
বাঙালির রান্নাঘরে পোস্তর জায়গা বরাবরই আলাদা। আলু পোস্ত থেকে শুরু করে পোস্ত দিয়ে নানা সবজি—বাঙালি রান্নায় পোস্তর ব্যবহার বহু পুরনো। তবে পোস্তর সঙ্গে চিংড়ির মেলবন্ধনও যে কতটা সুস্বাদু হতে পারে, তা একবার চিংড়ি পোস্ত খেলে সহজেই বোঝা যায়।
নরম ও রসালো চিংড়ি, পোস্তর মিহি পেস্ট, কাঁচালঙ্কার ঝাঁজ এবং সর্ষের তেলের নিজস্ব গন্ধ—সব মিলিয়ে এই পদটি তৈরি করে একেবারে ঘরোয়া বাঙালি স্বাদ। দুপুরের ভাতের সঙ্গে এই রান্না দারুণ মানিয়ে যায়।
রান্নার সময় ও পরিবেশন
প্রস্তুতির সময়: ১৫–২০ মিনিট
রান্নার সময়: ২০ মিনিট
পরিবেশন: ৩–৪ জন
উপকরণ
- মাঝারি আকারের চিংড়ি – ৪০০ গ্রাম
- পোস্তদানা – ৪ টেবিল চামচ
- কাঁচালঙ্কা – ৪–৫টি
- পেঁয়াজ – ১টি, পাতলা করে কাটা
- হলুদ গুঁড়ো – ½ চা চামচ
- লবণ – স্বাদমতো
- চিনি – ½ চা চামচ
- সর্ষের তেল – ৪ টেবিল চামচ
- কালোজিরে – ½ চা চামচ
- শুকনো লঙ্কা – ১টি
- নারকেল কোরানো – ১ টেবিল চামচ, ঐচ্ছিক
- জল – প্রয়োজনমতো
পোস্ত বাটা তৈরি
প্রথমে পোস্তদানা ভালো করে ধুয়ে ২০–৩০ মিনিট জলে ভিজিয়ে রাখুন। এতে পোস্ত নরম হবে এবং মিহি করে বাটা সহজ হবে।
ভেজানো পোস্তর সঙ্গে ২টি কাঁচালঙ্কা দিয়ে শিলনোড়া বা মিক্সারে মিহি করে বেটে নিন। মিক্সারে বাটলে খুব বেশি জল দেবেন না। অল্প অল্প করে জল দিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করুন।
যারা একটু সমৃদ্ধ স্বাদ পছন্দ করেন, তারা পোস্ত বাটার সঙ্গে সামান্য নারকেল কোরানো মিশিয়ে নিতে পারেন।
চিংড়ি প্রস্তুত করা
চিংড়ি পরিষ্কার করে মাথা ও খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। বড় চিংড়ি হলে পিঠের কালো শিরা ফেলে দিন।
চিংড়ির সঙ্গে সামান্য লবণ ও হলুদ মাখিয়ে ৫–১০ মিনিট রেখে দিন।
এরপর কড়াইতে ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল গরম করুন। তেল ভালোভাবে গরম হলে চিংড়িগুলো দিয়ে অল্প সময়ের জন্য ভেজে নিন।
চিংড়ি বেশি সময় ভাজবেন না। বেশি ভাজলে চিংড়ি শক্ত ও রাবারের মতো হয়ে যেতে পারে। চিংড়ির রং সামান্য বদলে গেলেই তুলে রাখুন।
চিংড়ি পোস্ত রান্নার পদ্ধতি
এবার একই কড়াইতে বাকি সর্ষের তেল দিন।
তেল গরম হলে শুকনো লঙ্কা এবং কালোজিরে দিয়ে ফোড়ন দিন। কালোজিরে থেকে সুন্দর গন্ধ বের হলে কাটা পেঁয়াজ দিয়ে দিন।
পেঁয়াজ হালকা সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। এরপর পোস্তর পেস্ট দিয়ে দিন।
মাঝারি আঁচে পোস্ত ভালোভাবে নাড়তে থাকুন। পোস্ত কড়াইয়ের তলায় লেগে যেতে পারে, তাই প্রয়োজনে অল্প অল্প করে জল দিন।
এরপর হলুদ, লবণ এবং সামান্য চিনি দিয়ে মিশিয়ে নিন।
পোস্তর মিশ্রণ থেকে তেল সামান্য ছাড়তে শুরু করলে ভেজে রাখা চিংড়ি দিয়ে দিন। সঙ্গে ২–৩টি চেরা কাঁচালঙ্কা দিন।
সবকিছু ভালোভাবে মিশিয়ে অল্প জল দিন। ঢাকনা দিয়ে কম আঁচে ৫–৭ মিনিট রান্না করুন।
চিংড়ি ও পোস্তর মশলা ভালোভাবে মিশে গেলে ঢাকনা খুলে দেখুন। ঝোল বেশি পাতলা রাখবেন না। এই রান্নার আসল সৌন্দর্য হলো ঘন পোস্তর মশলা চিংড়ির গায়ে ভালোভাবে লেগে থাকা।
শেষে উপর থেকে এক চা চামচ কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে দিতে পারেন। এতে রান্নায় আরও সুন্দর সর্ষের গন্ধ আসবে।
কীভাবে পরিবেশন করবেন?
চিংড়ি পোস্ত গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করলেই সবচেয়ে ভালো লাগে। সঙ্গে ডাল, আলুভাজা বা বেগুনভাজা থাকলে সম্পূর্ণ বাঙালি দুপুরের খাবার তৈরি হয়ে যায়।
তবে এই রান্না খুব বেশি ঝাল না করে রান্না করলে শিশু ও বয়স্কদের জন্যও স্বাদ অনুযায়ী পরিবেশন করা যায়।
রান্নার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস
১. পোস্ত ভালোভাবে ভিজিয়ে নিন:
কম সময় ভিজিয়ে রাখলে পোস্ত মিহি হবে না এবং রান্নার স্বাদও ভালো হবে না।
২. চিংড়ি বেশি ভাজবেন না:
অতিরিক্ত ভাজার ফলে চিংড়ি শক্ত হয়ে যায়।
৩. পোস্ত বাটার সময় বেশি জল দেবেন না:
ঘন পোস্ত পেস্ট হলে রান্নার স্বাদ ও গঠন ভালো হয়।
৪. সর্ষের তেল ব্যবহার করুন:
এই পদে সর্ষের তেলের গন্ধই স্বাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৫. কাঁচালঙ্কা নিজের স্বাদ অনুযায়ী দিন:
ঝাল কম পছন্দ করলে বীজ ফেলে দিতে পারেন।
শেষ কথা
চিংড়ি পোস্ত এমন একটি রান্না, যার উপকরণ খুব বেশি নয়, রান্নার পদ্ধতিও জটিল নয়। অথচ পোস্তর মোলায়েম স্বাদ আর চিংড়ির নিজস্ব গন্ধ একসঙ্গে মিশে তৈরি করে অসাধারণ একটি বাঙালি পদ।
রোজকার দুপুরের ভাত হোক কিংবা পরিবারের বিশেষ কোনো দিনের খাবার—চিংড়ি পোস্ত বাঙালির রান্নাঘরে সহজেই জায়গা করে নিতে পারে।












Leave a Reply