তথা আরাধনার একটি বিশেষ রীতি । পূজনীয় দেবতা বা ব্যক্তির প্রতি বিশেষ বিশেষ অনুরাগ বা প্রেমকেই ভক্তি বলে । ঈশ্বরের নিকট সম্পূর্ণ আত্নসমর্পনের নাম ভক্তি । কিন্তু ভক্তি আনয়নে বিভিন্ন রীতি-পদ্ধতি জনজীবনে প্রচলিত । ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যজ্ঞ, বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তিপূজা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির (যেমন ইস্কন) সতত প্রয়াস, ইত্যাদি ভক্তি আনয়নের বিভিন্ন মাধ্যম । মানুষের হৃদমাঝারে ভক্তিরস, ভক্তিভাবের উদ্রেক ঘটাতে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন কীর্তন, পালাগান, রামায়ন গান, পূজাপার্বন এমনকি ধর্মীয় নাটকের ভূমিকা অনস্বীকার্য । ইদানীং টি ভি’র বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ইউটিউবের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় সংঙ্গীত, মানুষের মধ্যে ভক্তিরস সৃষ্টির বড় সহায়ক । এছাড়া মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, ইত্যাদির ভূমিকা ভক্তির ব্যাপক প্রসারে উল্লেখযোগ্য । স্বয়ং ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছেন, “যত মত তত পথ” । এর ব্যাখায় বিভিন্ন বিদগ্ধজন তাঁদের উৎকৃষ্ট চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন । তবুও বাণীটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী । ঠাকুর রামকৃষ্ণ অকপটে বলেছেন, “বিভিন্ন পথ দিয়ে পৌঁছানো যায় ঈশ্বরের কাছে” । ভক্তি,ব্যকুলতা, ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা, ইত্যাদি প্রকৃত পথ । তাঁর মতে, মানবজীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বর লাভ, আর তারই উপায় সহজ কথায় তিনি তুলে ধরেছিলেন তাঁর “যত মত তত পথ” বাণী দিয়ে । এটা স্পষ্ট যে, অভীষ্ট সাধনের লক্ষ্যে বাণীটির তাৎপর্য বলা যেতে পারে সঠিক ও বাস্তবসম্মত । সুতরাং ঠাকুর রামকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে এইভাবে ভক্তির সঃঞ্চার ঘটিয়েছিলেন । তদ্রুপ কেউ আবার পরম করুণাময় শ্রীকৃষ্ণের পূজারী অর্থাৎ তাঁরা কৃষ্ণভক্ত মানুষ । শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে তাঁদের ভক্তি নিরন্তর । আবার কেউ শিব পূজায় আগ্রহী । সুতরাং তাঁদের মধ্যে শিবভক্তির ভাব উজ্জ্বীবিত । আবার মসজিদের নমাজে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের উপস্থিতি অনস্বীকার্য । গীর্জায় খ্রীষ্টানদের ভক্তি পরম্পরা । বৌদ্ধদের বুদ্ধভক্তি চিরাচরিত । বুদ্ধ ধর্মালম্বী ভক্তজনের ধর্মপালনের পদ্ধতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় । শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের ভক্তি বিশ্বব্যাপী । এখনও অমৃতস্বরের স্বর্ণমন্দিরে এবং অন্যত্র গুরুদ্বারে, করসেবকদের (শিখ সম্প্রদায়ভূক্ত) অনলস সেবা, শিখদের ভক্তির উৎকৃষ্ট উদাহরণ । সুতরাং মানুষের মধ্যে ভক্তির বিভিন্নতা লক্ষণীয় । দেব-দেবীর চেয়ে আজও বেশ কিছু মানুষের পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি অবিচল । তাঁরা তাঁদের বাবা-মা’কে উৎকৃষ্ট গুরু হিসাবে মানেন । সুতরাং উপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, মানুষের মধ্যে ভক্তির প্রকাশ বিভিন্নভাবে বিকশিত । এজন্য পথে ঘাটে সাধু সন্ন্যাসীদের বা বিভিন্ন ভক্তজনের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে বলা যায়, তিনি কোন্‌ ঈশ্বরের ভক্ত ? অর্থাৎ বৈষ্ণবভক্ত, বা তিনি মা-কালী ভক্ত । বাস্তবে অসংখ্যরকম ভক্তির বিভিন্নতা বিরাজিত ।
“ভক্তি-জ্ঞান, মানুষের শক্তির উৎস্য”  বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তকে এই পঙ্‌তির যথার্থতা, সত্যতা পরিলক্ষিত । কথিত আছে, ভক্তির মাধ্যমে জ্ঞানের বিকাশ । জ্ঞান ও ভক্তি একে অপরের পরিপূরক । “জ্ঞান-ভক্তি-কর্ম” তিনের সমন্বয় আত্নদর্শণের পরম পাথেয় । এখানে উল্লেখ্য, কেবলমাত্র শুদ্ধ ভক্তেরাই কেবল শ্রীকৃষ্ণের সর্বকারণ-কারণত্ব, সর্বশক্তি, যশ, সৌন্দর্য্য, জ্ঞান ও বৈরাগ্য আদি অনন্ত চিন্ময় গুণসমূহ কিঞ্চিৎরুপে জানেন । কারণ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের প্রতি সর্বদাই অনুগ্রহশীল । “জড় স্থুল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কখনই শ্রীকৃষ্ণকে জানা যায় না । ভক্তের ভক্তিতে প্রসন্ন হলে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর কাছে নিজেকে প্রকাশিত করেন” । (সূত্র ঃ ভক্তিরসামৃত সিন্ধু পর্ব ২/২৩৪) । আবার ভক্তিই মানুষ্কে ঈশ্বরের কাছে আত্নসমর্পণে সহায়তা করে । গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে ( মোক্ষযোগ ) কৃষ্ণরূপী ভগবান বললেন,
‘তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত
তৎপ্রাসৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসিশাশ্বত্তম’
অর্থাৎ অর্জুন, তুমি সর্বোতভাবে ঈশ্বরের শরণাগত হও । তাঁর কৃপায় তুমি পরম শান্তি ও শাশ্বত ধাম লাভ করবে ।
মনীষীরাও ভক্তিকে অবলম্বন করে ইষ্টের আরাধনায় নিজেদেরকে মেলে ধরতেন । উৎকৃষ্ট উদাহরণ শ্রীরামকৃষ্ণ । তাঁর মাতৃ ভক্তি (মা কালী) বিশ্ববন্দিত । নবদ্বীপের নিমাইয়ের কৃষ্ণ ভক্তি সর্বজনবিদিত । আবার নিজ-নিজ ভক্তির কারণে বর্তমানে প্রতি শনিবারে শনি-মন্দিরে বাঙালীদের উপচে পড়া ভিড় সকলের নজরকাড়া । সুতরাং ভক্তির টানে আজও ঘরে ঘরে বিভিন্ন ঠাকুর-দেবতার পূজোর আনন্দোচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত । তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গনেশ, দুর্গা, কালী, শিব, লক্ষী, ছট্‌-পূজা, ইত্যাদী । সুতরাং এটা অনস্বীকার্য, মানুষের মধ্যেই ভক্ত ও ভক্তি’র অবস্থান বিদ্যমান । অন্যদিকে ভক্তির বহির্প্রকাশ নিয়েও আশঙ্কার লক্ষণ মানুষের চোখে-মুখে । কেননা ভক্তির ভাব, ভক্তি রস বর্তমান প্রজন্মের কাছে সুদূরপরাহত । যেমন আগেকার দিনে বাড়িতে কোনো পূজনীয় অতিথি বা গুরুজন বেড়াতে এলে তাঁকে গড় হয়ে ভক্তিচিত্তে প্রণাম করার রেওয়াজ ছিলো । এটা শুদ্ধ ভক্তির নিদর্শন । যিনি প্রণাম করতো বা করতেন, তার ভক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ঐ অতিথি বা গুরুজন প্রাণখুলে আশীর্বাদ করতেন । ঐ আশীর্বাদ পাওয়ার মোহ মানুষকে আরও ভক্তিশীল হোতে সাহায্য করতো । বর্তমান প্রজন্মের ভিতর ঐ গড় হয়ে প্রণাম করার রেওয়াজ নিস্প্রভ । বরং প্রণাম থেকে এড়িয়ে চলাটাতেই তারা স্বচ্ছন্দ । পূজা-মন্ডপে, মন্দিরে হাতের একটা আঙ্গুল কোনোরকমে কপালে ঠেকিয়ে প্রণামের দায়িত্ব পালনে আজকের প্রজন্ম অভ্যস্ত । এখানেই শঙ্কা । উৎকন্ঠার ঘনঘটা । সুতরাং ভক্তির ব্যাপ্তি আবশ্যক । ভক্তি বাদ দিয়ে জীবনযুদ্ধ নিস্ফল ।
আমাদের দেশে সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব এক মর্যাদাপূর্ণ স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী । সেই সুদূর বৈদিক যুগ থেকে শত শত সাধকের জীবন ও সাধনায় সমৃদ্ধ হয়েছে ভক্তিবাদী ভাবনা । কিন্তু মহাপ্রভুর হাত ধরে তা পূর্ণতা লাভ করে পরিপূর্ণ দর্শনে পরিণত হয়েছে । শ্রীভগবানের প্রতি অহেতুকী ভালবাসাকে তিনি ভক্তির অপরাপর ধারা থেকে পৃথক করেন এবং তাঁকে সর্বাত্নক রূপ দান করেন । প্রমানিত হয় ভক্তির শ্রেষ্ঠত্ব । যাবতীয় মত ও পথের সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে শুধুমাত্র ভক্তির শক্তিতে যে ব্যাপক জাগরণ সম্ভব – জগৎ ইতিপূর্বে তা কখনো প্রত্যক্ষ করেনি । (সূত্র ঃ উদ্বোধন / পৃ-১৬৫, চৈত্র ১৪২৬) ।
তাই শুদ্ধ ভক্তি বিকাশের প্রয়াসে সতত সচেষ্ট থাকাটাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা চ্যালেঞ্জ হোক ।
——————————————————————
এ১০ক্স/৩৪, কল্যাণী-৭৪১২৩৫ (নদীয়া) / ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here