
শহরের পুরোনো বাজারের পাশে একটি ছোট আবাসিক হোটেল ছিল—‘নিরালা নিবাস’। হোটেলটি খুব বেশি পুরোনো নয়, কিন্তু অদ্ভুত কারণে সন্ধ্যার পর সেখানে অতিথি কম থাকত।
হোটেলের তৃতীয় তলায় তিন নম্বর ঘরটি বছরের পর বছর বন্ধ।
কেউ ঘরটি ভাড়া নিত না।
কারণ রাত হলেই নাকি ঘরটির আলো জ্বলে উঠত।
হোটেলের নতুন ম্যানেজার অমিত এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করত না।
এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সে মোমবাতি হাতে তৃতীয় তলায় উঠল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছতেই দেখল—
তিন নম্বর ঘরের দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।
অমিত থমকে দাঁড়াল।
“ভেতরে কেউ আছে?”
কোনো উত্তর নেই।
সে দরজায় হাত রাখল।
দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ঘরের ভেতর কেউ নেই।
কিন্তু টেবিলের ওপর একটি বাতি জ্বলছে।
অমিত এগিয়ে গিয়ে বাতিটি বন্ধ করল।
ঠিক তখনই তার পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
সে দ্রুত ফিরে তাকাল।
দরজার পাশে দেওয়ালে একটি পুরোনো ক্যালেন্ডার।
তারিখটি দেখে অমিতের বুক কেঁপে উঠল।
১৭ নভেম্বর ২০০৪।
কেন এত বছর আগের ক্যালেন্ডার এখানে?
সে ঘর থেকে বেরিয়ে ম্যানেজারের অফিসে ফিরে এল।
পরদিন পুরোনো কর্মচারী নিতাইকে বিষয়টি বলতেই লোকটি মুখ নিচু করল।
“ওই ঘরের কথা জিজ্ঞেস করবেন না স্যার।”
“কেন?”
“সতেরো নভেম্বর ২০০৪-এ এখানে একজন মেয়ে মারা গিয়েছিল।”
“কীভাবে?”
“আত্মহত্যা বলা হয়েছিল।”
অমিতের সন্দেহ হল।
“মেয়েটির নাম?”
“সুচরিতা।”
“কেউ তাকে চিনত?”
“একজন সাংবাদিক ছিল। কয়েকদিন এখানে ছিল। কিছু একটা তদন্ত করছিল।”
অমিত পুরোনো রেজিস্টার বের করল।
সুচরিতার নামের পাশে লেখা ছিল—
Room 3.
তারপর একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ল।
চেক-আউটের তারিখের ঘরটি ফাঁকা।
অর্থাৎ হোটেলের নথি অনুযায়ী, সুচরিতা কখনও ঘর ছাড়েনি।
অমিত পুরোনো কাগজপত্র খুঁজতে শুরু করল।
একটি খবরের কাগজে ছোট্ট প্রতিবেদন পেল।
“স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির অর্থ সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান করতে এসে এক তরুণ সাংবাদিকের মৃত্যু।”
আরও খুঁজে সে একটি পুরোনো পেনড্রাইভ পেল।
সেটি চালু করতেই একটি অডিও ফাইল।
সুচরিতার কণ্ঠ।
“যদি আমার কিছু হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমি যে নথিগুলো পেয়েছি, সেগুলো সত্যি।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“হোটেলের তৃতীয় তলার তিন নম্বর ঘরে আমি সব প্রমাণ রেখে যাচ্ছি।”
অমিতের হাত কেঁপে উঠল।
সে সেই রাতেই ঘরে ফিরে গেল।
এবার টেবিল, বিছানা, আলমারি—সব খুঁজতে শুরু করল।
শেষে দেওয়ালের একটি কাঠের প্যানেল একটু নড়তে দেখল।
প্যানেল সরাতেই একটি ছোট খোপ।
ভেতরে কয়েকটি ফাইল।
ব্যাংকের হিসাব।
জাল নথি।
টাকার লেনদেনের তালিকা।
সবকিছু সুচরিতার তদন্তের সঙ্গে মিলে গেল।
কিন্তু অমিতের চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে।
ছবিতে হোটেলের তৎকালীন মালিকের সঙ্গে কয়েকজন ব্যবসায়ী দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের মধ্যে একজনকে অমিত চিনতে পারল।
বর্তমানে তিনি শহরের অত্যন্ত পরিচিত একজন ব্যবসায়ী।
অমিত বুঝতে পারল, এত বছর ধরে সত্যিটা চাপা পড়ে ছিল।
পরদিন সে সমস্ত নথি পুলিশের হাতে তুলে দিল।
পুরোনো মামলাটি আবার তদন্ত শুরু হল।
তদন্তে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল, সুচরিতার মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল না। তার অনুসন্ধানের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
মামলায় নতুন করে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল।
হোটেলের পুরোনো মালিকও সত্য গোপন করার অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়লেন।
কয়েক সপ্তাহ পর তিন নম্বর ঘরটি সিল করে দেওয়া হল।
সেদিন রাতে অমিত হোটেলের নিচে বসে হিসাব করছিল।
হঠাৎ নিতাই দৌড়ে এল।
“স্যার!”
“কী হয়েছে?”
“তিন নম্বর ঘরের আলো জ্বলছে।”
অমিত চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে তৃতীয় তলায় উঠল।
দরজা বন্ধ।
সে দরজা খুলল না।
শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে বলল,
“সুচরিতা, আপনার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ভেতরের বাতি নিভে গেল।
চিরদিনের জন্য।
পরদিন সকালে ঘরের দরজা খুলে দেখা গেল, টেবিলের ওপর একটি কাগজ রাখা।
কাগজটি একেবারে সাদা।
শুধু নিচে একটি বাক্য—
“সত্যকে আলোয় আনলেই অন্ধকারের কাজ শেষ হয়।”
তারপর থেকে তিন নম্বর ঘরের বাতি আর কোনোদিন জ্বলেনি।
তবে ‘নিরালা নিবাস’-এর কর্মচারীরা আজও বলেন—
সত্য প্রকাশের আগের রাতগুলোতেই শুধু ওই ঘরে আলো জ্বলত।
যেন কেউ অন্ধকার ঘরের ভেতর বসে অপেক্ষা করছিল—
কেউ একজন এসে তার গল্পটা শেষ করবে বলে।












Leave a Reply