জাপানের নিক্কো (Nikkō) : জাপানের রহস্যময় প্রকৃতি ও পবিত্র মন্দিরের শান্ত শহর।

জাপানের তোচিগি প্রিফেকচারে অবস্থিত নিক্কো এমন এক শান্ত ও অতুলনীয় সৌন্দর্যের শহর, যেখানে প্রকৃতির নীরবতা আর প্রাচীন জাপানি ঐতিহ্য একে অপরকে পরিপূর্ণ করে। টোকিও থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই শহরটি ইতিহাস, ধর্ম, প্রকৃতি এবং সংস্কৃতির বিস্ময়কর মিলনস্থল। পাহাড়ঘেরা পরিবেশ, মন্দিরের আধ্যাত্মিক আবহ, ঝর্ণার কলকল শব্দ এবং চার ঋতুর সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে নিক্কো ভ্রমণ মানে জাপানের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।


নিক্কোর ইতিহাস

নিক্কোর ইতিহাস শুরু হয় ৮ম শতকে, যখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শোদো শোনিন এখানে প্রথম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে টোকুগাওয়া শোগুনাদের যুগে নিক্কো রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। জাপানের ইতিহাসের শক্তিশালী শাসক টোকুগাওয়া ইয়েয়াসু-এর সমাধিস্থল এখানেই, যা আজ UNESCO বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।


যা যা অবশ্যই ঘুরে দেখতে হবে

১. তোশোগু শ্রাইন (Toshogu Shrine)

নিক্কোর সবচেয়ে বিখ্যাত ও আকর্ষণীয় স্থাপনা।

  • টোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর সমাধি।
  • সূক্ষ্ম কাঠের খোদাই, সোনালি অলংকার এবং বিখ্যাত “See no evil, hear no evil, speak no evil” বানরের মূর্তি এখানেই।
  • ৫-স্তরের প্যাগোডা মন্দিরটির বিশেষ আকর্ষণ।

২. রিন্নোজি মন্দির (Rinno-ji Temple)

নিক্কোর প্রাচীনতম মন্দির।

  • বৌদ্ধধর্মের তিন দেবতার বিশাল স্বর্ণমণ্ডিত মূর্তি এখানে আছে।
  • শান্ত পরিবেশ ধ্যানের জন্য আদর্শ।

৩. ফুটারাসান শ্রাইন (Futarasan Shrine)

১০০০ বছরেরও বেশি পুরনো শিন্টো মন্দির।

  • পবিত্র পর্বত এবং প্রকৃতি সম্পর্কিত বিশ্বাস এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
  • আশেপাশের বনাঞ্চল অপূর্ব।

৪. নিক্কো ন্যাশনাল পার্ক

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গরাজ্য।

  • ঘন বন, পাহাড়, নদী, উঁচু পাহাড়ি পথ—সবই একসাথে।
  • বসন্তে ফুল, শরতে লাল পাতার (autumn foliage) সৌন্দর্য অপরূপ।

৫. কেগন জলপ্রপাত (Kegon Falls)

জাপানের সেরা তিনটি জলপ্রপাতের একটি।

  • উচ্চতা প্রায় ৯৭ মিটার।
  • এলিভেটর দিয়ে নিচে নেমে কাছ থেকে জলপ্রপাত দেখা যায়।

৬. চুজেনজি লেক (Lake Chuzenji)

নান্টাই পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত লেকটি একটি আদর্শ রোমান্টিক এবং শান্তিপূর্ণ স্থান।

  • নৌকাভ্রমণ, হাইকিং, ফটোগ্রাফি—সবকিছুর জন্য উপযুক্ত।

৭. ইরোহাজাকা রোড (Irohazaka Road)

৪৮টি বাঁক নিয়ে এই পাহাড়ি রাস্তা এডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য দারুণ আকর্ষণ।

  • শরৎকালে লাল-হলুদ পাতার সৌন্দর্য চোখ জুড়িয়ে যায়।

ঋতু অনুযায়ী নিক্কোর সৌন্দর্য

বসন্ত (মার্চ–মে)

চেরি ব্লসমের সৌন্দর্যে নিক্কো নতুন প্রাণ পায়। আবহাওয়া আরামদায়ক।

গ্রীষ্ম (জুন–আগস্ট)

পাহাড়ি আবহাওয়া ঠান্ডা, তাই টোকিওর গরম থেকে বাঁচতে পর্যটকেরা এখানে ভিড় করেন।

শরৎ (সেপ্টেম্বর–নভেম্বর)

নিক্কোর সবচেয়ে সুন্দর সময়।

  • লাল, কমলা ও হলুদ পাতার (Koyo) রূপ লাগবে মন কেড়ে।

শীত (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি)

বরফে ঢেকে যায় পাহাড় ও মন্দির এলাকা।

  • নিক্কো তখন রূপকথার মতো সাদা রাজ্যে পরিণত হয়।

নিক্কোর খাবার ও কেনাকাটা

  • ইউবা (Yuba): সয়া দুধের পাতলা স্তর দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবার।
  • সoba নুডলস: পাহাড়ি জলের কারণে বিশেষ স্বাদ।
  • নিক্কো কাঠের কারুকাজল্যাকারের সামগ্রী স্যুভেনিয়ার হিসেবে জনপ্রিয়।
  • কোকুসাই-দোরি মার্কেটে হস্তশিল্প, মিষ্টি, গিফট কিনতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন?

টোকিও → নিক্কো

  • JR ট্রেনে: প্রায় ২ ঘণ্টা
  • Tobu Railway: সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয়
  • বাস বা গাড়িতে: ২–২.৫ ঘণ্টা

নিক্কোর ভেতরে ঘোরার জন্য বাস, ট্যাক্সি বা হাঁটা খুবই সুবিধাজনক।


শেষকথা

প্রাকৃতিক শান্তি, ইতিহাসের গভীরতা এবং আধ্যাত্মিক জাপানের নিঃশব্দ অনুভূতি মিলিয়ে নিক্কো এক অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। ব্যস্ত শহুরে টোকিওর বাইরে এসে নিক্কোর মন্দির, জলপ্রপাত, পাহাড় ও লেক আপনাকে অন্য জগতের অনুভূতি দেবে—যেখানে সময় ধীরে চলে, মন শান্ত হয়, আর প্রকৃতি আপনাকে আলিঙ্গন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *