পুকুরের জলে দেখা আকাশ।।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। গ্রামের চারপাশে হালকা কুয়াশা। পাখির ডাকের সঙ্গে দূরে কোথাও মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছে।

মাধবপুর গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি বড় পুকুর।

পুকুরটির নাম রায়পুকুর

একসময় এই পুকুরে সারাবছর জল থাকত। গ্রামের মানুষ স্নান করত, মাছ ধরত, গরু জল খেত। বর্ষার জল জমিয়ে রাখার কারণে গরমকালেও পুকুরটি শুকিয়ে যেত না।

কিন্তু বছর কয়েক ধরে পুকুরটি ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে আসছিল।

পাড়ের মাটি ধসে পড়ছিল।

জলজ আগাছায় পুকুরের একটা বড় অংশ ঢেকে গিয়েছিল।

অনেকে বলত,

—“আর দু-এক বছর পর পুকুরটা থাকবে না।”

কেউ গুরুত্ব দিত না।

শুধু অয়ন প্রতিদিন পুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকত।

বয়স ষোলো।

বাবা ছিলেন মাছধরার কাজের সঙ্গে যুক্ত। ছোটবেলা থেকেই অয়নের পুকুরের সঙ্গে একটা আলাদা সম্পর্ক ছিল।

তার মা বলতেন,

—“তুই ছোটবেলায় হাঁটতেও পারতিস না। তোর বাবা তোকে কোলে করে এই পুকুরের ধারে বসাত।”

অয়ন তাই পুকুরটাকে শুধু জলাশয় হিসেবে দেখত না।

তার কাছে রায়পুকুর ছিল গ্রামের স্মৃতি।


একদিন মাছ কমে গেল

এক সকালে অয়নের বাবা জাল নিয়ে পুকুরে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন,

—“আজ মাছ খুব কম।”

অয়ন জিজ্ঞেস করল,

—“কেন?”

বাবা বললেন,

—“জল কমেছে। আগাছাও বেড়েছে।”

অয়ন পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল।

সে লক্ষ্য করল, পুকুরের একপাশে প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট আর নানা আবর্জনা জমে আছে।

সে বাবাকে বলল,

—“আমরা কি এগুলো পরিষ্কার করতে পারি না?”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—“একজন মানুষ করলে কতটুকুই বা হবে?”

অয়ন বলল,

—“একজন দিয়ে শুরু করলে?”

বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।


প্রথম দিন

পরদিন অয়ন হাতে একটা বস্তা নিয়ে পুকুরের ধারে গেল।

সে প্লাস্টিক কুড়োতে শুরু করল।

প্রথমে কেউ তাকে গুরুত্ব দিল না।

একজন পথচারী বলল,

—“এই কাজ করে কী হবে?”

অয়ন হাসল।

—“দেখি।”

দুই ঘণ্টায় সে তিন বস্তা প্লাস্টিক তুলল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তার মা বললেন,

—“আজ কী করলি?”

অয়ন বলল,

—“পুকুর পরিষ্কার করেছি।”

মা হাসলেন।

—“একদিনে পুকুর পরিষ্কার হবে?”

অয়ন বলল,

—“একদিনে না। প্রতিদিন একটু করে।”


বন্ধুরা যোগ দিল

পরদিন অয়নের বন্ধু রাকিব এল।

—“কাল তোকে দেখেছি।”

—“তাহলে?”

—“আমিও আসব।”

তারপর এল মিতুল।

তারপর পিউ।

তারপর আরও কয়েকজন।

এক সপ্তাহের মধ্যে দশ-বারোজন ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন বিকেলে পুকুরের পাড় পরিষ্কার করতে শুরু করল।

গ্রামের কয়েকজন বড় মানুষও এবার এগিয়ে এলেন।

কেউ বাঁশ দিল।

কেউ দড়ি দিল।

কেউ বস্তা দিল।

কেউ বলল,

—“আমরাও রবিবার আসব।”

অয়ন বুঝল—

মানুষকে শুধু কথা দিয়ে নয়, কাজ দেখিয়েও সঙ্গে নেওয়া যায়।


শুধু পরিষ্কার করলেই হবে না

পুকুর পরিষ্কার হওয়ার পর অয়ন বুঝল, আসল সমস্যা আরও বড়।

বর্ষায় গ্রামের নোংরা জল সরাসরি পুকুরে এসে পড়ে।

পাড়ের মাটি বৃষ্টিতে ধুয়ে পুকুরে চলে আসে।

ফলে পুকুর ক্রমশ ভরাট হচ্ছে।

অয়ন স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে গেল।

শিক্ষক বললেন,

—“তাহলে শুধু আবর্জনা পরিষ্কার করলে হবে না। জল ঢোকার পথটাও ঠিক করতে হবে।”

অয়ন বলল,

—“কীভাবে?”

শিক্ষক একটা খাতা বের করে বললেন,

—“চলো, আগে পুরো এলাকার একটা মানচিত্র বানাই।”


মানচিত্রের কাজ

অয়ন ও তার বন্ধুরা গ্রামের চারপাশ ঘুরে দেখল।

কোথা দিয়ে বৃষ্টির জল আসে?

কোথায় জমে?

কোথা দিয়ে পুকুরে ঢোকে?

কোথায় আবর্জনা পড়ে?

সবকিছু চিহ্নিত করা হল।

তারপর তারা একটি ছোট পরিকল্পনা তৈরি করল।

পুকুরের পাড়ে গাছ লাগানো হবে।

জল ঢোকার আগে মাটি ও আবর্জনা আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

প্লাস্টিক ফেলার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা হবে।

পাড়ে অপ্রয়োজনীয় মাটি ফেলা বন্ধ করা হবে।

গ্রামের মানুষকে বোঝানো হবে—পুকুরে আবর্জনা ফেলা যাবে না।

পরিকল্পনাটি নিয়ে তারা পঞ্চায়েত ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গেল।


প্রথম বাধা

সবাই একমত হল না।

একজন বললেন,

—“ছেলেপেলেরা এসব কী বোঝে?”

অয়ন চুপ করে রইল।

তার বিজ্ঞান শিক্ষক বললেন,

—“ওরা সব জানে না। কিন্তু সমস্যা দেখে প্রশ্ন করতে শিখেছে। এখন বড়দের কাজ ওদের সঠিকভাবে সাহায্য করা।”

কথাটা কাজে লাগল।

কয়েকজন প্রবীণ মানুষও এগিয়ে এলেন।

তারা বললেন,

—“এই পুকুর আমাদের বাবাদের সময়েও ছিল। এটাকে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।”


বর্ষার পরীক্ষা

বর্ষা এল।

প্রথম কয়েকদিন ভালোই বৃষ্টি হল।

এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হল।

অয়ন চিন্তায় ছিল।

সে ভোরে পুকুরের কাছে ছুটে গেল।

দেখল, পুকুরের জল অনেক বেড়েছে।

কিন্তু জল সরাসরি আবর্জনা নিয়ে পুকুরে ঢুকছে না।

আগে তৈরি করা ছোট জলছাঁকনি অংশে মাটি ও প্লাস্টিক আটকে গেছে।

অয়ন আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“কাজ হয়েছে!”

তার বন্ধু রাকিব বলল,

—“সত্যি!”

অয়ন পুকুরের জলে তাকাল।

মেঘলা আকাশের প্রতিচ্ছবি জলের ওপর পড়েছে।

সে মনে মনে বলল,

“পুকুরটাকে বাঁচানো মানে শুধু জল বাঁচানো নয়। গ্রামের একটা ভবিষ্যৎ বাঁচানো।”


বছর ঘুরে গেল

পরের এক বছরে রায়পুকুরের চেহারা বদলে গেল।

পাড়ে গাছ লাগানো হল।

নিয়মিত পরিষ্কার করা হল।

পুকুরে আবর্জনা ফেলার প্রবণতা কমল।

জল ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ল।

মাছও বাড়তে শুরু করল।

অয়নের বাবা একদিন জাল তুলে এনে বললেন,

—“আজ অনেক মাছ।”

অয়ন হেসে বলল,

—“পুকুরটা বাঁচছে বলেই।”

বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তুই ছোটবেলায় এখানে বসে আকাশ দেখতিস। এখন বুঝলাম, তুই শুধু আকাশ দেখিসনি। আকাশটাকে ধরে রাখার জায়গাটাকেও দেখেছিস।”


একটি নতুন স্বপ্ন

রায়পুকুরের কাজ শেষ হওয়ার পর অয়ন থামল না।

সে গ্রামের আরও দুটি ছোট পুকুরের কাজ শুরু করল।

তারপর স্কুলে একটি পরিবেশ ক্লাব তৈরি হল।

নাম দেওয়া হল—

“আমাদের জল, আমাদের দায়িত্ব”

প্রতি মাসে ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের জলাশয়গুলোর অবস্থা পরীক্ষা করত।

কোথায় জল কমছে?

কোথায় আবর্জনা জমছে?

কোথায় গাছ লাগানো দরকার?

সবকিছু নথিভুক্ত করা হত।

একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক অয়নকে বললেন,

—“তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”

অয়ন একটু ভেবে বলল,

—“জানি না। কিন্তু যেখানে থাকব, সেখানকার জল আর মাটির ক্ষতি হতে দেব না।”

শিক্ষক বললেন,

—“এই চিন্তাটাই তোমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।”


শেষ দৃশ্য

অনেক বছর পরে অয়ন শহরে পড়াশোনা শেষ করে আবার নিজের গ্রামে ফিরে এল।

রায়পুকুর তখন আরও সুন্দর।

পাড়ে বড় বড় গাছ।

জলে মাছের খেলা।

সকালে মানুষ হাঁটতে আসে।

ছোটরা পাড়ে বসে বই পড়ে।

এক বিকেলে অয়ন সেই পুরোনো জায়গায় এসে দাঁড়াল।

পুকুরের জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি পড়েছে।

তার ছোটবেলার বন্ধু রাকিব পাশে এসে বলল,

—“মনে আছে? এখান থেকেই শুরু করেছিলি।”

অয়ন হেসে বলল,

—“আমি একা শুরু করিনি।”

—“তাহলে?”

অয়ন পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“একটা প্রশ্ন শুরু করেছিল। তারপর অনেক মানুষ উত্তর খুঁজতে নেমেছিল।”

দু’জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে নেমে যাচ্ছে।

পুকুরের জলে সেই আলো কাঁপছে।

অয়ন মনে মনে ভাবল—

জলকে আমরা শুধু ব্যবহার করি না। জল আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে।

আর সেই দিন থেকে গ্রামের শিশুরা রায়পুকুরের পাড়ে একটি কথা লিখে রেখেছিল—

“আজ যে জল বাঁচাব, আগামীকাল সেই জলই আমাদের বাঁচাবে।”

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *