সেতু নয়, বাঁশের সাঁকো—গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা পারাপারের ঐতিহ্য কি ফিরতে পারে?
খাল-বিলের উপর বাঁশের সাঁকো, গ্রামীণ যোগাযোগ, কারিগরি জ্ঞান ও বদলে যাওয়া পথঘাট নিয়ে সাঁকো নির্মাণ গবেষক নীলাদ্রি জানার সঙ্গে মুখোমুখি
বিশেষ সাক্ষাৎকার | সম্পূর্ণ কাল্পনিক
গ্রামবাংলার মানচিত্রে নদী, খাল, বিল, পুকুর ও জলাভূমির উপস্থিতি বহু পুরনো। বর্ষাকালে কোথাও জল বেড়েছে, কোথাও রাস্তা ডুবে গেছে, কোথাও আবার একটি ছোট খাল দু’টি পাড়ের মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে প্রাকৃতিক দূরত্ব। এই জলপথের উপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য একসময় নৌকার পাশাপাশি ব্যবহৃত হতো বাঁশের সাঁকো।
দুই পাড়ের মধ্যে কয়েকটি বাঁশ বসিয়ে, তার ওপর আড়াআড়ি বাঁশ বা কাঠের সহায়তা দিয়ে তৈরি হতো সরু পথ। কোথাও সাঁকো এতটাই সরু যে একসঙ্গে একজনের বেশি মানুষ হাঁটতে পারতেন না। আবার কোথাও গ্রামের মানুষ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তুলনামূলক চওড়া সাঁকো তৈরি করতেন।
সাঁকো ছিল শুধু একটি পারাপারের ব্যবস্থা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামের মানুষের সহযোগিতা, স্থানীয় কারিগরি জ্ঞান এবং পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতা।
আজ বহু গ্রামে পাকা সেতু, কালভার্ট ও উন্নত রাস্তা তৈরি হয়েছে। ফলে বাঁশের সাঁকোর প্রয়োজন অনেক এলাকায় কমেছে। তবু এখনও এমন বহু প্রত্যন্ত অঞ্চল রয়েছে যেখানে ছোট খাল বা জলপথের উপর অস্থায়ী সাঁকো স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঐতিহ্য, নির্মাণপ্রযুক্তি ও পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেন কাল্পনিক সাঁকো নির্মাণ গবেষক নীলাদ্রি জানা।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকোকে আপনি গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ বলছেন কেন?
নীলাদ্রি জানা:
কারণ একটি বাঁশের সাঁকো কোনো এক ব্যক্তির তৈরি করা বস্তু হলেও তার ব্যবহার ছিল সমষ্টিগত।
একটি গ্রামের মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতেন কোথায় পারাপারের প্রয়োজন, কীভাবে সাঁকো তৈরি হবে, কারা বাঁশ দেবে এবং কারা নির্মাণের কাজ করবে।
অর্থাৎ এর মধ্যে সামাজিক সহযোগিতার একটি বড় দিক ছিল।
আরেকটি বিষয় হলো স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। যেখানে পাকা সেতু তৈরি করা কঠিন বা ব্যয়বহুল, সেখানে গ্রামের মানুষ স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নিজেদের সমস্যার সমাধান করতেন।
প্রশ্ন: একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করা কি খুব সহজ কাজ?
নীলাদ্রি:
দেখতে সহজ হলেও ভালো সাঁকো তৈরি করতে অভিজ্ঞতা দরকার।
বাঁশের গুণমান, তার দৈর্ঘ্য, মোটা-পাতলা, নমনীয়তা, কোথায় ভর দেওয়া হবে—এসব বুঝতে হয়।
সাঁকো শুধু বানিয়ে দিলেই হয় না। সেটি কতজন মানুষ ব্যবহার করবেন, বর্ষাকালে জল কতটা বাড়ে, স্রোত আছে কি না—এসবও বিবেচনা করতে হয়।
অভিজ্ঞ কারিগর পরিবেশ দেখে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।
প্রশ্ন: সাঁকো তৈরিতে বাঁশের কোন গুণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
নীলাদ্রি:
শক্তি ও নমনীয়তার ভারসাম্য।
খুব শুকনো বা দুর্বল বাঁশ ভার নিতে পারে না। আবার অতিরিক্ত কাঁচা বাঁশও সবসময় উপযুক্ত নয়।
বাঁশ কতদিনের, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং কোন অংশটি ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বর্তমান সময়ে নিরাপত্তার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
প্রশ্ন: আগে গ্রামের মানুষ কীভাবে বুঝতেন সাঁকো দুর্বল হয়ে গেছে?
নীলাদ্রি:
অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকটা বুঝতেন।
বাঁশের গায়ে ফাটল দেখা দিয়েছে কি না, পায়ের নিচে অস্বাভাবিক নড়াচড়া হচ্ছে কি না, বাঁশের বাঁধন আলগা হয়েছে কি না—এসব তাঁরা লক্ষ্য করতেন।
কিন্তু শুধু অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বর্তমানে নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করা দরকার।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকোর সঙ্গে গ্রামের শিশুদের স্মৃতির সম্পর্ক কেমন?
নীলাদ্রি:
অসাধারণ।
অনেকের শৈশবের গল্পে বাঁশের সাঁকো থাকে। স্কুলে যাওয়ার পথে সাঁকো পার হওয়া, বর্ষায় সাঁকো কাঁপা, বন্ধুর হাত ধরে পার হওয়া—এসব স্মৃতি খুব সাধারণ।
কেউ কেউ ছোটবেলায় সাঁকো পার হতে ভয় পেতেন। পরে বড় হয়ে সেই ভয় কেটে যায়।
এই অভিজ্ঞতাগুলো গ্রামের সামাজিক স্মৃতির অংশ।
প্রশ্ন: বর্ষাকালে বাঁশের সাঁকোর গুরুত্ব কি বাড়ত?
নীলাদ্রি:
অনেক ক্ষেত্রে বাড়ত।
বর্ষায় ছোট খাল বা নিচু জমিতে জল জমে গেলে সাধারণ পথ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ত। তখন সাঁকো পারাপারের পথ তৈরি করত।
কখনও পুরনো সাঁকো মেরামত করতে হতো, কখনও জল বেড়ে গেলে নতুন করে কাঠামো তৈরি করতে হতো।
অর্থাৎ সাঁকোর জীবনচক্রও ঋতুর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
প্রশ্ন: গ্রামের মানুষ নিজেরাই সাঁকো তৈরি করতেন?
নীলাদ্রি:
অনেক জায়গায় করতেন।
সব গ্রামে পেশাদার সাঁকো নির্মাতা ছিলেন না। স্থানীয় বাঁশশিল্পী, কাঠমিস্ত্রি বা অভিজ্ঞ কৃষকেরা মিলে কাজ করতেন।
একজন বাঁশ কাটতেন, কেউ মাপ নিতেন, কেউ বাঁধন দিতেন, কেউ কাঠামো ধরে রাখতেন।
এটি ছিল সমবায়ধর্মী কাজ।
প্রশ্ন: এই ধরনের কাজ কি গ্রামীণ সহযোগিতার উদাহরণ?
নীলাদ্রি:
অবশ্যই।
একটি সাঁকো একজন মানুষের জন্য তৈরি হয় না। সবাই ব্যবহার করবেন বলেই সবাইকে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হতে হতো।
কেউ বাঁশ দিতেন, কেউ শ্রম দিতেন, কেউ খাবার বা অন্যান্য সহযোগিতা করতেন।
গ্রামবাংলায় এমন বহু কাজ ছিল যা অর্থের বিনিময়ে নয়, পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পন্ন হতো।
প্রশ্ন: এখন পাকা সেতু তৈরি হওয়ার ফলে এই সামাজিক সহযোগিতার প্রয়োজন কমেছে?
নীলাদ্রি:
এক অর্থে হ্যাঁ।
পাকা সেতু স্থায়ী ও তুলনামূলক নিরাপদ। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন নির্মাণ করে দিলে গ্রামের মানুষকে প্রতিবছর সাঁকো বানাতে হয় না।
এটি উন্নয়নের দিক থেকে অবশ্যই ইতিবাচক।
তবে এর ফলে স্থানীয়ভাবে একসঙ্গে কাজ করার কিছু পুরনো অভ্যাসও কমে গেছে।
প্রশ্ন: তাহলে কি আপনি পাকা সেতুর বিরোধিতা করছেন?
নীলাদ্রি:
একেবারেই না।
মানুষের নিরাপত্তা ও উন্নত যোগাযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে পাকা সেতুর প্রয়োজন, সেখানে অবশ্যই পাকা সেতু হওয়া উচিত।
আমি শুধু বলছি, বাঁশের সাঁকোকে আমাদের ইতিহাস ও স্থানীয় প্রযুক্তির অংশ হিসেবে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
সব জায়গায় পাকা সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়। আবার কিছু ছোট জলপথে অস্থায়ী বা কম ব্যয়ের কাঠামোরও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকো কি পরিবেশবান্ধব?
নীলাদ্রি:
উপকরণের দিক থেকে বাঁশ একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য উদ্ভিদ। তাই সঠিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাঁশের ব্যবহার পরিবেশগতভাবে উপযোগী হতে পারে।
তবে যেকোনো নির্মাণের মতোই এরও পরিবেশগত প্রভাব আছে। বাঁশ সংগ্রহের পদ্ধতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারের পরে উপকরণ কীভাবে ফেলা হচ্ছে—এসব বিবেচনা করা দরকার।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকো কি আধুনিক গ্রামীণ পর্যটনে ব্যবহার করা যেতে পারে?
নীলাদ্রি:
খুব ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়।
গ্রামীণ পর্যটনে প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট খালের উপর নিরাপদভাবে তৈরি ঐতিহ্যবাহী বাঁশের সাঁকো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে পর্যটনের জন্য সাঁকো তৈরি করলে নিরাপত্তার মান অনেক বেশি রাখতে হবে। শুধু দেখতে সুন্দর হলেই চলবে না।
প্রশ্ন: সাঁকোর নকশায় কি স্থানীয় বৈচিত্র্য ছিল?
নীলাদ্রি:
ছিল।
কোথাও সাঁকো ছিল সম্পূর্ণ বাঁশের, কোথাও কাঠ ও বাঁশের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও সরু পথ, কোথাও তুলনামূলক চওড়া।
জলপথের প্রস্থ ও স্থানীয় উপকরণ অনুযায়ী নকশা বদলাত।
এই বৈচিত্র্য নথিবদ্ধ করা দরকার।
প্রশ্ন: পুরনো সাঁকোর ছবি বা তথ্য সংগ্রহ করা কেন জরুরি?
নীলাদ্রি:
কারণ অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পরে আমরা বুঝতে পারি যে তার কোনো নথিই নেই।
কোনো গ্রামের পুরনো সাঁকো হয়তো এখন আর নেই। কিন্তু তার ছবি, নির্মাণের গল্প, ব্যবহারকারীদের স্মৃতি—এসব সংগ্রহ করলে স্থানীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংরক্ষিত হয়।
এ কাজে গ্রামের প্রবীণ মানুষের সাক্ষাৎকার খুব মূল্যবান।
প্রশ্ন: সাঁকোকে কেন্দ্র করে কি স্থানীয় লোককথা বা গল্প তৈরি হয়েছে?
নীলাদ্রি:
অনেক জায়গায় হয়েছে।
কোনো সাঁকোতে প্রথমবার কে পড়ে গিয়েছিল, কে বিয়ের সময় বরযাত্রী নিয়ে সাঁকো পার হয়েছিল, কোন সাঁকো বর্ষায় ভেঙে গিয়েছিল—এসব নিয়ে স্থানীয় গল্প থাকে।
কখনও কোনো সাঁকো গ্রামের দুটি পাড়ার মানুষের পরিচিতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
এগুলো লিখে রাখা দরকার।
প্রশ্ন: আজকের শিশুদের কাছে বাঁশের সাঁকোকে কীভাবে শিক্ষার বিষয় করা যায়?
নীলাদ্রি:
স্থানীয় ইতিহাস প্রকল্পের মাধ্যমে।
শিশুরা গ্রামের পুরনো সাঁকোর ছবি সংগ্রহ করতে পারে। প্রবীণ মানুষদের সাক্ষাৎকার নিতে পারে। সাঁকো কীভাবে তৈরি হতো তার মডেল বানাতে পারে।
বিজ্ঞানের ক্লাসে ভারসাম্য ও কাঠামো বোঝানো যায়। ভূগোলের ক্লাসে জলপথ ও বসতির সম্পর্ক আলোচনা করা যায়।
অর্থাৎ একটি সাঁকোকে কেন্দ্র করে বহু বিষয় শেখানো সম্ভব।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?
নীলাদ্রি:
স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা।
বাঁশ প্রাকৃতিক উপাদান। জল, রোদ, পোকামাকড় এবং আবহাওয়ার কারণে সময়ের সঙ্গে ক্ষয় হতে পারে।
তাই নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু বা ভারী বোঝা নিয়ে মানুষ পারাপার করলে অতিরিক্ত সতর্কতা দরকার।
প্রশ্ন: এখন কি নতুন প্রজন্ম এই ধরনের নির্মাণশৈলী শিখতে আগ্রহী?
নীলাদ্রি:
আগ্রহ আছে, কিন্তু সুযোগ কম।
অনেক তরুণ মনে করেন এই কাজের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। ফলে পুরনো কারিগরি জ্ঞান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
যদি বাঁশের নির্মাণকে আধুনিক ডিজাইন, পর্যটন, পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তরুণদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকো তৈরির জ্ঞান কি আধুনিক স্থাপত্যে কাজে লাগতে পারে?
নীলাদ্রি:
অবশ্যই।
বাঁশ এখন বিশ্বজুড়েই টেকসই নির্মাণ উপকরণ হিসেবে আলোচিত। তাই ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ নির্মাণজ্ঞান আধুনিক প্রকৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।
তবে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিকে হুবহু ব্যবহার না করে আধুনিক নিরাপত্তা মান, প্রকৌশলগত পরীক্ষা এবং উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করতে হবে।
প্রশ্ন: গ্রামের ছোট জলপথের জন্য সবসময় কি বড় সেতু দরকার?
নীলাদ্রি:
সব ক্ষেত্রে নয়। তবে সিদ্ধান্ত অবশ্যই বাস্তব পরিস্থিতি দেখে নিতে হবে।
যেখানে সারা বছর মানুষের যাতায়াত বেশি, স্কুল, বাজার বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার প্রধান পথ—সেখানে স্থায়ী সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সাময়িক বা কম ব্যবহৃত পথের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত কম ব্যয়ের কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে।
মূল কথা হলো নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারীর প্রয়োজন।
প্রশ্ন: সাঁকো নির্মাণের সঙ্গে নারীদের কোনো ভূমিকা ছিল?
নীলাদ্রি:
সরাসরি নির্মাণকাজে অনেক সময় পুরুষেরা বেশি যুক্ত থাকলেও নারীদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
তাঁরা বাঁশ সংগ্রহের কাজে সহযোগিতা করেছেন, নির্মাণকাজে সহায়তা করেছেন, শ্রমিকদের খাবার তৈরি করেছেন এবং স্থানীয়ভাবে সাঁকোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছেন।
গ্রামীণ অবকাঠামোর ইতিহাস লিখতে গেলে শুধু পুরুষ কারিগরদের নয়, নারীদের অবদানও নথিবদ্ধ করা দরকার।
প্রশ্ন: সাঁকোর সঙ্গে কৃষির কোনো সম্পর্ক আছে?
নীলাদ্রি:
অবশ্যই।
অনেক কৃষককে জমিতে যেতে ছোট খাল পার হতে হয়। ফসল, কৃষি সরঞ্জাম বা গবাদি পশু নিয়ে পারাপারের জন্য সাঁকোর প্রয়োজন হতে পারে।
তবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত ভারী বোঝা পরিবহনের জন্য সরু বাঁশের সাঁকো সবসময় উপযুক্ত নয়। সেখানে শক্তিশালী কাঠামোর প্রয়োজন।
প্রশ্ন: সাঁকো কি কোনো গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে?
নীলাদ্রি:
যোগাযোগ উন্নত হলে অবশ্যই।
একটি খালের কারণে যদি মানুষ বাজারে যেতে অতিরিক্ত কয়েক কিলোমিটার ঘুরে যায়, তাহলে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা হলে সময় ও খরচ দুটোই কমে।
কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়। স্কুলে যাওয়া সহজ হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো সহজ হয়।
অর্থাৎ ছোট একটি পারাপারের পথও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রশ্ন: আপনি যদি একটি পুরনো বাঁশের সাঁকো সংরক্ষণ করতে চান, কীভাবে করবেন?
নীলাদ্রি:
প্রথমে তার ইতিহাস সংগ্রহ করব।
কবে তৈরি হয়েছিল, কে তৈরি করেছিলেন, কত বছর ব্যবহার হয়েছে, কোন কোন পরিবার ব্যবহার করেছে—এসব নথিভুক্ত করতে হবে।
তারপর বর্তমান কাঠামোর অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। যদি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ সম্ভব হয়, তাহলে ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে।
তবে সংরক্ষণ মানে মানুষের বিপজ্জনকভাবে ব্যবহার করা নয়।
প্রশ্ন: বাঁশের সাঁকো কি আজকের দিনে নতুনভাবে জনপ্রিয় হতে পারে?
নীলাদ্রি:
হ্যাঁ, তবে পুরনো রূপে নয়—নতুন অর্থে।
প্রকৃতি পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন, পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য, স্থানীয় উৎসব এবং শিক্ষামূলক প্রকল্পের সঙ্গে এটি যুক্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে পুরনো কারিগরি জ্ঞানও সংরক্ষণ করা যাবে।
প্রশ্ন: আপনার মতে সাঁকোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
নীলাদ্রি:
সীমিত সম্পদ দিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করা যায়।
গ্রামের মানুষের কাছে সবসময় বড় যন্ত্র বা বড় বাজেট ছিল না। কিন্তু তাঁদের কাছে ছিল অভিজ্ঞতা, স্থানীয় উপকরণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা।
বাঁশের সাঁকো সেই বুদ্ধির একটি উদাহরণ।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। আপনি যদি আজকের প্রজন্মকে বাঁশের সাঁকো সম্পর্কে একটি কথা বলতে চান, কী বলবেন?
নীলাদ্রি:
বলব—একটি সাঁকোকে শুধু দুই পাড়ের মাঝের কাঠামো হিসেবে দেখবেন না।
এটি দুই পাড়ের মানুষের সম্পর্কেরও প্রতীক।
এক পাড়ে বাড়ি, অন্য পাড়ে স্কুল। একদিকে কৃষকের জমি, অন্যদিকে বাজার। একদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অন্যদিকে তার প্রয়োজন।
সাঁকো সেই দূরত্ব কমায়।
আজ পাকা সেতু আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। সেটি উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সেই উন্নতির পথে আমরা যেন নিজেদের পুরনো জ্ঞান ও ইতিহাসকে ভুলে না যাই।
কারণ ভবিষ্যৎ তৈরি হয় শুধু নতুন প্রযুক্তি দিয়ে নয়; অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিয়ে।
সাক্ষাৎকার-পরবর্তী কথা
গ্রামবাংলার বাঁশের সাঁকো হয়তো অনেক জায়গায় আজ আর আগের মতো নেই। কোথাও তার জায়গা নিয়েছে পাকা সেতু, কোথাও কংক্রিটের কালভার্ট, কোথাও আবার জলপথই ভরাট হয়ে গেছে।
তবুও সাঁকোর স্মৃতি রয়ে গেছে মানুষের জীবনে।
একটি বাঁশের সাঁকো আমাদের শেখায়—স্থানীয় মানুষ তাদের পরিবেশকে বুঝে কীভাবে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেন। এর মধ্যে রয়েছে কারিগরি জ্ঞান, সামাজিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার।
আধুনিক উন্নয়নের সঙ্গে পুরনো ঐতিহ্যের সংঘাত তৈরি করার প্রয়োজন নেই। বরং নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুরনো জ্ঞানকে নথিবদ্ধ করে তার উপযোগী অংশকে নতুনভাবে কাজে লাগানোই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
কারণ একটি সেতু শুধু জলপথ পার করে না—কখনও কখনও একটি সেতু একটি গ্রামের ইতিহাসকেও এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেয়।













Leave a Reply