
গ্রামের নাম রঘুনাথপুর।
গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় ছিল ছোট্ট একটি টিনের ঘর। ঘরের সামনে কালো হয়ে যাওয়া কয়লা, পাশে লোহার টুকরো আর মাঝখানে একটি পুরোনো চুল্লি।
সেখানেই কাজ করতেন মাধব কর্মকার।
বয়স প্রায় ষাট।
সারাজীবন তিনি লোহা পিটিয়ে কৃষকদের জন্য কোদাল, কাস্তে, দা, লাঙলের ফলা বানিয়েছেন।
তার হাতের শক্তির জন্য পুরো এলাকায় তার নাম ছিল।
কিন্তু সময় বদলেছে।
বাজারে তৈরি যন্ত্রপাতি সহজে পাওয়া যায়।
কারখানায় তৈরি জিনিস সস্তা।
ফলে মাধবের দোকানে আগের মতো ভিড় হয় না।
তার ছেলে অনিক অবশ্য বাবার কাজ একেবারেই পছন্দ করত না।
সে শহরে গিয়ে কাজ করতে চাইত।
প্রায়ই বলত,
—“এই আগুনের সামনে বসে সারাদিন হাতুড়ি পেটানোর মধ্যে ভবিষ্যৎ কোথায় বাবা?”
মাধব শুধু হাসতেন।
—“ভবিষ্যৎ কোথায় আছে, সেটা আগুনও জানে না। মানুষকেই খুঁজে নিতে হয়।”
অনিক বাবার কথা বুঝত না।
এক বর্ষার সকালে গ্রামের কৃষক হরিপদ ছুটে এলেন।
—“মাধবদা, বিপদ হয়েছে।”
—“কী?”
—“ধান কাটার সময় এসে গেছে। আমার কাস্তেগুলো ভেঙে গেছে।”
মাধব কাস্তেগুলো হাতে নিয়ে দেখলেন।
লোহা পুরোনো।
কিন্তু তিনি বললেন,
—“দুপুরে নিয়ে যেও।”
হরিপদ বললেন,
—“আজই দরকার।”
মাধব চুল্লিতে আগুন ধরালেন।
অনিক পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
লোহার টুকরো আগুনে ঢুকল।
ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল।
মাধব সেটিকে বের করে নেহাইয়ের ওপর রাখলেন।
ঠং!
হাতুড়ির প্রথম আঘাত।
ঠং! ঠং! ঠং!
আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠল।
অনিক তাকিয়ে রইল।
বাবার হাত কাঁপছে।
কিন্তু আঘাতের জোর কমেনি।
কাস্তে তৈরি হয়ে গেলে হরিপদ হাতে নিয়ে বললেন,
—“দারুণ হয়েছে।”
মাধব বললেন,
—“এবার কাজ হবে।”
হরিপদ টাকা দিতে গেলে মাধব বললেন,
—“ফসল উঠলে দিও।”
অনিক অবাক হয়ে বলল,
—“এভাবে ব্যবসা চলে?”
মাধব বললেন,
—“কৃষকের ঘরে ফসল না উঠলে আমার টাকা দিয়ে কী হবে?”
সেদিন রাতে অনিক বাবাকে বলল,
—“তুমি সবাইকে বাকিতে কাজ করে দাও কেন?”
মাধব চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“তুই জানিস, তোর দাদার সময়ে এই গ্রামে টাকা ছিল কম। কিন্তু মানুষ একে অন্যকে চিনত বেশি।”
অনিক বলল,
—“সেই সময় আর এখন এক নয়।”
—“ঠিক।”
—“তাহলে?”
মাধব বললেন,
—“তাই পুরোনো আগুনটাকে নতুনভাবে জ্বালাতে হবে।”
অনিক বুঝল না।
কয়েকদিন পর অনিক শহরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল।
একটি কারখানায় কাজের সুযোগ পেয়েছে।
ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সে বাবাকে বলল,
—“আমি চলে যাচ্ছি।”
মাধব মাথা নাড়লেন।
—“যা।”
অনিক অবাক।
—“তুমি কিছু বলবে না?”
মাধব বললেন,
—“নিজের পথ নিজেকেই খুঁজতে হয়।”
অনিক চলে গেল।
শহরে কাজ শুরু হল।
বড় কারখানা।
বড় মেশিন।
হাজার হাজার লোহার জিনিস।
অনিকের মনে হল, বাবা যে কাজ সারাজীবন হাতে করে করেছেন, এখানে সেই কাজ কয়েক মিনিটে মেশিন করে দেয়।
কাজ কঠিন ছিল।
কিন্তু নিয়মিত বেতন ছিল।
অনিক খুশি ছিল।
তিন মাস পর একদিন বাড়ি থেকে খবর এল।
মাধব অসুস্থ।
অনিক তড়িঘড়ি গ্রামে ফিরল।
দোকানের চুল্লি ঠান্ডা।
নেহাইয়ের ওপর ধুলো।
হাতুড়ি এক কোণে পড়ে আছে।
বাবা খাটে শুয়ে।
অনিক বসে হাত ধরল।
মাধব মৃদু হাসলেন।
—“এসেছিস?”
—“হ্যাঁ।”
—“চাকরি কেমন?”
—“ভালো।”
মাধব বললেন,
—“ভালো থাকিস।”
অনিক চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“দোকানটা বন্ধ করে দেব?”
মাধব কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেন।
বললেন,
—“তুই যদি মনে করিস, দরজা বন্ধ করে দেওয়াই ঠিক…”
কথাটা শেষ করলেন না।
অনিকের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ লাগল।
পরদিন সকালে অনিক দোকানে গেল।
চুল্লির পাশে বসে রইল।
একটি পুরোনো খাতা পেল।
খাতায় বাবার হাতে লেখা হিসাব।
কার কাছ থেকে কত টাকা পাওনা।
কার জন্য কী তৈরি হয়েছে।
শেষ পাতায় একটি লাইন—
“কৃষকের যন্ত্র ঠিক থাকলে আমার আগুন জ্বলে।”
অনিক অনেকক্ষণ সেই লাইনটির দিকে তাকিয়ে থাকল।
সেদিনই একজন কৃষক এলেন।
—“মাধবদা নেই?”
অনিক বলল,
—“অসুস্থ।”
কৃষক বললেন,
—“তাহলে আমার লাঙলের ফলা একটু দেখে দেবে?”
অনিক থমকে গেল।
—“আমি?”
—“তুই তো মাধবদার ছেলে।”
অনিক লোহার ফলা হাতে নিল।
তার বাবার শেখানো কিছু কথা মনে পড়ল।
আগুনের তাপ।
লোহার রং।
হাতুড়ির আঘাত।
সে চুল্লি জ্বালাল।
প্রথমে আগুন ঠিকমতো জ্বলল না।
অনিক আবার কয়লা দিল।
ফুঁ দিল।
আগুন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠল।
লোহা গরম হল।
সে নেহাইয়ের ওপর রাখল।
হাতুড়ি তুলল।
ঠং!
একটি আঘাত।
তারপর আরেকটি।
ঠং! ঠং!
হাতুড়ির শব্দে যেন পুরো দোকানটা জেগে উঠল।
সন্ধ্যায় অনিক বাবার কাছে গেল।
মাধব চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন,
—“আজ চুল্লি জ্বলেছিল?”
অনিক হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
মাধব আর কিছু বললেন না।
শুধু চোখ বন্ধ করে মৃদু হাসলেন।
কয়েক মাস পর মাধব সুস্থ হলেন।
দোকানে ফিরে এসে দেখলেন কিছু পরিবর্তন হয়েছে।
অনিক পুরোনো নকশার পাশাপাশি নতুন ধরনের কৃষি-সরঞ্জাম তৈরি করছে।
হালকা ওজনের কোদাল।
বিভিন্ন মাপের কাস্তে।
ছোট কৃষকদের জন্য বিশেষ যন্ত্র।
আর প্রতিটি যন্ত্রের হাতলে ছোট করে লেখা—
“রঘুনাথপুর কর্মকার।”
মাধব বললেন,
—“এগুলো কে শিখিয়েছে?”
অনিক হাসল।
—“আগুন।”
অনিক পরে গ্রামের কয়েকজন তরুণকে কাজ শেখাতে শুরু করল।
কেউ লোহা কাটে।
কেউ গরম করে।
কেউ হাতল বানায়।
কেউ পালিশ করে।
একসময়ের ছোট্ট দোকানটি ধীরে ধীরে কর্মশালায় পরিণত হল।
শুধু পুরোনো কাজ নয়, নতুন নকশা ও আধুনিক পদ্ধতিও যুক্ত হল।
অনিক বলল,
—“ঐতিহ্য মানে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা নয়। ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগোনো।”
একদিন শহর থেকে একটি সংস্থা গ্রামের কারিগরদের তৈরি কৃষি-সরঞ্জাম দেখতে এল।
তারা বেশ কিছু যন্ত্র কিনল।
অনিককে বলল,
—“আপনারা চাইলে আরও বড় করে কাজ করতে পারেন।”
অনিক বাবার দিকে তাকাল।
মাধব হাসলেন।
—“এবার তুই সিদ্ধান্ত নে।”
অনিক বলল,
—“আমরা বড় হব। কিন্তু চুল্লিটা থাকবে।”
মাধব বললেন,
—“কেন?”
অনিক বলল,
—“কারণ মেশিন আমাদের কাজ দ্রুত করবে। কিন্তু এই আগুন আমাদের পরিচয়।”
বছর কয়েক পরে রঘুনাথপুরের সেই কর্মশালায় অনেক তরুণ কাজ করত।
গ্রামের কৃষকরা এখনও সেখানে যন্ত্র মেরামত করাতে আসত।
কেউ পুরোনো দা নিয়ে আসত।
কেউ লাঙলের ফলা।
কেউ নতুন কাস্তে বানাতে আসত।
দোকানের সামনে একটি কাঠের ফলক লাগানো হল—
“আগুন পুরোনো, কাজ নতুন।”
তার নিচে আরও একটি লাইন—
“হাতে তৈরি জিনিসে মানুষের হাতের গল্প থাকে।”
এক সন্ধ্যায় মাধব দোকানের বাইরে বসে ছিলেন।
অনিক চুল্লিতে আগুন দিচ্ছিল।
মাধব বললেন,
—“মনে আছে, একদিন বলেছিলি এই কাজের ভবিষ্যৎ নেই?”
অনিক হেসে বলল,
—“মনে আছে।”
—“এখন কী মনে হয়?”
অনিক কিছুক্ষণ আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আগুনের ভবিষ্যৎ নেই—এ কথা বলা যায় না। আগুনকে কী কাজে ব্যবহার করবে, সেটাই আসল।”
মাধব হেসে উঠলেন।
চুল্লির ভেতর আগুন তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
লাল লোহা নেহাইয়ের ওপর রাখা।
হাতুড়ি উঠছে।
ঠং!
ঠং!
ঠং!
সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যার গ্রামজুড়ে।
কেউ জানে না, এই শব্দের মধ্যে কত প্রজন্মের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
কিন্তু রঘুনাথপুর জানে—
যে হাত একদিন ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেই হাতই একদিন তাকে নতুন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।












Leave a Reply