ভোরের প্রথম বাস।।

শিমুলডাঙা গ্রামের বাসস্ট্যান্ডটা খুব ছোট।

একটা ভাঙা টিনের ছাউনি, দুটো কাঠের বেঞ্চ আর পাশে একটা পুরোনো চায়ের দোকান—এই নিয়েই গ্রামের বাসস্ট্যান্ড।

প্রতিদিন ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে সেখানে একটা বাস এসে দাঁড়াত।

বাসটির নাম ছিল “মা মনসা”।

বাসটি শিমুলডাঙা থেকে জেলা শহরের দিকে যেত।

গ্রামের মানুষজনের কাছে এই বাসটা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না। কারও কাছে চাকরির রাস্তা, কারও কাছে হাসপাতালের রাস্তা, কারও কাছে স্কুল-কলেজে যাওয়ার একমাত্র ভরসা।

আর সেই বাসের কন্ডাক্টর ছিলেন গোপাল।

বয়স পঞ্চান্ন।

চেহারায় সবসময় ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু মুখে হাসি।

প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি এই রুটে কাজ করছেন।

গোপালের একটা অভ্যাস ছিল।

বাসে ওঠা প্রতিটি যাত্রীর মুখ তিনি মনে রাখতেন।

কে কোন স্টপেজে নামে, কার হাতে বাজারের ব্যাগ থাকে, কে প্রতিদিন হাসপাতালে যায়—সবই তাঁর জানা।

একদিন ভোরে বাসস্ট্যান্ডে এসে গোপাল দেখলেন, এক বৃদ্ধা একা দাঁড়িয়ে আছেন।

হাতে ছোট্ট একটি কাপড়ের ব্যাগ।

চোখে উদ্বেগ।

গোপাল এগিয়ে গিয়ে বললেন,

—“মাসিমা, কোথায় যাবেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

—“জেলা হাসপাতালে।”

—“একাই?”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

—“ছেলেটা বাইরে কাজ করে। কাল রাতে ফোনে বলল, আজ হাসপাতালে যেতে। শরীরটা কয়েকদিন ধরে ভালো নেই।”

গোপাল তাঁকে বাসে তুলে দিলেন।

জানালার পাশে বসিয়ে বললেন,

—“চিন্তা করবেন না। আমি আছি।”

বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালেন।

—“তুমি কি আমাকে চেনো?”

গোপাল হেসে বললেন,

—“আজ থেকে চিনলাম।”

বাস ছেড়ে দিল।

সেদিন হাসপাতালে যাওয়ার সময় গোপাল বৃদ্ধাকে ঠিক গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।

ফেরার পথে বৃদ্ধা বললেন,

—“তোমার নাম কী বাবা?”

—“গোপাল।”

—“তোমার মায়ের মতো মনে হল তোমাকে।”

গোপাল হেসে বললেন,

—“আমার মা নেই।”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“তাহলে আজ থেকে আমাকে মা বলো।”

গোপাল আর কিছু বলতে পারলেন না।

শুধু মাথা নিচু করলেন।

সেদিন থেকে বৃদ্ধার নাম হয়ে গেল গোপালের কাছে “মা”।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কয়েক মাস পর শিমুলডাঙা গ্রামের স্কুলের এক ছাত্রী প্রতিদিন ভোরের বাসে শহরে যেতে শুরু করল।

তার নাম তিথি।

তিথির স্বপ্ন ছিল নার্স হওয়ার।

গ্রামে ভালো কোচিং ছিল না।

তাই প্রতিদিন তাকে ভোরের বাস ধরে শহরে যেতে হতো।

প্রথম দিন তিথি বাসে উঠে খুব ভয় পেয়েছিল।

অচেনা শহর।

অচেনা মানুষ।

গোপাল সেটা বুঝতে পেরে বললেন,

—“ভয় পেও না। শহরের শেষ স্টপেজে আমি তোমাকে নামিয়ে দেব।”

তিথি বলল,

—“কিন্তু আপনি তো বাসে থাকবেন।”

গোপাল হেসে বললেন,

—“তুমি যেখানে নামবে, আমি নিশ্চিত হব তুমি ঠিক জায়গায় পৌঁছেছ।”

তারপর থেকে প্রতিদিন গোপাল তিথিকে নির্দিষ্ট জায়গায় নামিয়ে দিতেন।

একদিন তিথি বলল,

—“কাকু, আপনি এত মানুষকে মনে রাখেন কী করে?”

গোপাল বললেন,

—“বাসে সবাই যাত্রী নয়। প্রত্যেকের একটা গল্প থাকে।”

তিথি হাসল।

—“আমার গল্প কী?”

গোপাল বললেন,

—“তুমি এখনও জানো না। তবে তোমার গল্পের নাম হবে—‘আমি পেরেছি।’”

তিথি কথাটা মনে রাখল।

দিন যেতে লাগল।

একদিন হঠাৎ বাসের মালিক জানালেন, পুরোনো বাসটি আর চালানো হবে না।

নতুন রুটে অন্য বাস আসবে।

গোপালের চাকরি থাকবে কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়।

খবরটা শুনে গোপালের মন খারাপ হয়ে গেল।

ত্রিশ বছর ধরে যে বাসে তিনি কাজ করেছেন, সেটাই যেন তাঁর নিজের বাড়ি।

বাসের প্রতিটি সিট তাঁর চেনা।

কোন জানালার কাচ কখন ভেঙেছিল, কোন সিটে বৃষ্টি পড়ে—সব তাঁর জানা।

শেষ দিন বাসস্ট্যান্ডে অদ্ভুত নীরবতা ছিল।

তিথি এসে বলল,

—“কাকু, আপনি থাকবেন না?”

গোপাল মৃদু হেসে বললেন,

—“হয়তো অন্য কোথাও কাজ পাব।”

তিথির চোখে জল এসে গেল।

—“আমার পরীক্ষা সামনে।”

গোপাল বললেন,

—“তুমি পরীক্ষা দেবে। বাস বদলালেই রাস্তা বদলে যায় না।”

সেদিন ভোরের বাস যখন শেষবারের মতো শিমুলডাঙা ছাড়ল, বাসে অস্বাভাবিক ভিড় ছিল।

শুধু যাত্রীরা নয়।

গ্রামের মানুষও এসেছিল।

চায়ের দোকানের মালিক, স্কুলের শিক্ষক, কৃষক, বাজারের দোকানদার—সবাই।

গোপাল অবাক হয়ে বললেন,

—“এত লোক কেন?”

চায়ের দোকানের নিতাই বললেন,

—“তুমি ভাবছ শুধু বাস চালিয়েছ? তুমি তো আমাদের জীবন চালিয়েছ।”

গোপাল কিছু বলতে পারলেন না।

সেই দিন বিকেলে গোপাল বাড়ি ফিরলেন।

স্ত্রী বললেন,

—“চিন্তা করো না। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

গোপাল চুপ করে বসেছিলেন।

পরদিন সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

গোপাল দরজা খুলে দেখলেন, তিথি দাঁড়িয়ে।

হাতে একটা খাম।

—“কাকু, এটা আপনার জন্য।”

গোপাল খাম খুলে দেখলেন, ভেতরে একটি চিঠি।

তিথি বলল,

—“আমি শহরের নার্সিং কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।”

গোপালের চোখে জল এসে গেল।

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

তিথি বলল,

—“আপনি না থাকলে আমি প্রথম দিনই ভয় পেয়ে ফিরে আসতাম।”

গোপাল মাথা নাড়লেন।

—“তোমার নিজের সাহস ছিল।”

তিথি বলল,

—“সাহস ছিল। কিন্তু কেউ একজন বলেছিল—‘তুমি পারবে।’”

গোপাল মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

তিনি চাননি তিথি তাঁর চোখের জল দেখুক।

কয়েক সপ্তাহ পর গোপাল নতুন একটি বাসে কাজ পেলেন।

রুটও নতুন।

কিন্তু শিমুলডাঙা থেকে শহরে যাওয়ার পথটি তাঁর জীবনে থেকে গেল।

আর বহু বছর পর এক ভোরে, সেই একই বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে গোপাল দেখলেন—একজন সাদা পোশাকের তরুণী হাতে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তিথি।

এখন সে নার্স।

গোপাল অবাক হয়ে বললেন,

—“তুমি এখানে?”

তিথি হেসে বলল,

—“আজ আমার প্রথম চাকরির দিন।”

গোপাল বললেন,

—“কোথায়?”

—“জেলা হাসপাতালে।”

গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“তাহলে ভোরের বাসেই যাবে?”

তিথি হেসে বলল,

—“হ্যাঁ। তবে আজ আমি আর ভয় পাচ্ছি না।”

বাস এসে দাঁড়াল।

তিথি উঠে গেল।

বাস ছাড়ার আগে জানালা দিয়ে হাত নাড়ল।

গোপালও হাত নাড়লেন।

বাসটা ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।

সেদিন গোপাল বুঝলেন, মানুষ জীবনে কত বড় কাজ করেছে তা সবসময় সে নিজে বুঝতে পারে না।

কখনও কখনও সে শুধু একটি দরজা খুলে দেয়।

তারপর অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে নিজের ভবিষ্যতের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

শিমুলডাঙার ভোরের বাসও তেমনই ছিল।

প্রতিদিন মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেত।

কিন্তু কিছু মানুষকে সে শুধু গন্তব্যে নয়—

স্বপ্নের কাছেও পৌঁছে দিত।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *