
মালপোয়া বাঙালি ও ভারতীয় মিষ্টি-পদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত ময়দা, দুধ, চিনি ও মৌরি দিয়ে মালপোয়া তৈরি করা হয়। তবে পরিচিত এই মিষ্টিতে একটু নতুনত্ব আনতে চাইলে ডিম ব্যবহার করে তৈরি করা যায় ডিমের মালপোয়া।
ডিমের কারণে মালপোয়ার ভিতরের অংশ নরম ও মোলায়েম হয়। বাইরে হালকা সোনালি ও সামান্য মুচমুচে, আর চিনির রসে ডোবানোর পর সেটি হয়ে ওঠে আরও রসালো ও সুস্বাদু।
উপকরণ
মালপোয়ার ব্যাটারের জন্য
- ডিম – ৩টি
- ময়দা – ১ কাপ
- সুজি – ২ টেবিল চামচ
- দুধ – ১ কাপ
- চিনি – ৩ টেবিল চামচ
- মৌরি – ½ চা-চামচ
- এলাচগুঁড়ো – ¼ চা-চামচ
- বেকিং পাউডার – ¼ চা-চামচ
- নুন – এক চিমটি
- ঘি বা তেল – ভাজার জন্য
চিনির রসের জন্য
- চিনি – ১ কাপ
- জল – ¾ কাপ
- এলাচ – ২টি
- গোলাপজল – ½ চা-চামচ, ইচ্ছেমতো
সাজানোর জন্য
- কাজুবাদাম – কুচি
- পেস্তা – কুচি
- কিশমিশ – সামান্য
- জাফরান – কয়েকটি রোঁয়া, ইচ্ছেমতো
ব্যাটার তৈরি
প্রথমে একটি বড় বাটিতে তিনটি ডিম ভেঙে নিন।
ডিম ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। এরপর চিনি দিয়ে আবার ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
এবার দুধ অল্প অল্প করে ঢালতে থাকুন এবং নাড়তে থাকুন।
অন্য একটি পাত্রে ময়দা, সুজি, বেকিং পাউডার ও এক চিমটি নুন মিশিয়ে নিন।
এই শুকনো মিশ্রণটি ধীরে ধীরে ডিম ও দুধের মিশ্রণের মধ্যে দিয়ে ভালোভাবে মেশান।
ব্যাটারে যেন কোনো দলা না থাকে।
এরপর মৌরি ও এলাচগুঁড়ো দিয়ে মিশিয়ে নিন।
ব্যাটার খুব ঘন হলে সামান্য দুধ যোগ করুন। আবার খুব পাতলা হলে অল্প ময়দা যোগ করতে পারেন।
ব্যাটারের ঘনত্ব এমন হওয়া উচিত যাতে চামচ থেকে ঢাললে ধীরে ধীরে পড়ে এবং প্যানে পড়ে নিজে থেকে সামান্য ছড়িয়ে যায়।
ব্যাটার বিশ্রাম দেওয়া
ব্যাটার তৈরি হয়ে গেলে ঢেকে ২০–৩০ মিনিট রেখে দিন।
সুজি এই সময়ে কিছুটা ফুলে উঠবে এবং মালপোয়ার গঠন আরও ভালো হবে।
বিশ্রামের পর ব্যাটার আবার ভালোভাবে নেড়ে নিন।
প্রয়োজন হলে সামান্য দুধ যোগ করে ঘনত্ব ঠিক করুন।
চিনির রস তৈরি
একটি পাত্রে চিনি ও জল দিন।
মাঝারি আঁচে চিনি গলতে দিন।
এর মধ্যে দুটি এলাচ দিয়ে দিন।
চিনি সম্পূর্ণ গলে গেলে কয়েক মিনিট ফুটতে দিন।
মালপোয়ার জন্য খুব ঘন একতারের সিরা দরকার নেই। হালকা আঠালো চিনির রস হলেই যথেষ্ট।
শেষে চাইলে সামান্য গোলাপজল যোগ করতে পারেন।
চুলা বন্ধ করে চিনির রস হালকা গরম অবস্থায় রাখুন।
মালপোয়া ভাজার পদ্ধতি
একটি সমতল নন-স্টিক প্যান বা কড়াই নিন।
তাতে পর্যাপ্ত ঘি বা তেল গরম করুন।
মালপোয়া ঘিতে ভাজলে গন্ধ ও স্বাদ আরও ভালো হয়।
আঁচ মাঝারি-কম রাখুন।
এবার একটি ছোট হাতা দিয়ে ব্যাটার নিয়ে প্যানে ঢালুন।
ব্যাটার নিজে থেকেই গোল আকারে ছড়িয়ে পড়বে।
মালপোয়া খুব পাতলা করবেন না। মাঝারি পুরু হলে ভিতরটা নরম থাকবে।
এক পাশ সোনালি হয়ে এলে সাবধানে উল্টে দিন।
দুই পাশ সুন্দর সোনালি বাদামি হলে তুলে নিন।
চিনির রসে ডোবানো
ভাজা মালপোয়াগুলো সরাসরি হালকা গরম চিনির রসে দিয়ে দিন।
প্রতিটি মালপোয়াকে প্রায় ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট রসে রাখুন।
এরপর তুলে একটি প্লেটে সাজিয়ে রাখুন।
বেশি সময় রসে রেখে দিলে মালপোয়া অতিরিক্ত নরম হয়ে ভেঙে যেতে পারে।
জাফরানি ডিমের মালপোয়া
আরও রাজকীয় স্বাদ চাইলে চিনির রসে কয়েকটি জাফরানের রোঁয়া দিতে পারেন।
জাফরান আগে এক চামচ হালকা গরম দুধে ভিজিয়ে নিয়ে রসে মেশালে এর রং ও গন্ধ ভালোভাবে বের হয়।
দুধের স্বাদ বাড়াতে
ব্যাটারে সাধারণ দুধের পরিবর্তে সামান্য ঘন দুধ ব্যবহার করা যায়।
এতে মালপোয়া আরও মোলায়েম ও সমৃদ্ধ স্বাদের হবে।
তবে দুধ বেশি ঘন হলে ব্যাটারের ঘনত্ব ঠিক রাখতে পরিমাণ অনুযায়ী ময়দা ও দুধ সামঞ্জস্য করতে হবে।
নারকেল দিয়ে ডিমের মালপোয়া
মালপোয়ার ব্যাটারে ২–৩ টেবিল চামচ কোরানো নারকেল যোগ করা যায়।
নারকেলের সঙ্গে মৌরি ও এলাচের গন্ধ খুব ভালোভাবে মিশে যায়।
চাইলে পরিবেশনের সময় ওপরেও সামান্য কোরানো নারকেল ছড়িয়ে দিতে পারেন।
ক্ষীরের সঙ্গে পরিবেশন
ডিমের মালপোয়া শুধু চিনির রসে ডুবিয়েই পরিবেশন করা যায়।
তবে বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য এর সঙ্গে ঘন ক্ষীর বা রাবড়ি পরিবেশন করলে স্বাদ আরও সমৃদ্ধ হবে।
একটি প্লেটে মালপোয়া রেখে ওপর থেকে সামান্য রাবড়ি ঢেলে কাজুবাদাম ও পেস্তা ছড়িয়ে দিন।
মালপোয়া নরম রাখার টিপস
১. ব্যাটার খুব ঘন করবেন না।
২. সুজি ব্যবহারের পর ব্যাটার অন্তত ২০ মিনিট বিশ্রাম দিন।
৩. খুব বেশি আঁচে মালপোয়া ভাজবেন না।
৪. ঘি বা তেল অতিরিক্ত গরম হলে বাইরে দ্রুত বাদামি হয়ে ভিতর কাঁচা থাকতে পারে।
৫. চিনির রস খুব ঘন করবেন না।
৬. মালপোয়া দীর্ঘ সময় রসে ডুবিয়ে রাখবেন না।
৭. পরিবেশনের আগে কাজু, পেস্তা ও জাফরান দিয়ে সাজালে দেখতে সুন্দর হবে।
মালপোয়া ভাজার সময় কীভাবে বুঝবেন?
ব্যাটার প্যানে দেওয়ার পর প্রথমে এর কিনারা শক্ত হতে শুরু করবে।
কিছুক্ষণ পর নিচের অংশ সোনালি হয়ে এলে স্প্যাচুলা দিয়ে ধীরে ধীরে উল্টে দিন।
অন্য পাশও সোনালি হলে তুলে নিন।
মাঝারি আঁচে ধীরে ভাজাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে বাইরের অংশ সুন্দর রং পায় এবং ভিতরটাও ভালোভাবে রান্না হয়।
পরিবেশনের পদ্ধতি
ডিমের মালপোয়া হালকা গরম বা ঘরের তাপমাত্রায় পরিবেশন করা যায়।
একটি প্লেটে ২টি মালপোয়া সাজিয়ে ওপর থেকে সামান্য চিনির রস দিন।
এর ওপর কাজুবাদাম, পেস্তা ও কিশমিশ ছড়িয়ে দিন।
বিশেষ অনুষ্ঠানে সঙ্গে রাবড়ি বা ঘন ক্ষীর দিলে পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় হবে।
রান্নার সময়
প্রস্তুতির সময়: ২০ মিনিট
ব্যাটার বিশ্রাম: ২০–৩০ মিনিট
ভাজার সময়: ২০ মিনিট
মোট সময়: প্রায় ১ ঘণ্টা
পরিমাণ: ৮–১০টি মালপোয়া
পুষ্টির দিক
ডিমে প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। দুধও খাবারে প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম যোগ করে।
তবে এটি একটি মিষ্টি পদ হওয়ায় এতে চিনি ও তেলের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
উপসংহার
প্রচলিত মালপোয়ার স্বাদে একটু নতুনত্ব আনতে চাইলে ডিমের মালপোয়া তৈরি করে দেখতে পারেন। ডিম ও দুধের কারণে এর ভিতরের অংশ নরম ও মোলায়েম হয়, আর চিনির রসে ডোবানোর পর তৈরি হয় মিষ্টি ও সুগন্ধি স্বাদ।
পৌষ-পার্বণ, অতিথি আপ্যায়ন, উৎসব কিংবা বাড়ির বিশেষ দিনে এই অভিনব মিষ্টি পরিবেশন করলে খাবারের তালিকায় সহজেই আলাদা আকর্ষণ তৈরি হবে।












Leave a Reply