১. পুরোনো বাড়ির মানুষটি
পূর্ব মেদিনীপুরের শ্যামপুর নামে একটি ছোট্ট জনপদে থাকত ষোলো বছরের অয়ন। পড়াশোনায় সে মোটামুটি ভালো, কিন্তু তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল—মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা।
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সে প্রায়ই বাজারের পাশের পুরোনো ডাকঘরটির সামনে দাঁড়াত। ডাকঘরটি এখন আর আগের মতো ব্যস্ত নয়। একসময় যেখানে চিঠির বস্তা আসত, ডাকপিয়নেরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন, সেখানে এখন কয়েকজন মানুষ পেনশন ও ডাকসংক্রান্ত কাজের জন্য আসেন।
একদিন বিকেলে অয়ন দেখল, ডাকঘরের সিঁড়িতে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর হাতে একটি পুরোনো খাম। খামের কাগজ হলদে হয়ে গেছে, কালির অক্ষরও প্রায় মুছে এসেছে।
বৃদ্ধটি বারবার খামটি চোখের কাছে নিয়ে দেখছেন।
অয়ন কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কিছু খুঁজছেন, কাকু?”
বৃদ্ধ মুখ তুলে বললেন, “একটা ঠিকানা। বহু বছর আগে এই ঠিকানায় আমার ছোট ভাই থাকত। অনেক দিন যোগাযোগ নেই। চিঠি লিখতে চাই, কিন্তু ঠিকানাটা এখন আর বুঝতে পারছি না।”
অয়ন খামটি হাতে নিয়ে দেখল। তাতে একটি গ্রামের নাম, পুরোনো রাস্তার উল্লেখ এবং কয়েকটি অস্পষ্ট সংখ্যা লেখা রয়েছে।
“আপনি কি জানেন, আপনার ভাই এখন কোথায় থাকেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“না বাবা। শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, তখন আমাদের দুজনেরই বয়স কম। পরে কাজের জন্য আলাদা হয়ে গেলাম। প্রথমে চিঠি আসত। তারপর একদিন ডাকঘর থেকে চিঠি ফিরে এল। সেই থেকে আর যোগাযোগ নেই।”
বৃদ্ধের নাম হরিপদ মাইতি।
অয়ন খামটি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। তবে ঠিকানা খুঁজে পাব, এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “এত বছর কেউ চেষ্টা করেনি বাবা। তুই অন্তত কথাটা শুনলি।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অয়নের মনে হতে লাগল, মানুষের জীবনে কত সম্পর্ক শুধু একটি ঠিকানা হারিয়ে যাওয়ার কারণে দূরে সরে যায়!
২. একটি নতুন ভাবনা
রাতে খাওয়ার সময় অয়ন তার বাবাকে হরিপদবাবুর কথা বলল। তার বাবা স্থানীয় একটি দোকানে কাজ করতেন। তিনি বললেন, “আগে মানুষের ঠিকানা খুব সহজ ছিল। গ্রামের নাম, কার বাড়ির পাশে কার বাড়ি—এসব দিয়েই চিঠি পৌঁছে যেত। এখন রাস্তার নাম বদলেছে, বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি হয়েছে, অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন।”
অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে পুরোনো ঠিকানা খুঁজে বের করার কোনো উপায় নেই?”
বাবা বললেন, “উপায় থাকতে পারে। পুরোনো ডাকঘরের নথি, গ্রামের প্রবীণ মানুষদের স্মৃতি, পঞ্চায়েতের প্রকাশ্য তথ্য—সব মিলিয়ে খোঁজ করা যায়। তবে কারও ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজতে বা অন্যের কাছে দিতে হলে তাঁর অনুমতি ও গোপনীয়তার কথা মনে রাখতে হবে।”
বাবার কথাটি অয়নের মনে গেঁথে গেল।
পরদিন স্কুলে গিয়ে সে তার বন্ধু রুদ্র ও সায়ন্তনকে বিষয়টি জানাল। তারা প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে আগ্রহী হয়ে উঠল।
রুদ্র বলল, “আমরা কি এমন একটা দল করতে পারি, যারা বয়স্ক মানুষদের পুরোনো ঠিকানা, পরিচিত মানুষের যোগাযোগ বা প্রয়োজনীয় সরকারি অফিসের ঠিকানা খুঁজতে সাহায্য করবে?”
সায়ন্তন বলল, “কিন্তু আমরা তো গোয়েন্দা নই!”
অয়ন হেসে বলল, “গোয়েন্দা হতে হবে না। আমরা শুধু সঠিক প্রশ্ন করব, প্রকাশ্য তথ্য দেখব, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করব। আর যেটা পারব না, সেটা পারব না বলব।”
তিন বন্ধু মিলে তাদের উদ্যোগের নাম দিল—‘ঠিকানার সেতু’।
তারা ঠিক করল, প্রথমে স্কুলের শিক্ষকের অনুমতি নেবে। তারপর এলাকার প্রবীণ মানুষদের সাহায্যের জন্য একটি ছোট স্বেচ্ছাসেবী দল গড়বে।
৩. প্রথম খোঁজ
পরের শনিবার অয়ন হরিপদবাবুর বাড়িতে গেল। সঙ্গে ছিল রুদ্র।
বাড়িটি পুরোনো হলেও পরিচ্ছন্ন। ছোট উঠোনের এক পাশে তুলসীগাছ, অন্য পাশে একটি কাঠের চেয়ার। হরিপদবাবু তাঁদের দেখে খুশি হলেন।
অয়ন বলল, “আপনার ভাইয়ের নাম, বয়স, পুরোনো গ্রামের নাম আর যতটা মনে আছে সব বলুন। আমরা লিখে নিচ্ছি।”
বৃদ্ধের ভাইয়ের নাম ছিল গোপাল মাইতি। ছোটবেলায় তাঁরা একই গ্রামে থাকতেন। পরে গোপাল কাজের জন্য অন্য জেলায় চলে যান। তাঁর পুরোনো চিঠিতে একটি বাজারের নাম এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উল্লেখ ছিল।
অয়ন সব তথ্য খাতায় লিখে নিল। তারপর হরিপদবাবুর অনুমতি নিয়ে পুরোনো খামটির ছবি তুলল। ছবিটি সে কোথাও প্রকাশ করল না। শুধু নিজের কাজের জন্য রাখল।
প্রথমে তারা গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলল। কেউ গোপালবাবুকে চিনতে পারলেন না। একজন বললেন, বহু বছর আগে ওই নামের একজন মানুষ পাশের জেলার একটি বাজারে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তবে তিনি নিশ্চিত নন।
পরের দিন অয়ন ও রুদ্র স্থানীয় গ্রন্থাগারে গেল। সেখানে পুরোনো এলাকার মানচিত্র এবং কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকা ছিল। তারা বাজারের নামটি খুঁজে পেল, কিন্তু ঠিকানার সঙ্গে মিলল না।
তিন দিন কেটে গেল।
অয়ন বুঝতে পারল, শুধু উৎসাহ থাকলেই হবে না। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়। একই নামের একাধিক মানুষ থাকতে পারেন। অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে খুঁজে পাওয়া গেছে বলে ঘোষণা করা বিপজ্জনক।
তারা ঠিক করল, হরিপদবাবুর কাছ থেকে আরও তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছবে না।
৪. স্মৃতির ছোট্ট সূত্র
একদিন হরিপদবাবু অয়নকে ডাকলেন।
“বাবা, একটা কথা মনে পড়েছে। আমার ভাই যে জায়গায় থাকত, সেখানে একটা বড় লাল রঙের পানির ট্যাংক ছিল। আর কাছেই ছিল ‘শান্তি’ নামে একটা ওষুধের দোকান।”
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে খাতায় কথাটি লিখল।
রুদ্র বলল, “এখনও কি সেই দোকান আছে?”
হরিপদবাবু জানতেন না।
অয়ন তাদের স্কুলের ভূগোলের শিক্ষককে বিষয়টি জানাল। শিক্ষক বললেন, “পুরোনো বাজারের নাম আর ওই ট্যাংকের কথা মিলিয়ে এলাকাটি চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির বর্তমান ঠিকানা অনুমান করে ছড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।”
শিক্ষকের পরামর্শে তারা প্রথমে পুরোনো বাজারটির নাম যাচাই করল। পরে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রকাশ্য ব্যবসায়িক তালিকায় ‘শান্তি’ নামের একটি ওষুধের দোকানের উল্লেখ পেল। দোকানটির নাম বদলেছে কি না, সেটিও তারা যাচাই করার চেষ্টা করল।
একটি ফোন নম্বর পাওয়া গেল। কিন্তু অয়ন সরাসরি গোপালবাবুর ঠিকানা জানতে চাইল না। সে দোকানে ফোন করে জানাল, তারা একজন প্রবীণ ব্যক্তির পারিবারিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করছে। দোকানদার যদি কাউকে চিনে থাকেন, তবে গোপালবাবুর অনুমতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটাই জানতে চাইল।
দোকানদার প্রথমে কিছু মনে করতে পারলেন না। পরে বললেন, “এই নামে একজন বৃদ্ধ আমাদের এলাকায় থাকতেন। তবে তিনি এখনও এখানে আছেন কি না, জানি না। আমি পাশের পুরোনো বাড়ির একজন বাসিন্দাকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারি।”
অয়ন তাঁকে হরিপদবাবুর ফোন নম্বর দিতে চাইল না। বরং বলল, “যদি তাঁকে চিনতে পারেন, তাহলে তাঁকে আমার কাকুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবেন। কাকু কথা বলতে রাজি থাকলে তবেই যোগাযোগ করবেন।”
এভাবেই তারা প্রথমবার বুঝল, কারও সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা আর কারও ব্যক্তিগত ঠিকানা সংগ্রহ করা এক জিনিস নয়।
৫. অপেক্ষার দিন
এক সপ্তাহ কেটে গেল। কোনো খবর এল না।
হরিপদবাবু মাঝে মাঝে অয়নকে জিজ্ঞাসা করতেন, “কিছু জানতে পারলি?”
অয়ন প্রতিবার সত্য কথাই বলত, “এখনও নিশ্চিত খবর পাইনি। আমরা চেষ্টা করছি।”
বৃদ্ধের চোখে হতাশা দেখলে অয়নের মন খারাপ হতো। সে চাইত দ্রুত ভালো খবর দিতে। কিন্তু তার শিক্ষক বলেছিলেন, “সাহায্য করার অর্থ কাউকে মিথ্যা আশা দেওয়া নয়। যা জানা আছে, তা বলবে; যা জানা নেই, তা স্পষ্ট করবে।”
একদিন বিকেলে অয়ন স্কুল থেকে ফিরে দেখল, তার ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বার্তা এসেছে। বার্তায় লেখা—একজন ব্যক্তি হরিপদ মাইতি নামটি চিনতে পেরেছেন। তিনি গোপালবাবুর পরিচিত ছিলেন।
অয়ন প্রথমে বার্তাটির সত্যতা যাচাই করল। তারপর শিক্ষক ও হরিপদবাবুর সঙ্গে আলোচনা করে সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলল।
তিনি জানালেন, গোপালবাবু বহু বছর আগে ওই এলাকায় থাকতেন। পরে অসুস্থতার কারণে তাঁর ছেলে তাঁকে অন্য জায়গায় নিয়ে যান। বর্তমান যোগাযোগের ব্যবস্থা তাঁর পরিবারের কাছে থাকতে পারে।
অয়ন আনন্দে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। এখনও গোপালবাবুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয়নি।
সে হরিপদবাবুকে খবর দিল।
বৃদ্ধ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর শুধু বললেন, “তাহলে মানুষটা বেঁচে আছেন কি না, সেটাও হয়তো জানতে পারব!”
কথাটির মধ্যে কত বছরের অপেক্ষা লুকিয়ে ছিল, অয়ন তা অনুভব করল।
৬. ফোনের ওপারে কণ্ঠস্বর
আরও কয়েক দিন পর সেই পরিচিত ব্যক্তি গোপালবাবুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হলেন। পরিবারের অনুমতি নিয়ে হরিপদবাবুর ফোন নম্বর তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলো।
এক সন্ধ্যায় হরিপদবাবুর ফোন বেজে উঠল।
অয়ন সেদিন তাঁর বাড়িতেই ছিল। বৃদ্ধ কাঁপা হাতে ফোন ধরলেন।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে ভেসে এল একটি দুর্বল কণ্ঠস্বর, “দাদা? তুমি কি হরিপদদা?”
হরিপদবাবু কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
তারপর বললেন, “গোপাল! তুই?”
ওপাশের মানুষটিও কাঁদছিলেন। দুজনের মধ্যে প্রথমে কোনো কথা ছিল না—শুধু কান্না আর দীর্ঘশ্বাস।
কিছুক্ষণ পরে গোপালবাবু বললেন, “দাদা, কত বছর তোমার সঙ্গে কথা হয়নি! ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো আর বেঁচে নেই।”
হরিপদবাবু বললেন, “আমিও তোকে খুঁজেছি রে। ঠিকানাটা হারিয়ে গিয়েছিল। তারপর আর কোনো খবর পাইনি।”
সেদিন তাঁরা অনেক কথা বললেন। শৈশবের স্মৃতি, বাবা-মায়ের কথা, গ্রামের পুরোনো বাড়ি—সব যেন আবার ফিরে এল।
ফোন রাখার আগে গোপালবাবু বললেন, “দাদা, এবার তোমার সঙ্গে দেখা করব। এত বছর আর অপেক্ষা নয়।”
হরিপদবাবু ফোনটি বুকে চেপে ধরলেন।
অয়ন এক পাশে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট ফোনকলের মধ্যে বহু বছরের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমে গেল।
৭. ঠিকানার সেতু বড় হতে থাকে
হরিপদবাবু ও গোপালবাবুর পুনর্মিলনের খবর ধীরে ধীরে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। কয়েকজন প্রবীণ মানুষ অয়নের কাছে এসে তাঁদের পুরোনো পরিচিতদের খোঁজ করার অনুরোধ জানালেন।
অয়ন ও তার বন্ধুরা বুঝল, একসঙ্গে অনেক কাজ শুরু করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। তাই তারা স্কুলের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে একটি নিয়ম তৈরি করল।
প্রথমত, সাহায্য চাইছেন এমন ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করা হবে না।
দ্বিতীয়ত, কাউকে খুঁজে পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো খবর ছড়ানো হবে না।
তৃতীয়ত, ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা বা পারিবারিক তথ্য প্রকাশ্যে পোস্ট করা হবে না।
চতুর্থত, কোনো পরিচয় বা তথ্য যাচাই করা না গেলে সংশ্লিষ্ট ডাকঘর, পঞ্চায়েত বা উপযুক্ত সরকারি দপ্তরের সাহায্য নেওয়া হবে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ছিল—কোনো কাজের জন্য টাকা চাইবে না তারা। কেউ চাইলে স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে পারেন, কিন্তু মানুষের অসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করা হবে না।
কয়েক মাসের মধ্যে তারা তিনজন প্রবীণ মানুষের পুরোনো পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সাহায্য করল। সব খোঁজ সফল হয়নি। একজনের পুরোনো ঠিকানা আর যাচাই করা যায়নি। অন্য একজনের পরিচিত ব্যক্তি মারা গিয়েছিলেন বলে জানা গেল।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা সত্য তথ্য জানিয়েছে। কারও দুঃখকে ছোট করে দেখেনি, আবার অসম্ভব আশাও দেয়নি।
৮. সবচেয়ে বড় পুরস্কার
একদিন স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক অয়ন ও তার বন্ধুদের ডেকে বললেন, “তোমরা খুব বড় কোনো প্রযুক্তি তৈরি করোনি। কিন্তু মানুষের একটি বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছ। সেটাই তোমাদের উদ্যোগের মূল্য।”
অয়ন বলল, “স্যার, আমরা তো শুধু কিছু মানুষকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছি।”
প্রধান শিক্ষক উত্তর দিলেন, “মানুষের জীবনে সব বড় কাজ বড় মঞ্চে হয় না। কখনও একটি মনোযোগ দিয়ে শোনা কথা, একটি যাচাই করা তথ্য, কিংবা একটি ফোনকলও অনেক মূল্যবান হয়ে ওঠে।”
অনুষ্ঠানের শেষে হরিপদবাবু মঞ্চে উঠলেন। তিনি অয়নের হাতে একটি ছোট্ট বাক্স তুলে দিলেন।
বাক্সের মধ্যে ছিল তাঁর পুরোনো খামটি।
তিনি বললেন, “এই খামটা এত বছর ধরে আমার কাছে ছিল। একসময় ভেবেছিলাম, এটা শুধু একটা কাগজ। এখন বুঝেছি, এর মধ্যে আমার ভাইয়ের স্মৃতি ছিল। তুই আমাকে শুধু একটা ঠিকানা খুঁজে দিসনি, আমার জীবনের একটা হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের দরজাও খুলে দিয়েছিস।”
অয়ন বাক্সটি গ্রহণ করল, কিন্তু বলল, “কাকু, এটা আপনার কাছেই থাকুক। এটা আপনার স্মৃতি। আমি শুধু আপনাকে সাহায্য করেছি।”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “ঠিকই বলেছিস। তবে তুই যেন কখনও ভুলে না যাস—মানুষের পাশে দাঁড়াতে সব সময় বড় ক্ষমতা লাগে না। অনেক সময় দরকার হয় ধৈর্য, সততা আর অন্যের কথা শোনার মন।”
৯. একটি নতুন উপলব্ধি
কয়েক সপ্তাহ পরে হরিপদবাবু ও গোপালবাবুর দেখা হলো। দুজনের চুল সাদা, শরীর দুর্বল, কিন্তু মুখে আনন্দের আলো।
তাঁরা একে অপরের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। তাঁদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবু সামনে যতটুকু সময় আছে, তা একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অয়ন দূর থেকে তাঁদের দেখছিল।
সে বুঝল, সব সমস্যার সমাধান হয়তো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনা, সঠিক পথে চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নেওয়া—এসবের মধ্যেও মানুষের জন্য কাজ করার অর্থ লুকিয়ে আছে।
পরের বছর অয়ন স্কুলের নতুন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ‘ঠিকানার সেতু’ উদ্যোগটিকে আরও সংগঠিত করল। তারা প্রবীণদের ডিজিটাল পরিষেবা বুঝতে সাহায্য করত, পুরোনো সরকারি দপ্তরের যোগাযোগের তথ্য খুঁজে দিত এবং প্রয়োজনে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নিরাপদ পথ দেখাত।
অয়ন কখনও নিজেকে কোনো মহান মানুষ ভাবেনি। সে জানত, তার কাজের সীমাবদ্ধতা আছে। তবু যখনই কোনো প্রবীণ মানুষ বলতেন, “বাবা, একটু শুনবি?”—অয়ন নিজের কাজ থামিয়ে তাঁর পাশে বসত।
কারণ সে শিখেছিল, মানুষের জীবনে কিছু দূরত্ব রাস্তার দূরত্ব নয়। সেগুলো তৈরি হয় সময়, ভুল বোঝাবুঝি, হারিয়ে যাওয়া যোগাযোগ আর দীর্ঘ অপেক্ষা থেকে।
সেই দূরত্ব কমানোর জন্য কখনও একটি সেতু তৈরি করতে হয় ইট-পাথর দিয়ে, আর কখনও তৈরি করতে হয় বিশ্বাস দিয়ে।
শিক্ষা: অন্যের সমস্যার সমাধান করতে গেলে সহানুভূতির পাশাপাশি প্রয়োজন সততা, ধৈর্য, তথ্য যাচাই এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান। সব চেষ্টা সফল না হলেও, আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর মূল্য কখনও ছোট নয়।













Leave a Reply