
চলচ্চিত্রে আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয় দেখি, সংলাপ শুনি, ক্যামেরার কাজ দেখি। কিন্তু পর্দায় কোনও চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নীরবে কাজ করে—তার পোশাক।
একজন মানুষ কী ধরনের পোশাক পরছেন, তার রং কেমন, কাপড়ের ধরন কী, পোশাকটি কোন সময়ের—এসবের মধ্য দিয়েও চরিত্রের পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, সময়কাল এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই পোশাক-নকশাকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পে পরিণত করার ক্ষেত্রে যে কয়েকজন শিল্পী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভানু আথাইয়া।
তিনি শুধু চলচ্চিত্রের পোশাক তৈরি করেননি। ভারতীয় পোশাক, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে এমন এক সৃজনশীল জগৎ তৈরি করেছিলেন, যার স্বীকৃতি এসেছিল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র পুরস্কার—অস্কারের মাধ্যমে।
১৯৮৩ সালের ৫৫তম Academy Awards-এ Gandhi চলচ্চিত্রের জন্য John Mollo ও Bhanu Athaiya যৌথভাবে Costume Design-এর পুরস্কার পান।
শিল্পের পরিবেশে বেড়ে ওঠা
ভানু আথাইয়ার জন্ম ২৮ এপ্রিল ১৯২৯ সালে মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে।
তাঁর পরিবারে শিল্প ও সংস্কৃতির পরিবেশ ছিল। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা এবং শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি চিত্রকলার শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং মুম্বইয়ের Sir J. J. School of Art-এ পড়াশোনা করেন।
তাঁর প্রতিভা খুব দ্রুত নজরে আসে।
চিত্রশিল্পী হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তিনি ফ্যাশন ও পোশাকের নকশার প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
এই আগ্রহই পরবর্তীকালে তাঁকে চলচ্চিত্রের জগতে নিয়ে যায়।
ছবি আঁকা থেকে ফ্যাশন
চলচ্চিত্রে আসার আগে ভানু আথাইয়া ফ্যাশন ইলাস্ট্রেশন এবং পোশাক নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সেই সময় ভারতে ফ্যাশন ম্যাগাজিনের জগৎও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছিল।
তাঁর আঁকা পোশাকের নকশা এবং সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে এই জগতে পরিচিত করে তোলে।
কিন্তু চলচ্চিত্রে পোশাক নকশা করা ফ্যাশন ডিজাইনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ফ্যাশনে একটি পোশাকের সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ।
চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে যুক্ত হয় চরিত্র, গল্প, সময়কাল, স্থান এবং পরিচালকের ভাবনা।
একজন ভালো চলচ্চিত্রের পোশাক-নকশাকারকে তাই একই সঙ্গে শিল্পী, গবেষক এবং গল্পের ভাষা বোঝেন এমন একজন সৃজনশীল সহযোগী হতে হয়।
ভানু আথাইয়া এই জায়গাটিই নিজের কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
চলচ্চিত্রে প্রবেশ
১৯৫০-এর দশকে ভানু আথাইয়া হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন।
সেই সময় ভারতীয় সিনেমা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল।
স্টুডিও-নির্ভর চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নতুন ধরনের গল্প, নতুন চরিত্র এবং বাস্তবধর্মী পোশাকের ব্যবহার বাড়ছিল।
ভানু আথাইয়ার কাজ এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়।
তিনি শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সুন্দর পোশাক পরানোর কথা ভাবতেন না।
চরিত্রটি কে?
সে কোন সময়ে বাস করছে?
তার সামাজিক অবস্থান কী?
সে কী ধরনের জীবনযাপন করে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে তারপর পোশাকের নকশা তৈরি করতেন।
এভাবেই পোশাক তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল গল্প বলার একটি মাধ্যম।
ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
ভানু আথাইয়ার অন্যতম বড় শক্তি ছিল ভারতীয় পোশাক ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান।
শাড়ি, ধুতি, পাগড়ি, বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক পোশাক, অলংকার এবং ঐতিহাসিক পোশাকের ব্যবহার তিনি চলচ্চিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজিয়ে নিতেন।
একটি চরিত্রের পোশাক যেন শুধু সুন্দর না হয়, বরং সেই চরিত্রের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়—এটাই ছিল তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এই কারণে তাঁর পোশাকগুলো অনেক সময় দর্শকের কাছে আলাদা করে চোখে পড়লেও গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি।
বড় পরিচালকদের সঙ্গে কাজ
ভারতীয় চলচ্চিত্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকের সঙ্গে ভানু আথাইয়া কাজ করেছেন।
গুরু দত্তের মতো চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে তাঁর কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
Pyaasa, Kaagaz Ke Phool প্রভৃতি চলচ্চিত্রের নান্দনিক জগতের সঙ্গে পোশাকও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
পরবর্তীকালে তিনি বহু জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ করেন।
তাঁর কাজের বিস্তার ছিল ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র থেকে সমকালীন গল্প—দুই ক্ষেত্রেই।
প্রতিটি ছবির জন্য তিনি আলাদা ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করতেন।
‘Gandhi’: জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
ভানু আথাইয়ার আন্তর্জাতিক পরিচিতির সবচেয়ে বড় অধ্যায় অবশ্যই Gandhi।
Richard Attenborough পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে মহাত্মা গান্ধীর জীবন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি দীর্ঘ সময়কে পর্দায় তুলে ধরা হয়।
এই ধরনের চলচ্চিত্রে পোশাক নকশা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ।
কারণ গল্পের সময়কাল ছিল কয়েক দশক।
একই সঙ্গে চরিত্রগুলির পোশাককে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হতো।
ভারতের বিভিন্ন সামাজিক স্তর, অঞ্চল এবং সময়ের পোশাকও যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে হতো।
ভানু আথাইয়া এই বিশাল কাজের অংশ ছিলেন।
তিনি John Mollo-র সঙ্গে মিলে চলচ্চিত্রটির Costume Design করেন।
১৯৮৩ সালের Academy Awards-এ Gandhi Costume Design বিভাগে বিজয়ী হয় এবং পুরস্কারটি পান John Mollo ও Bhanu Athaiya।
অস্কারের মঞ্চে ভারতীয় পোশাক
আজ ভারতীয় শিল্পীরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কারের মঞ্চে স্বীকৃতি পান—এটি আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে।
কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেই সময় কোনও ভারতীয় শিল্পীর Academy Award জয় ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
ভানু আথাইয়ার সাফল্য তাই শুধু ব্যক্তিগত পুরস্কার ছিল না।
এটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের শিল্প-পরিকল্পনা, পোশাক এবং নকশার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
Academy-এর সরকারি নথিতে Gandhi-র Costume Design বিজয়ী হিসেবে John Mollo এবং Bhanu Athaiya-র নাম রয়েছে।
পোশাক যে শুধু পোশাক নয়
ভানু আথাইয়ার কাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।
একজন চরিত্রের পোশাক দর্শককে তার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দিতে পারে।
একজন দরিদ্র মানুষের পোশাক তার জীবনযাত্রার কথা বলতে পারে।
একজন রাজপরিবারের সদস্যের পোশাক তার সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করতে পারে।
একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর পোশাক তার সময়কে মনে করিয়ে দিতে পারে।
একজন সাধারণ গ্রামবাসীর পোশাকের কাপড়, রং ও ব্যবহার থেকেও তার পরিবেশ বোঝা যায়।
অর্থাৎ পোশাক চলচ্চিত্রে নীরব সংলাপের মতো কাজ করতে পারে।
ভানু আথাইয়া সেই নীরব ভাষাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
গবেষণার গুরুত্ব
ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রের পোশাক তৈরি করতে শুধু কল্পনা যথেষ্ট নয়।
পুরনো ছবি দেখতে হয়।
ঐতিহাসিক দলিল পড়তে হয়।
পুরনো পোশাকের নকশা বুঝতে হয়।
কোন সময়ে কোন ধরনের কাপড় ব্যবহার হতো, কোন সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষ কী পরতেন—এসব জানতে হয়।
ভানু আথাইয়ার কাজের মধ্যে এই গবেষণাধর্মী মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই কারণেই তাঁর তৈরি পোশাক শুধু ‘কস্টিউম’ হয়ে থাকেনি; অনেক ক্ষেত্রে তা চলচ্চিত্রের সময়কাল নির্মাণের অংশ হয়ে উঠেছিল।
দীর্ঘ কর্মজীবন
ভানু আথাইয়া কয়েক দশক ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন।
তাঁর কাজের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র রয়েছে।
কখনও তিনি সমকালীন শহুরে চরিত্রের পোশাক তৈরি করেছেন, আবার কখনও ঐতিহাসিক চরিত্রের জন্য পোশাক নির্মাণ করেছেন।
এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর কাজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গেও এগিয়েছে।
সাদা-কালো যুগ থেকে রঙিন সিনেমা, স্টুডিও-নির্ভর চলচ্চিত্র থেকে আন্তর্জাতিক প্রযোজনা—বদলে যাওয়া চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তাঁর কাজও পরিবর্তিত হয়েছে।
নিজের কাজের উত্তরাধিকার
জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে ভানু আথাইয়া নিজের কাজ ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করার দিকেও মন দেন।
তিনি নিজের স্মৃতি ও কর্মজীবন নিয়ে The Art of Costume Design নামে একটি বই প্রকাশ করেন।
এটি শুধু আত্মজীবনীমূলক দলিল নয়; ভারতীয় চলচ্চিত্রে পোশাক নকশার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বহু দশকের চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা একজন প্রত্যক্ষ শিল্পীর চোখ দিয়ে সেখানে ধরা পড়েছে।
শেষ জীবন
ভানু আথাইয়া দীর্ঘ কর্মজীবনের পরও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তিনি ১৫ অক্টোবর ২০২০ সালে মুম্বইয়ে মারা যান।
তাঁর মৃত্যুর পর Academy-ও তাঁকে Costume Designer হিসেবে স্মরণ করে।
কিন্তু তাঁর কাজের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে চলচ্চিত্রের পর্দায়।
যে চরিত্রগুলিকে দর্শক মনে রেখেছেন, তাদের অনেকের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নকশা করা পোশাক।
নতুন প্রজন্মের জন্য তাঁর গুরুত্ব
আজকের চলচ্চিত্রে Costume Design একটি স্বতন্ত্র পেশা।
ঐতিহাসিক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, বিজ্ঞাপন, মিউজিক ভিডিও—সব ক্ষেত্রেই পোশাক পরিকল্পনার গুরুত্ব বেড়েছে।
চরিত্রের পোশাক এখন চলচ্চিত্রের সামগ্রিক Production Design-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পেশাকে ভারতে মর্যাদা দেওয়ার পথ তৈরিতে ভানু আথাইয়ার মতো শিল্পীদের অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি দেখিয়েছিলেন, পর্দার সামনে দাঁড়ানো শিল্পীর মতো পর্দার পেছনে কাজ করা একজন ডিজাইনারের সৃজনশীলতাও একটি চলচ্চিত্রের পরিচয় তৈরি করতে পারে।
উপসংহার
ভানু আথাইয়ার গল্প কোনও সাধারণ পুরস্কার জয়ের গল্প নয়।
এটি এমন একজন শিল্পীর গল্প, যিনি পোশাককে সাজসজ্জার সীমা থেকে বের করে গল্প বলার শিল্পে পরিণত করেছিলেন।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একটি শাড়ির ভাঁজ, একটি পাগড়ির ধরন, একটি ধুতির কাপড় কিংবা একটি সাধারণ মানুষের পোশাকও ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলতে পারে।
১৯৮৩ সালে Gandhi ছবির জন্য John Mollo-র সঙ্গে তাঁর Academy Award জয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা।
কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু অস্কারের ট্রফিতে নেই।
আসল উত্তরাধিকার রয়েছে সেই ধারণায়—চলচ্চিত্রে পোশাকও একটি ভাষা।
আর সেই ভাষাকে আন্তর্জাতিক শিল্পের মর্যাদায় পৌঁছে দেওয়া ভারতীয় নারীদের মধ্যে ভানু আথাইয়ার নাম তাই বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।












Leave a Reply