পুতুলের মঞ্চ।

গ্রামের নাম কুসুমডাঙা।

গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি পরিত্যক্ত কমিউনিটি হল। বহু বছর ধরে সেখানে কোনও অনুষ্ঠান হয়নি। জানালার কাচ ভাঙা, দরজায় মরচে, মেঝেতে ধুলো আর ছাদের একপাশে বড় ফাটল।

লোকজন জায়গাটাকে বলত—

“পুরোনো ঘর।”

কিন্তু দশ বছরের রূপা সেই ঘরটাকে অন্য চোখে দেখত।

তার দাদু ছিলেন পুতুলনাচের শিল্পী।

ছোটবেলায় রূপা দাদুর কাছ থেকে নানা ধরনের কাঠের পুতুলের গল্প শুনত।

রাজা।

রানি।

কৃষক।

সৈনিক।

বৃদ্ধ।

বৃদ্ধা।

দাদু বলতেন,

—“পুতুলের মুখে কথা নেই। কিন্তু পুতুল মানুষকে কথা বলাতে পারে।”

রূপা তখন কথাটার মানে বুঝত না।


একদিন দাদু তাকে পুরোনো একটি বাক্স দিলেন।

বললেন,

—“এটা রেখে দিস।”

রূপা বাক্স খুলে অবাক হয়ে গেল।

ভেতরে কয়েকটি কাঠের পুতুল।

একটি রাজার।

একটি কৃষকের।

একটি মেয়ের।

আর একটি বৃদ্ধের।

রূপা জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, এগুলো দিয়ে কী হয়?”

দাদু বললেন,

—“গল্প হয়।”


কয়েকদিন পর দাদু মারা গেলেন।

বাড়ির সবাই পুরোনো জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলছিল।

রূপা পুতুলগুলো নিয়ে বসে ছিল।

তার মা বললেন,

—“ওগুলো রেখে দে। স্মৃতি হিসেবে।”

রূপা বলল,

—“শুধু বাক্সে রেখে দেব?”

মা বললেন,

—“তাহলে কী করবি?”

রূপা জানত না।

কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, দাদুর পুতুলগুলো শুধু বাক্সে বন্ধ থাকার জন্য নয়।


পরদিন সে তার বন্ধুদের ডাকল।

সুমন, মেঘ, তিতলি আর ছোট্ট বাপন।

রূপা বলল,

—“আমরা পুতুলনাচ করব।”

সবাই হেসে উঠল।

সুমন বলল,

—“আমরা পুতুল চালাব?”

রূপা বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“কিন্তু মঞ্চ কোথায়?”

রূপা দূরের পুরোনো কমিউনিটি হলটার দিকে আঙুল দেখাল।

—“ওখানে।”

সবাই চুপ হয়ে গেল।

ঘরটা দেখে বাপন বলল,

—“ওখানে ভূত আছে!”

রূপা বলল,

—“ভূত থাকলে পুতুলদের সঙ্গে ওরাও নাটক দেখবে।”

সবাই হেসে ফেলল।


পরদিন তারা ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করল।

প্রথমে ঝাড়ু।

তারপর মাকড়সার জাল।

তারপর ভাঙা কাচ সরানো।

গ্রামের কয়েকজন বড় মানুষও সাহায্য করলেন।

কেউ পুরোনো কাপড় দিলেন।

কেউ বাঁশ।

কেউ কাঠ।

একজন কাঠমিস্ত্রি বললেন,

—“মঞ্চটা আমি বানিয়ে দেব।”

রূপা অবাক।

—“কত টাকা নেবেন?”

লোকটি হেসে বললেন,

—“দাদুর পুতুলের জন্য টাকা নেব?”


দুই সপ্তাহে ঘরটা বদলে গেল।

দেওয়ালে রং করা হল।

সামনে ছোট্ট মঞ্চ।

পেছনে কাপড়ের পর্দা।

মঞ্চের ওপরে নাম লেখা হল—

“পুতুলের মঞ্চ”

প্রথম নাটকের নাম—

“হারিয়ে যাওয়া বীজ”।

রূপা নিজেই গল্প লিখল।

এক কৃষক নিজের জমির পুরোনো বীজ হারিয়ে ফেলে।

তারপর গ্রামের মানুষ একসঙ্গে খুঁজে সেই বীজ ফিরিয়ে আনে।

দাদুর পুরোনো কৃষকের পুতুলটিকে প্রধান চরিত্র করা হল।


কিন্তু সমস্যা হল—

পুতুল চালাবে কে?

রূপা পুতুল হাতে নিয়ে চেষ্টা করল।

পুতুল বারবার উল্টে গেল।

সুমনের পুতুলের হাত খুলে গেল।

তিতলির পুতুল মঞ্চের পর্দায় আটকে গেল।

সবাই হেসে গড়াগড়ি।

রূপা বলল,

—“আবার করব।”


দিনের পর দিন অনুশীলন চলল।

পুতুল কীভাবে ধরতে হয়।

কীভাবে হাঁটাতে হয়।

কীভাবে কথা বলাতে হয়।

কখন আলো কমাতে হয়।

কখন পর্দা তুলতে হয়।

সব শেখা হল।

রূপা দাদুর পুরোনো খাতা খুঁজে পেল।

সেখানে পুতুলনাচের কিছু নির্দেশ লেখা ছিল।

সে সেই নির্দেশ পড়ে আরও ভালোভাবে অনুশীলন করতে লাগল।


অবশেষে অনুষ্ঠানের দিন এল।

গ্রামের মানুষ প্রথমে খুব বেশি আগ্রহ দেখাল না।

কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই কয়েকজন শিশু এসে বসে পড়ল।

তারপর আরও কয়েকজন।

তারপর বৃদ্ধরা।

মহিলারা।

কৃষকরা।

শেষ পর্যন্ত পুরো ঘর ভরে গেল।


পর্দা উঠল।

আলো জ্বলল।

মঞ্চে এল কৃষকের পুতুল।

পেছন থেকে রূপার কণ্ঠ—

—“এই মাটি আমার। কিন্তু মাটির স্মৃতি কি আমার?”

দর্শকরা চুপ।

নাটক এগিয়ে চলল।

কৃষক হারানো বীজ খুঁজছে।

এক বৃদ্ধ সাহায্য করছে।

এক শিশু নিজের বাড়ির বাক্স থেকে পুরোনো বীজ এনে দিচ্ছে।

শেষে পুরো গ্রাম একসঙ্গে বীজ ফিরিয়ে দেয়।

পর্দা নামল।

এক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর—

হাততালি।

অনেকক্ষণ ধরে হাততালি।

রূপা পর্দার আড়াল থেকে দাদুর পুতুলটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, দাদু যেন কোথাও দাঁড়িয়ে হাসছেন।


সেদিনের পর পুতুলের মঞ্চ আর বন্ধ হয়নি।

মাসে একবার নাটক হতে লাগল।

শুধু পুতুলনাচ নয়।

গ্রামের শিশুরা নিজেরাই গল্প লিখতে শুরু করল।

কেউ নদী নিয়ে গল্প লিখল।

কেউ গাছ নিয়ে।

কেউ গ্রামের ইতিহাস নিয়ে।

কেউ বৃদ্ধ মানুষদের জীবন নিয়ে।

রূপা সবাইকে বলত,

—“গল্পের বিষয় ছোট-বড় হয় না। বলার মতো কিছু থাকলেই গল্প হয়।”


একদিন পাশের গ্রামের এক শিক্ষক এসে বললেন,

—“তোমাদের নাটক আমাদের স্কুলে দেখাবে?”

রূপা বলল,

—“অবশ্যই।”

তারপর পুতুলের দলটি স্কুলে স্কুলে যেতে শুরু করল।

শিশুরা আনন্দ পেত।

শিক্ষকরাও পুতুলনাটক ব্যবহার করে নানা বিষয় বোঝাতে শুরু করলেন।

স্বাস্থ্য।

পরিবেশ।

পড়াশোনা।

সততা।

সহযোগিতা।


একবার একটি গ্রামের মেয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

রূপারা তার গল্প নিয়ে একটি পুতুলনাটক করল।

নাটক শেষে সেই মেয়েটির মা এসে বললেন,

—“আমরা বুঝিনি, পড়াশোনাটা এত গুরুত্বপূর্ণ।”

কয়েক সপ্তাহ পর মেয়েটি আবার স্কুলে ফিরল।

রূপা বুঝল—

দাদু ঠিকই বলেছিলেন।

পুতুলের মুখে কথা নেই। কিন্তু পুতুল মানুষকে কথা বলাতে পারে।


বছর কয়েক পরে রূপা বড় হল।

পুতুলের মঞ্চ তখন গ্রামের বাইরে পরিচিত।

শহর থেকেও মানুষ আসত।

কিন্তু রূপা সেই পুরোনো কাঠের পুতুলগুলো এখনও যত্ন করে রাখত।

একদিন তার ছোট ভাই বাক্স খুলে জিজ্ঞেস করল,

—“দিদি, এই বুড়ো পুতুলটা কে?”

রূপা বলল,

—“ও আমার দাদু।”

ছেলেটি হেসে বলল,

—“সত্যি?”

রূপা বলল,

—“হ্যাঁ। কারণ ওর হাত ধরেই আমি গল্প বলতে শিখেছি।”


এক সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শেষে রূপা একা মঞ্চে বসেছিল।

হল প্রায় খালি।

মঞ্চের ওপর দাদুর পুরোনো পুতুলটি রাখা।

রূপা সেটিকে হাতে তুলে নিল।

মৃদু স্বরে বলল,

—“দাদু, তোমার গল্প শেষ হয়নি।”

বাইরে তখন গ্রামের শিশুরা হাসছে।

কেউ পরের নাটকের জন্য সংলাপ লিখছে।

কেউ নতুন পুতুল বানানোর জন্য কাঠ কাটছে।

কেউ মঞ্চ পরিষ্কার করছে।

পুরোনো পরিত্যক্ত ঘরটি এখন আর “পুরোনো ঘর” নয়।

এখন সেটি গ্রামের মানুষের গল্পের ঘর।

আর সেই ঘরের ছোট্ট মঞ্চে প্রতিবার আলো জ্বলে উঠলেই মনে হয়—

একটি পুতুল নড়ছে।

একটি গল্প জন্ম নিচ্ছে।

আর কোনো এক কোণে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ শিল্পী হয়তো মৃদু হেসে বলছেন—

“দেখলি তো? পুতুল কখনও চুপ থাকে না।”

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *