
গ্রামের নাম মহুলবনি।
গ্রামের একেবারে মাঝখানে, পুরোনো বটগাছটার পাশে ছিল একটি ছোট্ট পোস্ট অফিস।
লাল রঙের দরজা।
দেওয়ালে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সরকারি বিজ্ঞপ্তি।
এক কোণে পুরোনো কাঠের টেবিল।
আর জানালার পাশে বসতেন সুবর্ণা দেবী।
বয়স পঞ্চান্ন।
প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি ওই পোস্ট অফিসে কাজ করছেন।
গ্রামের মানুষ তাঁকে ডাকত—
“সুবর্ণাদি।”
কারও চিঠি এসেছে কি না, মানি অর্ডার এসেছে কি না, পার্সেল এসেছে কি না—সব খবর যেন তাঁর হাত দিয়েই গ্রামের বাড়িতে পৌঁছত।
কিন্তু সময় বদলে গেছে।
চিঠি কমেছে।
মানি অর্ডারের জায়গা নিয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং।
অনলাইনে পার্সেল আসে।
পোস্ট অফিসে আগের মতো ভিড় নেই।
তবু সুবর্ণাদি প্রতিদিন ঠিক সময়ে জানালা খুলতেন।
একদিন সকালে এক বৃদ্ধ এলেন।
হাতে একটি কাগজ।
তিনি বললেন,
—“দিদি, এই ঠিকানায় চিঠি যাবে?”
সুবর্ণা কাগজটি পড়লেন।
ঠিকানা শহরের।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
—“কাকে লিখেছেন?”
বৃদ্ধ বললেন,
—“ছেলেকে।”
—“ফোন করেন না?”
বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন,
—“ফোনে সব কথা বলা যায় না।”
সুবর্ণা চুপ করে রইলেন।
চিঠিটি গ্রহণ করলেন।
বৃদ্ধ যাওয়ার সময় বললেন,
—“পৌঁছবে তো?”
সুবর্ণা বললেন,
—“চিঠি পৌঁছানোর জন্যই তো পোস্ট অফিস।”
সেই কথাটা সারাদিন তাঁর মাথায় ঘুরতে লাগল।
“ফোনে সব কথা বলা যায় না।”
তিনি বুঝলেন, গ্রামের অনেক মানুষের কাছেই যোগাযোগ মানে এখনও শুধু মোবাইল নয়।
কেউ চিঠি লিখতে জানে না।
কেউ পড়তে পারে না।
কেউ আবার নিজের মনের কথা মুখে বলতে পারে না।
তাহলে পোস্ট অফিস কি শুধু চিঠি পাঠানোর জায়গা?
পরদিন সুবর্ণাদি একটি নতুন খাতা খুললেন।
খাতার নাম দিলেন—
“আমার কথা”।
তিনি গ্রামের মানুষকে বললেন,
—“যারা চিঠি লিখতে পারেন না, তারা চাইলে আমাকে বলবেন। আমি লিখে দেব।”
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করল না।
তারপর এক বৃদ্ধা এলেন।
বললেন,
—“আমার মেয়েকে লিখে দেবে?”
—“কী লিখব?”
বৃদ্ধা বললেন,
—“লিখবে, মা যেন পুজোর সময় বাড়ি আসে।”
সুবর্ণা লিখলেন।
বৃদ্ধা শুনলেন।
তারপর বললেন,
—“আর লিখো, আমি রাগ করিনি।”
সুবর্ণা থমকে গেলেন।
—“কেন?”
বৃদ্ধা বললেন,
—“তিন বছর ধরে আসেনি। সবাই ভাবে আমি রাগ করেছি। আসলে আমি অপেক্ষা করি।”
চিঠির শেষে সুবর্ণা লিখলেন—
“তোর জন্য দরজা এখনও খোলা।”
বৃদ্ধা চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন।
এরপর আরও মানুষ আসতে শুরু করল।
একজন কৃষক শহরে থাকা ছেলেকে লিখতে এলেন।
একজন মা বিদেশে থাকা মেয়েকে লিখলেন।
এক স্কুলছাত্র তার বাবাকে লিখল।
এক বিধবা মহিলা তার ভাইকে লিখলেন।
সুবর্ণাদি শুধু লিখতেন না।
চিঠি পড়েও শোনাতেন।
কারণ অনেকেই নিজের লেখা পড়তে পারতেন না।
একদিন একটি ছোট মেয়ে পোস্ট অফিসে এল।
নাম মৌ।
বয়স আট।
হাতে একটি কাগজ।
সে বলল,
—“দিদি, এটা যাবে?”
সুবর্ণা কাগজটি নিলেন।
তাতে শিশুসুলভ অক্ষরে লেখা—
“প্রিয় বাবা, তুমি কবে বাড়ি আসবে?”
সুবর্ণা জিজ্ঞেস করলেন,
—“তোমার বাবা কোথায়?”
মৌ বলল,
—“অন্য শহরে কাজ করে।”
—“ফোনে কথা হয়?”
—“হয়।”
—“তাহলে চিঠি?”
মৌ বলল,
—“ফোনে বাবা তাড়াতাড়ি কথা বলে। চিঠি পড়লে হয়তো বেশি সময় থাকবে।”
সুবর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
কয়েক সপ্তাহ পর মৌ আবার পোস্ট অফিসে এল।
তার হাতে একটি খাম।
সুবর্ণা বললেন,
—“তোমার বাবার চিঠি।”
মৌ খাম খুলল।
সে পড়তে পারছিল না।
সুবর্ণা চিঠিটি পড়ে শোনালেন।
চিঠির শেষে লেখা—
“তুই আমাকে চিঠি লিখেছিস বলে মনে হল, আমি আবার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি।”
মৌ হাসল।
সুবর্ণার চোখও ভিজে উঠল।
এভাবেই পোস্ট অফিসের জানালাটি আবার মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
কিন্তু এবার শুধু চিঠির জন্য নয়।
সুবর্ণাদি সেখানে একটি ছোট্ট পড়ার কোণ তৈরি করলেন।
পুরোনো সংবাদপত্র।
শিশুদের বই।
চাকরির বিজ্ঞপ্তি।
সরকারি ফর্ম পূরণের সাহায্য।
বয়স্কদের জন্য চিঠি লেখা।
সবকিছুর ব্যবস্থা করলেন।
একটি ছোট্ট বোর্ডে লিখলেন—
“যা বুঝতে অসুবিধা হয়, জিজ্ঞেস করুন।”
একদিন এক যুবক এল।
হাতে একটি চাকরির ফর্ম।
সে বলল,
—“দিদি, এটা পূরণ করতে পারছি না।”
সুবর্ণাদি তাকে বসালেন।
এক এক করে বুঝিয়ে দিলেন।
ফর্ম জমা পড়ল।
কয়েক মাস পর সেই যুবক চাকরি পেল।
সে এসে বলল,
—“দিদি, আপনি না থাকলে আমি ফর্মটাই পূরণ করতে পারতাম না।”
সুবর্ণাদি বললেন,
—“চাকরিটা তুমি পেয়েছ। আমি শুধু একটা জানালা খুলে দিয়েছি।”
কিন্তু একদিন খবর এল—
মহুলবনির পোস্ট অফিসটি অন্য বড় পোস্ট অফিসের সঙ্গে একীভূত করা হবে।
ছোট শাখাটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গ্রামের মানুষ চিন্তায় পড়ে গেল।
সুবর্ণাদি কিছু বললেন না।
শুধু তাঁর খাতাটা খুলে বসলেন।
“আমার কথা” খাতায় তখন শত শত মানুষের নাম।
কেউ চিঠি লিখেছে।
কেউ পড়তে এসেছে।
কেউ ফর্ম পূরণ করেছে।
কেউ পার্সেল পাঠিয়েছে।
কেউ নিজের জীবনের কথা বলেছে।
তিনি বুঝলেন—
এই পোস্ট অফিসের মূল্য শুধু ডাক বিভাগের হিসাবের খাতায় মাপা যাবে না।
গ্রামের মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ নিল।
সবাই মিলে একটি আবেদন তৈরি করল।
স্কুলের শিক্ষক স্বাক্ষর করলেন।
কৃষকরা স্বাক্ষর করলেন।
মহিলারা স্বাক্ষর করলেন।
যুবকেরা স্বাক্ষর করল।
মৌও নিজের ছোট্ট হাতের ছাপ দিল।
সুবর্ণাদি আবেদনটি পাঠিয়ে দিলেন।
কয়েক মাস পরে খবর এল—
পোস্ট অফিস বন্ধ হচ্ছে না।
শাখাটি থাকবে।
গ্রামের মানুষ আনন্দে ভরে গেল।
সুবর্ণাদি শুধু হাসলেন।
মৌ দৌড়ে এসে বলল,
—“দিদি, আমাদের জানালাটা বেঁচে গেছে!”
সুবর্ণাদি বললেন,
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“কারণ এই জানালা দিয়ে শুধু চিঠি বেরোয় না। মানুষের কথা বেরিয়ে যায়।”
বছর কয়েক পর সুবর্ণাদি অবসর নিলেন।
শেষ দিন তিনি প্রতিদিনের মতো পোস্ট অফিসের জানালা খুললেন।
কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
বটগাছ।
চায়ের দোকান।
স্কুলের রাস্তা।
দূরে মাঠ।
সব একই আছে।
শুধু তিনি আর প্রতিদিন এখানে থাকবেন না।
মৌ তখন অনেক বড় হয়েছে।
সে এসে বলল,
—“দিদি, আপনি চলে গেলে কে চিঠি লিখে দেবে?”
সুবর্ণা হেসে বললেন,
—“তুই লিখবি।”
—“আমি?”
—“হ্যাঁ। অন্য কেউ না পারলে তাকে সাহায্য করবি।”
মৌ মাথা নাড়ল।
অবসরের দিন পোস্ট অফিসের দরজায় একটি ছোট ফলক লাগানো হল।
তাতে লেখা—
“এই জানালায় বহু বছর ধরে মানুষের খবরের সঙ্গে মানুষের মনও পৌঁছেছে।”
সুবর্ণাদি শেষবারের মতো নিজের চেয়ার থেকে উঠলেন।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা “আমার কথা” খাতাটি মৌয়ের হাতে তুলে দিলেন।
বললেন,
—“এটা রাখিস।”
মৌ জিজ্ঞেস করল,
—“এতে কী আছে?”
সুবর্ণাদি বললেন,
—“যেসব কথা মানুষ কাউকে বলতে পারেনি।”
মৌ খাতাটি বুকে জড়িয়ে ধরল।
বাইরে তখন ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে।
সুবর্ণাদি ধীরে ধীরে পোস্ট অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু গ্রামের মানুষ জানত—
সুবর্ণাদি চলে গেলেও সেই জানালাটা বন্ধ হবে না।
কারণ কোনো কোনো জানালা কাঠের নয়।
কোনও কোনও জানালা মানুষের হৃদয়ের দিকে খোলে।
আর সেই জানালা একবার খুলে গেলে—
তার আলো অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।












Leave a Reply