কুয়াশার ভেতর জলের পথ।।

শীতের সকাল।

মাধবপুর গ্রামের চারদিক তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। বাঁশঝাড়ের মাথা দেখা যায় না, পুকুরের ওপারের তালগাছগুলোও যেন সাদা চাদরের আড়ালে লুকিয়ে আছে।

কিন্তু এই কুয়াশার মধ্যেও প্রতিদিন ভোরে একটি মেয়ে হাঁটতে বের হয়।

তার নাম রূপা।

বয়স মাত্র চৌদ্দ।

হাতে দুটো অ্যালুমিনিয়ামের কলসি।

গ্রামের শেষ প্রান্তে তাদের বাড়ি। আর পানীয় জলের একমাত্র নলকূপটি রয়েছে প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে।

রূপার বাবা বহু বছর আগে শহরে কাজ করতে গিয়ে আর ফেরেননি। মা বাড়িতে অন্যের কাপড় সেলাই করেন।

সংসারে রূপাই মায়ের সবচেয়ে বড় ভরসা।

প্রতিদিন ভোরে জল আনা, তারপর রান্নায় মাকে সাহায্য করা, তারপর স্কুলে যাওয়া—এই ছিল তার জীবন।

একদিন সকালে রূপা নলকূপের কাছে গিয়ে দেখল, সেখানে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে।

কেউ ঝগড়া করছে।

কেউ বলছে,

—“আগে আমি এসেছি।”

কেউ বলছে,

—“আমার বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে।”

রূপা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে পড়ল, নলকূপের নিচে মাটি কাদায় ভরে গেছে। চারপাশে জল জমে দুর্গন্ধ হচ্ছে।

এক বৃদ্ধ বললেন,

—“এই নলকূপটাও আর বেশি দিন চলবে না।”

রূপা জিজ্ঞেস করল,

—“কেন?”

বৃদ্ধ বললেন,

—“ভেতরের পাইপে সমস্যা হয়েছে। জল উঠতে সময় লাগে।”

রূপা নলকূপের হাতলটা একবার চাপ দিল।

কষ্ট করে একটু জল উঠল।

তারপর আবার শুকনো।

সেদিন স্কুলে গিয়েও রূপার মন বসছিল না।

বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,

—“জল সংরক্ষণ কীভাবে করা যায়?”

সবাই নানা উত্তর দিল।

রূপা হাত তুলল।

—“স্যার, আমাদের গ্রামে বৃষ্টির জল ধরে রাখা যায়?”

শিক্ষক অবাক হয়ে বললেন,

—“অবশ্যই যায়। কেন?”

রূপা বলল,

—“আমাদের তো জলের খুব কষ্ট।”

শিক্ষক বোর্ডে একটা ছবি আঁকলেন।

ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে জল নামবে, তারপর একটি বড় ট্যাঙ্কে জমা হবে।

রূপা খুব মন দিয়ে ছবিটা দেখল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে মাকে বলল,

—“মা, বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখলে কেমন হয়?”

মা হাসলেন।

—“আমাদের এই ভাঙা বাড়িতে আবার ট্যাঙ্ক?”

রূপা বলল,

—“ট্যাঙ্ক না হোক, বড় ড্রাম তো রাখা যায়।”

মা বললেন,

—“টাকা কোথায়?”

রূপা চুপ করে গেল।

পরদিন সে স্কুলের শিক্ষকের কাছে গেল।

সব কথা বলল।

শিক্ষক বললেন,

—“টাকা দিয়ে সব কাজ হয় না। আগে চেষ্টা করতে হয়।”

রূপা গ্রামের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতে শুরু করল।

সে সবাইকে বোঝাতে লাগল—

“বৃষ্টির জল নষ্ট করবেন না।”

কেউ শুনল।

কেউ হাসল।

কেউ বলল,

—“এই বয়সে এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস কেন?”

রূপা কিছু বলল না।

সে জানত, একদিন উত্তর দেবে কাজ দিয়ে।

বর্ষা আসতে এখনও দুমাস বাকি।

এই সময়ের মধ্যে সে গ্রামের খালি প্লাস্টিকের ড্রাম সংগ্রহ করল।

পুরোনো পাইপ জোগাড় করল।

স্কুলের শিক্ষক কিছু টাকা দিলেন।

গ্রামের এক মিস্ত্রি বিনা পারিশ্রমিকে সাহায্য করতে রাজি হলেন।

একদিন গ্রামের মোড়ল এসে বললেন,

—“এসব করে লাভ হবে?”

রূপা বলল,

—“একবার চেষ্টা করে দেখুন।”

অবশেষে কাজ শুরু হল।

স্কুলের ছাদে পাইপ বসানো হল।

তারপর সেই পাইপ নেমে এল বড় একটি ড্রামে।

রূপা প্রতিদিন কাজটা পরীক্ষা করত।

কিন্তু গ্রামের মানুষ তখনও খুব একটা বিশ্বাস করত না।

তারপর এল বর্ষার প্রথম দিন।

সকাল থেকেই আকাশ কালো।

দুপুরের পর হঠাৎ বৃষ্টি নামল।

প্রথমে টুপটাপ।

তারপর ঝমঝম।

স্কুলের ছাদ দিয়ে জল গড়িয়ে পাইপের মধ্যে ঢুকতে শুরু করল।

রূপা দৌড়ে গেল।

ড্রামের ভেতর টুপটাপ করে জল পড়ছে।

সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“জল জমছে!”

তার বন্ধুরাও ছুটে এল।

এক ঘণ্টার মধ্যে ড্রাম প্রায় ভর্তি।

গ্রামের মানুষও দেখতে এল।

মোড়ল অবাক হয়ে বললেন,

—“সত্যিই তো!”

রূপা বলল,

—“এই জল আমরা ব্যবহার করতে পারি।”

সেদিন থেকেই গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে একই ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হল।

কিন্তু সমস্যা শেষ হয়নি।

কয়েক মাস পর খরা দেখা দিল।

পুকুর শুকিয়ে গেল।

নলকূপে জল কমে গেল।

গ্রামের মানুষ তখন বুঝতে পারল, রূপার পরিকল্পনাটা কতটা জরুরি ছিল।

স্কুলের জলাধারে জমিয়ে রাখা বৃষ্টির জল দিয়ে রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং কিছু জরুরি কাজে সাহায্য করা হতে লাগল।

একদিন গ্রামের সেই বৃদ্ধ, যিনি প্রথম দিন বলেছিলেন নলকূপ আর চলবে না, তিনি রূপাকে ডাকলেন।

বললেন,

—“তুই না থাকলে আমরা বুঝতেই পারতাম না, বৃষ্টির জলও সম্পদ।”

রূপা হেসে বলল,

—“আমি একা কিছু করিনি। সবাই মিলে করেছি।”

বৃদ্ধ বললেন,

—“না। সবাইকে প্রথমে কেউ না কেউ ভাবতে শেখায়।”

রূপা মাথা নিচু করল।

তারপর আরও বড় পরিবর্তন এল।

গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিল, শুধু বৃষ্টির জল নয়, গ্রামের পুরোনো পুকুরটিও সংস্কার করা হবে।

পুকুরের চারপাশ পরিষ্কার হল।

জল ঢোকার পথ খুলে দেওয়া হল।

বাঁধ মেরামত করা হল।

পরের বর্ষায় পুকুর আবার জলে ভরে উঠল।

মাধবপুর গ্রামের জলকষ্ট অনেকটাই কমে গেল।

কয়েক বছর পর রূপা বড় হয়ে জলসম্পদ নিয়ে পড়াশোনা করতে শহরে চলে গেল।

বিদায়ের দিন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক বললেন,

—“তুই একদিন ফিরে আসবি তো?”

রূপা বলল,

—“অবশ্যই।”

অনেক বছর পর এক শীতের সকালে রূপা সত্যিই ফিরে এল।

গ্রামের রাস্তা বদলে গেছে।

অনেক বাড়িতে নতুন ছাদ হয়েছে।

অনেক বাড়ির পাশে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক।

পুরোনো নলকূপটির পাশে একটি ফলক লাগানো—

“জল বাঁচাও, ভবিষ্যৎ বাঁচাও।”

রূপা ফলকটি দেখে হাসল।

তার ছোটবেলার বন্ধু মিতা এসে বলল,

—“মনে আছে? আমরা একদিন এখানে কলসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম।”

রূপা বলল,

—“মনে আছে।”

মিতা হেসে বলল,

—“তখন তো ভাবিনি গ্রামের চেহারা বদলে যাবে।”

রূপা আকাশের দিকে তাকাল।

শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।

সূর্যের আলো গ্রামের মাটিতে পড়তে শুরু করেছে।

রূপা বলল,

—“পরিবর্তন কখনও একদিনে আসে না। একটা ছোট্ট চিন্তা থেকে শুরু হয়।”

তারপর সে স্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

যে স্কুলের ছাদ থেকে একদিন প্রথম বৃষ্টির জল ড্রামে জমেছিল।

পেছনে রয়ে গেল মাধবপুর।

আর কুয়াশার ভেতর দিয়ে যেন ভেসে এল এক অদৃশ্য বার্তা—

যে মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজ একটু চেষ্টা করে, একদিন তার সেই ছোট্ট চেষ্টা বহু মানুষের জীবন বদলে দেয়।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *