
জার্মানির বাভারিয়া প্রদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নুরেমবার্গ (Nürnberg) এমন একটি জায়গা, যেখানে ইতিহাসের গভীরতা, মধ্যযুগের স্থাপত্যশৈলী, শিল্পের অনন্য সৌন্দর্য ও আধুনিক নগরজীবন একসাথে মিশে আছে। আলব্রেখ্ট ড্যুরারের শহর, মধ্যযুগীয় দুর্গের শহর, আর বিশ্ব ইতিহাসের মোড়-ফেরানো নুরেমবার্গ ট্রায়ালের শহর—সব পরিচয় একত্রে ধারণ করে এ শহর।
১. শহরে প্রথম পরিচয় – সময়ের কণ্ঠস্বরের মতো এক পরিবেশ
নুরেমবার্গে পৌঁছালেই চোখে পড়ে পুরনো শহরের লাল ছাদের ঘর, পাথরের সেতু, পাথুরে রাস্তা, আর বিশাল দুর্গের দেয়াল। মনে হবে যেন কয়েক শতাব্দী আগের জার্মানিতে ফিরে গেছেন।
পুরনো শহর (Altstadt) ঘুরতে ঘুরতেই বোঝা যায়, এ শহরের স্থাপত্যে এখনও মধ্যযুগের শৈলী ধরে রাখা হয়েছে অত্যন্ত যত্নে।
২. নুরেমবার্গ ক্যাসেল – শহরের মুকুট
নুরেমবার্গের প্রতীক হল Kaiserburg Nürnberg বা নুরেমবার্গ ক্যাসেল।
কেন এটি দেখবেন?
- ১১শ শতকে নির্মিত জার্মানির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মধ্যযুগীয় দুর্গ
- প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে পুরো নুরেমবার্গ শহরের মনকাড়া প্যানোরামা
- পুরনো অস্ত্র, বর্ম, রাজাদের ব্যবহৃত সামগ্রী
- ঐতিহাসিক কূপ (Deep Well) যার গভীরতা অবিশ্বাস্য
দুর্গের উঠোনে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন কোনো রাজা-রানীর যুগে আছেন।
৩. হাউপ্টমার্কট – নুরেমবার্গের প্রাণকেন্দ্র
পুরনো শহরের সবচেয়ে জমজমাট জায়গা হলো এই স্কয়ারটি। এখানে আছে—
ফ্রাউয়েনকির্খে (Frauenkirche)
গথিক স্থাপত্যের অপূর্ব উদাহরণ। বিশেষ করে ঘড়ির নিচের মূর্তিগুলোর নড়াচড়া প্রতিদিন দুপুর ১২টায় দেখার মতো দৃশ্য।
সুখের কূপ (Schöner Brunnen)
একটি অলংকৃত ফোয়ারা। এখানে থাকা সোনালি রিংটি ঘুরালে নাকি সৌভাগ্য আসে—এমন বিশ্বাস প্রচলিত।
বিশ্ববিখ্যাত ক্রিসমাস মার্কেট
নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর—
এ জায়গাটি পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর Christmas Market হয়ে ওঠে, চমৎকার আলো, কাঠের স্টল, দারুচিনি–চকোলেটের গন্ধ এবং উৎসবের আবহে ভরে ওঠে।
৪. আলব্রেখ্ট ড্যুরারের বাড়ি – শিল্পের স্মৃতিচিহ্ন
রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত জার্মান শিল্পী Albrecht Dürer-এর বাড়িটি নুরেমবার্গের বড় আকর্ষণ।
এখানে পাবেন—
- ড্যুরারের আঁকা বিখ্যাত স্কেচ ও প্রিন্ট
- তাঁর স্টুডিওর পুনর্নির্মাণ
- সেই সময়কার জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র
শিল্পপ্রেমীদের জন্য এটি এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্রের মতো।
৫. নুরেমবার্গ ট্রায়াল মিউজিয়াম – ইতিহাস বদলে দেওয়া বিচারকক্ষ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নাৎসি নেতাদের বিচার হয়েছিল Courtroom 600-এ।
আজ সেটি Nuremberg Trials Memorial নামে পরিণত হয়েছে।
এখানে পাবেন—
- যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাস
- অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার নথি
- ভিডিও সাক্ষ্য
- মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বিরল দলিল
এটি চরম হৃদয়স্পর্শী ও চিন্তাশীল একটি অভিজ্ঞতা।
৬. সেন্ট লরেঞ্জ চার্চ (St. Lorenz Kirche) – আকাশ ছোঁয়া সৌন্দর্য
এই গথিক চার্চটির বিশাল স্পায়ার, রঙিন কাঁচের জানালা, আর নিখুঁত ভাস্কর্য মন কেড়ে নেয়।
বিশেষ করে সূর্যের আলো যখন কাঁচের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে—চার্চের ভেতর আলোকস্নাতে আলাদা জাদু সৃষ্টি হয়।
৭. পেগনিটজ নদীর ধারে হাঁটা – নির্জনতার শহর
নুরেমবার্গ শহরকে দুই ভাগে ভাগ করেছে পেগনিটজ নদী। নদীর ওপর কাঠের সেতু, জলচাকা, আর নদীর ধারের ছোট ক্যাফেগুলো শহরটিকে আরও রোমান্টিক করে তোলে।
Hangman’s Bridge—ইতিহাস ও দৃশ্য–দুইয়ের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
৮. নুরেমবার্গের খাবার – ছোট ছোট সসেজের অপরূপ স্বাদ
নুরেমবার্গের বিখ্যাত খাবার—
Nürnberger Rostbratwürste
খুব ছোট আকারের সসেজ, মধুর গন্ধ আর মশলার স্বাদে অসাধারণ।
মাস্টার্ড বা সাওয়ারক্রাউটের সাথে খেলে আরও মজা।
এ ছাড়া রয়েছে—
- জিঞ্জারব্রেড (Lebkuchen)
- স্থানীয় বিয়ার
- রোস্ট পর্ক
শহর ঘুরে খাবার না চেখে দেখা অপরাধের মতো।
৯. জাদুঘরের ভাণ্ডার – মধ্যযুগ থেকে শিল্প পর্যন্ত
নুরেমবার্গে রয়েছে বেশ কিছু বিশ্বমানের মিউজিয়াম—
- Germanisches Nationalmuseum – জার্মানির বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগ্রহ
- Toy Museum – ছোটদের জন্য স্বর্গ
- Transport Museum – রেলপথের ইতিহাস
ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অসাধারণ সম্পদ।
১০. কেনাকাটা – পুরনো শহরের সেরা অভিজ্ঞতা
নুরেমবার্গের পুরনো শহরের বাজারগুলো রূপকথার মতো সাজানো।
এখানে পাবেন—
- হস্তশিল্প
- কাঠের তৈরি খেলনা
- বাদ্যযন্ত্র
- জিঞ্জারব্রেড
- ক্রিসমাস সজ্জা
পর্যটকদের প্রিয় স্যুভেনির স্বর্গ।
১১. কবে নুরেমবার্গে গেলে সবচেয়ে ভালো?
- বসন্ত ও শরৎ (এপ্রিল–জুন, সেপ্টেম্বর–অক্টোবর): আবহাওয়া সুখকর
- শীত (ডিসেম্বর): ক্রিসমাস মার্কেটের জন্য সেরা
- গ্রীষ্ম (জুলাই–আগস্ট): উৎসব, আউটডোর ইভেন্টে ভরা
শেষ কথা – নুরেমবার্গ হলো ইতিহাস ও সৌন্দর্যের নিখুঁত মেলবন্ধন
নুরেমবার্গ এমন শহর, যেখানে প্রতিটি মোড়ে ইতিহাসের গল্প লুকিয়ে আছে।
একদিকে দুর্গ, চার্চ, রেনেসাঁ শিল্পী ড্যুরারের রহস্যময় জগৎ—
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গভীর স্মৃতি।
মধ্যযুগীয় সৌন্দর্য আর আধুনিকতার মিশেলে নুরেমবার্গ ইউরোপ ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় শহর।












Leave a Reply