
নুবিয়ার মরুভূমির বুকে, নীল নদের তীরে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মিশরের আরেক বিস্ময়—আবু সিম্বেল টেম্পল। ফেরাউন রামেসিস II-এর অদম্য শক্তি, শিল্পদক্ষতা ও স্থাপত্যকৌশলের এক প্রাণবন্ত নিদর্শন এটি। মরুভূমির নিস্তব্ধতার মাঝে সুউচ্চ পাথুরে পাহাড় কেটে নির্মিত এই মন্দির যেন রোদে ঝলমলে সোনালি পিরামিডের মতো চোখে পড়ে দূর থেকেই।
এখানে এসে মনে হয়—
ইতিহাস, শিল্প, পুরাণ আর প্রকৃতির এক অতুলনীয় মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে আছি।
আবু সিম্বেলের ইতিহাস—এক ফেরাউনের গৌরবকাব্য
খ্রিস্টপূর্ব ১৩শ শতকে ফেরাউন রামেসিস II তাঁর সামরিক বিজয়, দেবতা আমুনের প্রতি ভক্তি এবং নিজের শক্তি প্রকাশের উদ্দেশ্যে আবু সিম্বেল নির্মাণ করেন।
মন্দিরটি দুটি ভাগে বিভক্ত—
১️⃣ বৃহৎ মন্দির – রামেসিস II-কে উৎসর্গ
এটি আবু সিম্বেলের প্রধান আকর্ষণ, যেখানে চারটি বিশাল আসীন মূর্তি পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা। প্রতিটি মূর্তির উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার! সূর্য ওঠার সময় এই মূর্তিগুলোতে যে আলোর খেলা হয় তা এক অনুপম দৃশ্য।
২️⃣ ক্ষুদ্র মন্দির – রানি নেফারতারিকে উৎসর্গ
রামেসিস II তাঁর প্রিয় রানি নেফারতারি-র জন্যও দ্বিতীয় মন্দির তৈরি করেছিলেন। এখানে রানির মূর্তিকে ফেরাউনের সমান উচ্চতায় খোদাই করা হয়েছে—যা প্রাচীন মিশরে ছিল এক অসাধারণ সম্মান।
বিস্ময়কর সূর্য-অভিসার—বিজ্ঞান আর ধর্মের নিখুঁত মেলবন্ধন
আবু সিম্বেলের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো—
বছরে দুই দিন (২২ ফেব্রুয়ারি ও ২২ অক্টোবর)
সকালবেলার সূর্যের আলো মন্দিরের গভীর চেম্বার পর্যন্ত পৌঁছে রামেসিস II, আমুন ও রা-হারাখতি-র মূর্তিকে আলোকিত করে।
এই মুহূর্তকে বলা হয় Solar Alignment Festival, যা দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন।
এটি প্রাচীন মিশরীয় স্থাপত্যকলার অপরূপ বিজ্ঞানভিত্তিক দক্ষতার প্রমাণ।
আবু সিম্বেল—একবার বাঁচানো হলো, পুরো বিশ্বকে অবাক করে
১৯৬০-এর দশকে যখন নীল নদের ওপর আসওয়ান হাই ড্যাম নির্মাণ করা হচ্ছিল, তখন আশঙ্কা করা হয়—
আবু সিম্বেল চিরতরে পানির নিচে তলিয়ে যাবে।
ইউনেস্কোর উদ্যোগে ৫০ টিরও বেশি দেশের সহায়তায় টেম্পলটিকে সম্পূর্ণ কেটে টুকরো টুকরো করে ৬৫ মিটার উঁচুতে ও ২০০ মিটার দূরে সরিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্ধার প্রকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
মন্দিরে প্রবেশ—যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়
১. বিশাল দ্বারপ্রান্তের চারটি মহাকায় মূর্তি
দূর থেকেই মরুভূমির উজ্জ্বল রোদে এগুলো মনে হয় পাথরের পাহাড়। প্রতিটি মূর্তি রামেসিসের ক্ষমতার প্রতীক।
২. অভ্যন্তরীণ স্তম্ভশালা
ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় রামেসিসের সামরিক বিজয়ের দৃশ্য—কাদেশ যুদ্ধে তাঁর শৌর্যের কাহিনি পাথরে খোদাই করা।
৩. পবিত্র মূর্তির চেম্বার
রামেসিস II ও দেবতাদের আসনে সূর্যের যে আলো প্রতি বছরে দুই দিন এসে পড়ে—এ অংশই তার কেন্দ্র।
৪. নেফারতারির মন্দির
এখানে দেবী হাতোরের প্রতীকী গরুর শিঙসহ মূর্তি আর দেয়ালে নেফারতারির রূপায়ণ দেখে পুরনো প্রেমের কাহিনি ভেসে ওঠে মনে।
কীভাবে যাবেন আবু সিম্বেল?
✔ আসওয়ান থেকে
- বাস — ৩ থেকে ৪ ঘন্টা
- প্রাইভেট কার — ৩ ঘন্টা
- বিমান — ৩০ মিনিট (সবচেয়ে দ্রুত)
✔ কায়রো থেকে
- কায়রো → আসওয়ান (বিমান) → আবু সিম্বেল
সেরা সময়
অক্টোবর – মার্চ: আবহাওয়া ঠাণ্ডা ও সুখকর।
২২ ফেব্রুয়ারি ও ২২ অক্টোবর: Solar Festival দেখার জন্য আদর্শ।
ভ্রমণকারীদের কিছু টিপস
- গরম এড়াতে সকালে বা বিকেলে পৌঁছান।
- ভেতরে ছবি তোলা কিছু অংশে নিষিদ্ধ—স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন।
- পানি ও সানস্ক্রিন অবশ্যই রাখুন, কারণ মরুভূমির পরিবেশ খুব শুষ্ক।
শেষকথা
আবু সিম্বেল হচ্ছে শুধু স্থাপত্য নয়—এ হলো ফেরাউনদের ক্ষমতা, মানবশক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা ও শিল্পকলার মহাকাব্য।
নীল নদের ঢেউ আর মরুভূমির বাতাসের মধ্যে দাঁড়ানো এই মন্দিরে গেলে মনে হয়—












Leave a Reply