নির্ভেজাল সত্যি : ডঃ অশোকা রায়।

0
431

বয়েস হলে ফেলে আসা স্মৃতিদের গুন গুন যেনো বেড়ে যায়। হয়তো সেটাকে গুনগুন বলা ভুল। আসলে এটা অবসর জীবনে অতীতের নানা কথার মধুর- মেদুর অলস আলাপণ। হয়তো নিজে নিজে, নয়তো দুজনে। তাতেই আজকাল বড়ো তৃপ্তি। তবে আলোচনা শেষে তৃপ্তির সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে কখনো কখনো…” দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি” ক্রিকেট সাজা না মজা.. এই স্মৃতিকথায় আমার স্বামীর কিছু স্মৃতি তোমাদের সাথে শেয়ার করেছিলাম। আজ চলো তারই চোখে তার ছোটোবেলার এক ঝলক স্মৃতি আবার ঝলমল করে উঠুক। এই স্মৃতিকথা বিখ্যাত এক সাহিত্যিককে
নিয়ে। চলো ঘুরে আসি ওর সাথে ওর ছোটোবেলা থেকে। ওর তখন সাত-আট বছর বয়েস। তখন ওর জীবনে আমি কোথায়? তাই ওর জবানীতেই শোনো।
সেদিন রথযাত্রার আগের দিন। মনটা খুব খুশি। জগন্নাথ, বলরাম সুভদ্রা কে রথে চাপিয়ে বন্ধুদের সাথে পাড়া টহল দেব, আর ভেঁপু বাজাব। সংগে বাড়িতে ভাজা হবে পাঁপড়। কুড়মুড়। আহা কি উপাদেয়। তবে সে মুহুর্তে আমি আমাদের বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক ফালি রসালো তরমুজ জম্পেশ করে খাচ্ছি। পরণে হাফপ্যান্ট, উর্ধাঙ্গ নগ্ন। বেশ মনে আছে প্রচন্ড গরম সেদিন। আকাশ ভর্তি মেঘের আনাগোনা। অথচ জমাট বাঁধার চিহ্ন নেই। ফলে ভ্যাপসা গরমে তরমুজের রসে প্রাণহরার সন্ধান। একটা সাদা গাড়ি এসে থামে আমার সামনে। তরমুজের বীজ ফেলতে গিয়ে থমকে যাই। আজকের আমার মনে হয়, তরমুজের রসাস্বাদনের ব্যাঘাতে আমার মেজাজ চটকে গিয়েছিল সে সময়। তবে বালকসুলভ কৌতূহল বড়ো হয়ে উঠেছিল। তরমুজ খাওয়া থামিয়ে অনুসন্ধিৎসু চোখে জরিপে মেতেছি, কে এলো? দরজা খুলে গেছে। গাড়ি থেকে প্রথমে বেরিয়েছে নাগরা পরা দুটি পা, তারপর আস্ত মানুষটা। আরিব্বাস কি সুন্দর দেখতে! পরণে দুধ-সাদা শেরওয়ানি ও কাজ করা পাঞ্জাবি। আমায় জিজ্ঞাসা করেছেন, ” তোমার বাবা, বাড়িতে আছেন? ” তরমুজের কিছুটা রস মুখে, বীজ সুদ্দু গিলেছি। ঘাবড়াইনি একটুও। বাজিয়ে দেখতে হবে না, লোকটার কোন কুঅভিসন্ধি আছে কিনা? মা তো এখন একা বাড়িতে। তার খোকন বীরপুরুষ। মাকে তো রক্ষা করার দায়িত্ব বাবার অনুপস্থিতিতে আমার। গম্ভীর হয়ে পাল্টা জবাব চেয়েছি, ” তুমি
কে? ” আমার তরমুজের রস লাগা গালে আদরের টিপুনি, “আমি তরমুজা আলি, তুমি খাও তরমুজের ফালি। ” লোকটার রসাত্মক কথায় বিশেষ মজা পাই নি। আসলে রসিকতা বুঝব কি করে? লোকটার পরিচয় যে জানা নেই তখনো। পরে যখন জেনেছি, তখন যত তাঁকে দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি। তবে সেদিন এ প্রশ্ন করতে ছাড়িনি, ” এ কেমন ধারা নাম তোমার? বানানো নাম বলে কোন ছেলে ধরা নও তো? ” লোকটির অট্টহাসি। আমার কিঞ্চিৎ বিড়ম্বনা। তা ঢাকতে তরমুজের গায়ে কামড়। মা বারান্দায় হাসির শব্দে, ” ওমা, ঠাকুরপো আপনি! অনেক দিন হয়ে গেল, এ পথ যে মাড়াননি বড়ো। তা’ দরজায় দাঁড়িয়ে কেনো, আসুন, ভেতরে আসুন। ” আমি ভ্যাবা গঙ্গারাম। মায়ের এতো পরিচিত! এতোটাই আপ্যায়ন। ওঁর সাথে বেয়াদপি আচরণ করেছি আমি! বলেছি, ছেলেধরা! আজ কপালে মার অবধারিত। ভদ্রলোক নালিশ করবেন, আর আজ নির্ঘাত মা আমায় মারতে গিয়ে হাতের শাঁখা ভাঙবে। উঠোনের তুলসি তলায় শাঁখার টুকরোর সংখ্যা বাড়বে। শাঁখারী আসবে আবার কাল সকালে বাড়িতে। কিন্তু ভদ্রলোকের নালিশের ধান্ধা নেই বলেই তো মনে হচ্ছে। মাকে বলতে বলতে বাড়ির ভেতরে ঢুকছেন, “বৌঠান, জানেনই তো আমি বোহেমিয়ান। এক জায়গায় ভালো লাগে না বেশিদিন। ঠিকানা বদল আমার রক্তে। শান্তিনিকেতনের অধ্যাপনার চাকরি কতবার ছাড়া হলো বলুন তো; কতবার আবার ফিরেও গেলাম। তবে কলকাতায় থাকলে এ বাড়ি আমায় যেনো টানে। ” আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বাকি তরমুজ শেষ করে খোলা আর বীজ গুলো যতটা সম্ভব দূরে ফেলি। মা না হলে বকবে। এই নির্জন দুপুরে যে দু একটা কাক আছে, তারা যদি ঠোঁটের ফাঁকে খোলা গুলো নিয়ে আরো দূরে চলে যায়, আমি আরো নিশ্চিন্ত। আমি বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে ভাবি, “আচ্ছা ভদ্রলোক জানলেন কি করে, আমি আমার বাবার ছেলে! ” উনি তো সরাসরি আমায় প্রশ্ন করেছেন, বাবা বাড়িতে আছে কিনা? হিসেব মেলাতে পারিনি। মায়ের সাহায্য নিতে হয়েছে, রাতে শোবার সময়। ” মা উনি আমায় চিনলেন কি করে? আমি তো চিনি না।” ” তুই যখন পাঁচ বছরের, তখন ঠাকুর পো শেষ এসেছেন। ওঁনার স্মৃতি আর তাৎক্ষণিক অনুমানের ক্ষমতা প্রবল। তাই এতদিন বাদেও তোকে ঠিক চিনতে পেরেছেন মুজতবা ঠাকুরপো।আর দ্যাখ তুই কেমন ভুলে গেছিস! সাধে কি বলি বুদ্ধুরাম!” খোকন জিজ্ঞেস করে তার মাকে, ” কে মুজতবা? ” উনি যে বললেন ওঁর নাম তরমুজা আলি! ” মা সে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। হেসে বলেছে , “নে ঘুমো এবার। ” পরে জেনেছি, মায়ের মুজতবা ঠাকুরপো হচ্ছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। আমি তার ন্যাওটা হয়েছিলাম। বেশিদিন না এলে মা যখন অনুযোগ করেছে, “শান্তিনিকেতন কত দূর ঠাকুরপো,
এতদিন বাদে বাদে দর্শন দেন কেন বলুন তো ? আমার মনে এই একই কথার প্রতিধ্বনি।
সৈয়দ মুজতবা চাচার সাথে মায়ের আপন দেবর- বৌঠানের সম্পর্ক। ধর্মের কোন বেড়াজাল সে সম্পর্কে ছিল না। মা আর মুজতবা চাচার মানসিকতায় অনেক মিল- জুল। মুজতবা চাচার শুধু কোরাণ নয়, বাইবেল, বেদ- বেদান্ত- গীতায়ও প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি ও অনুরক্তি। আমার মায়েরও হিন্দু শাস্ত্রে প্রগাঢ় জ্ঞান ছিল। কিন্তু গোঁড়ামি ছিল না। তাই দেখেছি কখনো মুজতবা চাচা মাকে কোরাণ- বাইবেলের ব্যাখা শোনাচ্ছেন। কখনো মা চাচাকে গীতার শ্লোকের মর্মার্থ বোঝাচ্ছেন। দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ঋদ্ধতা বাড়ছে। মা ছোট মেয়ের মতো তাঁর মুজতবা ঠাকুরপোর কাছে আবদার করছে, ” বাইবেলের যে জায়গাটা সেদিন বোঝাচ্ছিলেন ঠাকুর পো, সেটা আজ আরেকবার বলবেন, পুরোপুরি না বুঝলে কেমন অস্বস্তি লাগে। ” দেখেছি,
তিন ধরনের ধর্মের মুক্ত আলোচনাকে আমাদের হলঘরের বাতাসটা কেমন বদলে দিতে। মা মুজতবা চাচাকে বলেছে, “আপনি তো প্রায়ই বিদেশে যান, প্রতি জায়গা থেকে চার্চ, মন্দির, মসজিদ নির্বিশেষে কিছু একটা স্মারক নিয়ে আসবেন আমার জন্য? ” ” কি করবেন বৌঠান? ” “আমার আলমারিতে রাখবো। সর্ব তীর্থ সমন্বয় হবে আর কি? রোজ স্নান করে প্রনাম করব।” মুজতবা চাচা তাঁর বৌঠানের মধ্যে পরিণত আধ্যাত্মিক মনস্কতা অনুভব করেছেন। মনে পড়ে, মুজতবা চাচা ঠিক এর পর-পর বিদেশ গেছেন। কোথায় জানা সেদিনও ছিল না, আজো নেই। তবে জানি সাগর পাড়ের কোনো দেশের চার্চ থেকে একটা বোতলে হোলি ওয়াটার আর বার্লির বিস্কুট মাকে এনে দিয়ে বলেছেন, “খ্রীশ্চানরা বিশ্বাস করে হোলি ওয়াটারে এই বার্লির বিস্কুট চুবিয়ে খেলে মৃত্যুর সময় স্বর্গের রথ আসে তাদের নিয়ে যেতে। ”
মুজতবা চাচার সর্ব ধর্মে বিশ্বাস ছিল। অথচ কোন ধর্ম নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়তেন না। এমন কি কোরাণকেও নয়। একবার বলেন, ” কোরাণ কে লাল কাপড়ে মোড়ানো দেখলে মনে হয়, রক্ত চক্ষু মেলে শাসাচ্ছে, এই করো না, ঐ করো না। আল্লাহ পাপ দেবে। আমি তো বাবা কোরাণ ঢুঁড়ে ফেলেও এই সব বিধি নিষেধ পাইনি। যা পেয়েছি কোরাণে, তাই -ই পেয়েছি, গীতা- বাইবেলে। জানেন বৌঠান, একদিন যদি গীতার কোনো অংশ না পাঠ করি, মনে হয়, কর্ণের রথের চাকার মতো আমার জীবনের চাকাও মেদিনী গ্রাস করছে। ” মুজতবা চাচার রসবোধ সাংঘাতিক। ধর্মেরও এ ব্যাপারে ছাড়ানছুড়ি নেই। কিন্তু এ রসিকতায় মালিন্য নেই। আজকের আমি মনে করি, ধর্ম নিয়ে ভন্ডামি করার চেয়ে, প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নির্মল রসিকতায় ক্ষতি কি? তাইতো একবার এক গীর্জার মোমবাতি মাকে এনে দিয়ে মুজতবা চাচা বলেন, এই মোমবাতি যীশুর পায়ের তলায় কিছুক্ষণ জ্বলেছে বৌঠান, যীশুর আর্শীবাদ ধন্য। যান ঠাকুরঘরে রেখে আসুন। ” মা তাই-ই করেছিল।
এইরকম নানা ক্ষেত্রে নানা বিখ্যাত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছি। পরে আবার অন্য কারোর গল্প বলব। তবে গল্প হলেও এগুলো নির্ভেজাল সত্যি।
1 st এপ্রিল, 2021.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here