জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমে নেকার নদীর তীরে অবস্থিত হাইডেলবার্গ (Heidelberg) এমন এক শহর, যেখানে ইতিহাস, সৌন্দর্য, কবিতা এবং যুবসমাজের প্রাণচাঞ্চল্য একসাথে মিশে আছে। জার্মানির সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাচীন দুর্গ, মনোমুগ্ধকর পুরনো শহর—সব মিলিয়ে হাইডেলবার্গ এমন একটি শহর যা ভ্রমণকারীর মনকে প্রথম দেখাতেই জয় করে নেয়।
হাইডেলবার্গের প্রথম ছাপ – নেকার নদী আর লাল-ইটের সেতু
শহরে ঢুকতেই চোখে পড়বে শান্ত নেকার নদী আর তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ওল্ড ব্রিজ (Alte Brücke)। লাল পাথরের এই সেতু শহরের এক অনন্য প্রতীক। নদীর জল, শহরের রঙিন বাড়ি আর সবুজ পাহাড়—এমন দৃশ্য যেন কোনো রূপকথার বই থেকে তুলে আনা।
হাইডেলবার্গ ক্যাসল – ইউরোপের সবচেয়ে সুন্দর ধ্বংসাবশেষ
হাইডেলবার্গ মানেই হাইডেলবার্গ ক্যাসল।
১৩শ শতকে নির্মিত এই দুর্গটি আজ ধ্বংসাবশেষ হলেও এর সৌন্দর্য অপরূপ। দুর্গ থেকে পুরনো শহর ও নেকার নদীর প্যানোরামিক দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না।
দুর্গের ভেতরে রয়েছে—
- বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়াইন ব্যারেল,
- রেনেসাঁ সময়ের চমৎকার স্থাপত্য,
- আর একটি রূপকথার মতো বাগান—হর্টাস প্যালাটিনাস।
এখানে দাঁড়ালে মনে হয় ইতিহাস ফিসফিস করে কথা বলছে।
হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি – জার্মানির সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়
১৩৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি ইউরোপের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্রছাত্রী আসে এখানে পড়তে, তাই পুরো শহরটিই মনে হয় এক বিশাল ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অদ্ভুত আকর্ষণ হলো—
“স্টুডেন্ট জেল (Studentenkarzer)”
আগে ছাত্রদের দুষ্টুমি করার জন্য এখানে আটক রাখা হতো।
ভেতরের দেয়ালে লেখা ছাত্রদের আঁকিবুকি আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
আল্টস্টাড (Old Town) – রঙিন আর ঐতিহাসিক
হাইডেলবার্গের পুরনো শহর ছোট ছোট মনোরম রাস্তা, ক্যাফে, জার্মান বার, দোকান আর গির্জায় ভরপুর। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাবেন—
হোলি স্পিরিট চার্চ (Heiliggeistkirche)
শহরের প্রতীকী চার্চ, যার ওপর থেকে দেখা যায় পুরো আল্টস্টাডের সৌন্দর্য।
হাউপ্টস্ট্রাসে (Hauptstraße)
ইউরোপের অন্যতম দীর্ঘ ও সুন্দর pedestrian street।
এখানে কেনাকাটা, কফি, আইসক্রিম—সবই মিলবে প্রাণবন্ত পরিবেশে।
ফিলজোসোফেনভেগ (Philosophenweg) – দার্শনিকদের হাঁটার পথ
এটি নেকার নদীর উত্তর তীরে পাহাড়ের ওপর একটি চমৎকার হাঁটার পথ।
কথিত আছে, এখানকার শান্ত পরিবেশে বসে দার্শনিকরা তাদের চিন্তা-ভাবনা করতেন।
পথের শেষে পৌঁছালে আপনি পাবেন—
- শহরের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য,
- দুর্গের রঙিন প্রতিচ্ছবি,
- নিচে ঝলমলে পুরনো শহর।
এটি ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গ।
হাইডেলবার্গে কী কী করবেন
- নেকার নদীতে বোট ক্রুজ
- পুরনো শহরে হাঁটা
- দুর্গে কেবল কারে চড়ার অভিজ্ঞতা
- স্থানীয় জার্মান খাবার—বিশেষ করে Schweinshaxe, Pretzel, Schnitzel
- ইউনিভার্সিটির জাদুঘর ভ্রমণ
কবে যাবেন
হাইডেলবার্গ সারাবছরই সুন্দর, তবে সেরা সময়—
- এপ্রিল–জুন (বসন্তের ফুলে রঙিন)
- সেপ্টেম্বর–অক্টোবর (পাতাঝরার অসাধারণ রং)
- ডিসেম্বর (ক্রিসমাস মার্কেট একেবারে স্বপ্নের মতো)
শেষ কথা – রোমান্টিক, ঐতিহাসিক, কবিতার শহর
হাইডেলবার্গ এমন একটি শহর, যেখানে এসে মনে হবে—
জীবন একটু ধীরে বয়ে যাক, একটু বেশি উপভোগ করা যাক।
নেকার নদীর তট, লাল ইটের দুর্গ, রঙিন পুরনো শহর—সব মিলিয়ে হাইডেলবার্গ হলো ইউরোপের এক চিরন্তন প্রেমের কবিতা।













Leave a Reply