
ভূমিকা
নদী মানবজীবনের অকৃত্রিম বন্ধু। সভ্যতার জন্ম, বিকাশ এবং বিস্তারের ইতিহাসের সঙ্গে নদীর অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে। নীল নদের পাড়ে মিশর, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের তীরে মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু-গঙ্গার তীরে ভারতীয় সভ্যতা, হোয়াংহো-ইয়াংসি নদীর তীরে চীন—সবকিছুই প্রমাণ করে যে নদী শুধু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের মূলভিত্তি। এই নদীগুলিকে স্মরণ করা, তাদের রক্ষার শপথ নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার পালিত হয় বিশ্ব নদী দিবস (World Rivers Day)।
এই দিনটি আজ বিশ্বজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ-বিষয়ক দিবসে পরিণত হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্ব নদী দিবসের উৎপত্তি, উদ্দেশ্য, নদীর গুরুত্ব, বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করব।
বিশ্ব নদী দিবসের ইতিহাস
বিশ্ব নদী দিবসের সূচনা কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে। বিখ্যাত পরিবেশবিদ মার্ক অ্যাঞ্জেলো (Mark Angelo) নদী সংরক্ষণে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ২০০৫ সালে এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। জাতিসংঘের সমর্থনে প্রথমবার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয় ২০০৫ সালে। সেই থেকে প্রতিবছরই সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার সারা বিশ্বে নানান কর্মসূচির মাধ্যমে এই দিনটি পালিত হচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশ এই দিবস উদযাপন করে। স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, নদী পরিস্কার অভিযান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার, গবেষণাপত্র প্রকাশ, সরকারি নীতি নির্ধারণ ইত্যাদির মাধ্যমে দিনটি বিশ্বজনীন গুরুত্ব অর্জন করেছে।
নদীর গুরুত্ব : সভ্যতা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
১. সভ্যতার উৎস
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। নদী ছিল পানীয় জল, কৃষি সেচ, পরিবহন এবং খাদ্যের উৎস। নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা এবং ধর্মীয় আচার।
২. কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
বিশ্বের ৪০% খাদ্য উৎপাদন সরাসরি নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীর বন্যা উর্বর পলি এনে জমিকে উর্বর করে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ডেল্টা পৃথিবীর অন্যতম উর্বর অঞ্চল।
৩. পরিবহন ও বাণিজ্য
প্রাচীনকাল থেকে নদী ছিল সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা। আজও ইউরোপ, চীন, বাংলাদেশ, ভারতের বহু অঞ্চলে নদীপথে মালবাহী ও যাত্রীবাহী পরিবহন জনপ্রিয়।
৪. শক্তি উৎপাদন
জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস হল নদী। অনেক দেশ তাদের বিদ্যুতের বড় অংশ নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ থেকে পেয়ে থাকে।
৫. জীববৈচিত্র্য
নদী শুধু মানুষের জন্য নয়, অসংখ্য প্রাণী, মাছ, উদ্ভিদ এবং ক্ষুদ্রজীবের জন্য জীবনদায়ী। নদী-নির্ভর এই ইকোসিস্টেম পৃথিবীর খাদ্যশৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬. সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতা
ভারতীয় সংস্কৃতিতে নদীকে দেবী হিসেবে পূজা করা হয়—গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা, গদাধর। বিশ্বের অন্যান্য সংস্কৃতিতেও নদীকে দেবত্ব দেওয়া হয়েছে। নদীর গান, কবিতা, লোককথা মানবজীবনের অন্তরে নদীর গভীর প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।
নদীর বর্তমান সংকট
আজকের দিনে নদীগুলি বিপুল সংকটে। মানবসভ্যতার লোভ, অদূরদর্শী উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীগুলি ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে।
১. দূষণ
শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য, প্লাস্টিক, কীটনাশক নদীতে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। ফলে নদীর জল বিষাক্ত হচ্ছে, মাছ মারা যাচ্ছে, রোগ ছড়াচ্ছে।
২. অতিরিক্ত বাঁধ ও জল সরানো
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচের জন্য অসংখ্য বাঁধ নির্মিত হওয়ায় নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ডেল্টা শুকিয়ে যাচ্ছে।
৩. বালু চুরি ও অবৈধ খনন
অতিরিক্ত বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশ গভীর হয়ে যায়, ফলে সেতু ও তীরভূমি দুর্বল হয়, ভাঙন বাড়ে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন
গ্লেসিয়ার গলনের হার বেড়ে যাওয়ায় কিছু নদীতে হঠাৎ বন্যা, আবার কিছু নদীতে শুকিয়ে যাওয়া—এই দুই বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
৫. নগরায়ণ
নদীর পাড় দখল করে বহুতল, কারখানা, রাস্তা নির্মাণের ফলে নদীর প্রাকৃতিক বিস্তার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
নদী রক্ষায় করণীয়
বিশ্ব নদী দিবস আমাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং দায়িত্ববোধও জাগিয়ে তোলে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি – স্কুল-কলেজে নদী বিষয়ক পাঠ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- আইন প্রয়োগ – নদীদূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
- কমিউনিটি অংশগ্রহণ – স্থানীয় মানুষকে নদী পরিচ্ছন্ন অভিযানে যুক্ত করতে হবে।
- বৈজ্ঞানিক গবেষণা – নদীর জলস্তর, দূষণের মাত্রা, জীববৈচিত্র্য নিয়ে নিয়মিত গবেষণা দরকার।
- প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখা – বাঁধ ও জল সরানোর ক্ষেত্রে সুষম নীতি গ্রহণ করতে হবে।
- গাছ লাগানো ও নদীর পাড় সংরক্ষণ – পাড় ভাঙন রোধে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে।
বিশ্ব নদী দিবস উদযাপনের তাৎপর্য
এই দিনটি কেবল নদীকে স্মরণ করার দিন নয়, এটি নদীকে রক্ষার অঙ্গীকার করার দিন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ নদীর তীরে সমবেত হয়ে প্রতিজ্ঞা করে—নদীকে দূষণমুক্ত রাখবে, নদীর তীর দখল করবে না, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখবে। এই কর্মসূচি শিশুদের মধ্যেও পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলে।
ভারত ও বাংলার প্রেক্ষাপট
ভারত নদীমাতৃক দেশ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, গোদাবরী, কৃষ্ণা, নর্মদা, তাপ্তি—এসব নদী ভারতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পশ্চিমবঙ্গের জন্য গঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখা শুধু কৃষি নয়, সংস্কৃতিরও প্রাণস্রোত। দুর্গাপুজো, গঙ্গাস্নান, তর্পণ—সবই নদীকেন্দ্রিক। তাই বিশ্ব নদী দিবস ভারতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
উপসংহার
নদী ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করা যায় না। নদী আমাদের জল দেয়, খাদ্য দেয়, জীবন দেয়, সংস্কৃতি দেয়। অথচ আমরা নিজেরাই নদীর সর্বনাশ ডেকে এনেছি। বিশ্ব নদী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এখনও সময় আছে, যদি আমরা একসঙ্গে সচেতন হই, নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে দিই, দূষণ রোধ করি, তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ পৃথিবী পাবে।
বিশ্ব নদী দিবস কেবল একদিনের অনুষ্ঠান নয়—এটি একটি বৈশ্বিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের প্রত্যেককে যুক্ত হতে হবে, কারণ নদী বাঁচলে তবেই মানুষ বাঁচবে।












Leave a Reply