
ভূমিকা
কলকাতা শহর আজ যেমন থিম পুজো ও ঝলমলে প্যান্ডেলের জন্য বিখ্যাত, তেমনই এর এক বিশেষ দিক হল বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজো। শতাব্দী প্রাচীন এই বাড়িগুলির দুর্গা পুজো কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং ঐতিহ্য, রাজকীয় আভিজাত্য এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এখানকার পুজোর আচার-অনুষ্ঠান, বলিরীতি, প্রতিমার রূপ সবই আলাদা এবং বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাস
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর সূচনা হয় মূলত ১৭ ও ১৮ শতকে। নবকৃষ্ণ দেব, রানি রাসমণি, লাহা পরিবার, দত্ত পরিবার, ঠাকুর পরিবার—এদের মতো জমিদার ও ধনীদের হাত ধরে এই পুজো গড়ে ওঠে। তখনকার সময়ে দুর্গা পুজো কেবল দেবী আরাধনা নয়, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও গণ্য হত। ব্রিটিশ সাহেবরা, জমিদার, রাজারা সবাই এই পুজোতে নিমন্ত্রিত হতেন।
কলকাতার বিখ্যাত বনেদি বাড়ির পুজো
১. শোভাবাজার রাজবাড়ি
- প্রতিষ্ঠাতা: রাজা নবকৃষ্ণ দেব
- শুরুর বছর: ১৭৫৭, প্লাসির যুদ্ধের পর
- বিশেষত্ব: এখানে আজও একচালা ঠাকুর, পরম্পরাগত বলিরীতি (চালকুমড়ো বলি), আর রাজকীয় ঠাকুরদালানের আভিজাত্য বজায় রয়েছে।
২. জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়ি
- প্রতিষ্ঠাতা: রানি রাসমণি
- বিশেষত্ব: আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত এই পুজো। এখানে আজও প্রচুর মানুষ একত্রিত হন।
৩. লাহা বাড়ি
- বিশেষত্ব: প্রাচীন রীতি মেনে অন্নকুট, বলি ও অন্যান্য আচার হয়। এখানে ঠাকুরদালানের স্থাপত্যও এক বিশেষ আকর্ষণ।
৪. দত্ত বাড়ি (হাটখোলা দত্ত পরিবার)
- বিশেষত্ব: এখানকার প্রতিমা ও পুজোর মহিমা কলকাতায় সুপরিচিত।
৫. ঠাকুরবাড়ি (জোরাসাঁকো ঠাকুর পরিবার)
- বিশেষত্ব: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের পুজো। এখানে পুজোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বনেদি বাড়ির পুজোর বিশেষ রীতি
- একচালা ঠাকুর: দেবী, অসুর, সিংহ—সব একসঙ্গে এক ফ্রেমে।
- বলিরীতি: ছাগ বলির বদলে অনেক বাড়িতে আজও চালকুমড়ো বা লাউ বলির প্রথা চালু আছে।
- সান্ধ্যবাতি ও ধুনুচি নাচ: বাড়ির ঠাকুরদালানে পরিবারের সদস্যরা নিজের হাতে করেন।
- রাজকীয় ভোগ: ভোগে বহু পদ থাকে, যা রান্না হয় বাড়ির ভেতরেই।
বনেদি বাড়ির পুজোর সামাজিক ভূমিকা
আগে এই পুজোগুলি ছিল আমন্ত্রণমূলক, এখন অনেক বাড়ি তাদের পুজো সাধারণ মানুষের জন্যও খুলে দিয়েছে। পর্যটকরাও আজ এই বাড়ির পুজো দেখতে আসেন। এটি কলকাতার ঐতিহ্য পর্যটনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে।
বনেদি পুজোর বর্তমান চিত্র
আজকের দিনে অনেক বনেদি পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগলেও তারা চেষ্টা করে এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে। অনেক বাড়ি আবার নিজেদের পুজোকে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিছু পরিবার সরকারি সহায়তা বা সাংস্কৃতিক সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে পুজো চালিয়ে যাচ্ছে।
উপসংহার
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজো এক অমূল্য ঐতিহ্য। এটি কেবল দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, কলকাতার ইতিহাস, স্থাপত্য, আভিজাত্য ও সামাজিক জীবনের প্রতিফলন। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই বাড়িগুলির পুজো দেখতে আসেন, এবং ইতিহাসের সেই রাজকীয় আবহ অনুভব করেন। কলকাতার এই বনেদি পুজোগুলি প্রমাণ করে—যুগ পাল্টালেও ঐতিহ্য আজও জীবন্ত।












Leave a Reply