ঝিঙে পটল (ধারাবাহিক, নবম পর্ব) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
159

ঘুগনি বানাতে গিয়ে খরচা অনেক । মটরের দাম বেড়েছে । সঃ তেলের দাম ঊর্ধ্বগতি । দাম যাই থাক পটলের আবার গুণগতমান ভাল রাখার দিকে বেশী ঝোঁক । বেশী সতর্ক । ঘুগনিটার স্বাদ এমনভাবে তৈরী করে, কোনো খরিদ্দার একবার খেলে দ্বিতীয়বার সেই খরিদ্দার পটলের দোকানে ঘুগনি খেতে আসবেই । ঘুগনি বানানোতে এতটাই পটু ও আন্তরিক । স্বাদ ভাল করতে গিয়ে ঘুগনি বানানোর উপকরণের দিকে সর্বদাই খেয়াল । সেই ক্ষেত্রে পটলের কার্পণ্য নেই । প্রয়োজনে দামী মশলাপাতির প্রয়োগ ঘটাতেও পটল সিদ্ধহস্ত । যার জন্য স্বাদ নিয়ে কারও ক্ষোভ বা নালিশ নেই । ভাল স্বাদযুক্ত ঘুগনি বানাতে খরচাও অনেক । যার জন্য লাভের পরিমান কম । অন্যদিকে মুড়িতেও লাভ কম । কেননা মুড়ি কিনে বিক্রি । তবুও দিনের শেষে যেটুকু লাভ থাকে তাতে দুজনের হাসিমুখে দিব্যি চলে যায় ।
সমস্যা এখানে নয় । পটল চাইছে, লভ্যাংশের টাকা বাঁচিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই । কিন্তু স্বল্প লাভে বাড়ি তৈরী সম্ভব না । অতঃপর পাশের হোটেলের জগাই পরামর্শ দিলো, ত্রিপল দিয়ে ঘিরে ঘেরা জায়গায় আপাতত থাকার বন্দোবস্ত করতে । সেইক্ষেত্রে অন্তত প্লাটফর্মে আর শুয়ে রাত কাটাতে হবে না । তারপর পটল জগাইয়ের পরামর্শমতো রাস্তা ঘেঁষে বাঁশের খুটিতে ত্রিপল টাঙালো । যাকে বলে শেড বানালো । সুন্দর ঘর । ঝিঙে খুব খুশী । অদূরে পঞ্চায়েতের সৌজন্যে বানানো শৌচালয় থেকে তাদের অন্যান্য প্রাতকালীন কাজকর্ম সারা আর ত্রিপল টাঙানো ঘরে বাস করা । পটল সময় সুযোগ মতো ঘুগনি বানানোর উনুনে চাল ফুটিয়ে নেয় । তারপর সেদ্ধ পোড়া দিয়ে খাওয়া । অন্তত তারা এখন পেট ভরে সময় মতো দুমুঠো খেতে পারছে ।
অন্যের জায়গায় ত্রিপল টাঙিয়ে ঘর বানানো, স্থানীয় ঘোষপাড়ার কয়েকজন কুচক্রী মানুষ সহ্য করতে পারলো না । তারা চুপিসারে রাতের অন্ধকারে পটলকে হুমকী দিয়ে বলে গেল তিন দিনের মধ্যে জায়গা খালি করে দিতে । নতুবা তারাই বাধ্য হবে দোকান ভেঙ্গে দিতে ।
পটল পড়লো মহা ফাঁপরে । ছুটলো ভুঁড়িওয়ালা গদাই খুড়োর কাছে । তাকে সব ঘটনা জানালো । গদাই খুড়োকে একটা বিহিত করতে বলল । পটল আরও বলল, “ঐ জায়গা থেকে উচ্ছেদ করলে তার বেঁচে থাকার স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে যাবে । কেননা পটলের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে । ব্যবসা বন্ধ হলে তারা খাবে কী ?“
গদাই খুড়ো সব শুনে মাথা চুলকিয়ে চিন্তিতভাবে বললেন, কাজটা খুব কঠিন । ঘোষেরা তাঁর কথা শুনতে চাইবে না । ঘোষেরা খুব গোঁয়ার । অতীতে তাঁদের গাঁয়ের মানুষের সাথে ঘোষেদের অচরণের ন্যক্কারজনক একটা ঘটনা ঘটেছিল । সবটাই ঘোষেদের গোঁয়ার্তুমির জন্য । ঘোষেরা ইচ্ছা করে এবং গৌরীনগর গ্রামবাসীদের টাইট দেওয়ার জন্য তাদের গরু,বাছুর, মহিষ ছেড়ে দিয়েছিলো গাঁয়ের তরতাজা রবিশষ্যের জমিতে । তারপর গ্রামবাসীদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের সর্বনাশ ! সেই নিয়ে বিশাল ঝামেলা । থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছিলো । কিন্তু গদাই খুড়োর গৌরীনগর গ্রামের মানুষ দমে যায়নি । বরং ঘোষেদের গোঁয়ার্তুমির যোগ্য জবাব দিয়েছিলো । সেই থেকে গদাই খুড়োদের গাঁয়ের মানুষের উপর ঘোষেদের খুব রাগ ।
পটল গদাই খুড়োকে চেপে ধরলো একটা বিহিত করার জন্য । নতুবা তার পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন ! দোকান খুলে পটল ধাপে ধাপে ব্যবসার উন্নতির কথা ভাবছে । বোনটাকে সে পড়াতে চায় । বোন আর একটু বড় হলে তাকে স্কুলে ভর্তি করবে । তার দুই চোখে এখন বেঁচে থাকার স্বপ্ন ।
কিন্তু ঘোষেদের কয়েকজন অল্পবয়সী ত্যাঁদড় ছোকরার হুমকিতে কেমন যেনো পটলের বেঁচে থাকার চিন্তাভাবনাগুলির তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে, তার সমস্ত চিন্তাভাবনাগুলি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে । বাজারসৌ স্টেশনে বাস করে সে যেটা বুঝতে পেরেছে, এলাকার মানুষ খারাপ না । তাঁরা অভাব দারিদ্রতার মধ্যে বসবাস করছে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের অন্তর প্যাঁচালো নয় । ঘোষেদের আচরণ সম্বন্ধে তার কোনো ধারণা ছিলো না । তারা এভাবে পটলকে কেন উচ্ছেদ করতে চাইছে সেটাও পটলের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মালুম হচ্ছে না । গদাই খুড়োর গ্রামের উপর রাগ থাকলে, তারা কেন পটলকে শাস্তি দিয়ে তাদের রাগের ঝাল মেটাবে !
আবার অন্যদিকে পটল এটাও ভাবছে, যেহেতু তার গৌরীনগরের গদাই খুড়ো এমনকি মনোহরের সাথে মেলামেশা তাই ঘোষদের গাত্রদাহ !
গদাই খুড়ো বললেন, “পটল, তুমি বাড়ি যাও । আমি ভাবছি, কীভাবে ঘোষেদের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটার সুষ্ঠু মীমাংসা করা যায় ?”
পরেরদিন গদাই খুড়ো পটল, মনোহর ও গৌরীনগর গ্রামের মোড়লকে নিয়ে ঘোষপাড়ার মোড়লের বাড়িতে উপস্থিত । অদ্বৈতনাথ ঘোষ হচ্ছেন ঘোষপাড়ার মোড়ল । যেমনি চেহারা, তেমনি তাঁর গোঁফ । চেহারায় বয়সের ছাপ খুব কম । গদাই খুড়োকে দেখতে পেয়ে ঘোষপাড়ার মোড়ল মশাই হেঁকে উঠলেন, “এসো গদাই । হঠাৎ কী মনে করে ? তুমি তো সাধারণত এই পাড়ায় আসোনা !“
“এলাম একটা জরুরি দরকারে । আপনাকে না জানালে ব্যাপারটা খারাপের দিকে গড়াচ্ছে ।“ গদাই খুড়ো আমতা আমতা করে বললেন ।
এতে আমতা আমতা করার কী আছে ? সোজা সাপ্টা বলে ফেলো ? কী দরকারে তোমার আগমন ?
তারপর গদাই খুড়ো পটলের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “ছেলেটা অনাথ । নোনাই নদীর বাঁধে মাটি কাটার কাজ করছিলো । কিন্তু হাল্কা বয়সের কারণে বিডিও সাহেব পটলকে কাজে লাগাতে নিষেধ করলেন । অগত্যা ছেলেটা বাজারসৌ স্টেশনের কাছে বাস স্ট্যান্ডের পাশে একটা পোড়োবাড়ি পরিষ্কার করে সেখানে মুড়ির দোকান খুলেছে । সেই ছোট দোকান থেকে তার বেঁচে থাকার মরিয়া প্রয়াস । আরও একটা কথা মোড়ল মশাই আপনার জানা দরকার, ছেলেটার বাড়ি ঘর কিছুই নেই । থাকে স্টেশনের প্লাটফর্মে । পটলের একটা বোন রয়েছে । বোনের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য পটলের মুড়ির ব্যবসার উদ্যোগ । কিন্তু আপনাদের পাড়ার নটরাজ ও কার্তিক সঙ্গে কয়েকজন ত্যাঁদর ছোঁড়াদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে পটলকে হুমকী দিয়ে বলেছে, “দোকান ঘর করা চলবে না । দুদিনের মধ্যে দোকান ঘর বন্ধ না করলে তারা ভেঙ্গে দেবে ।“
“এই খবরটা আমার জানা নেই । তবে ঘাবড়িয়ো না গদাই । আমি দুজনকে আজ ডেকে পাঠাচ্ছি ! তারপর তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানবো তাদের মতলব কী ? এভাবে কাউকে হুমকী দেওয়া অন্যায় !” তারপর বাবার বললেন, “এমন দুটি ছোকরার নাম করলে যাদের স্বভাব চরিত্রের রেকর্ড ভাল না । ওদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে কয়েকটা ঝামেলার নিষ্পত্তি আমি ঘটিয়েছি । এভাবে ওদের কর্মকাণ্ড চললে আখেরে ঘোষপাড়ার বদনাম ! পরবর্তী সময়ে রাস্তাঘাটে মুখ দেখানো দায় হয়ে দাঁড়াবে ?”
আর একটা কথা মোড়ল মশাই, “পটল দোকান খোলার আগে স্থানীয় পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি নিয়েছে । জায়গাটা যার, তিনি অনেকদিন থেকে অসমে থাকেন । আদৌ আসবেন কিনা, সন্দেহ ? সুতরাং পোড়োবাড়ি সাফাই করে পটল মুড়ির ব্যবসা করে বাঁচতে চাইছে । সকলের উচিত, তাকে ব্যবসার ব্যাপারে উৎসাহ জোগানো ! সহযোগিতা করা । সেটা না করে বরং দোকান ঘর ভেঙ্গে দিতে চাইছে ।“
তারপর গদাই খুড়ো দলবল নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন ।
পরেরদিন নটরাজ ও কার্তিককে অদ্বৈতনাথ ঘোষ ডেকে পাঠালেন । মোড়ল মশাইয়ের কাছে তারা নিজেদের হয়ে সওয়াল করে বললো, “পটল যে জায়গাটায় দোকান করেছে সেটা অন্যের জমি । জমির মালিক ফিরে এলে আখেরে পটলের ক্ষতি । তখন বেচারা আবার পড়বে সমস্যায় ? এইজন্য তারা পটলকে সরে যেতে বলছে এবং সরে গিয়ে অন্যত্র ব্যবসা চালাতে । তাদের উদ্দেশ্য পটলকে উচ্ছেদ নয় বরং তার ভালোর জন্য অন্যত্র ব্যবসার কথা বলছে ।“
“দেখো বাপু, পটল ঘাম ঝরিয়ে ‘করে-কর্মে’ খাচ্ছে । কার জায়গা দেখার দায়িত্ব তোমাদের নয় । তোমরা ঘোষপাড়ার মানুষ হয়ে স্টেশন অঞ্চলে বিরূপ প্রভাব খাটালে সেটা কেউ মেনে নেবে না । ফলে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য । এরপর কখনই যেনো না শুনি তোমরা পটলকে তাড়াবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছো ।“ মোড়ল মশাই দুজনকে পরিষ্কারভাবে তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন ।
কিন্তু মোড়লের কথা শুনে দুই কুচক্রী চুপচাপ বসে রইলো না । তারা জমির মালিকের সাথে অসমে যোগাযোগ করলো । জমির মালিক ললিতবাবু অসমের ডিব্রুগরে চা বাগানে কাজ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন । বাজারসৌয়ের জমিটা ললিতবাবুর নামে । কিন্তু তিনি ইহলোক ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এখন জমির মালিক ললিতবাবুর স্ত্রীকে ধরে চারজন । ললিতবাবুর দুই মেয়ে ও এক ছেলে । ছেলে শুভ্রাংশবাবু বড় ডাক্তার । দুই মেয়ে, অনামিকা ও তনামিকা । দুইজনেই ডিব্রুগরের হাই স্কুল শিক্ষিকা ও বিবাহিতা । মেয়ে দুজনই ডিব্রুগরের জল আবহাওয়ায় মানুষ এবং তাঁরা প্রতিষ্ঠিত । তাঁরা কেউ বাজারসৌতে ফিরে আসবেন না । শুভ্রাংশবাবু ত্রিবান্দ্রম থেকে এম-ডি এবং পোস্ট-ডক্টোরেট করে এখন ডিব্রুগর মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক । তিনি এখন পুরোপুরি ডিব্রুগরের বাসিন্দা । ডাক্তারিতে তাঁর ভীষণ নাম-ডাক । তিনিও অসমকে ভালবেসে ফেলেছেন । তাঁর এতটুকু ইচ্ছা নেই বাজারসৌতে ফিরে আসার । তবুও নটরাজ ও কার্তিকের পীড়াপীড়িতে শুভ্রাংশবাবু কথা দিয়েছেন, তিনি বাজারসৌতে আসবেন এবং জমির ব্যাপারটা ফয়সালা করে ফিরবেন ।
এদিকে নটরাজ ও কার্তিক উঠেপড়ে লেগেছে, জমিটা শুভ্রাংশবাবুর কাছ থেকে অল্প পয়সায় হাতিয়ে নেওয়ার । তার জন্য দুই ছোকরা কুচক্রী সমানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে । অন্যদিকে শুভ্রাংশবাবু চাইছেন, আর ঝুটঝামেলা না রাখতে । জমিটা বিক্রি করে দিতে । এইজন্য ডিব্রুগর কোর্ট থেকে তিনি পাওয়ার-নামা তৈরী করলেন । তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, তিনি যখন স-শরীরে বাজারসৌতে যাচ্ছেন তখন জমি বিক্রি করে ফিরবেন । ঝামেলা রেখে অহেতুক বিড়ম্বনার মধ্যে না থাকাটাই শ্রেয় ।
পটলের কানে গেল, জমির মালিক অসম থেকে বাজারসৌতে আসছেন । তিনি জমি বিক্রি করে ডিব্রুগরে ফিরে যাবেন । পটল পড়ে গেল মহা-ফাঁপড়ে । পটল পুনরায় গদাই খুড়োর স্মরণাপন্ন হল । গদাই খুড়ো আশ্বাস দিয়ে বললেন, “জমির মালিক আসুক । শুনেছি তিনি মহৎ মনের মানুষ । তাঁকে সব বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় তিনি ব্যাপারটা উপলব্ধি করবেন এবং তোমার অনুকূলে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেবেন । আগে থাকতে উলট-পালট ভাববার কিছু নেই । তুমি বরং তোমার নিজের কাজে মন দাও ।“
মুড়ির দোকানের খরিদ্দার ক্রমশ বাড়ছে । জগাই পটলকে পরামর্শ দিলো, “এবার ভায়া তোমাকে চায়ের ব্যবস্থা করতে হবে । খরিদ্দারেরা মুড়ি খাওয়ার পর চায়ের দোকান খোঁজ করছেন । তুমি বরং ইতিমধ্যে চা বানানোটা শিখে নাও । দরকার হলে আমিও তোমাকে চা বানানো শিখিয়ে দেবো ।“
জগাইয়ের কথা শুনে পটল শুধুমাত্র হাসলো । তারপর জগাইকে বললো, “জমির মালিক আগে আসুক । আমার থাকার জায়গাটা পাকা হলে পরের কাজগুলিতে মনোযোগ দেবো । এই মুহূর্তে আমার টিকে থাকার চিন্তাটাই বেশী । কেননা যেভাবে কয়েকজন চক্রান্ত্রকারী মানুষ আমাকে উচ্ছেদ করার জন্য জমির মালিকের সাথে দরবার করছে তাতে আমার অবস্থা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, এটাই আমার কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন ?
তারপর খরিদ্দার আসার কারণে জগাই তার খাওয়ার হোটেলে ঢুকলো ।
দাদার কাছে গিয়ে ঝিঙে বসলো । সেই সময় মণ্ডল রিক্সাওয়ালা উপস্থিত । ঝিঙে তাকে মুড়ি খাওয়ার থালাটা ও এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলো । পটল একপ্লেট ঘুগনি ও এক বাটী মুড়ি মণ্ডলদাকে দিয়ে বললো, “তোমার আসতে এত দেরী কেন ?”
“আর বলো না ভায়া, আজ রাস্তায় বিরাট মিছিল । শহর থেকে নাকি নেতারা এসেছে, তার জন্য মিছিল । শুধু ইনক্লাব -জিন্দাবাদ । মানুষে মানুষে ছয়লাপ । ঘরে খাবার নেই অথচ মানুষগুলির মিছিলে যাওয়া চাই ।“ বিরক্ত সহকারে কথাগুলি বললো মণ্ডল রিক্সাওয়ালা । তারপর ঘুগনি দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে খেতে খেতে পটলের দিকে তাকিয়ে বললো, “শুনলাম, তোমার দোকান নাকি উঠে যাচ্ছে ?”
কোথায় শুনলে মণ্ডল কাকা ।
রাস্তায় বলাবলি করছিলো, জমির মালিক নাকি বাজারসৌতে আসছেন । তিনি এসে নাকি বিক্রি করে দেবেন । বিশেষ করে কার্তিক ছোঁড়াটা বেশী করে বলছিলো । কিন্তু আমি গা লাগাইনি । কার্তিক ছোঁড়াটা বড্ড ত্যাঁদর । লোকের পকেট মেরে ওদের রুটি রোজগার । এমনকি কিছু কিছু জায়গায় ভয় দেখিয়ে তোলা আদায় । পার্টির সাথে এদের সখ্যতা ও দহরম-মহরম । ভয়ে কেউ তাদের ঘাটায় না । আজকের মিছিলে তারাই মধ্যমণি । লোক জড়ো করার দায়িত্ব তাদের । এলাকার কয়েকটা ছেলের উটকো মস্তানি মানুষ সহ্য করতে পারছে না । একদিন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলে, ঐগুলির অবস্থা ভীষণ খারাপ হবে ।
মণ্ডল কাকা, তুমি কার্তিক ছাড়া আর কাদের কথা বলছো ?
লোহাদহের কটাই, তালডাঙ্গার মাধব, সবগুলি একসঙ্গে দল বেঁধেছে । নানানদিকে চুরি ছিনতাই বেড়েছে । বয়স্থা মেয়েরা রাস্তা দিয়ে হাঁটলে নানান ধরনের বেইজ্জতির সম্মুখীন হচ্ছে । ভয়ে মানুষের মুখে কুলুপ আঁটা ।
মণ্ডল রিক্সাওয়ালা জল দিয়ে হাত ধুতে ধুতে পটলের দিকে তাকিয়ে বললো, “এখন আমাকে উঠতে হবে । এই ট্রেনটায় সালার থেকে বনমালী দাদার আসার কথা । বনমালী দাদার মনোহারী দোকানের অনেক জিনিস নিয়ে নামার কথা । আমি এখন চললাম ।
মণ্ডল কাকা চলে গেল ।
ভাত হয়ে গেছে । দুজনে স্নান সেরে খেয়ে নিলো । দুপুরের দিকে বেচাকেনা কম থাকে । তবুও এক-দুজন খরিদ্দারের আনাগোনা সর্বক্ষণ । খরিদ্দার থাকলে পটলের খুব ভাল লাগে । খরিদ্দারদের পরিষেবা দিতে পটল খুব আন্তরিক । যার জন্য পটলের দোকানে খরিদ্দারদের বিরাম নেই । এটাই পটলের প্রশান্তি । ব্যবসায় ভাললাগার জায়গা । ছোট ব্যবসা । কিন্তু ব্যবসা চালানোতে কোনোরকম খামতি নেই । খরিদ্দারের তুষ্টির জায়গাটায় পটল খুব সতর্ক ।
ভাই-বোনের খাওয়া শেষ না হতেই হোটেলের জগাই খবর দিলো অসম থেকে শুভ্রাংশবাবু এসে পৌঁছেছেন । জমির মালিক শুভ্রাংশবাবু ।
পটলের মাথায় হাত !
করুণ দৃষ্টিতে বারংবার ঝিঙের দিকে তাকাচ্ছে পটল । ঝিঙে ভাত খাওয়ার পর হাত ধুয়ে দাদাকে বলল, “তুমি মিছে টেনশনে ভুগছো ।“
বোনের মাথায় বা-হাত রেখে ছলছল চোখে পটল বলল, “তুই আমার আদরের বোন । তুই আমার কাছে ভগবানের পাঠানো শান্তির দূত ।“
 (চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here