
রাত তখন ১২টা ৪৫।
অফিসের শেষ কর্মী হিসেবে নীহারিকা সতেরো তলা থেকে লিফটে উঠল। পুরো বিল্ডিং প্রায় ফাঁকা। নিচের নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া আর কাউকে সে দেখতে পাচ্ছিল না।
লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক দৌড়ে এসে ভেতরে ঢুকলেন।
— একটু দাঁড়াবেন মা?
নীহারিকা দরজা আটকে দিল।
বৃদ্ধ লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
— নিচতলা।
লিফট নামতে শুরু করল।
দুই তলা…
এক তলা…
হঠাৎ লিফট থেমে গেল।
আলো নিভে গেল।
নীহারিকা আতঙ্কিত হয়ে বলল,
— কী হলো?
বৃদ্ধ লোকটি শান্ত গলায় বললেন,
— ভয় পাবেন না।
কয়েক সেকেন্ড পর জরুরি আলো জ্বলে উঠল।
নীহারিকা ইন্টারকম চাপল।
কোনো উত্তর নেই।
বৃদ্ধ লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো ঘড়ি বের করে দেখলেন।
— আর দশ মিনিট।
— কীসের দশ মিনিট?
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।
নীহারিকা আবার ইন্টারকম চাপল।
এবার ওপাশ থেকে নিরাপত্তারক্ষীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— ম্যাডাম, লিফটটা মাঝপথে আটকে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার আসছে।
নীহারিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু হঠাৎ বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
— আপনি কি জানেন, এই লিফটে আগে একজন মারা গিয়েছিল?
নীহারিকার মুখ শুকিয়ে গেল।
— কী বলছেন?
— প্রায় কুড়ি বছর আগে। রাতের শিফটের একজন কর্মচারী। লিফটের দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়ায় সে নিচে পড়ে যায়।
— আপনি সেটা জানেন কীভাবে?
বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কারণ সেদিন আমি তার সঙ্গে ছিলাম।
নীহারিকা চুপ করে গেল।
তারপর বৃদ্ধ বললেন,
— তার নাম ছিল নীলয়।
লিফটের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইল।
নীহারিকা নিজের হাত জড়িয়ে ধরল।
— আপনি কি নীলয়কে চিনতেন?
— খুব ভালোভাবে।
— তাহলে আপনি…?
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— আমি তার বাবা।
ঠিক তখন লিফটের আলো আবার নিভে গেল।
অন্ধকারে বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল,
— আজ তার মৃত্যুর কুড়ি বছর পূর্ণ হলো।
নীহারিকা আতঙ্কে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।
হঠাৎ লিফটের ভেতর থেকে আরেকটি শব্দ ভেসে এল।
টুপ…
টুপ…
যেন কারও জুতোর শব্দ।
কিন্তু সেখানে তো দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই!
নীহারিকা কাঁপা গলায় বলল,
— আপনি শুনছেন?
বৃদ্ধ বললেন,
— হ্যাঁ।
শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল।
তারপর লিফটের মেঝেতে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র পড়ে গেল।
নীহারিকা টর্চ জ্বালিয়ে দেখল—
“নীলয় দত্ত — রাত্রিকালীন কর্মী।”
কার্ডটির তারিখ কুড়ি বছর আগের।
বৃদ্ধ সেটি হাতে তুলে নিলেন।
তার চোখে জল।
— আমি প্রতিটি বছর এই দিনে এখানে আসি। কিন্তু আজ প্রথমবার লিফটে আটকে গেলাম।
হঠাৎ ইন্টারকম বেজে উঠল।
নিরাপত্তারক্ষী বললেন,
— লিফট ঠিক হয়ে গেছে। দরজা খুলছে।
দরজা খুলতেই নিচে কেউ ছিল না।
শুধু নিরাপত্তারক্ষী দৌড়ে এসে বলল,
— ম্যাডাম, আপনি একাই ছিলেন?
নীহারিকা অবাক হয়ে বলল,
— না! এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক…
সে পিছনে তাকাল।
লিফটের ভেতর কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে সেই পুরোনো পরিচয়পত্র।
নীহারিকার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে নিরাপত্তারক্ষীকে সব বলল।
লোকটি পরিচয়পত্র দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
— এটা নীলয় দত্তের।
— আপনি তাকে চিনতেন?
— আমার বাবা তাকে চিনতেন। শুনেছি, নীলয়বাবুর বাবা প্রতি বছর এই দিনে এখানে আসতেন।
নীহারিকা চারদিকে তাকাল।
— উনি কোথায় গেলেন?
নিরাপত্তারক্ষী ধীরে বলল,
— ম্যাডাম… নীলয়বাবুর বাবা তো বারো বছর আগেই মারা গেছেন।
নীহারিকা কোনো কথা বলতে পারল না।
পরদিন সকালে বিল্ডিংয়ের পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে গিয়ে সে একটি ছবি পেল।
ছবিতে তরুণ নীলয় দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার পাশে।
ছবির পেছনে লেখা—
“ছেলের সঙ্গে শেষ রাতের ডিউটি।”
নীহারিকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝল, আগের রাতের বৃদ্ধটি হয়তো সত্যিই এসেছিলেন।
ছেলেকে শেষবার দেখতে।
কুড়ি বছর আগে যে লিফট তাকে ছেলের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই লিফটেই ফিরে এসে তিনি যেন নিজের অপেক্ষাটুকু শেষ করেছিলেন।
সেদিন থেকে নীহারিকা আর কখনো মধ্যরাতে লিফটে একা ওঠেনি।
তবে বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তারক্ষীরা এখনও বলে—
কুড়ি বছর ধরে বন্ধ থাকা পুরোনো লিফটটি মাঝরাতে কখনো কখনো নিজে থেকেই এক তলায় থামে।
দরজা খুলে যায়।
ভেতরে কেউ থাকে না।
শুধু মেঝেতে পড়ে থাকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র।
নীলয় দত্ত।












Leave a Reply