
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে। দোকানের ঝাঁপ নেমে গিয়েছে, ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোও গুটিয়ে নিচ্ছে তাদের শেষ আয়োজন। শুধু বাসস্ট্যান্ডের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো নীল রঙের একটি বাস। তার গন্তব্য শহরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত শালবন গ্রাম।
বাসের কন্ডাক্টর মলয় ঘোষ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গত কয়েক মাস ধরে রাতের এই শেষ বাসে যাত্রী কমে গিয়েছে। মালিকের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, আর কয়েক দিন এমন চললে বাসটি বন্ধ করে দিতে হবে। মলয়ের সংসার চলে এই সামান্য বেতনে। বাস বন্ধ হয়ে গেলে নতুন কাজ খুঁজে পাওয়াও সহজ হবে না।
চালক নরেনদা ইঞ্জিন চালু করে বললেন, “আর কেউ আসবে না। চল, মলয়।”
ঠিক তখনই দূর থেকে ছুটতে ছুটতে এল একটি বছর দশেকের ছেলে। তার গায়ে স্কুলের পোশাক, কাঁধে ব্যাগ, আর হাতে একটি ছোট্ট টিফিনের বাক্স। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বাসের দরজায় উঠে দাঁড়াল।
“কাকু, শালবন যাবে তো?”
“যাবে। কিন্তু এত রাতে একা কোথায় যাচ্ছিস?” মলয় জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি একটু ইতস্তত করে বলল, “আমার নাম অর্ক। আমি মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। ফেরার সময় ভুল বাসে উঠে পড়েছিলাম। পরে বুঝতে পেরে নেমে যাই। এখন বাড়ি ফিরতে হবে।”
মলয় অবাক হয়ে বলল, “তোর বাড়ির লোক জানে তুই কোথায়?”
অর্ক মাথা নিচু করল। “মা হাসপাতালে কাজ করে। রাতে ডিউটি থাকে। বাড়িতে দিদা আছেন। আমার কাছে ফোন নেই। দিদার নম্বরটাও মুখস্থ নেই।”
কথাটা শুনে মলয়ের বুকের ভিতর কেমন যেন করে উঠল। সে নিজের ছোটবেলার কথা মনে করল। তার বাবা দিনমজুর ছিলেন। একবার মলয় মেলা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। এক অচেনা বাসচালক তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার কথা সে আজও ভুলতে পারেনি।
“আচ্ছা, ভয় পাস না। আগে বস,” মলয় বলল।
বাস ছেড়ে দিল। রাস্তার আলো একের পর এক পিছনে সরে যেতে লাগল। অন্য যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্যে নেমে গেলেন। শেষ পর্যন্ত বাসে রইল শুধু অর্ক আর মলয়। নরেনদা মাঝেমধ্যে আয়নায় তাকিয়ে ছেলেটিকে দেখছিলেন।
শালবনের মোড়ে পৌঁছে নরেনদা বাস থামালেন। কিন্তু অর্ক নামতেই আবার থমকে দাঁড়াল।
“কী হয়েছে?” মলয় জিজ্ঞেস করল।
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “আমাদের বাড়ি থেকে এখানে আরও অনেকটা পথ। এই সময়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ভয় লাগছে।”
মলয় কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। বাসের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট গন্তব্যের বাইরে যাওয়া নিষেধ। তবু সে নরেনদার দিকে তাকিয়ে বলল, “দাদা, আর একটু এগিয়ে দেওয়া যায়? ছেলেটাকে একা ছাড়া ঠিক হবে না।”
নরেনদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মালিক জানলে রাগ করবেন। তবে ছেলেটাকে এভাবে ফেলে যাওয়াও যায় না।”
বাস আবার চলল।
প্রায় পনেরো মিনিট পরে অর্ক একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে নামতে বলল। বাড়ির বারান্দায় তখন এক বৃদ্ধা উদ্বিগ্নভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাসের আলো দেখে তিনি ছুটে এলেন।
“অর্ক! কোথায় ছিলি এতক্ষণ? আমি তো ভেবেছিলাম—”
বাকিটুকু তাঁর কান্নায় আটকে গেল। অর্ক দিদাকে জড়িয়ে ধরল।
বৃদ্ধা মলয় ও নরেনদার দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করলেন। “আপনারা না থাকলে আজ কী যে হতো! আমার ছেলেটার মা হাসপাতালে। আমি চোখে ভালো দেখি না, একা বেরোতেও পারি না।”
মলয় মৃদু হেসে বলল, “ওকে সাবধানে রাখবেন। আর ওর ব্যাগে একটা কাগজে বাড়ির ঠিকানা ও জরুরি ফোন নম্বর লিখে রাখবেন। কখন কী হয়, বলা যায় না।”
ফেরার পথে নরেনদা বললেন, “আজ বাসের বাড়তি সময় গেল। মালিক হয়তো বকবেন।”
মলয় জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “বকুনি খেলে খাব। কিন্তু একটা বাচ্চাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য যদি একটু দেরি হয়, তাতে ক্ষতি কী?”
পরের দিন সকালে বাসমালিক সত্যিই তাঁদের ডেকে পাঠালেন। কিন্তু সব কথা শোনার পরে তিনি চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, “আমার ছেলেটাও একবার ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়েছিল। একজন অচেনা মানুষ ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেদিন থেকে ভাবি, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ালেই পৃথিবীটা একটু নিরাপদ হয়।”
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, রাতের বাসে চালক ও কন্ডাক্টর বিপদে পড়া কোনো যাত্রীকে সাহায্য করতে চাইলে তাঁদের শাস্তি দেওয়া হবে না, বরং ঘটনাটি জানাতে হবে যাতে প্রয়োজনে আরও সহায়তা করা যায়।
কয়েক সপ্তাহ পরে বাসের ভিতরে একটি ছোট্ট বোর্ড লাগানো হলো—
“বিপদে পড়লে নির্দ্বিধায় সাহায্য চান। আপনার নিরাপত্তাই আমাদের প্রথম দায়িত্ব।”
মলয় প্রতিদিন সেই বোর্ডটির দিকে তাকিয়ে কাজ শুরু করত। তার মনে হতো, একটি রাতের ছোট্ট সিদ্ধান্ত কখনও কখনও অনেক মানুষের জীবনে নতুন নিয়ম তৈরি করে দিতে পারে।
আর অর্ক? সে স্কুলে যাওয়ার আগে প্রতিদিন নিজের ব্যাগে রাখা জরুরি নম্বরের কাগজটি পরীক্ষা করত। একদিন শিক্ষক যখন জিজ্ঞেস করলেন, বড় হয়ে সে কী হতে চায়, অর্ক বলেছিল, “আমি এমন একজন মানুষ হতে চাই, যার কাছে বিপদে পড়লে কেউ ভয় পাবে না।”
শিক্ষা: নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিপদের সময় মানবিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করাও সমান জরুরি। একটি ছোট্ট সাহায্য কারও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সমাজকেও আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।












Leave a Reply