গাছছোঁয়া: গাছের ছায়ায় দৌড়ঝাঁপের আনন্দ, হারিয়ে যেতে বসা এক পুরনো খেলা।।

একসময় গ্রামবাংলার বিকেল মানেই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে কিংবা গাছতলায় ছুটে বেড়ানো। বাড়ির উঠোন, পুকুরপাড়ের খোলা জায়গা বা গ্রামের বড় গাছের আশপাশে শিশুদের খেলাধুলা জমে উঠত। খেলতে খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন হতো না। কখনও একটি বল, কখনও কয়েকটি কাঠি, আবার কখনও শুধু একটি গাছই হয়ে উঠত খেলার কেন্দ্র।

গাছকে কেন্দ্র করে দৌড়ঝাঁপের যে ধরনের খেলা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল, তার মধ্যে গাছছোঁয়া নামটি লোকখেলার বিবরণে পাওয়া যায়। এই ধরনের খেলায় একটি গাছ বা নির্দিষ্ট গাছকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা হতো। একজন খেলোয়াড় অন্যদের ধরার চেষ্টা করত, আর বাকিরা গাছ ছুঁয়ে নিরাপদ থাকার সুযোগ খুঁজত।

তবে গাছছোঁয়ার নিয়ম সর্বত্র এক ছিল, এমন বলা যায় না। স্থানীয় শিশুদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে খেলাটির ধরন বদলাতে পারত।

কীভাবে খেলা হতো?

খেলার একটি সহজ রূপে কয়েকজন শিশু একটি বড় গাছের আশপাশে জড়ো হতো। তাদের মধ্যে একজনকে অন্যদের ধরার দায়িত্ব দেওয়া হতো। বাকি খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট দূরত্বে ছড়িয়ে থাকত।

খেলা শুরু হলে ধরার দায়িত্বে থাকা খেলোয়াড় অন্যদের স্পর্শ করার চেষ্টা করত। অন্যরা গাছের গুঁড়ি ছুঁয়ে নিরাপদ থাকার সুযোগ খুঁজত। কিছু প্রচলিত রীতিতে গাছ ছুঁয়ে থাকলে সাময়িক নিরাপত্তা পাওয়া যেত, আবার অন্য রীতিতে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা চলত না।

যে খেলোয়াড় ধরা পড়ত, তাকে পরবর্তী পালায় ধরার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারত। এভাবেই খেলা চলতে থাকত।

এটি গাছকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা দৌড়ঝাঁপের খেলার একটি সাধারণ বর্ণনা। সব অঞ্চলের গাছছোঁয়া খেলায় এই একই নিয়ম ছিল বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

গাছ কেন হয়ে উঠত খেলার কেন্দ্র?

পুরনো দিনের গ্রামীণ পরিবেশে বড় গাছ ছিল পরিচিত দৃশ্য। বট, অশ্বত্থ, আম, জাম কিংবা অন্য ছায়াদার গাছের নিচে মানুষ বিশ্রাম নিত, গল্প করত এবং শিশুদের খেলাধুলারও জায়গা তৈরি হতো।

খোলা জায়গায় একটি গাছকে কেন্দ্র করে খেলার নিয়ম তৈরি করা সহজ ছিল। গাছটি খেলোয়াড়দের কাছে একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন হিসেবে কাজ করত। কোথায় নিরাপদ থাকতে হবে, কোথায় থেকে দৌড় শুরু হবে—এসব বুঝতে সুবিধা হতো।

এই ধরনের খেলার জন্য কোনো দামি সরঞ্জাম দরকার হতো না। শুধু কয়েকজন বন্ধু এবং নিরাপদ একটি খোলা জায়গা থাকলেই খেলার পরিবেশ তৈরি হতে পারত।

দৌড় ও উপস্থিত বুদ্ধির খেলা

গাছছোঁয়ার মতো খেলায় শুধু দ্রুত দৌড়ানোই যথেষ্ট ছিল না। কখন গাছের দিকে এগোতে হবে, কখন অন্যদিকে সরে যেতে হবে এবং কখন প্রতিপক্ষের মনোযোগ অন্য দিকে রয়েছে—এসব বুঝে চলারও প্রয়োজন হতো।

কেউ হয়তো গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকত, আবার কেউ একটু দূরে সরে গিয়ে ধরার দায়িত্বে থাকা খেলোয়াড়কে অন্য দিকে টানার চেষ্টা করত। সুযোগ বুঝে সে গাছের দিকে ছুটে আসত।

এই কৌশলগত দিক খেলাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলত। তবে খেলাটির নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কৌশলগুলির ধরন বদলাতে পারে।

বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে শেখা

দলবদ্ধ দৌড়ঝাঁপের খেলায় শিশুদের পালা মেনে চলা, অন্যদের সঙ্গে নিয়ম ভাগ করে নেওয়া এবং জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

গাছছোঁয়ার মতো খেলায় সবাইকে খেলার সীমানা বুঝতে হয়। কেউ ধরা পড়লে পরবর্তী পালা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়েও খেলোয়াড়দের মধ্যে সমঝোতা দরকার হয়।

এই সাধারণ নিয়মগুলি শিশুদের একসঙ্গে খেলতে শেখার অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে। তবে এসব থেকে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত বা শারীরিক ফল নিশ্চিত হয়, এমন দাবি করা ঠিক নয়। খেলাটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আনন্দের সঙ্গে সময় কাটানো।

লোকখেলার নিয়ম মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত

বাংলার অনেক লোকখেলার মতো গাছছোঁয়ার ক্ষেত্রেও স্থানীয় রীতি গুরুত্বপূর্ণ। এক এলাকার শিশুরা যে নিয়মে খেলত, অন্য এলাকার শিশুরা হয়তো অন্যভাবে খেলত।

কোথাও একটি গাছকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা হতো, কোথাও একাধিক গাছের মধ্যে দৌড়ে যাওয়ার নিয়ম থাকতে পারত। আবার কোথাও ধরা পড়া খেলোয়াড়ের পালা বদলানোর পদ্ধতিও আলাদা হতে পারত।

এই পরিবর্তন লোকখেলার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঐতিহ্য নিয়ে লিখতে হলে স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতি এবং নির্ভরযোগ্য নথি থেকে নিয়ম যাচাই করা জরুরি।

কেন কমে যাচ্ছে এমন খেলা?

সময়ের সঙ্গে শিশুদের অবসর কাটানোর ধরন বদলেছে। অনেক জায়গায় খোলা মাঠ কমেছে, গাছপালায় ঘেরা নিরাপদ জায়গাও আগের মতো নেই। পড়াশোনার চাপ, শহুরে জীবন এবং ডিজিটাল বিনোদনের প্রসারের ফলে শিশুদের বাইরে দল বেঁধে খেলার সুযোগ কমে যেতে পারে।

এ ছাড়া পুরনো খেলাগুলি শেখানোর মতো মানুষ না থাকলে তাদের নাম ও নিয়মও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। অনেক শিশু হয়তো আজও বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপের খেলা খেলে, কিন্তু সেই খেলার পুরনো নাম বা স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে জানে না।

এই কারণেই লোকখেলার নাম, নিয়ম ও স্মৃতি সংগ্রহ করা জরুরি। এতে বোঝা যায়, একসময় মানুষের দৈনন্দিন পরিবেশ কীভাবে শিশুদের বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছিল।

স্কুলে কীভাবে পরিচয় করানো যায়?

গাছছোঁয়ার মতো খেলা স্কুলের ক্রীড়া অনুষ্ঠান বা পাড়ার শিশুদের মিলনমেলায় পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে প্রথমে খেলার নিয়ম পরিষ্কার করে নিতে হবে।

খেলার জন্য একটি নিরাপদ, সমতল জায়গা বেছে নেওয়া উচিত। বাস্তব গাছের বদলে মাটিতে আঁকা একটি বৃত্ত বা নিরাপদ চিহ্নকেও আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা লাগা বা ভিড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।

শিশুদের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী দৌড়ানোর দূরত্ব ঠিক করতে হবে। কাউকে ধাক্কা দিয়ে ধরা, গাছের গায়ে জোরে ধাক্কা মারা কিংবা অন্যকে টেনে সরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না।

নিরাপত্তার বিষয়টি জরুরি

দৌড়ঝাঁপের খেলা আয়োজন করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা দরকার।

  • ভাঙা ডাল, পাথর, কাচ ও গর্তমুক্ত জায়গা বেছে নিতে হবে।
  • গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা দিয়ে বা গাছে উঠে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
  • ভেজা বা পিচ্ছিল মাটিতে দৌড়ানো এড়িয়ে চলতে হবে।
  • ধাক্কাধাক্কি, টানাটানি ও জোর করে স্পর্শ করা চলবে না।
  • ছোট শিশুদের খেলায় বড়দের নজরদারি রাখা উচিত।
  • কেউ ক্লান্ত হলে তাকে বিশ্রাম নিতে দিতে হবে।

খেলার আনন্দ যেন কখনও আঘাতের কারণ না হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

গাছছোঁয়ার মতো দৌড়ঝাঁপের খেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পুরনো দিনের শিশুদের বিনোদন কতটা সহজ ও পরিবেশকেন্দ্রিক ছিল। একটি গাছ, কিছু বন্ধু এবং দৌড়ানোর মতো সামান্য জায়গাই যথেষ্ট ছিল আনন্দের পরিবেশ তৈরি করতে।

তবে এই ধরনের লোকখেলার নাম ও নিয়ম বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা হতে পারে। তাই বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে এগুলিকে সংরক্ষণ করতে হলে প্রবীণদের স্মৃতি সংগ্রহ এবং স্থানীয় তথ্য যাচাই করা দরকার।

সময়ের সঙ্গে খেলার ধরন বদলালেও শিশুদের একসঙ্গে খেলার আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। নিরাপদ পরিবেশে গাছছোঁয়ার মতো সহজ খেলাকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া গেলে তারা যেমন বাইরে সক্রিয় থাকার সুযোগ পাবে, তেমনই বাংলার লোকজ শৈশবের স্মৃতির সঙ্গেও পরিচিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *