প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী— এক আশ্চর্য মহাজীবন কথা (প্রথম পর্ব) : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

0
497

১৯শে শ্রাবণ ঝুলন পূর্ণিমা তিথিতে আবির্ভূত হন পরম প্রতাপী প্রভুপাদ শ্রীল বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীজী। ১২৪৮সালে উচ্চকোটির এই সিদ্ধ মহাত্মার ধরায় আগমন । তিনি শান্তিপুরনাথ শ্রীঅদ্বৈত আচার্য্যের দশম অধঃস্তন ছিলেন। তাঁর জীবনে অলৌকিক ঘটনার এত ঘনঘটা যে ভাবা যায় না। তাঁর শ্রীঅঙ্গে নানান দেবদেবীর চিত্র আপনা থেকেই প্রকট হত। ভাগবত বা চৈতন্যচরিতামৃত পাঠ করতে বসেছেন , সেসময়ে তাঁর শরীরে শ্লোক, পয়ার ফুটে উঠতো। হরিনাম মহামন্ত্র তো প্রায়শঃই দেখা যেত। এমনকি তাঁর জটা থেকেও মধু ক্ষরণ হত। এসবই অভাবনীয় যদিও , তবু সব সত্য । তবে প্রভুপাদ শ্রীল বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সম্পূর্ণ জীবনীটি এক বিতর্কিত অধ্যায় বলা যায় । প্রথম জীবন থেকেই যে তিনি ভক্তি পথের মহাপথিক ছিলেন তা কিন্তু নয়। এই মহাশক্তিধর মহাপুরুষ সমস্ত জীবন ধরেই নানান আলো-আঁধারি অবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে পরিশেষে এক অলোকসুন্দর জীবনের অবতরণ ঘটিয়েছেন । এবং, বলা যায় তা স্ব-ইচ্ছাতেই। যাঁরা নাস্তিক অর্থাৎ কিনা ঈশ্বর বিশ্বাসী নন তাঁদের কাছে তো এক চরম শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত তিনি বা তাঁর জীবনী। আমরা সেসব জানার চেষ্টা করবো একে একে এ প্রবন্ধের নানান পর্বে।

১২৯৬-৯৭ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ, ওই ইং ১৮৮৯-৯০ সালের কথা। অদ্বৈত প্রভুর স্বপ্নাদেশ মত প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ এলেন বৃন্দাবনে। শ্রীঅদ্বৈত তাঁকে মালা-তিলক ধারণ করতে বলেছেন। তাই বৃন্দাবনে এসে তিনি মালা পরলেন আর তিলকও ধারণ করলেন। কিন্তু , মালাও যেমন অদ্ভুত , তিলকও ততোধিক অদ্ভুত। তিনি করলেন কী নিজে থেকে উদ্ভাবন করে এমন এক তিলকের অঙ্কন করলেন কপালে , যে তিলকে যেমন রয়েছে বিষ্ণুর চক্র, শিবের ত্রিশূল , তেমন আবার রয়েছে যীশুখ্রিষ্টের ক্রস এবং হজরত মহাম্মদের অর্ধচন্দ্র। এমন অদ্ভুত দর্শন তিলক এঁকে যখন তিনি প্রভাতে সর্বসমক্ষে এলেন , সকলে আশ্চর্য্য হয়ে গেলেন তাঁকে দেখে। প্রথমে কেউ কিছু মুখের ওপর বলার সাহস পেলেন না। কিন্তু, বৃন্দাবনের বৈষ্ণবদের মধ্যে ভিতরে ভিতরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হল। শাস্ত্র বহির্ভূত এমন তিলক করার কোন কারণ তাঁরা খুঁজে পেলেন না। তাঁরা স্থির করলেন কিছু প্রশ্ন ওঠানো দরকার এই প্রসঙ্গে। গৌর শিরোমণি মহাশয়ের সাথে খুব সুসম্পর্ক ছিল গোস্বামীপাদের। তিনি শেষে একদিন সকলের মুখপাত্র হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, এ আপনি কেমন তিলক আঁকেন? এমন তিলকের নির্দেশ তো নেই কোথাও!” গোস্বামীপাদ অতি সরল স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, ” নেই তো কী হয়েছে? আমি প্রবর্ত্তন করলাম। সর্ব ধর্মের সমন্বয় বোঝাতেই এমন তিলক। সকল ধর্মকে আশ্রয় করা , মান্যতা দেওয়া এ তিলকের উদ্দেশ্য।” শিরোমণি মহাশয় অবাক হয়ে বললেন, ” প্রভু , এ কেমন কথা! তবে কী আপনি নতুন কোন সম্প্রদায়ের জন্ম দিতে চাইছেন?” প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ বললেন, “না, না, তা কেন হতে যাবে! আমি অদ্বৈত পরিবারভুক্ত। আর এটাই আমার পরিচয়। নতুন সম্প্রদায় সৃষ্টির কথা কল্পনাতেও আনি না।”
শিরোমণি মহাশয়—” বুঝলাম। কিন্তু দেখুন, এই যে আপনি নতুন ধরণের তিলক কাটছেন, এতে হবে কী, আপনার অনুগত শিষ্যরাও তো আপনাকে অনুসরণ করবে। তারাও এমন তিলক করবে। এর ফলে হবে কী আপনি না চাইলেও আপনার নামে নতুন এক সম্প্রদায় বা দলের সৃষ্টি হয়ে যাবে। আপনি কী সেটা চান! যদি না চান তবে অবিলম্বে এমন শাস্ত্রবহির্ভূত আচরণ বন্ধ করুন। আপনার পরিবারের তিলক যেমন, তেমনটাই ধারণ করুন।”
শিরোমণি মহাশয়ের কথা শুনে প্রভুপাদ যেন খানিক চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু , তাঁর স্বভাব হল ভাঙ্গবেন তবু মচকাবেন না। তাই কপালে সামান্য ভাঁজ থাকলেও মুখে বললেন, “বেশ , আপনার কথা আমি চিন্তা করে দেখব।”

——–ক্রমশঃ
—- ভক্তকৃপাপ্রার্থিনী
রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।