আলমারির শেষ ড্রয়ার।

মাধবী দেবী একা থাকতেন।

বাড়িটা ছিল গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। সামনে বড় পুকুর, পেছনে বাঁশঝাড় আর উঠোনের পাশে একটি পুরনো শিউলি গাছ।

বছর পাঁচেক আগে তাঁর স্বামী মারা গিয়েছেন।

তারপর থেকেই বাড়িটা যেন আরও বড় হয়ে গিয়েছিল।

তাঁর একমাত্র ছেলে অমিত কলকাতায় চাকরি করত। বছরে দু-একবার বাড়ি আসত। ফোনে কথা হতো, টাকা পাঠাত, ওষুধপত্রের খোঁজ নিত—কিন্তু মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করার সময় তার হয়ে উঠত না।

মাধবী দেবী কখনও অভিযোগ করতেন না।

ছেলে ফোন করলে বলতেন,

“ভালো আছিস তো?”

অমিত বলত,

“হ্যাঁ মা। তুমি ওষুধ খেয়েছ?”

“হ্যাঁ।”

তারপর দু’জনেই চুপ।

কথা শেষ।

একদিন দুপুরে অমিতের ফোন এল।

“মা, আমি কাল আসছি।”

মাধবী দেবী অবাক।

“হঠাৎ?”

“কিছু কাজ আছে। বাড়িটা বিক্রি করার কথা ভাবছি।”

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মা শুধু বললেন,

“আয়।”

পরদিন অমিত বাড়ি এল।

বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখল।

দেয়ালে শ্যাওলা ধরেছে।

ছাদের কিছু অংশ ভেঙে গেছে।

পুকুরের ঘাটও আগের মতো নেই।

অমিত বলল,

“এ বাড়ি আর রাখা সম্ভব নয় মা।”

মাধবী দেবী জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

“তুই যা ভালো বুঝিস কর।”

অমিত ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করল।

পুরনো আসবাবপত্র সরাতে গিয়ে সে মায়ের কাঠের আলমারিটা দেখতে পেল।

আলমারিটা সে ছোটবেলা থেকেই দেখছে।

তিনটি বড় ড্রয়ার।

দুটি সে খুলল।

পুরনো শাড়ি, কিছু কাগজ, বাবার চশমা।

তৃতীয় ড্রয়ারটা খুলল না।

কারণ সেটিতে তালা।

অমিত বলল,

“মা, এই ড্রয়ারে কী আছে?”

মাধবী দেবী একটু চমকে উঠলেন।

“কিছু নেই।”

“তাহলে তালা কেন?”

“পুরনো জিনিস।”

“চাবি কোথায়?”

মা উত্তর দিলেন না।

অমিত আর জিজ্ঞেস করল না।

রাতে খাওয়ার পর মাধবী দেবী হঠাৎ বললেন,

“তুই কি সত্যিই বাড়িটা বিক্রি করে দিবি?”

অমিত বলল,

“হ্যাঁ মা। এখানে তো তুমি একা থাকো। তোমাকে আমার সঙ্গে কলকাতায় নিয়ে যাব।”

মা মৃদু হেসে বললেন,

“আমি কি সেখানে মানিয়ে নিতে পারব?”

“কেন পারবে না?”

“তোর তো অফিস থাকে। বউমার কাজ থাকে। নাতনির স্কুল থাকে।”

অমিত কিছু বলল না।

মা বললেন,

“এই বাড়িতে আমি একা হলেও, আমার সময়টা একা নয়।”

অমিত বুঝতে পারল না কথাটার অর্থ।

পরদিন সকালে মাধবী দেবী তাকে আলমারির চাবিটা দিলেন।

“শেষ ড্রয়ারটা খুলে দেখ।”

অমিত চাবি ঘুরিয়ে ড্রয়ার খুলল।

ভেতরে কোনও গয়না নেই।

টাকা নেই।

কোনও গুরুত্বপূর্ণ দলিলও নেই।

শুধু একগুচ্ছ চিঠি।

সব চিঠিই অমিতের নামে।

কিন্তু কোনও চিঠি কখনও পোস্ট করা হয়নি।

প্রথম চিঠিটা খুলল সে।

“অমিত,

আজ তোর প্রথম চাকরি হয়েছে। ফোনে বলেছিলি, খুব ব্যস্ত। তাই তোকে বিরক্ত করিনি।

আজ সারাদিন ভাবলাম, তুই ছোটবেলায় বলতিস—‘আমি বড় হয়ে মাকে বড় একটা বাড়ি কিনে দেব।’

তুই ভুলে গেছিস নিশ্চয়ই।

আমি ভুলিনি।”

অমিতের বুকটা ধক করে উঠল।

দ্বিতীয় চিঠি—

“অমিত,

আজ তোর মেয়ের জন্মদিন। ছবিতে দেখলাম, ও খুব সুন্দর হয়েছে।

ওকে বলিস, তার দিদা ওর জন্য একটা লাল জামা কিনে রেখেছে।

তুই বলেছিলি, সময় পেলে আসবি।

আমি অপেক্ষা করব।”

তৃতীয় চিঠি—

“অমিত,

আজ তোর বাবার মৃত্যুবার্ষিকী।

তুই আসতে পারিসনি।

আমি কাউকে কিছু বলিনি।

তোর ওপর রাগ নেই।

শুধু মনে হয়, তোর সঙ্গে একদিন বসে তোর বাবার কথা বলব।”

আরও চিঠি।

একটার পর একটা।

বছরের পর বছর।

শেষ চিঠিটা ছিল সবচেয়ে ছোট।

“অমিত,

আজ ডাক্তার বলেছে আমার হৃদয় খুব দুর্বল।

ভয় পাস না।

আমি মরতে চাই না।

কারণ তুই এখনও একদিন এসে বলিসনি—

‘মা, তোমার কষ্ট হয়েছে।’

এই কথাটা শুনে যেতে ইচ্ছে করে।

তুই যদি কখনও এই চিঠিগুলো পড়িস, বুঝবি—আমি কোনওদিন তোর ওপর রাগ করিনি।

আমি শুধু তোকে খুব মিস করেছি।”

অমিত আর পড়তে পারল না।

সে মাটিতে বসে পড়ল।

মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

অমিত মাথা নিচু করে বলল,

“তুমি এগুলো আমাকে কখনও দাওনি কেন?”

মা হাসলেন।

“মায়েরা সব কথা মুখে বলতে পারে না।”

“তাহলে লিখেছিলে কেন?”

“নিজের মনটা হালকা করার জন্য।”

অমিত উঠে মায়ের কাছে গেল।

বহু বছর পর সে মাকে জড়িয়ে ধরল।

তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“মা, বাড়ি বিক্রি হবে না।”

মাধবী দেবী চুপ করে রইলেন।

“আমি এখানেই থাকব।”

মা বললেন,

“তোর চাকরি?”

“দেখব।”

“সংসার?”

“সেটাও দেখব।”

“আর আমি?”

অমিত মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,

“তুমি আর একা থাকবে না।”

কয়েক মাস পর বাড়িটা বদলে গেল।

পুরনো দেওয়ালে নতুন রং হলো।

পুকুরের ঘাট ঠিক করা হলো।

শিউলি গাছটার নিচে একটি বেঞ্চ বসানো হলো।

অমিত সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন বাড়ি থেকে কাজ করতে শুরু করল।

তার মেয়েও ছুটিতে এসে দিদার কাছে থাকতে শুরু করল।

একদিন মাধবী দেবী আলমারির শেষ ড্রয়ারটা খুললেন।

ভেতরে আর কোনও চিঠি নেই।

অমিত সব চিঠি নিয়ে গেছে।

শুধু ড্রয়ারের এক কোণে একটি নতুন কাগজ পড়ে আছে।

মাধবী দেবী খুলে দেখলেন।

অমিতের লেখা—

“মা, এতদিন তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছ। এবার থেকে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে না। আমি বাড়ি ফিরেছি।”

মাধবী দেবী চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন।

জানালার বাইরে তখন শিউলি ফুল ঝরছিল।

বাড়িটা আগের মতোই ছিল।

শুধু এবার বাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করছিল না কেউ।

কারণ যে মানুষটার জন্য অপেক্ষা ছিল, সে অবশেষে ফিরে এসেছিল।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *