প্রকৃতির কোলে শান্ত ভ্রমণ – কালিম্পং-এর নীরব সৌন্দর্য।

পাহাড় মানেই সাধারণত আমাদের মনে পড়ে দার্জিলিং-এর ভিড়, মল রোডের কোলাহল, বা গ্যাংটকের জমজমাট শহর। কিন্তু পাহাড় যদি চুপচাপ হয়ে আপনাকে আপন করে নেয়, দূরে যদি দেখা যায় কুয়াশা ঢাকা উপত্যকা আর অজস্র সবুজ, তবে সেই অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। কালিম্পং আমার কাছে এমনই এক অভিজ্ঞতা – শান্ত, নির্জন অথচ গভীরভাবে প্রাণবন্ত।


যাত্রার শুরু – ভিড় এড়িয়ে শান্তির খোঁজে

শারদীয়ার এক ভোরে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছে আমরা ঠিক করেছিলাম দার্জিলিং নয়, এবার যাব কালিম্পং। ছোটো শহর, কম ভিড়, আর মন শান্ত করার মতো জায়গা খুঁজছিলাম। স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে রওনা দিলাম কালিম্পং-এর দিকে।

টিস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তা যেন মনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। নদীর জলে সূর্যের আলো পড়তেই সে ঝিকমিক করতে লাগল। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকানে থামতাম – চা আর মোমোর গন্ধে মন ভরে যাচ্ছিল। শহরের ব্যস্ততা ফেলে পাহাড়ি পথ ধরে চলতে চলতে মনে হচ্ছিল যেন আমরা অন্য এক জগতে প্রবেশ করছি।


কালিম্পং পৌঁছে – প্রথম দেখা

কালিম্পং পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। শহর ছোট হলেও বেশ ছিমছাম। আমাদের বুক করা হোমস্টে ছিল ডেলো হিলের কাছাকাছি। হোমস্টের জানালা থেকে দেখা যাচ্ছিল বিস্তীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা আর দূরে হিমালয়ের চূড়া।

সন্ধ্যায় শহরের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। কালিম্পং-এর বাজার এলাকায় তখন উৎসবের রঙ। দুর্গাপুজোর সময় ছোট ছোট প্যান্ডেল হয়, কিন্তু ভিড় কম। স্থানীয় লেপচা, গুরুঙ্গ, নেপালি মানুষ সবাই মিলে আনন্দে অংশ নেয়। ঢাকের বদলে শোনা গেল পাহাড়ি বাঁশির সুর, তবুও মনে হল দেবী এসেছেন আমাদের কাছেই।


ডেলো হিল – কালিম্পং-এর হৃদয়

পরের দিন সকালে বেরোলাম ডেলো হিলের দিকে। গাড়ি যেতেই পারে, তবে আমরা কিছুটা হেঁটেই উঠলাম। ডেলো হিলে পৌঁছে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। চারদিক সবুজ ঘাসের কার্পেট, দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য, আর কুয়াশার আস্তরণ যেন পাহাড়কে জড়িয়ে রেখেছে।

ডেলো পার্কে বসে দীর্ঘক্ষণ কাটালাম। এখানে এমন কিছু নির্জন জায়গা আছে যেখানে বসে থাকলে মনে হয় সময় থেমে গেছে। বাতাস ঠান্ডা, মন শান্ত, আর চারপাশে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য – এর চেয়ে শান্তির জায়গা আর হয় না।


কালিম্পং-এর মঠ ও ঐতিহ্য

কালিম্পং-এ অনেক সুন্দর বৌদ্ধ মঠ আছে। আমরা ঘুরে এলাম ঝাং ধোক পালরি ফোদং মঠ। এখানে শান্তির আবহ একেবারে অন্যরকম। সোনালি বুদ্ধমূর্তি, টংটং করা প্রার্থনার ঘণ্টা, আর ধূপের গন্ধ মিলে যেন মন ধ্যানস্থ হয়ে গেল।

আরেকটি দর্শনীয় স্থান হল থার্পোচোলিং মঠ – এখানে সকালে গেলে লামারা প্রার্থনা করেন। প্রার্থনার সুর পাহাড়ি বাতাসে ভেসে বেড়ায়, মনে হয় যেন পাহাড়ও প্রার্থনায় মগ্ন।


লোভার্স মিট ভিউপয়েন্ট

কালিম্পং-এর অন্যতম সুন্দর জায়গা হল লোভার্স মিট। এখান থেকে দেখা যায় যেখানে রাঙিত ও তিস্তা নদী একসঙ্গে মিশেছে। দু’টি নদীর রঙ আলাদা হওয়ায় এই মিলনদৃশ্য সত্যিই দেখার মতো। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিলাম নদীর স্রোত, চারপাশের পাহাড় আর নীরবতা। মনে হচ্ছিল জীবন কতটা শান্ত হতে পারে!


সাইলেন্ট রিট্রিট – একান্তে সময় কাটানোর জায়গা

কালিম্পং-এ সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সাইলেন্ট রিট্রিটে কাটানো কয়েকটা ঘন্টা। এটি একটি শান্ত আশ্রমের মতো জায়গা যেখানে কথা বলার নিয়ম নেই। শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মেলানো। গাছের ছায়ায় বসে পাখির ডাক শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল যেন মনটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেল।

এখানে ধ্যানের ব্যবস্থা আছে। আমরা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ধ্যান করলাম। দূরের পাহাড়ি বাতাস, চারপাশের নীরবতা, আর মনের ভেতরের অস্থিরতা যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল।


কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রথম রোদ

কালিম্পং থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, যদিও দার্জিলিং-এর মতো এতটা কাছে নয়। ভোরে উঠে দেখলাম দূরের পাহাড়ে সোনালি আলো পড়ছে। সেই মুহূর্তটা একেবারেই অবিস্মরণীয়।


কালিম্পং-এর খাবারের স্বাদ

কালিম্পং-এর খাবার খুবই সহজ অথচ সুস্বাদু। এখানে সবচেয়ে বিখ্যাত হল কালিম্পং চিজ এবং কালিম্পং পেপার জ্যাম। এগুলো কিনে নিয়ে এলাম। বাজারের ছোট ক্যাফেতে গরম গরম মোমো আর থুকপার স্বাদও নিলাম।


পাহাড়ি পুজোর আবহ

পুজোর সময় কালিম্পং-এ ভিড় কম থাকলেও আনন্দের অভাব নেই। স্থানীয় ক্লাবগুলোতে ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় – পাহাড়ি নাচ, গান, লোককথার নাটক। আমরা একদিন স্থানীয় প্যান্ডেলে গিয়ে অংশ নিলাম সিঁদুর খেলায়। পাহাড়ি মহিলারা হাসিমুখে সিঁদুর মাখিয়ে দিলেন, মনে হল আমরা যেন এখানকারই মানুষ।


কেনাকাটা ও স্মৃতিচিহ্ন

কালিম্পং-এর হাটে গিয়ে কিছু হ্যান্ডমেড কার্পেট, বাঁশের তৈরি শোপিস আর নেপালি হস্তশিল্প কিনলাম। দাম খুব বেশি নয়, আর এগুলো বাড়ি নিয়ে আসতে দারুণ লাগল।


❤️ উপসংহার – পাহাড়ের নীরব কবিতা

কালিম্পং আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি ছিল এক ধরণের আত্মশুদ্ধির অভিজ্ঞতা। এখানে ভিড় নেই, কোলাহল নেই – আছে শুধু পাহাড়, নদী, মঠের প্রার্থনা আর শান্তির আবহ।

শহরের চাপে ক্লান্ত মন যদি কখনও মুক্তি চায়, তবে কালিম্পং তার জন্য সেরা জায়গা। সাইলেন্ট রিট্রিটের নির্জনতা, লোভার্স মিটের নদীর মিলন, ডেলো হিলের কুয়াশা আর স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা – সবকিছু মিলে কালিম্পং এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

এখানে কয়েকদিন কাটিয়ে ফিরে আসার পরও মনে হয়েছিল, আমি যেন এখনও পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে আছি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *