মাটির পুতুলের হাসি।

শান্তিপুরের কাছাকাছি ছোট্ট একটি গ্রামের নাম ছিল চরকাঠি। গ্রামটি খুব বড় নয়। চারদিকে ধানখেত, মাঝখানে কয়েকটি পুকুর, আর গ্রামের শেষ প্রান্তে পুরোনো একটি বটগাছ।

সেই গ্রামেই থাকত মেঘলা।

বয়স মাত্র বাইশ।

ছোটবেলা থেকেই মাটির কাজ করতে ভালোবাসত সে। অন্য বাচ্চারা যখন মাঠে খেলত, মেঘলা তখন পুকুরের ধারে বসে ভেজা মাটি দিয়ে ছোট ছোট পাখি, হাতি, ঘোড়া আর মানুষের মুখ বানাত।

তার বাবা হরিপদ ছিলেন মৃৎশিল্পী।

কিন্তু সময় বদলেছিল।

প্লাস্টিকের খেলনা বাজার দখল করে নিয়েছিল। মাটির পুতুলের চাহিদা কমে গিয়েছিল।

হরিপদ প্রায়ই বলতেন,

—“এই কাজ দিয়ে আর সংসার চলে না রে মা।”

মেঘলা চুপ করে শুনত।

কিন্তু তার হাতে মাটি থাকলে সে যেন অন্য মানুষ হয়ে যেত।


একদিন শহর থেকে কয়েকজন লোক গ্রামে এল।

তারা গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে পুরোনো মাটির পুতুল কিনছিল।

মেঘলা নিজের তৈরি একটি পুতুল নিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল।

পুতুলটির নাম দিয়েছিল সে—হাসি।

পুতুলটি ছিল একটি ছোট মেয়ের।

মেয়েটির হাতে একটি বই।

লোকটি পুতুলটি হাতে নিয়ে বললেন,

—“এটা তুমি বানিয়েছ?”

—“হ্যাঁ।”

—“কী দিয়ে?”

—“মাটি দিয়ে।”

লোকটি হেসে বললেন,

—“এটা খুব সুন্দর।”

কিন্তু পুতুলটি কিনলেন না।

কারণ দাম নিয়ে মেঘলার সঙ্গে তার মত হল না।

তিনি বললেন,

—“এত দাম দিয়ে কেউ মাটির পুতুল কিনবে না।”

লোকটি চলে গেলেন।

মেঘলা পুতুলটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

তার চোখে জল।


সেদিন রাতে সে বাবাকে বলল,

—“বাবা, মাটির পুতুলের দাম কম কেন?”

হরিপদ বললেন,

—“কারণ মানুষ এখন জিনিসের দাম দেখে, সময়ের দাম দেখে না।”

—“আমরা তো অনেক সময় দিই।”

—“সেটাই তো সমস্যা। সময়ের দাম কেউ দেয় না।”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“আমি বদলাব।”

বাবা অবাক।

—“কী বদলাবি?”

—“পুতুল।”


পরের দিন থেকে মেঘলা নতুনভাবে কাজ শুরু করল।

সে শুধু পুতুল বানাল না।

পুতুলের সঙ্গে গল্প তৈরি করতে শুরু করল।

একটি পুতুলের হাতে বই।

নাম—পড়ুয়া।

একটির হাতে ছোট গাছ।

নাম—সবুজ।

একটির হাতে কলসি।

নাম—জলবতী।

একটি বৃদ্ধার পুতুল।

নাম—ঠাকুমা।

একটি কৃষকের পুতুল।

নাম—মাটির মানুষ।

প্রতিটি পুতুলের সঙ্গে ছোট্ট একটি গল্প লিখে রাখত মেঘলা।

তার ধারণা ছিল—

পুতুল শুধু খেলনা নয়। পুতুল একটি গল্পও বলতে পারে।


কিন্তু গ্রামের মানুষ হাসতে শুরু করল।

কেউ বলল,

—“পুতুল দিয়ে আবার গল্প হয় নাকি?”

কেউ বলল,

—“এসব দিয়ে সংসার চলবে?”

মেঘলা কারও কথায় থামল না।

সে বাবার পুরোনো মাটির ঘরের এক কোণে নিজের ছোট্ট কর্মশালা বানাল।

দেয়ালে সে লিখে রাখল—

“মাটি থেকে গল্প জন্মায়।”


কয়েক মাস পর গ্রামের কাছে একটি হস্তশিল্প মেলা বসবে বলে খবর এল।

মেঘলা সেখানে স্টল নেওয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু ভাড়ার টাকা ছিল না।

সে বাড়ির পুরোনো একটি পিতলের কলসি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করল।

বাবা জানতে পেরে বললেন,

—“ওটা তো আমার মায়ের দেওয়া।”

মেঘলা মাথা নিচু করে বলল,

—“জানি বাবা।”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তুই সত্যিই এই কাজটা নিয়ে এতটা সিরিয়াস?”

মেঘলা বলল,

—“আমি জানি না সফল হব কি না। কিন্তু চেষ্টা না করলে সারাজীবন মনে হবে—আমি পারতাম।”

বাবা আর কিছু বললেন না।


মেলার দিন এল।

চারদিকে আলো।

বিভিন্ন দোকান।

খাবারের গন্ধ।

মানুষের ভিড়।

মেঘলার ছোট্ট স্টলে সারি দিয়ে সাজানো মাটির পুতুল।

কিন্তু প্রথম এক ঘণ্টায় কেউ কিছু কিনল না।

দুই ঘণ্টা কেটে গেল।

একজন এসে বললেন,

—“কত?”

মেঘলা দাম বলল।

লোকটি চলে গেলেন।

তারপর আরেকজন এলেন।

সেও চলে গেল।

মেঘলার মন ভেঙে যাচ্ছিল।

তখন একটি ছোট মেয়ে তার স্টলের সামনে এসে দাঁড়াল।

মেয়েটির বয়স সাত-আট বছর।

সে বই হাতে পুতুলটি তুলে নিল।

—“এটার নাম কী?”

মেঘলা বলল,

—“পড়ুয়া।”

—“ওর হাতে বই কেন?”

—“কারণ ও পড়তে চায়।”

মেয়েটি বলল,

—“আমি ওকে কিনব।”

তার মা দাম শুনে একটু দ্বিধা করলেন।

মেঘলা বলল,

—“আপনি চাইলে গল্পটাও পড়ে দেখতে পারেন।”

সে একটি কাগজ এগিয়ে দিল।

মেয়েটির মা গল্পটি পড়লেন।

কয়েক মুহূর্ত পর তাঁর মুখে হাসি ফুটল।

তিনি পুতুলটি কিনে নিলেন।


সেই একটি বিক্রিই যেন সব বদলে দিল।

একজন ছবি তুলল।

তারপর আরেকজন।

কেউ মেঘলার গল্প শুনল।

কেউ পুতুলের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করল।

বিকেল হতে না হতেই স্টলের সামনে ভিড়।

একজন শিক্ষক এসে দশটি পুতুল কিনলেন।

তিনি বললেন,

—“স্কুলে বাচ্চাদের গল্প বলার কাজে এগুলো ব্যবহার করব।”

মেঘলার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।


মেলা শেষ হওয়ার পর মেঘলার কাছে অর্ডার আসতে শুরু করল।

শুধু তার নিজের জন্য নয়।

গ্রামের আরও কয়েকজন মৃৎশিল্পীর কাছেও কাজ পৌঁছাতে লাগল।

মেঘলা তাদের বলল,

—“আমরা সবাই মিলে কাজ করি।”

হরিপদ অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

একদিন তিনি বললেন,

—“তুই শুধু নিজের কাজ বাঁচাসনি মা। আমাদের কাজটাকেও বাঁচিয়েছিস।”

মেঘলা হেসে বলল,

—“মাটি তো আমাদের সবার।”


কয়েক বছর পর চরকাঠির মাটির পুতুল গ্রামের বাইরেও পরিচিত হয়ে উঠল।

মেঘলা গ্রামের মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করল।

কেউ মাটি প্রস্তুত করত।

কেউ পুতুল বানাত।

কেউ রং করত।

কেউ গল্প লিখত।

কেউ প্যাকেট তৈরি করত।

গ্রামের বহু বাড়িতে নতুন করে আয় শুরু হল।

যে কাজ একসময় মানুষ ছেড়ে দিতে বসেছিল, সেই কাজই আবার নতুন রূপ পেল।


একদিন শহরের একটি অনুষ্ঠানে মেঘলাকে সম্মান জানানো হল।

মঞ্চে উঠে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল,

—“আপনি কীভাবে এই কাজকে সফল করলেন?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“আমি মাটির কোনো নতুন ক্ষমতা আবিষ্কার করিনি। আমি শুধু বুঝেছি, পুরোনো জিনিসকে নতুন গল্পে বলা যায়।”

অনুষ্ঠানের পর একজন সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“আপনার সবচেয়ে প্রিয় পুতুল কোনটি?”

মেঘলা মৃদু হেসে বলল,

—“হাসি।”

—“কেন?”

—“কারণ ওর হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কোনো দামি জিনিস নেই। শুধু একটা বই আছে।”


সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মেঘলা তার পুরোনো কর্মশালায় ঢুকল।

দেয়ালে এখনও সেই লেখা—

“মাটি থেকে গল্প জন্মায়।”

কিন্তু তার নিচে নতুন একটি বাক্য যোগ হয়েছে—

“আর গল্প মানুষকে বদলাতে পারে।”

বাইরে তখন গ্রামের কয়েকটি শিশু খেলছে।

একটি ছোট ছেলে হাতে মাটির ঘোড়া নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে।

একটি মেয়ে তার নতুন পুতুলকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে।

মেঘলা দরজায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

তার বাবা পাশে এসে বললেন,

—“মা, মনে আছে? একদিন বলেছিলাম মাটির কাজ দিয়ে আর সংসার চলে না।”

মেঘলা হেসে বলল,

—“আপনি ভুল বলেননি বাবা।”

হরিপদ অবাক হয়ে তাকালেন।

মেঘলা বলল,

—“তখনকার মতো করে করলে হয়তো চলত না। কিন্তু মাটির সঙ্গে যদি নতুন স্বপ্ন মেশানো যায়, তাহলে মাটিও কথা বলে।”

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।

আর কর্মশালার তাকের ওপর সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাটির পুতুলগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল—

তারা সবাই যেন হাসছে।

কারণ তারা জানে,

যে মানুষ নিজের শিকড়কে ফেলে না দিয়ে তাকে নতুনভাবে বাঁচাতে শেখে, তার হাতে মাটি থেকেও ভবিষ্যৎ তৈরি হতে পারে।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *