যে মানুষটি শহরের শব্দ শুনতেন।।

শহরের মাঝখানে একটি ব্যস্ত মোড় ছিল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে গাড়ির হর্ন, বাসের ব্রেক, দোকানের মাইক, ফেরিওয়ালার হাঁক আর মানুষের চিৎকার মিলেমিশে এক অদ্ভুত কোলাহল তৈরি করত। আশপাশের মানুষ সেই শব্দে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কেউ আর খেয়াল করত না, এই অবিরাম আওয়াজের মধ্যে কত মানুষের শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে।

শুধু খেয়াল করতেন অনিরুদ্ধ সেন।

অনিরুদ্ধবাবু ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শব্দবিজ্ঞানী। একসময় তিনি গবেষণাগারে কাজ করতেন। অবসরের পর তাঁর সময় কাটত জানালার পাশে বসে শহরের নানা শব্দ শোনার মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছে শব্দ শুধু আওয়াজ ছিল না; শব্দের মধ্যেও তিনি মানুষের অভ্যাস, অসহায়তা আর অবহেলার গল্প খুঁজে পেতেন।

একদিন পাশের বাড়ির বারো বছরের মেয়ে তিতলি তাঁর কাছে এসে বলল, “দাদু, আপনি সারাক্ষণ জানালার পাশে বসে কী শোনেন?”

অনিরুদ্ধবাবু মৃদু হেসে বললেন, “শহর কী বলতে চাইছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করি।”

তিতলি হেসে উঠল। “শহর আবার কথা বলে নাকি?”

“অবশ্যই। কখনও হর্ন দিয়ে, কখনও মানুষের চিৎকার দিয়ে, কখনও আবার এমন নীরবতা দিয়ে, যেটা কেউ খেয়ালই করে না।”

কথাটা তিতলির মাথায় ঢুকল না। কিন্তু পরদিন স্কুলে পরিবেশবিষয়ক একটি প্রকল্পের কথা ঘোষণা হতেই তার অনিরুদ্ধবাবুর কথা মনে পড়ল। সে ঠিক করল, তাদের এলাকার শব্দ নিয়ে একটি সমীক্ষা করবে।

পরদিন থেকে তিতলি একটি খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সকালে স্কুলের সামনে, দুপুরে বাজারে, বিকেলে হাসপাতালের রাস্তায় আর রাতে আবাসনের পাশে সে শব্দের মাত্রা নথিবদ্ধ করতে লাগল। অনিরুদ্ধবাবু তাকে শব্দ মাপার একটি ছোট যন্ত্র ব্যবহার করতে শেখালেন।

কয়েক দিনের মধ্যেই তিতলি একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করল। হাসপাতালের প্রবেশপথের কাছে গাড়ির হর্নের শব্দ সবচেয়ে বেশি। সেখানে রোগীদের নিয়ে গাড়ি ঢুকতে ও বেরোতে সমস্যা হচ্ছিল। অন্যদিকে, স্কুলের সামনের রাস্তায় ছুটির সময় এত হর্ন বাজত যে শিক্ষকরা শিশুদের ডাকলেও অনেক সময় তারা শুনতে পেত না।

তিতলি তথ্যগুলো সাজিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করল। কিন্তু স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন দেখানোর পর কয়েকজন অভিভাবক হেসে বললেন, “এসব ছোটখাটো আওয়াজ নিয়ে এত ভাবার কী আছে? শহরে থাকলে শব্দ তো হবেই!”

তিতলি মন খারাপ করে বাড়ি ফিরল।

অনিরুদ্ধবাবু প্রতিবেদনটি মন দিয়ে পড়লেন। তারপর বললেন, “তোমার কাজ মানুষকে ভুল প্রমাণ করা নয়। তাদের এমন কিছু দেখানো, যা তারা এত দিন খেয়াল করেনি।”

তিনি তিতলিকে পরামর্শ দিলেন, শুধু সংখ্যার তালিকা না দেখিয়ে শব্দের প্রভাবও তুলে ধরতে। তিতলি হাসপাতালের এক নার্সের সঙ্গে কথা বলল। তিনি জানালেন, অতিরিক্ত হর্নের কারণে রোগীদের কথা শুনতে অসুবিধা হয়। স্কুলের এক শিক্ষক বললেন, ছোটদের রাস্তা পার হওয়ার সময় সতর্কবার্তা অনেক সময় কোলাহলে হারিয়ে যায়। এক বৃদ্ধ বাসিন্দা জানালেন, সারাদিনের শব্দে রাতে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়।

এবার তিতলি তার প্রকল্পে তথ্যের পাশাপাশি মানুষের অভিজ্ঞতাও যোগ করল।

স্কুলের বিজ্ঞানমেলায় তার প্রকল্পটি প্রদর্শিত হলো। একটি বড় মানচিত্রে এলাকার বিভিন্ন স্থানের শব্দের মাত্রা চিহ্নিত করা ছিল। পাশে লেখা ছিল—‘শব্দও দূষণ হতে পারে, যদি আমরা তার সীমা ভুলে যাই।’

প্রকল্পটি দেখে এক শিক্ষক বললেন, “আমরা পরিবেশ বলতে গাছপালা আর জলকেই বেশি বুঝি। কিন্তু সুস্থ পরিবেশের জন্য শান্তিরও প্রয়োজন রয়েছে।”

পরের সপ্তাহে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদনটি পাঠাল। হাসপাতালের সামনে ‘অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজাবেন না’ লেখা বোর্ড বসানো হলো। স্কুলের ছুটির সময় স্বেচ্ছাসেবকেরা রাস্তা পারাপারে সাহায্য করতে শুরু করলেন। বাজারের কয়েকটি দোকানও মাইকের আওয়াজ কমিয়ে দিল।

সব সমস্যা একদিনে মিটে গেল না। তবু পরিবর্তনের শুরু হলো।

এক সন্ধ্যায় তিতলি আবার অনিরুদ্ধবাবুর জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে তখনও বাসের শব্দ, মানুষের কথাবার্তা, ফেরিওয়ালার ডাক শোনা যাচ্ছে।

তিতলি বলল, “দাদু, শহর তো এখনও অনেক কথা বলছে!”

অনিরুদ্ধবাবু হাসলেন। “হ্যাঁ। শহরকে চুপ করিয়ে দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা শুধু চাই, তার কথাগুলো যেন অন্যের জীবনকে অসহনীয় করে না তোলে।”

তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজের খাতায় লিখল—‘শব্দ কমানো মানে জীবনকে থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেককে নিজের জীবন শান্তিতে বাঁচার সুযোগ দেওয়া।’

সেদিন সে বুঝল, পরিবর্তন আনতে সব সময় বড় পদ বা বিপুল ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও মন দিয়ে শোনা, সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরাই যথেষ্ট।

শিক্ষা: পরিবেশ রক্ষা শুধু গাছ লাগানো বা জল বাঁচানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যের শান্তি, বিশ্রাম ও স্বস্তির অধিকারকে সম্মান করাও পরিবেশ সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *