
শহরের পুরনো আদালত ভবনের পাশের গলিতে একটি ছোট্ট দোকান ছিল। দোকানের নাম—‘ওজনঘর’। সেখানে চাল, ডাল কিংবা মশলা বিক্রি হতো না। দোকানের মালিক নিবারণবাবু মানুষের বলা কথার ওজন মাপতেন।
অবশ্য তাঁর কাছে কোনো দাঁড়িপাল্লা ছিল না। ছিল একটি পুরনো টেবিল, কয়েকটি খাতা এবং দেওয়ালে টাঙানো হাতে লেখা একটি বাক্য—‘কথা বলার আগে ভেবে নাও, এই কথার ভার অন্য কেউ বইতে পারবে তো?’
প্রতিদিন দুপুরে আদালতের কর্মচারী, আইনজীবী, পথচারী এমনকি আশপাশের দোকানদারেরাও তাঁর কাছে আসতেন। কেউ রাগের মাথায় বলে ফেলা কথার জন্য অনুতপ্ত হতেন, কেউ প্রিয়জনকে কষ্ট দেওয়ার পরে কীভাবে ক্ষমা চাইবেন জানতে চাইতেন। নিবারণবাবু কাউকে উপদেশ দেওয়ার আগে মন দিয়ে তাঁদের কথা শুনতেন।
একদিন সেখানে এল রুদ্র নামে এক তরুণ আইনজীবী। সদ্য চাকরি পেয়েছে। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছেলেটি আদালতে ভালো যুক্তি দিতে পারলেও মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রায়ই কঠোর হয়ে উঠত।
সেদিন সকালে আদালতের এক কর্মচারী একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। রুদ্র সবার সামনে তাঁকে বলেছিল, “আপনার মতো অযোগ্য মানুষদের জন্যই আদালতের কাজ এগোয় না!”
পরে জানা গেল, নথিটি ভুল করে অন্য একটি ফাইলে রাখা হয়েছিল। কর্মচারীটি নির্দোষ ছিলেন। কিন্তু অপমানের কথাগুলো ততক্ষণে অনেকের কানে পৌঁছে গিয়েছে।
বিকেলে নিবারণবাবুর দোকানে এসে রুদ্র বলল, “কাকু, একটা কথা বলুন তো, সত্যি কথা বললেও মানুষ কষ্ট পায় কেন?”
নিবারণবাবু চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“সত্যি কথা আর কাউকে ছোট করার কথা এক জিনিস নয়, বাবা। সত্যি বলার উদ্দেশ্য যদি ভুল শুধরে দেওয়া হয়, তবে ভাষায় সম্মান থাকা দরকার। আর উদ্দেশ্য যদি কাউকে অপমান করা হয়, তাহলে সত্যিটাও অস্ত্র হয়ে ওঠে।”
রুদ্র একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “তা হলে কি সব সময় মিষ্টি কথা বলতে হবে? ভুল দেখেও চুপ করে থাকব?”
“না,” নিবারণবাবু শান্তভাবে বললেন। “অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই হবে। কিন্তু প্রতিবাদ আর অপমানের মধ্যে পার্থক্য আছে। একজনকে ভুল বোঝানো যায়, আবার সেই ভুলের জন্য তাকে মানুষ হিসেবেই তুচ্ছ করা যায়। তুমি কোনটা বেছে নেবে, সেটাই আসল।”
রুদ্র আর কথা বাড়াল না। চলে যাওয়ার আগে দেওয়ালের বাক্যটির দিকে একবার তাকিয়ে নিল।
পরের দিন আদালতে সেই কর্মচারীর সঙ্গে দেখা হলো। রুদ্র দেখল, মানুষটি আগের মতোই নিজের কাজে ব্যস্ত, কিন্তু মুখে কেমন একটা বিষণ্ণতা। অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বললেও তাঁর চোখে চোখ রাখছেন না।
রুদ্র এগিয়ে গেল।
“সেদিন আপনাকে যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলো অন্যায় ছিল। আমি যাচাই না করেই আপনাকে অপমান করেছি। আমাকে ক্ষমা করবেন।”
কর্মচারীটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি ভুল বুঝেছিলেন, সেটা বড় কথা নয়। আমরা সবাই ভুল করি। কিন্তু সবার সামনে কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, এত বছরের কাজের কোনো মূল্যই নেই।”
রুদ্র মাথা নিচু করল। “আমি বুঝতে পারিনি, আমার কথায় এতটা কষ্ট হতে পারে।”
কর্মচারীটি বললেন, “এখন বুঝেছেন, সেটাই ভালো।”
সেদিনের পর রুদ্র নিজের আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করল। কোনো ভুল দেখলে প্রথমে কারণ জানত, তারপর সংশোধনের কথা বলত। এতে তার কর্তৃত্ব কমেনি; বরং সহকর্মীদের বিশ্বাস বেড়েছিল।
কয়েক মাস পরে আদালতের এক অনুষ্ঠানে রুদ্রকে বক্তৃতা দিতে বলা হলো। সে মঞ্চে উঠে বলল, “আইনের ভাষা যেমন মানুষের অধিকার রক্ষা করে, তেমনই আমাদের দৈনন্দিন ভাষাও মানুষের সম্মান রক্ষা করতে পারে। একটি কঠোর বাক্য মুহূর্তে কাউকে ভেঙে দিতে পারে, আর একটি আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনা তাকে আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস দিতে পারে।”
অনুষ্ঠান শেষে সে আবার নিবারণবাবুর দোকানে গেল।
“কাকু, আপনার সেই শব্দের ওজন মাপার যন্ত্রটা কোথায়?”
নিবারণবাবু হেসে নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখালেন।
“এখানেই আছে। তবে যন্ত্রটা কাজ করে তখনই, যখন মানুষ নিজের বিবেককে প্রশ্ন করতে শেখে।”
রুদ্র দোকান থেকে বেরিয়ে আদালতের দিকে হাঁটতে লাগল। চারপাশে অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল। সেই প্রথম তার মনে হলো, পৃথিবীতে শব্দের সংখ্যা সীমাহীন হলেও প্রতিটি শব্দ ব্যবহার করার আগে মানুষের হাতে একটি ছোট্ট সুযোগ থাকে—সে কাউকে আঘাত করবে, নাকি সাহস জোগাবে।
শিক্ষা: কথা বলার স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িয়ে থাকে। সত্য কথা বলা জরুরি, কিন্তু সত্যের আড়ালে কাউকে অপমান করা নয়। সম্মান বজায় রেখে ভুল ধরিয়ে দেওয়াই প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের পরিচয়।












Leave a Reply