
গ্রামের নাম শালবেড়িয়া। একসময় গ্রামটির চারপাশে ছিল ধানখেত, তালগাছ আর বড় বড় পুকুর। এখন অনেক কিছু বদলে গেছে। তবে গ্রামের মাঝখানে একটি জিনিস এখনও আগের মতোই আছে—একটি পুরোনো শুকনো কুয়ো।
কুয়োটির চারপাশে ইটের পাঁচিল। বহু বছর ধরে কেউ সেখানে যায় না।
গ্রামের লোকেরা বলে, মাঝরাতে সেই কুয়োর ভেতর থেকে গান শোনা যায়।
কেউ বলে, সেটা মৃত মানুষের গলা।
কেউ বলে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক মেয়ের আত্মা গান গায়।
তবে এসব কথায় বিশ্বাস করত না অয়ন।
শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে সে ঠিক করল, বিষয়টির সত্যতা নিজেই দেখবে।
এক রাতে মোবাইলের টর্চ আর একটি ছোট রেকর্ডার নিয়ে সে কুয়োর কাছে পৌঁছল।
রাত তখন প্রায় একটা।
চারপাশে নিস্তব্ধতা।
দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
অয়ন কুয়োর পাশে বসে রেকর্ডার চালু করল।
প্রথম আধঘণ্টায় কিছুই ঘটল না।
তারপর হঠাৎ—
খুব নিচু স্বরে একটি গান ভেসে এল।
“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি…”
অয়নের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
গানটি যেন কুয়োর গভীর থেকে আসছে।
সে সাহস করে কুয়োর মুখের দিকে ঝুঁকল।
গানটি আবার শোনা গেল।
এবার একটু স্পষ্ট।
অয়ন তাড়াতাড়ি রেকর্ডার বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এল।
পরদিন সকালে রেকর্ডিংটি গ্রামের বৃদ্ধ শিক্ষক হরিপদবাবুকে শোনাল।
তিনি গান শুনে চুপ করে গেলেন।
“এই গানটা কে গাইত জানেন?”
“কে?”
“মালতী।”
অয়ন নামটি আগে শোনেনি।
হরিপদবাবু বললেন,
“প্রায় চল্লিশ বছর আগে এই গ্রামে মালতী নামে একটি মেয়ে ছিল। খুব ভালো গান গাইত। বিশেষ করে ছোটদের ঘুম পাড়ানোর গান।”
“তারপর?”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“এক বর্ষার রাতে সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”
“কীভাবে?”
“কেউ জানে না।”
অয়ন কুয়োর দিকে তাকাল।
“তাহলে সবাই ধরে নিল সে মারা গেছে?”
“হ্যাঁ।”
কিন্তু অয়নের সন্দেহ হল।
সেদিন রাতে সে আবার কুয়োর কাছে গেল।
এবার সঙ্গে নিল দড়ি, টর্চ আর ক্যামেরা।
রাত বারোটার পর আবার গান শুরু হল।
কিন্তু এবার অয়ন লক্ষ্য করল—গানের সঙ্গে খুব ক্ষীণ ধাতব শব্দও হচ্ছে।
টং… টং…
যেন নিচে কোনো লোহার জিনিসে বাতাস লাগছে।
পরদিন কয়েকজন গ্রামবাসীকে নিয়ে কুয়োর মুখ পরিষ্কার করা হল।
কুয়োটি শুকনো ছিল। অনেক নিচে মাটি জমে শক্ত হয়ে গেছে।
দড়ি বেয়ে অয়ন নিচে নামল।
প্রায় দশ ফুট নিচে একটি পুরোনো লোহার বাক্স দেখতে পেল।
বাক্সটি মাটির মধ্যে অর্ধেক ঢুকে ছিল।
উপরে তুলে আনা হল সেটি।
ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো কাগজ, একটি ভাঙা হারমোনিয়ামের অংশ এবং একটি ছোট ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“মালতী।”
গ্রামের সবাই নিঃশব্দ।
ডায়েরির পাতাগুলো থেকে জানা গেল, মালতী আসলে সেদিন নিখোঁজ হয়নি।
সে গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য জানতে পেরেছিল। গ্রামের দরিদ্র মানুষের জমি জোর করে দখল করার পরিকল্পনা চলছিল।
মালতী সেই তথ্য লিখে রেখেছিল।
কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ করার আগেই তাকে ভয় দেখানো হয়।
এক রাতে সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
তারপর?
ডায়েরির শেষ কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা।
কেউ জানত না, এরপর কী হয়েছিল।
অয়ন কুয়োর দেয়ালের একটি অংশ পরীক্ষা করতে গিয়ে অদ্ভুত শব্দ পেল।
দেয়ালের পেছনে ফাঁপা জায়গা।
ইট সরাতেই একটি ছোট গোপন ঘর পাওয়া গেল।
সেখানে ছিল পুরোনো নথি।
জমির কাগজ।
নাম।
স্বাক্ষর।
সবই প্রমাণ করছিল, বহু বছর আগে গ্রামের কিছু মানুষের জমি জোর করে দখল করা হয়েছিল।
মালতী সম্ভবত সেই প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু গান?
রহস্যের উত্তর পাওয়া গেল কয়েকদিন পর।
অয়ন রাতে আবার রেকর্ডার নিয়ে বসে রইল।
গান শুরু হল।
এবার সে কুয়োর ভেতরে একটি ছোট যন্ত্র দেখতে পেল।
একটি পুরোনো ব্যাটারি চালিত অডিও ডিভাইস।
কেউ সেটি সেখানে রেখে দিয়েছিল।
অর্থাৎ ভূতের গান নয়।
কেউ ইচ্ছা করেই গান বাজাচ্ছিল।
কিন্তু কে?
অয়ন তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারল, গ্রামেরই এক বৃদ্ধা—সুবর্ণা দেবী—প্রতিদিন রাতে গোপনে সেখানে এসে যন্ত্রটি চালিয়ে যেতেন।
তিনি ছিলেন মালতীর ছোট বোন।
“আপনি এত বছর ধরে এটা করতেন কেন?”
বৃদ্ধা বললেন,
“সবাই মালতীকে ভূত বানিয়ে ফেলেছিল। আমি চেয়েছিলাম, একদিন কেউ যেন ভয় না পেয়ে সত্যিটা খুঁজতে আসে।”
“আপনি জানতেন নথিগুলো এখানে আছে?”
“হ্যাঁ। দিদি যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিল, সত্যি যেন কোনোদিন মাটির নিচে চাপা না থাকে।”
অয়ন অবাক হয়ে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে রইল।
সুবর্ণা দেবী ধীরে বললেন,
“মানুষ ভূতকে ভয় পায়। কিন্তু অন্যায়কে ভয় পাওয়া উচিত ছিল।”
কয়েক মাস পরে সেই পুরোনো জমির নথি নিয়ে তদন্ত শুরু হল।
অনেক পরিবার তাদের হারানো জমির ইতিহাস জানতে পারল।
আর কুয়োর পাশে একটি ছোট ফলক বসানো হল—
“মালতীর স্মৃতিতে—যে সত্যকে মাটির নিচে চাপা পড়তে দেয়নি।”
সেদিনের পর থেকে কুয়োর ভেতর আর কোনো গান শোনা যায়নি।
তবে গ্রামের মানুষ এখনও বলে—
কখনও কখনও গভীর রাতে বাতাসে ভেসে আসে খুব ক্ষীণ একটি সুর।
ভূতের গান নয়।
একটি অসমাপ্ত সত্যের স্মৃতি।












Leave a Reply