আনাড়ি মহিলার উচ্ছৃঙ্খলতা (ধারাবাহিক উপন্যাস, চতুর্থ পর্ব) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
364

তখন সন্ধ্যা ৬টা ৩০মিনিট । ইতাস, ইমলি ও গদাই তিনজনে মিলে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কুসুমগ্রাম শাখায় উপস্থিত । ব্রাঞ্চে কর্মচারীদের মধ্যে তখন কাজের ভীষণ তৎপরতা । বলা চলে কর্মচারীদের মধ্যে কাজের হুলস্থুল । কেননা শেষ হয়ে যাওয়া আর্থিক বছরের হিসাব-নিকাশের অডিটের জন্য উপর থেকে স্ট্যাটুউটরি অডিটের লোকজন এসেছেন । অবাঙালি চার্টার্ড ফার্ম । তাঁদের চূলচেরা অডিট । নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অডিট শেষ করার জন্য তাড়াহুড়ো । সুতরাং ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাবুকে অডিটরদের সঙ্গে বেশী সময় দিতে হচ্ছে । ডকুমেন্টস ভেরিফিকেশন, ভাউচার্স চেকিং, হিসাবের খুঁটিনাঁটি, ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অডিটরদের বোঝাচ্ছেন, এমনকি প্রয়োজনে কাগজপত্র দেখাচ্ছেন ম্যানেজার বাবু । সঠিক হিসাবের প্রেক্ষাপটে অডিটরকে সন্তুষ্টি করা ম্যানেজার বাবুর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে । তাই সবটাই ম্যানেজার বাবু সামলাচ্ছেন । এছাড়া গ্রামীণ ব্যাঙ্কের আঞ্চলিক অধিকর্তা সকাল থেকেই ব্রাঞ্চে বসে আছেন । তিনি ব্রাঞ্চের ব্যবসা বৃদ্ধির স্বার্থে কুসুমগ্রাম বাজারে বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য শাখা প্রবন্ধককে নিয়ে বেরিয়েছেন । এই সময়টা অডিটরদের সামলাচ্ছেন ম্যানেজার বাবুর পরের অফিসার । অফিসে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাবু কখন ফিরবেন, কেউ তার হদিস দিতে পারছেন না । অথচ ইতাস ও ইমলি অনেক আশা নিয়ে শাখা প্রবন্ধকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো । এই মুহূর্তে তাদের থাকার ব্যাপারটার সুরাহা হওয়া দরকার । থাকার ব্যাপারটা নিয়ে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাবু কথা দিয়েছিলেন, ব্রাঞ্চের অন্যান্য কর্মীদের সম্মতি মোতাবেক ইমলিদের ব্রাঞ্চ বিল্ডিংয়ে থাকার ব্যাপারে মত দেবেন । কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি । ব্যাঙ্কে এখন অডিট চলছে । অডিট শেষ না হলে ম্যানেজার বাবুর সাথে কোনো কথা বলেও লাভ নেই । যা হবে অডিটের পরে । গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটিউটরি অডিট । সুতরাং ম্যানেজার বাবুর ধ্যান জ্ঞান অডিটের কাজে ঠিক ভাবে সহায়তা করা ।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সাহেবকে না পেয়ে গভীর সমস্যায় পড়ে গেল ইতাস ও ইমলি । কুসুমগ্রামে রাত কাটানোই সমস্যা । এতবড় বর্ধিষ্ণু গ্রামে থাকার জায়গা নিয়ে ইমলিদের সমস্যা । স্টেশন কাছে থাকলে স্টেশনের প্লাটফর্মে রাত কাটানো বরং সহজ । ম্যানেজার বাবুকে না পেয়ে তারা খুব উদ্বিগ্ন । কিভাবে এত বড় রাত কাটাবে, সেটাই চিন্তার বিষয় ! অন্যদিকে রাতে থাকার ব্যাপারে গদাই কোনো আশ্বাস দিতে পারলো না । ইতাস গালে হাত দিয়ে অসহায়ের মতো বসে পড়লো । দুশ্চিন্তায় তার নাভিশ্বাসের ন্যায় অবস্থা । তার প্রাণ প্রিয় স্ত্রীকে নিয়ে কিভাবে রাত্রি যাপন করবে সেই দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত । ইমলি ইতাসের মাথায় হাত দিয়ে বললো, “চিন্তা করো না । পথ একটা বের হবেই” । “রাত্রি এখন সাড়ে আটটা । গদাই কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ি চলে যাবে । তারপর আমাদের গতি কী হবে ভেবে দেখেছো, অথচ তুমি বলছো পথ একটা বের হবে । কোথা থেকে বের হবে, আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না” ? উদ্বিগ্নতার সাথে ভয়ার্ত মুখে ইতাস তার মত ব্যক্ত করলো ।
নিশ্চল পাথরের ন্যায় দুটি মানুষ গদাইয়ের চায়ের দোকানে ঠায় চুপচাপ বসা । ধীরে ধীরে বাজারের সমস্ত দোকান ঘরের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । বর্দ্ধমান যাওয়ার শেষ বাস অনেকক্ষণ আগেই কুসুমগ্রাম ছেড়ে চলে গেছে । বাস স্ট্যান্ড প্রায় ফাঁকা । গদাইয়ের চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে এইমাত্র মালডাঙ্গা যাওয়ার শেষ বাস চলে গেল । যদিও বাসে প্যাসেঞ্জার কম । বাস স্ট্যান্ড সুনসান । বাজারের ভিতর সবদোকান মোটামোটি বন্ধ । অদূরে হেমায়েত হাটির রুটি তড়কার দোকান খোলা । তাঁর দোকানে বসে দুজন খরিদ্দার খাচ্ছেন এবং তিনজন মানুষ সম্ভবত বাড়ির জন্য রুটি তড়কা নেবেন বলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন । হেমায়েত হাটি দূরন্ত গতিতে রুটি বানিয়ে যাচ্ছেন । ফাঁকে ফাঁকে কড়াইতে তড়কা বসিয়ে নাড়াচাড়া করছেন । গদিয়ের কাছে তারা শুনেছে, হেমায়েতের দোকানের রুটি তড়কা নাকি খুব সুস্বাদু । যার জন্য তাঁর দোকানে বিক্রি-বাট্টা বেশী । বাস স্ট্যান্ডে আরও একটা খাওয়ার দোকান খোলা । চুনিলাল সামন্তের । সেখানে সেঁকা পাউরুটি ও ঘুগনি ও ডিমের ওমলেট । চুনিলালের দোকান বন্ধ হওয়ার পথে । তাঁর দোকানে কোনো খরিদ্দার নেই । এবার চুনিলালের দোকান গুটিয়ে বাড়ি ফেরার পালা । চুনিলাল ও হেমায়েত, দুজনেই জায়গা কিনে দোকান ঘর বানিয়েছে অর্থাৎ তাঁদের আইনসম্মত দোকান । সেইজন্য তাঁরা উভয়েই সরকারকে নিয়মিত নির্ধারিত হারে ট্যাক্স দেন । তখন রাত্রি এগারোটা । গদাইয়ের দোকান থেকে উঠে বাজারের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলো তারা । জ্যোৎস্না রাত্রি । গ্রীস্মকালের জন্য দিনের বেলায় প্রচন্ড গরম, তবে রাত্রিতে অতোটা গরমের প্রকোপ নেই । হাঁটতে হাঁটতে বাজারের সবচেয়ে বড় কাপড়ের দোকানের বারান্দার সামনে এসে উপস্থিত । বারান্দায় তারা বসলো । চোখে ঘুম নেই । ভয় একটাই, সাধারণ মানুষ তাদের চোর সন্দেহে বেদম প্রহার করলেই বিপদ । উপায় নেই । রাত্রি কাটাতে হবে । রাত্রি যাপনের পক্ষে বড় কাপড়ের দোকানের বারান্দাটা যথেষ্ট উপযোগী । তারা চুপচাপ বসে রইলো । ইতাস ঝিমোচ্ছে । কিন্তু ইমলির চোখে ঘুম নেই । বড় বড় চোখে তাকিয়ে । ইমলি ভাবছে, এভাবে তাদের আরও কতোদিন কাটাতে হবে তার কোনো নির্দ্দিষ্ট হিসাব নেই । সেইজন্য ইমলির দৃষ্টিভঙ্গি, বিকল্প ব্যবস্থা সত্বর ভাবতে হবে । নতুবা শরীরে কুলাবে না । শরীরের ভাল-মন্দ এখন তাদের হিসাবের বাইরে । এখন একটাই চিন্তা, বাঁচার পথ …?
রাত্রি সম্ভবত তিনটের কাছাকাছি । অতো রাত্রিতে তাদের চোখের উপর হঠাৎ পাঁচ ব্যাটারি টর্চের আলো ! আত্‌কে উঠলো ইমলি । এত রাত্রিতে কারা তার চোখের উপরে টর্চ ধরছে ? ঘাবড়ে গেল ইমলি । ভয়ে ভাবছে, আবার কোন্‌ বিপদ ? বিপদের ভয়ে ইমলি তটস্থ । ভয়ার্ত গলায় একটু জোরেই ইমলি বললো, “কে ? কে টর্চের লাইট জ্বালছেন” ?
আমরা বাজারের নৈশ প্রহরী । নাইট গার্ড । আপনারা এখানে কী করছেন ?
“কোনো উপায় না থাকায় রাত্রি কাটানোর জন্য বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছি । তবে কথা দিচ্ছি, ভোরবেলায় আমরা চলে যাবো” । ইমলি নাইট গার্ডদের জানালো ।
আপনারা কী গদাইয়ের লোক ?
ইমলি চটজলদি উত্তর দিয়ে বললো, “ঠিক ধরেছেন । গদাই আমার ভাই” ।
গদাই আপনাদের ব্যাপারে আমাদের জানিয়ে রেখেছে । এবার বলুন তো, দোকানের মালিককে কী আপনারা বারান্দায় থাকার কথা জানিয়েছেন ?
“কাউকে দেখতে না পাওয়ায় দোকানের বারান্দায় থাকার অনুমতি নেওয়া হয়নি । তবে আবারও বলছি, সকাল হওয়ার আগেই আমরা অন্যত্র চলে যাবো” ।
“ঠিক আছে, আপনারা এখানে থাকুন । রাত্রি কাটান । আমরা মোবাইলে দোকানের মালিকের সাথে কথা বলছি । আপনাদের ভয় নেই । আমরা পাহাড়ায় রইলাম, অসুবিধা হলে বলবেন” । তারপর নাইট গার্ডের মানুষগুলি পাহাড়া দিতে অন্যত্র চলে গেলেন ।
ভোরবেলায় ইমলি ও ইতাস আবার গদাইয়ের দোকানের দিকে ধাবিতো । রাস্তা দিয়ে মেমারী-কাটোয়া লোকাল বাস । বাসের খালাসী হাঁকছে, “কাটোয়া ! মালডাঙ্গা ও দাঁইহাট মোড় হয়ে সোজা কাটোয়া” । বাসটি কাটোয়া যাচ্ছে । কাটোয়া সম্বন্ধে কিছুটা গদাই ইমলিকে অবহিত করেছে । গ্রাম ঘেঁষা শহর । পাশ দিয়ে বিখ্যাত ভাগীরথী গঙ্গা বয়ে চলেছে । কাটোয়ায় নানান কাজে কয়েকটা জেলার মানুষ হামেশাই ঢোকেন । রেল ও বাস যোগাযোগ অনেক উন্নত । রেল ও বাসের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্দ্ধমান, বীরভূম, ইত্যাদি জেলার যোগাযোগ । কাটোয়া থেকে হাওড়ার সরাসরি রেল যোগাযোগ থাকায় কলকাতা যাওয়া সহজ । সব শ্রেণীর মানুষের বসবাস । কাঁচা সবজির দুর্দান্ত বাজার । এছাড়া ব্যবসার দিক থেকে কাটোয়া অনেকটাই উন্নত ।
তাই কাটোয়া যাওয়ার বাস দেখতে পেয়ে ইমলি ইতাসকে বললো, এইরূপ অনিশ্চয়তার ডামাডোলে না-থেকে চলো কাটোয়া যাই । সেখানে গেলে যদি মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে” ?
ভাববার অবকাশ নেই । উঠে পড়লো বাসে । বাসটি মালডাঙ্গা এসে অনেকক্ষণ দাঁড়ালো । অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর ছাড়লো বটে কিন্তু আস্তে আস্তে বাসটি এগোচ্ছে । বাসের নাকি পর্যাপ্ত সংখ্যায় প্যাসেঞ্জার হয়নি । তাই বাস ধীরে চালানোর বাহানা । দাঁইহাট মোড়ে পৌঁছে, দাঁইহাটের ভিতর না ঢুকে হাই রোড ধরে সোজা কাটোয়া । কাটোয়ায় তারা নেমে অবাক । অনেক জমজমাট শহর । লোকের সমাগম যথেষ্ট । ইমলির গদাইয়ের কথা মনে পড়লো । সে কাটোয়া সম্পর্কে সঠিক বিবরণ দিয়েছিলো ।
কাটোয়া স্টেশন । চারটি জেলার সংযোগস্থল । তবে এটাও গ্রাম ঘেঁষা মহাকুমা শহর । হাই স্কুল, কলেজ, অনেক সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, হোটেল, ইত্যাদি রয়েছে । খুব প্রাণবন্ত শহর । ট্রেন, বাস ঢুকলে লোকজনের সমাগম চোখে পড়ার মতো । বিকেলের পরে সন্ধ্যার দিকে আবার ফাঁকা । গ্রামের মানুষ সকাল বেলায় শহরমুখি আর বিকেল বেলায় ঘরমুখি । প্লাটফর্মে সুনীলদার চায়ের দোকানে বসে দু-কাপ চা চাইলো । সুনীলদা মানুষটা ওপার বাংলার ভাষায় দিব্যি কথা বলে কাস্টোমার সামলাচ্ছেন । ট্রেনের হকার ছাড়াও ট্রেনের প্যাসেঞ্জারেরাও সুনীলদার চায়ের দোকানে ভিড় করছেন । দু-নম্বর প্লাটফর্মে তাঁর অস্থায়ী চায়ের দোকান । সুনীলদার চা স্টেশন চত্বরে ভীষণ জনপ্রিয় । সুনীলদার চায়ের দোকানে চা ছাড়াও বিভিন্ন ব্রান্ডের জলের বোতল, কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল, ইত্যাদি পাওয়া যায় । দূরপাল্লার ট্রেনের প্যাসেঞ্জারদের কথা ভেবে ওগুলি রাখা । দূরপাল্লার প্রত্যেকটা ট্রেন কাটোয়া জংশনে থামে । ট্রেনের কামরার জানালা দিয়ে প্যাসেঞ্জারেরা হাত বাড়িয়ে জলের বোতল, কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল খোঁজ করেন । ঐসব ট্রেন যাত্রীদের কথা ভেবে সুনীলদার চায়ের দোকানে ব্যবস্থাপনা ।
“নিন, আপনাদের চা নিন” । থালার উপরে কাগজের ভাঁড়ে দুকাপ চা এগিয়ে দিয়ে ইতাসকে উদ্দেশ্য করে সুনীলদা বললেন ।
“দাদা, একটু জল খাওয়াবেন” ?
“জল কখনও একটু হয় নাকি” ? জলের জগটা এগিয়ে দিয়ে সুনীলদা বললেন, “যতো খুশী জল খান” । ভাল জল । আমার বাড়ি থেকে আনা । সকাল বেলায় বাড়ি থেকে বের হবার সময় ব্যাগে যতোগুলি বোতল আনা যায় সবগুলি বোতলে জল ভরে নিয়ে আসি । সব খরিদ্দারদের জলের বোতল কেনার ক্ষমতা থাকে না । বিশেষ করে তাঁদের কথা ভেবে বাড়ি থেকে খাওয়ার জল আনার ব্যবস্থাপনা ।
চা খাওয়ার পর এবার তাদের ওঠার পালা । কিন্তু উঠে যাবে কোথায়, তাই চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ বসলো । ইতিমধ্যে সম্ভবত সুনীলদার ছেলে জলখাবার নিয়ে চায়ের দোকানে হাজির । জলখাবার খেতে বসবেন এমন সময় সুনীলদা ইতাসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা কোন্‌ ট্রেন ধরবেন” ?
“জী, আমরা ট্রেন ধরবো না । একটা কাজের খোঁজে এসেছি । কাজকর্ম না পেলে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলছে না” ?
“ওপার বাংলা থেকে কবে এসেছেন” ?
“ওপার বাংলা থেকে তাড়া খেয়ে এদেশে এসে বিপদে পড়ে গেছি, দাদা । আজ পর্যন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেনি । পেটে দানাপানির কোনো সুরাহা হয়নি । তাই কাটোয়া আসা, যদি কোনো কাজের খোঁজ মেলে” । কথাগুলি একটানা বলে থামলো ইতাস । ইতাসের চোখ দুটি ছলছল ।
“আপনারা খানিকক্ষণ বসুন । জলখাবার খেয়ে আপনাদের সাথে পুনরায় কথা বলছি” । সুনীলদা জলখাবার খেতে বসলেন ।
মাথা নাড়লো ইতাস । তারপর ইমলি ইতাসকে না বলে প্লাটফর্ম ঘুরতে বের হল । আশপাশের চারিদিকটাই নতুন ! হাঁটতে হাঁটতে একেবারে প্লাটফর্মের শেষ দিকটায় পৌঁছে ইমলি লক্ষ্য করলো, একজন মাঝারি বয়সের মহিলা কোলে দুটি বাচ্চা নিয়ে টিন দিয়ে বানানো উনুনে কুড়ানো শুকনো পাট-কাঠি ও কাঠের টুকরোর সাহায্যে জ্বাল দিয়ে ভাত রান্না করছেন । ক্ষিদেয় মায়ের কাছে বাচ্চা দুটির কাতরকন্ঠে বায়না, কখন তারা ভাত খাবে । বাচ্চা দুটির ও মায়ের করুণ দৃশ্য দেখে ইমলি হতভম্ভ ! তাই ইমলি কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করলো, “এখানে এভাবে রান্না করছো কেন” ?
“আর কইয়েন না মা-জননী । নিজের দ্যাশ থাইক্যা তাড়া খাইয়া এই দ্যাশে আসা । কিন্তু দ্যাখেন দি, থাহার জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই । কী করুম, রেল স্টাশনের প্লাটফরমেই দিন কাটাইত্যাছি” ।
ইমলি আরও জানতে পারলো, তাঁর কর্তা টেঁয়া গেছেন । সেখানে নাকি জঙ্গল কেটে গ্রাম তৈরী হচ্ছে । কোন্‌ ভোরে গেছেন, অথচ এখনও ফেরেননি ।
খবর জেনে ফিরে এল ইমলি । তারপর ইমলি ইতাসকে তাগাদা দিলো, টেঁয়া যাওয়ার জন্য । বিকেলের আগে পৌঁছাতে পারলে যদি সেই গ্রামে একটা তালপাতার ঘর বানানো যায় তবে অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে । এই দিকে সুনীলদার সঙ্গে কাটোয়া সন্নিহিত এলাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের ব্যাপারে ইতাস খোঁজ খবর নিচ্ছিলো । সেই সময় সুনীলদা ভাগীরথী গঙ্গার চর এলাকার খোঁজ দিলেন । সেখানে এখনও বসবাসের জায়গা খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে । স্পটে গিয়ে খোঁজ খবর নিলে, তবেই চরে জমি জায়গার ব্যাপারে খবর জানা সম্ভব ।
পরের কাটোয়া-আজিমগঞ্জ ট্রেনে উঠে বসলো ইতাস ও ইমলি । কাটোয়া ও টেঁয়ার মাঝে চারটি স্টেশন । বেলা তিনটের মধ্যে টেঁয়া স্টেশন । টেঁয়া নেমে, জানতে পারলো, পশ্চিম দিকে “বাবলা” নদী পার হয়ে ওপারটায় জঙ্গল কেটে গ্রামের পত্তন হচ্ছে । ওপার থেকে আসা বেশ কিছু মানুষের মধ্যে বাড়ি বানানো নিয়ে জটলা । তাঁদের মধ্যে হুলস্থুল । টেঁয়া স্টেশনের প্লাটফর্মে বদর মিঞার টী স্টলে বসে চা খেতে খেতে তারা আরও জানতে পারলো, জঙ্গল কাটা নিয়ে ঘোষেদের সঙ্গে বাঙালদের তুমুল রেষারেষি ।
ইতাস বদর মিঞাকে জিজ্ঞাসা করলো, “রেষারষি কেন” ?
বুঝলেন না মশাই । “উড়ে এসে জুড়ে বসা” মানতে পারছে না ঘোষেরা । তাঁদের দীর্ঘদিনের গরু-মহিষের বিচরণক্ষেত্র ঐ জঙ্গল । সেখানকার ঘাস খেয়ে ঘোষেদের গাই-গরু বালতি বালতি দুধ দেয়, সেটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । জলাশয় ঘেঁষা ফাঁকা মাঠে এতকাল তাঁদের গরুর অবাধ বিচরণ ছিলো । সেটাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । ঘোষেরা সেটা কী মানতে পারে ? স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা ক্ষিপ্ত ! জঙ্গল কেটে তৈরী হচ্ছে গ্রাম । ফাঁকা মাঠ পরিস্কার করে শুরু হয়েছে চাষ-আবাদ । এবার ঘোষেরা এখন গরু-বাছুর, মোষ নিয়ে কোথায় চরাতে যাবে ? সেই জন্য তাঁদের মধ্যে তৈরী হচ্ছে বাধ-ভাঙ্গা রোষ । রোষ দাবানলের মতো জ্বলছে । ঘোষেরা তাতছে ! সুযোগ পেলেই কলোনী থেকে উদ্বাস্তুদের তাড়িয়ে ছাড়বে, এমনই হুমকি ঘোষদের । অন্যদিকে তাড়া খাওয়া মানুষগুলিও এককাট্টা । যতো ঝড় ঝাপ্টাই আসুক না কেন, ঘোষেদের কাছে মাথা নোওয়ানো নৈব-নৈব-চ ।
বদর মিঞার কাছ থেকে ইতাস যেটা বুঝতে পারলো, ওপার থেকে তাড়া খাওয়া মানুষগুলি লড়াই করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন ।
ইমলি ও ইতাস সেখানে পৌঁছে দেখে, গাঁয়ে ৮০টি বাড়ি তৈরীর কাজ শেষ । জায়গা একটুও নেই বললেই চলে । গোটা কয়েক ঘর মানুষ রাস্তার উপরে ত্রিপল টাঙিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন । নিজের দেশের মানুষদের সঙ্গ পেয়ে তাঁদের ছেড়ে ত্রিপল টাঙানো উদ্বাস্তু মানুষগুলি কোথাও যেতে চাইছেন না । তাঁরাও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন ।
অন্যদিকে জঙ্গল কাটার জন্য স্থানীয় ঘোষেদের সাথে উদ্বাস্তু মানুষগুলির তুমুল ঝগড়াঝাটি । দীর্ঘদিনের ঘোষেদের গরু-মহিষের বিচরণ স্থান, এই জঙ্গল । সেই জঙ্গল সাফ করার জন্য ঘোষেরা ক্ষিপ্ত । ঘোষেদের রোষ থামাবার জন্য স্থানীয় গ্রামবাসীরা কেউ এগিয়ে আসছেন না । ফলে ঘোষেদের রোষ তখনও ষোলোয়ানা চরমে । তবুও ওপার থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষেরা মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন । সবাই জায়গা দখল করে তালপাতার ছাউনি দিয়ে ঘর বানিয়ে তাঁদের বাঁচার স্বপ্ন । তাঁদের চোখে-মুখে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতার ছাপ !
গ্রামটার নাম দিয়েছেন সোনারগাঁও কলোনী । এখানকার উদ্বাস্তু মানুষেরা চাইছেন, গ্রামটাকে আদর্শ সোনার গাঁও বানাতে । এইজন্য সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে গ্রামের নামকরণ করেছেন সোনারগাঁও । চাষ ছাড়া অন্য কোনো আয়ের পথ নেই বললেই চলে । মাছ ধরে বিক্রির ব্যবসার সুযোগ রয়েছে । সোনারগাঁও মানুষেরা বিলে, নদীতে মাছ ধরে সাময়িকভাবে বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছেন । চাষ ভরসা, অথচ চাষের জমি পাওয়া দুস্কর । দূরের বিল ঘেঁষা কিছু নীচু জমি অচাষযোগ্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে । বর্ষাকালে সেখানে জল জমে । কিন্তু অন্য সময় চাষ করলে ফসল ফলবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল । সকলে যখন বুঝতে পারলেন, তাঁদের চাষবাসের জন্য জমি দরকার । বেঁচে থাকার জন্য ফসল দরকার । তখন তাঁরা আর ইতস্তত করলেন না । যে যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ঐ নীচু জমি চাষবাসের জন্য দখল করে নিলেন । তাঁরা জানতে পেরেছেন, পুরানো এক জমিদারের জমিগুলি । অথচ সেই জমিদার মারা যাওয়ার পর তাঁদের পুরো পবিবার গ্রাম থেকে উঠে গিয়ে ভিন্‌ রাজ্য ছত্রিশগড়ের রায়পুর চলে গেছেন । শোনা যায় তাঁরা রায়পুরের কালী বাড়ির সন্নিকট বাড়ি বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন । যদিও জমিদারের বাড়িটি ভগ্নাবস্থায় পড়ে রয়েছে । সেই বাড়ি ঘেঁষেই জঙ্গল । এলাকার মানুষেরা বলতেন, ঐটা নাকি ভূতের বাড়ি । সেই বাড়িটা পরিস্কার করে মানুষ সেখানেও অস্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছেন । যদিও বাড়িটাতে সাপের উপদ্রব ছিলো যথেষ্ট । সেগুলি হটিয়ে মানুষের বাঁচার তাগিদে ভাঙ্গা বাড়িতে বেশ কিছু ওপারের তাড়া খাওয়া মানুষ বাস করছেন । ইতাস আরও জানতে পারলো, সোনারগাঁও কলোনীর প্রায় সব ঘর মানুষ ঐ দেশের ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের । ঐদেশে প্রত্যেকের জমি জায়গা ও টিনের ঘর বাড়ি ছিলো । আত্মীয় স্বজন নিয়ে প্রত্যেকেই অবস্থাপন্ন ঘরের মানুষ । খাদ্য-খাওয়া, গান-বাজনার মধ্যে ছিলো তাঁদের পরম তৃপ্তির জীবন যাপন । স্বচ্ছল পরিবারের মানুষগুলি সেই কথা ভাবেন আর কাঁদেন, এদেশে তাঁরা এখন সত্যিকার অর্থে ভিখারী ।
সনৎ পোদ্দার ইতাস ও ইমলিকে বললেন, “আপনারা দুদিন এখানে থেকে যান । সোনারগাঁও কলোনীতে থেকে কিভাবে বসত বাড়ি বানাবেন সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন । গাঁয়ের শেষে যেটুকু জমি পড়ে রয়েছে আপনারা চাইলে সেখানেও ত্রিপল টাঙিয়ে অথবা তালপাতার ছাউনি তুলে বাস করা শুরু করতে পারেন । আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, বাঁচার জন্য আগামীদিনে আপনাদের কঠিন লড়াই । কঠিন কসরত । কঠোর পরিশ্রমের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হন । আগে কী ছিলেন ভুলে যান । এখন আপনি রাস্তার ভিখিরির ন্যায় । বাঁচতে গেলে কঠিন সংগ্রাম ছাড়া দ্বিতীয় পথ খোলা নেই” ।
“রাতে কোথায় থাকবো, দাদা” ? প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো ইমলি ।
“এতগুলি মানুষ যেভাবে থাকছেন, আপনাদের এই কটাদিন সেইভাবেই কেটে যাবে । বলা চলে খোলা আকাশের নীচে রাত্রি যাপন । দুমুঠো খাওয়া ঠিক জুটে যাবে । আমরা একমুঠো খাবার জোগাড় করতে পারলে, আপনাদেরও আমাদের সঙ্গে খাবার জুটবে” । আশ্বাস দিলেন সনৎ পোদ্দার ।
তারপর সন্ধ্যাবেলায় সোনারগাঁও কলোনীর সকল বাসিন্দা একত্রিত হয়ে পরবর্তী তাঁদের করণীয় কাজের ব্যাপারে আলোচনায় বসলেন । সেখানে পোদ্দার বাবু ইতাসকে সকল অধিবাসীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন । ইতাস লক্ষ্য করলো, মানুষগুলির চোখ-মুখ থেকে সব হারানোর আতঙ্ক তখনও কাটেনি । সবাই দুঃখে কষ্টে ম্রিয়মান । সব হারানোর বেদনায় মর্মাহত । মিটিংয়ে সন্ধ্যারাত্রিতে সাব্যস্ত হোলো কলোনীর রাস্তা তৈরীর । তারপর নিজেদের মধ্যে খাদ্য খাবার যোগাড় করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা । সেখানেই ইতাস জানতে পারলো, “জলাশয় পার হলে বিশাল তালবাগান । তারপর বয়ে চলেছে ছোটখাটো “নোনাই” নদী । এই নদী আবার “বাবলা” নদীর শাখা নদী” । খাদ্য-খাবারের নিরিখে তাঁদের মধ্যে আলোচনা মোতাবেক ইতাস যেটা জানতে পারলো, “সেই নোনাই নদীর পার বাধাঁনো রাস্তার দুপাশে অনেক ফলমূলের গাছগাছালি । পেয়ারা, তাল, কাঠাল, গাব, জগডুমুর, ইত্যাদি । সেইসব জায়গা দিয়ে ঘোরাঘুরি করলে দৈনন্দিন খাওয়ার অনেক উপাদান মিলতে পারে” ।
তারপর সামনে বর্ষাকাল । এখন চাষে নামলে বর্ষাকালে কী দাঁড়াবে তাঁরা সেই ব্যাপারে ধন্দে । তবুও সবজির ফসল চাষে গ্রামবাসীরা মনোযোগ দিলেন । বাড়ির আশেপাশে লাউ, পেঁপে, ঝিঙ্গে, কুমড়ো, লঙ্কা, বেগুন, ইত্যাদির সবজির চাষ । ইতিমধ্যে নদীর ওপারের কায়েত পাড়া থেকে মানুষজন এসেছিলেন । তাঁরা উদ্বাস্তুদের করুণ জীবন যাপন দেখে খুব উদ্বিগ্ন । তাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে সোনারগাঁও কলোনীর মানুষদের খাওয়ার জন্য ঘর পিছু বিশ কেজি চাল দিয়ে গেছেন । সেই চাল পাওয়ায় কলোনীর মানুষের অন্তত মার-ভাত জুটছে ।
সনৎ পোদ্দার ইতাসদের তাঁর তালপাতার ছাউনির ঘরে নিয়ে তুললেন । সেই রাত্রিতে জলাশয়ের পার থেকে সংগ্রহ করা কলমি শাক ভাজা ও ফেনা ভাত খেয়ে সকলে শুয়ে পড়লেন । পোদ্দার বাবুর আন্তরিকতায় ইতাস ও ইমলি গর্বিত ।
পরের দিন সকাল বেলায় ইমলিকে রেখে ইতাস খেতি জমি দেখতে ছুটলো । নীচু এলাকায় জমি । নীচু এলাকায় জমি হলে কী হবে, জমির উর্বরতা যথেষ্ট । দো-ফসলী জমি, কিন্তু বর্ষার চাষে ভরসা কম । উঁচু ডাঙায় যাদের জমি, সেখানে বছরে মাত্র একটাই ফসল । সেটা ধান । তবে ইদানীং উঁচু ডাঙার মাঠে ডিপটিউবওয়েল ঢুকেছে । ফলে জল ঠিকমতো সরবরাহ পেলে তাদের দুটো ফসল অনিবার্য । পোদ্দারের সঙ্গে ঘোরার জন্য ইতাস নীচের দিকে প্রায় বিঘা চারেক জমি আগলাতে পারলো । জমিগুলির আইলে পাটকাঠি দিয়ে ব্যারিকেট অর্থাৎ ঘেরাও করে রাখলো । জমিটা নীচু থাকায় মানুষের মধ্যে টানাপোরেন চলছিলো । মাঝখানে ইতাস যাওয়ার দরুন তার পক্ষে জমিটা পাওয়া সহজ হল । ইতাস মনে মনে ভাবছে, এবার অন্তত চার বিঘে জমিতে ধান চাষ করলে যে ধান পাওয়া যাবে তাতে তাদের সারা বৎসর চলে যাবে । তারপর পোদ্দার বাবু বললেন, এবার বাড়ির দিকে রওনা দেওয়া যাক । তাঁরা মাঠ থেকে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন । ফেরার সময় পোদ্দার বাবুর সঙ্গে কথোপকথনে ইতাস যেটা বুঝতে পারলো, “পোদ্দার বাবুরা গোপালগঞ্জে থাকতেন । তিনি ছিলেন ঐদেশে প্রাথমিক স্কুলের হেড মাস্টার । দশ বিঘা জমির উপর তাঁদের বাড়ি । সঙ্গে বড় একটি পুকুর । পুকুর পার দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ । বাড়িতে যেমন গরু-বাছুর, তেমনি পুকুরে ছিলো নানান প্রজাতির হাঁস ও মাছ । একেবারে ভরা সংসার । মাঠে কাজের জন্য বাড়িতে প্রতিদিন আট-দশজন মুনিষ থাকতোই । তাঁর বড় ভাই ছিলেন হাই স্কুলের শিক্ষক । দুই ভাইয়ের একান্নবর্তী শান্তির পরিবার । বর্ডার পার হওয়ার সময় তাঁরা দুই ভাই কিভাবে যেনো আলাদা হয়ে গেলেন, এখনও তাঁর বড় ভাইয়ের খোঁজ তিনি পাননি । সেজন্য পোদ্দার বাবুর মনের কোনে বড় ব্যথা । তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই তাঁকে মানুষ করেছেন । স্নেহ ভালবাস দিয়েছেন ঠিক বাবার মতো । বর্ডারে সেই বড় ভাইকে হারিয়ে কথার মাঝেই পোদ্দার বাবুর চোখে জল । বড় ভাই বলেছিলেন, “পিতৃ-পুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে আমার দেশ ছাড়তে ইচ্ছা করছে না ।“ কিন্তু রাতের অন্ধকারে আপনজন মানুষেরা শয়তান হয়ে গিয়ে আমাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার । টিকতে না পেরে আমরা রাতের অন্ধকারে অজানা উদ্দেশ্যে বের হই । নানান ঘাটে জল খেয়ে এখন সোনারগাঁও কলোনীর মাটি কামড়ে রয়েছি পৃথিবীতে একটু বাঁচার আশায়” । বলেই পোদ্দার বাবু হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন । সব হারানোর ব্যথার কান্না । পোদ্দার বাবুকে থামাতে গিয়ে উল্টে ইতাসেরও কান্না ! তারপর কিছুক্ষণ দুইজনে নিশ্চল পাথরের মতো জমির আইলে দাঁড়িয়ে রইলো ।
তারপর আবার বাড়ির দিকে হাঁটা ।
এদিকে ইমলি ও পোদ্দার-গিন্নি দুজনে মিলে ত্রিপল জোগাড় করে রাস্তার পাশ ঘেঁষে ত্রিপল টাঙিয়ে ইমলিদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন । পোদ্দার-গিন্নির অভিমত হচ্ছে, আপাতত ত্রিপল টাঙানো রইলো, বাড়ি বানানো হলে সেখানে তখন উঠে যাবে । অন্যদিকে ইতাস ও পোদ্দার বাবুর ফিরতে প্রায় বেলা গড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম । স্নান সেরে খেতে বসে পোদ্দার বাবু দেখলেন ভাত আর ল্যাঠা মাছের ঝোল । কৌতূহলবশত পোদ্দার বাবু তাঁর গিন্নিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি ল্যাঠা মাছ কোথায় পেলে” ?
“তোমার বড় খোকা বড়শি দিয়ে ধরে এনেছে” । পোদ্দার-গিন্নি উত্তরে বললেন ।
পরম তৃপ্তি করে খেয়ে পোদ্দার বাবু ও ইতাস ছুটলো বাঁশ জোগাড় করতে । বাড়ি বানাতে গেলে বাঁশ আগে লাগবে । পাশের গ্রাম কাটাইকুনা ঢুকে কোথাও বাঁশ না পেয়ে তাঁরা সন্ধ্যার আগে বেজার মুখে বাড়ি ফিরলেন । দেখতে দেখতে সোনারগাঁও গ্রামে ইমলিদের পাঁচদিন কেটে গেল । ইতাসের কাজকর্মের তৎপড়তা দেখে ইমলি বুঝতে পারলো, সোনারগাঁও কলোনীতে ইতাসের বসবাস করার ইচ্ছা ষোলোআনা । অথচ ইমলির এই ধরনের অনুন্নত জায়গায় বাস করার ইচ্ছা একদম নেই । এর চেয়ে কাটোয়া বা কুসুমগ্রাম অনেক ভাল । সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত । ইতাসকে কিছু পরামর্শ দেওয়ার স্কোপ পাচ্ছে না । সর্বক্ষণ পোদ্দার বাবুর পেছনে পেছনে আঠার মতো লেপটে আছে ইতাস । বলা চলে পোদ্দার বাবুর বড় ভক্ত । অবলম্বন হিসাবে পোদ্দার বাবুকে পেয়ে ইতাস অনেকটা হাল্কা । আর অন্যদিকে পোদ্দার বাবু ইতাসকে ভাই বলতে অজ্ঞান । ঈশ্বর তাঁকে আপন একজন ভাইকে জোগাড় করে পাঠিয়েছেন । ত্রিপল টাঙিয়ে আলাদা থাকার ব্যবস্থা হলে কী হবে, পোদ্দার বাবু তাঁর স্নেহের ভাই ও ভাই-বৌকে সেখানে থাকতে দিচ্ছেন না । তাঁর বক্তব্য, ভাইকে বাড়ি বানিয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হবেন এবং তারপর ভাই সোজা নতুন বাড়তে উঠবে । যতোদিন নতুন বাড়ি না হচ্ছে ততদিন ইতাস ও ইমলি পোদ্দার বাবুর বাড়ির অতিথি ।
তারপর একদিন দুপুরের খাবারের পর সুযোগ পেয়ে ইমলি ইতাসের হাত টেনে বসিয়ে বললো, “তুমি জমি পেয়েছো, নিঃসন্দেহে আনন্দের ব্যাপার । কিন্তু তুমি কী কখনও ভেবে দেখেছো, তুমি লাঙ্গল দিয়ে ঐ জমি চাষ করতে পারবে কিনা ? ছোটবেলায় ডাংগুটি খেলা, তারপর পরবর্তী জীবনে শুধু পড়াশুনা, পড়াশুনা শেষ হতে না হতেই চাকরি । একফোঁটাও মাঠে কাজ করোনি । তুমি কী পারবে, জমিতে অমানুষিক পরিশ্রন করতে ? ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে । আর তাছাড়া ………?”
আর তাছাড়া, কী বলতে চাইছো ?
“সোনারগাঁও কলোনীতে মাঠে চাষ ছাড়া আর কোনো কিছু সৃষ্টিমূলক কাজ করার সুযোগ নেই । যোগাযোগ ব্যবস্থা তথৈ-ব-চ । নদীর পারে বাস করাটা ভীষণ অশান্তির । বর্ষাকালে যেকোনো সময় বন্যা আসার সম্ভাবনা” । তাই ইমলির সোজাসাপ্টা জবাব, সোনারগাঁও কলোনীতে তার থাকার এতটুকু ইচ্ছা নেই । সে যতোটুকু বুঝেছে, “নদীর পারে বাস / দুঃখ বারোমাস” । প্রচুর খেটেও ছেলেমেয়ে মানুষ করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে । তোমার মতো শিক্ষিত ছেলের চেহারা কোনোদিনও ধরে রাখতে পারবে না । সারাজীবন মেহনত করে খাটাখাটুনিই সার হবে । জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ! পরে সোনারগাঁও কলোনীতে থাকার সিদ্ধান্ত ভুলের জন্য আপশোশ করতে হবে, এমনকি হা-হুতাশ করে কপাল চাপড়াতে হবে ?
“তাহলে তুমি কী চাইছো” ? বিরক্ত হয়ে ইতাস ইমলিকে জিজ্ঞাসা করলো ।
তাদের দুইজনের ঐ দেশের শিক্ষা যেহেতু জলে গেল, তাহলে কুসুমগ্রামে বাস করা আমাদের পক্ষে শুভ । কেননা সেখানে হকারি, ছোটখাট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা সহজ । বন্যা, ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নীচু জমিতে চাষে যেমন গ্যারান্টি নেই তেমনি চাষ করার পর প্রয়োজনীয় ফসল ঘরে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ । তার উপর তুমি জানো, চাষে সর্বক্ষণ ঝুঁকি বেশী । অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খড়া, ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ অহরহ । এখানে যাঁরা ঘর বানিয়েছেন, তাঁরা মানসিকভাবে চাষবাস পেশা হিসাবে ধরে নিয়েছেন । তাছাড়া এখানকার অধিকাংশ মানুষগুলো ঐদেশেও চাষবাসের মধ্যেই ছিলেন । সুতরাং তাঁদের পক্ষে চাষের হ্যাপা সামলানো অনেক সহজ । চাষের ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি আনকোরা । চাষ যেমন ভাল বুঝি না, তেমনি ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে কী কী করণীয় সেটাতেও পুরোপুরি অনভিজ্ঞ ।
ইমলির কথা শুনে ইতাস রীতিমতো বিরক্ত । রাগে গজরাতে লাগলো । ইমলির পরামর্শ ইতাসের কাছে ভাল লাগছে না । কেননা পোদ্দার বাবুকে ধরে চার-পাঁচ দিনে মোটামোটি চাষের জমি, ঘর বানানোর জন্য কাঠা পাঁচেক জমির সুরাহা । নদী, জলাশয়ে মাছ ধরার জন্য ধার-বাকীতে খেপলা জালের ব্যবস্থা । ঘর বানানোর জন্য নোনাই নদীর পাশের তালবাগানে গিয়ে তালপাতা সংগ্রহ করা । থাকার ব্যাপারে সব ব্যবস্থা মোটামোটি পাকা । তারপর ইমলির এই ধরনের আপত্তি । যার জন্য ইমলির উপর ইতাসের গোসা । অথচ ইমলিকে বাদ দিয়ে তার পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেও আসা অসম্ভব । তাই রাগে অভিমানে ইতাস শুয়ে রইলো । তার ভুখা পেট । তবুও খাবার খাওয়ার নাম করছে না । ইমলি ইতাসকে কয়েকবার অনুনয়-বিনয় করলো খাওয়ার জন্য, তবুও ইতাস বাবুর গোসা কমার লক্ষণ নেই । তখন ইমলি পোদ্দার বাবুকে ডাকলেন । পোদ্দার বাবুকে ইমলি তাদের পরবর্তী সিদ্ধান্তের কথা বুঝিয়ে বললেন । তখন পোদ্দার বাবু ইমলিকে বললেন, “তুমি আমার বোনের মতো । তোমার কথা শুনলাম । যেটা বলেছো, “ভবিষ্যতের কথা বলেছো” । কিন্তু এই কথাগুলি টালমাটাল বাস্তব পরিস্থিতির উপর তাকিয়ে বলা কঠিন । বাস্তবে বাঁচলে ভবিষ্যত নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ! তবে তোমার চিন্তাভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে পারলে নিঃসন্দেহে ভাল প্রস্তাব । কিন্তু বোন, এখন তোমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাঁচার জন্য ঠাঁইয়ের ব্যবস্থা । সেই নিরিখে তুমি যদি কুসুমগ্রামে গিয়ে গতর খাটিয়ে কাজ করে নিজেদের দাঁড় করাতে পারো তাহলে এটা একটা অতি উত্তম প্রস্তাব । বাস্তবায়নের নিরিখে তোমাদের মনে কতোটুকু সাহস, শরীরে কতোটুকু তাকত, আমার জানা নেই । তবুও বলবো, সোনারগাঁও কলোনীতে থাকলে তোমরা অপনজনদের মধ্যে বাস করতে পারবে । সুখে-দুঃখে একই দেশের মানুষের সান্নিধ্য ও সহযোগিতা পাবে । আর তাছাড়া তোমরা ঐদেশের বড় ঘরের ছেলে-মেয়ে । বাড়ির গুরুজনদের আদর, যত্নে, আবদারে মানুষ । কষ্ট কী ঘূণাক্ষরেও টের পাওনি । তোমাদের দুজনের সুন্দর ডিগ্রিগুলো এদেশের কাছে নিমেষেই অচ্ছু্ত হয়ে গেল । এদেশে আমাদের এখন একটাই পরিচয়, আমরা শরণার্থী/উদ্বাস্তু । তুমি বুদ্ধিমান মেয়ে, যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই আমরা মাথা পেতে নেব” ।
পরের দিন ফের কাটোয়া । প্লাটফর্মের সুনীলদার চায়ের দোকান । সুনীলদা ইতাসদের দেখামাত্র বললেন, “আমি ফাসিরচরের মানুষদের সাথে কথা বলেছি । তাঁরা বলেছেন, “ভাগীরথী গঙ্গা সন্নিহিত চরে যেসব ফাঁকা জায়গা পড়ে রয়েছে সেখানে বাড়ি-ঘর তোলা যাবে । কিন্তু বাড়ি করার পরে সেখানে বাস করাটা খুব ঝুঁকির হবে । কেননা যেকোনো মুহূর্তে গঙ্গার জল ফুলে-ফেঁপে কিনার ছাপিয়ে উঠে এলে ফাসিরচরের বাড়ি ঘরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন । সুতরাং বুঝতেই পারছেন, জেনেশুনে বিপদের মুখে ঢোকা । আর তাছাড়া চাষের জমি পাওয়া খুব কঠিন ! বাঁচার জন্য খেতি জমি না-থাকলে এই সব জায়গায় উপায়ের পথ নিশ্চিত করা ভীষন সমস্যাবহুল । এমতাবস্থায় আপনারা ভেবে দেখুন, কী করবেন ? ইতাস বাবু বারবার আমাকে খোঁজ খবর নিতে বলেছিলেন, তাই আমি উপযাজক হয়ে এই খবরগুলি জোগাড় করেছি । এইবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আপনাদের” ?
ইতাস সুনীলদাকে অনুরোধ করলো তার সঙ্গে ফাসিরচরে যেতে । তারপর দুজনে সুনীলদার সঙ্গে ফাসির চর রওনা দিলো । কাটোয়া শহর ছাড়িয়ে গ্রাম ছাড়িয়ে ভাগিরথী গঙ্গার তীরে বিশাল চর । প্রায় সমস্ত চরটা ঘিরে মানুষের বসবাস । ওপার বাংলা থেকে আগত সমস্ত মানুষ । চরের মধ্যেই তৈরী হয়েছে গ্রাম, ফাসির চর । এখানে চাষের জমি কম । তবে যেটুকু রয়েছে, তাতে চাষাবাদ খুবই উন্নত । মাটি ভীষণ উর্বর । শাক-সবজির চাষ চোখে পড়ার মতো । প্রত্যেকের ঘরে গাই গরু, হাল-গরু রয়েছে । খেটে খাওয়া মানুষজন । জমিতে উৎপাদিত ফসল বিক্রির সমস্যা নেই বললেই চলে । কেননা কাটোয়া বাজার কাছাকাছি থাকায় আনাচ, সবজির বিক্রি-বাট্টা সেখানেই সংঘটিত হয় । চারটা জেলার মানুষ কাটোয়া বাজারে সমাগম ঘটায় । ফলে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে কাটোয়া বাজার অনেক উন্নত । ফাসির চরের মানুষ খাটা-খাটুনি করে সুন্দরভাবে ঘর-সংসার করছেন । সেখানকার চন্দন পুরকায়েত সুনীলদার পরিচিত । তাঁরা সেখানে স্বচ্ছল পরিবার । ঐদেশ থেকে এসে তিনিই প্রথম গ্রামটা আবিস্কার করেন । তারপর অন্যন্য মানুষের আগমন । সেই পুরকায়েত বাবু ইতাসকে বললেন, “এখানে বাস করতে পারেন, এখনও বাড়ি করার জায়গা পাওয়া যায় । তবে সেটা কিনে নিতে হবে, যদিও স্বল্প দামে । মাঠে চার-পাঁচ বিঘা জমি চাষ করতে পারলে বছরের খাবার অনায়াসে ঘরে এসে যাবে । বাজার-হাট, স্কুল-কলেজ সবকিছুই কাটোয়ায় । বর্ষাকালে কাটোয়া যাতায়াত একটু কঠিন । কেননা ফাসির চর থেকে কাটোয়া যাওয়ার রাস্তায় গঙ্গার জল থাকে । তখন ডিঙি নৌকা যাতায়াতের ভরসা । অন্য সময়ে সাইকেলে যাতায়াত সম্ভব । এবার ভেবে দেখুন, কী করবেন” ?
সেই বাড়ি থেকে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মুড়ি খেয়ে বিদায় নিলো তারা দুজন । তারপর সুনীলদার অনুরোধে সন্নিহিত চরা জায়গাগুলি ঘুরে দেখলো ইতাস ও ইমলি । ইমলি বুঝতে পারলো, ঐসব জায়গায় বাস করলে গাধার মতো খাটতে হবে । তাহলে বেঁচে থাকা সম্ভব ! ফাসির চরের বন্যা এতদঞ্চলে বিখ্যাত । সুতরাং বছরে এক-দুবার ভাগীরথী গঙ্গার জলে বাড়ি-ঘর ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল ।
বিকেলের মধ্যে ইমলি ও ইতাস ঘুরেফিরে সেই কুসুমগ্রামের গদাইয়ের চায়ের দোকানে । ইমলিকে দেখামাত্র গদাইয়ের চোখে জল, “তুমি আমাকে না জানিয়ে কোথায় চলে গেলে সেটা ভেবে ভেবেই আমি দিশেহারা । কোথায় খোঁজ নেবো, সেটা আমার মাথায় কাজ করছিলো না । তোমাদের ফিরে আসার জন্য প্রতিদিন আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতাম । অবশেষে ঈশ্বর আমার ডাক শুনেছেন । তোমাকে ফেরত পেয়ে আমি খুব খুশী” ।
তারপর আবার ইতাস ও ইমলির দিকে তাকিয়ে গদাই বললো, “ইতিমধ্যে দুদিন তোমাদের খোঁজে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাবু আমার দোকানে এসেছিলেন” ।
 ( চলবে )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here