
জেনে নিই, কৌশিকী অমাবস্যা কী ? অশুভ শক্তি বিনাসের তিথি হলো কৌশিকী অমাবস্যা । ভগবান ব্রহ্মার বর পাওয়ার পর শুম্ভ ও নিশুম্ভের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায় । শুম্ভ ও নিশুম্ভের অত্যাচারে ত্রিলোক অশান্ত ও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে । সেই অত্যাচারে অতিষ্ঠ ও ভীত হয়ে দেবগণ অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ত্রিলোকে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশে দেবী পার্বতীর শরণাপন্ন হন । কৌশিকী অমাবস্যা বলতে আমরা আরও বুঝি, বৌদ্ধ ও হিন্দু তন্ত্রে এই দিনের এক বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে । তন্ত্র মতে এই অমাবস্যার রাতকে তারা রাত্রিও বলা হয় । এ দিন এক বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ ও নরক দুইয়ের দ্বার মুহূর্তের জন্য উম্মুক্ত হয় ও সাধক নিজের ইচ্ছামতো ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক শক্তি নিজের সাধনার মধ্যে আত্মস্থ করে ও সিদ্ধি লাভ করে । তাই শোনা যায়, তন্ত্রসাধনার জন্য এই কৌশিকী অমাবস্যা খুবই গুরুত্বপুর্ণ ।
এখন জানা যাক, কৌশিকী দেবী কে ছিলেন ? কালিকা পুরাণে কৌশিকী দেবী মাতঙ্গীর দেহ থেকে উৎপন্ন শক্তি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে । দেবী ভাগবত পুরাণে কৌশিকীকে দেবী পার্বতীর দেহ থেকে উৎপন্ন শক্তি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং দেবী ভাগবত পুরাণের শুরুতে তাকে “কৌশিকী” বলা হয়েছে ।
কৌশিকী অর্থ ‘কোষের নারী’ যিনি একজন হিন্দু দেবী এবং পার্বতীর আবরণ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন । এখানে উল্লেখ থাকে যে, পার্বতীর কোষ থেকে সৃষ্ট হওয়ার কারণেই তিনি নিজের নাম রাখেন কৌশিকী, যার আক্ষরিক অর্থ হলো কোষের “নারী” । তিনি পার্বতীর অসুর ভাই শুম্ভ ও নিশুম্ভের সাথে সংঘর্ষের আগে সৃষ্টি হয়েছিলেন এবং মাতৃকার অস্তিত্বের কারণও ছিলেন ।
কৌশিকী নামের অর্থ হচ্ছে “কোষ থেকে জাত” বা “কোষ থেকে উৎপন্ন” । এই নামটি দেবী পার্বতীর একটি রূপের সাথে সম্পর্কিত, যিনি দেবী দুর্গার অংশ এবং যিনি পার্বতীর দেহকোষ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন । অনেকে বলেন, এই নামটি নাকি দেবী দুর্গার একটি শক্তিশালী এবং উগ্র রূপের সাথেও সম্পর্কিত, যিনি তার ভক্তদের রক্ষা করেন । আবার কিছু বিশ্বাস অনুযায়ী, কৌশিকী দেবী মহাদেবের স্ত্রী এবং তিনি মহাকালীর একটি রূপ ।
যাই হোক কৌশিকী নামের অর্থ হলো দুর্গা দেবী । এই নামের মানে হলো মহাকালের উপর জয়শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে মহাদেবের সঙ্গী তথা একজন শক্তিশালী দেবী । দুর্গা মা সমস্ত শক্তির প্রতীক ।
কৌশিকী অমাবস্যা হিন্দু ক্যালেন্ডারে একটি অত্যন্ত শুভ দিন, বিশেষ করে দেবী কালীর ভক্তদের জন্য । এটা প্রচলিত বিশ্বাস, এই রাতে দেবী কালী অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে এবং ধর্ম পুনরুদ্ধার করতে দেবী “কৌশিকী” রূপে অবতীর্ণ হন । তা ছাড়া ঋষি বামাখ্যাপা এই রাতে বোধি লাভ করেছিলেন ।
***********************************
হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন তিথিতে মা কালীর বিভিন্ন রূপের পুজো করা হয়। দেবীর আরাধনা সর্বজনবিদিত । ভাদ্র মাসের শুরুতেই যে অমাবস্যা, সেটাই কৌশিকী অমাবস্যা নামে পরিচিত । এই পুজোর সঙ্গে জড়িত আছে নানা পৌরাণিক কাহিনি । এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কৌশিকী অমাবস্যার পবিত্র লগ্নে বীরভূম জেলার তারাপীঠ মন্দিরে, বিশেষ উপাচারে তারা মায়ের পুজো হয় ।
এটা প্রচলিত বিশ্বাস, এই তিথিকে তারা নিশি বলা হয়ে থাকে । এই তিথিতে বিশেষ ভাবে মায়ের পুজোর আয়োজন হয় । কৌশিকী অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ পুজোয় অংশগ্রহণ করে দ্বারকা নদীতে স্নান করলে নাকি জীবনের সব পাপ থেকে মুক্তি মেলে । মোক্ষ লাভ ঘটে । তিথি মাহাত্ম্যের জন্য এইদিন তারাপীঠে প্রচুর ভিড় হয় । হাজার হাজার ভক্তেরা কৌশিকী অমাবস্যার দিন ছুটে যান তারাপীঠ মন্দিরে । ”
সিদ্ধি লাভ করার জন্য সাধকরা এই অমাবস্যাকে বেছে নেন । “মা কালী” বাঙালিদের অন্যতম প্রধান দেবী । আমরা জানি কালীর বিভিন্ন রূপ, তার মধ্যে দেবী কৌশিকী হচ্ছে মা কালীর অন্যতম রূপ । তন্ত্রসাধনার জন্য সাধারণত জ্যোতিষীরা অমাবস্যার রাতকেই বেছে নেন । ঐ অমাবস্যর মধ্যে একটি অমাবস্যা হচ্ছে কৌশিকী অমাবস্যা । জনশ্রুতি আছে, বামাখ্যাপা কৌশিকী অমাবস্যায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন । কৌশিকী অমাবস্যা, অন্য সব অমাবস্যার থেকে আলাদা । কারণ, তন্ত্র ও শাস্ত্র মতে ভাদ্র মাসের এই তিথিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । তন্ত্রশাস্ত্র মতে অনেক কঠিন ও গুপ্ত সাধনা কৌশিকী অমাবস্যার দিনে করলে আশাতীত ফল মেলে । বৌদ্ধ ও হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রে এই দিনের এক বিশেষ মাহাত্ম্য আছে । আগেই বলেছি তন্ত্র মতে এই অমাবস্যার রাতকে তারা রাত্রিও বলা হয় । এ দিন এক বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ ও নরক দুইয়ের ‘দ্বার’ মুহূর্তের জন্য উম্মুক্ত হয় ও সাধক নিজের ইচ্ছামতো ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক শক্তি নিজের সাধনার মধ্যে আত্মস্থ করে ও সিদ্ধি লাভ করে । তাই তন্ত্রসাধনার জন্য এই অমাবস্যা খুবই গুরুত্বপুর্ণ বলে মনে করা হয় ।
শোনা যায়, পূর্ব জন্মে পার্বতী যখন সতী রূপে দক্ষ যজ্ঞ স্থলে আত্মাহুতি দেন, তার কারণে এই জন্মে ওঁর গাত্র বর্ণ কালো মেঘের মতো । তাই ভোলানাথ তাঁকে কালিকা ডাকতেন । একদিন দানব ভাইদের দ্বারা পীড়িত ক্লান্ত দেবতারা যখন কৈলাশে আশ্রয় নিলেন — শিব সব দেবতাদের সামনেই পার্বতীকে বললেন, “কালিকা তুমি ওদের উদ্ধার করো ।” সবার সামনে ‘কালী’ বলে ডাকায় পার্বতী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, অপমানিত ও ক্রোধিত মনে মানস সরোবরের ধারে কঠিন তপস্যা করলেন ।
তপস্যান্তে শীতল মানস সরোবরের জলে স্নান করে নিজের দেহের সব কালো পরিত্যাগ করলেন ও পূর্ণিমার চাঁদের মতো গাত্র বর্ণ ধারণ করলেন । ওই কালো কোশিকাগুলি থেকে এক অপূর্ব সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ দেবীর সৃষ্টি হয় । ইনি দেবী কৌশিকী । যেদিন এই দেবীর উৎপত্তি হয় এবং এই দেবী শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করেন । তাই এই অমাবস্যার নাম কৌশিকী অমাবস্যা ।
উল্লেখ থাকে যে, এই বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের কৌশিকী অমাবস্যা পালিত হবে ২২শে অগাস্ট (৫ ভাদ্র) । আর অমাবস্যা তিথি শুরু হবে ২২শে অগাস্ট শুক্রবার সকাল ১১-৫৫ মিনিটে এবং শেষ হবে ২৩শে অগাস্ট শনিবার সকাল ১১-২৫ মিনিটে । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত) ।












Leave a Reply