হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘লাগোরি’: সাতটি পাথর সাজিয়ে জয়ের লড়াই।

এক সময় গ্রামের মাঠে, পাড়ার ফাঁকা জায়গায় কিংবা স্কুলের ছুটির সময় শিশুদের দল বেঁধে খেলতে দেখা যেত নানা ধরনের দেশীয় খেলা। সেসব খেলার জন্য প্রয়োজন হতো না দামি খেলনা বা আধুনিক ক্রীড়া সরঞ্জাম। সামান্য কয়েকটি পাথর, একটি বল আর কয়েকজন বন্ধু থাকলেই জমে উঠত আনন্দের আসর। এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী দলগত খেলা হল ‘লাগোরি’, যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সাত পাথর বা সাতটি টুকরো সাজানোর খেলা হিসেবেও পরিচিত।

এই খেলায় রয়েছে লক্ষ্যভেদ, দ্রুত দৌড়, দলগত সহযোগিতা এবং প্রতিপক্ষের হাত থেকে বাঁচার কৌশল। নাম ও স্থানীয় নিয়ম অঞ্চলভেদে বদলে গেলেও মূল আকর্ষণ একই—পাথরের স্তূপ ভেঙে আবার সাজিয়ে তোলার লড়াই।

লাগোরি খেলার পরিচয়

লাগোরি ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী দলগত খেলা। মহারাষ্ট্রে ‘লাগোরি’ নামটি পরিচিত; অন্য অঞ্চলে এটি ‘সাত পাথর’, ‘সাতোলিয়া’ বা ‘পিঠু’ নামেও পরিচিত। বাংলার বিভিন্ন জায়গায় সাতপাথর নামে যে খেলা খেলা হয়, তার সঙ্গে লাগোরির মিল রয়েছে।

খেলার মূল উপকরণ হল কয়েকটি সমতল পাথর বা ভাঙা টালির টুকরো এবং একটি নরম বল। সাধারণত সাতটি পাথর একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে ছোট স্তূপ তৈরি করা হয়। একটি দল বল ছুড়ে সেই স্তূপ ভাঙার চেষ্টা করে। স্তূপ ভেঙে গেলে সেই দলের লক্ষ্য হয় আবার পাথরগুলি সাজিয়ে তোলা। অন্য দল বল দিয়ে প্রতিপক্ষকে আউট করার চেষ্টা করে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিভিন্ন অঞ্চলে খেলার নাম, আউট হওয়ার নিয়ম এবং পাথরের সংখ্যা আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে সেই প্রতিযোগিতার নিয়ম মেনে চলতে হয়।

কীভাবে খেলাটি খেলা হয়?

লাগোরি খেলার জন্য প্রথমে একটি সমতল ও নিরাপদ জায়গা বেছে নিতে হয়। তারপর খেলোয়াড়দের দুটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল পাথরের স্তূপ ভাঙার চেষ্টা করবে, অন্য দল স্তূপ রক্ষা ও প্রতিপক্ষকে আউট করার চেষ্টা করবে।

প্রথম ধাপ: পাথরের স্তূপ তৈরি

সাতটি সমতল পাথর বা নিরাপদ টুকরো একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে একটি ছোট স্তূপ তৈরি করা হয়। পাথরগুলি যেন খুব ধারালো না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: বল ছুড়ে স্তূপ ভাঙা

একটি দলের খেলোয়াড় নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে নরম বল ছুড়ে স্তূপ ভাঙার চেষ্টা করে। বলের আঘাতে পাথরগুলি পড়ে গেলে সেই দল পরবর্তী পর্যায়ে যায়।

তৃতীয় ধাপ: পাথর আবার সাজানো

স্তূপ ভেঙে যাওয়ার পর আক্রমণকারী দলের খেলোয়াড়রা পাথরগুলি আবার আগের মতো সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করে। এই সময় প্রতিপক্ষ দল বল দিয়ে তাদের আউট করার চেষ্টা করে।

চতুর্থ ধাপ: প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে চলা

পাথর সাজানোর সময় খেলোয়াড়দের সতর্ক থাকতে হয়। বলের আঘাত এড়িয়ে সঠিক সময়ে পাথরের কাছে পৌঁছতে হয়। তবে মাথা বা মুখ লক্ষ্য করে বল ছোড়া উচিত নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে নরম বল ব্যবহার করাই নিরাপদ।

পঞ্চম ধাপ: জয় নির্ধারণ

আক্রমণকারী দল যদি প্রতিপক্ষের বাধা এড়িয়ে পাথরের স্তূপ আবার সাজাতে পারে, তাহলে সহজ সংস্করণে তারা সফল হয়। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ যদি নির্ধারিত নিয়মে আক্রমণকারী দলের খেলোয়াড়দের আউট করে দেয়, তবে তাদের পালা শেষ হতে পারে। এরপর দুই দলের ভূমিকা বদল হয়।

খেলার আগে আউট হওয়ার নিয়ম, বল কোথায় লাগলে আউট গণ্য হবে এবং কত সময়ের মধ্যে পাথর সাজাতে হবে, তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।

কেন এই খেলা এত জনপ্রিয় ছিল?

লাগোরির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল এর সহজ উপকরণ। বাড়ির আশপাশে পাওয়া কয়েকটি সমতল পাথর এবং একটি বল দিয়েই খেলা শুরু করা যেত। অনেক ক্ষেত্রে বল না থাকলে স্থানীয়ভাবে তৈরি নরম বল ব্যবহার করা হতো।

এই খেলায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ভালো লক্ষ্যভেদ করতে পারে, কেউ দ্রুত পাথর সাজাতে পারে, আবার কেউ বলের আঘাত এড়িয়ে সতীর্থদের সাহায্য করতে পারে। ফলে একক দক্ষতার পাশাপাশি দলগত বোঝাপড়াও জরুরি।

গ্রামের মাঠে বা পাড়ার খোলা জায়গায় এমন খেলা শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে তুলত। জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তারা নিয়ম মানা, পালা মেনে চলা এবং অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করার অভিজ্ঞতা পেত।

শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা

লাগোরি একটি সক্রিয় খেলা। এতে দৌড়ানো, ঝুঁকে পাথর সাজানো, বল ছোড়া এবং প্রতিপক্ষের গতিবিধি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে।

শারীরিক সক্রিয়তা: খেলোয়াড়দের বারবার চলাফেরা করতে হয়। এতে দৈনন্দিন শরীরচর্চার আনন্দদায়ক সুযোগ তৈরি হয়।

লক্ষ্যভেদের দক্ষতা: নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে বল ছুড়ে পাথরের স্তূপ ভাঙার চেষ্টা করতে হয়। এতে চোখ ও হাতের সমন্বয় অনুশীলন হয়।

দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া: বল কোন দিক থেকে আসছে, কখন পাথরের কাছে যেতে হবে এবং কখন সরে দাঁড়াতে হবে—এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

দলগত সহযোগিতা: পাথর সাজানোর সময় দলের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। একজন পাথর সাজাতে গেলে অন্যজন সতর্ক থাকতে পারে বা সতীর্থকে সহায়তা করতে পারে।

ধৈর্য ও নিয়ম মেনে চলা: পাথর সাজানো, নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুদের ধৈর্য অনুশীলনের সুযোগ হয়।

তবে এই খেলাকে সব ধরনের শারীরিক বা মানসিক বিকাশের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। নিয়মিত খেলাধুলার পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং নিরাপদ পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক সময়ে কেন কম দেখা যায়?

বর্তমানে অনেক শিশুর অবসর কাটে মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম এবং টেলিভিশনের সামনে। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে খোলা মাঠের অভাব, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং নিরাপদ খেলার জায়গা কমে যাওয়াও দেশীয় খেলাধুলার চর্চায় প্রভাব ফেলেছে।

তবে লাগোরি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি এখনও খেলা হয় এবং সংগঠিত প্রতিযোগিতাতেও এর উপস্থিতি রয়েছে। তাই একে বিলুপ্ত খেলা না বলে বলা ভালো, অনেক এলাকার দৈনন্দিন শিশুদের খেলাধুলা থেকে এর উপস্থিতি কমেছে।

বিদ্যালয় ও পাড়ার ক্লাবগুলিতে নিয়মিত দেশীয় খেলাধুলার আয়োজন করা হলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই খেলার পরিচিতি বাড়তে পারে।

খেলতে গেলে কী কী সতর্কতা দরকার?

লাগোরিতে বল ছোড়া এবং দ্রুত দৌড়ানোর কারণে আঘাতের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।

  • ধারালো পাথর বা কাচের টুকরো ব্যবহার করা যাবে না।
  • পাথরের বদলে নিরাপদ, হালকা ও সমতল টুকরো ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • শক্ত বলের পরিবর্তে নরম বল ব্যবহার করা উচিত।
  • মুখ ও মাথা লক্ষ্য করে বল ছোড়া নিষিদ্ধ রাখতে হবে।
  • খেলার মাঠে গর্ত, কাচ বা পিচ্ছিল অংশ থাকলে আগে পরিষ্কার করতে হবে।
  • ছোট শিশুদের খেলায় বড়দের তত্ত্বাবধান থাকা ভালো।
  • ধাক্কাধাক্কি বা ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না।

খেলায় জয় পাওয়ার চেয়ে সকলের নিরাপদে আনন্দ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উপায়

লাগোরির মতো দেশীয় খেলাকে বাঁচিয়ে রাখতে বিদ্যালয়ের ক্রীড়া দিবসে এই খেলা রাখা যেতে পারে। পাড়ার ক্লাব ও স্থানীয় সংগঠন শিশুদের নিয়ে দলগত প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে। অভিভাবকেরাও ছুটির দিনে শিশুদের সঙ্গে খেলাটি শিখতে পারেন।

এই ধরনের খেলায় ব্যয় কম হওয়ায় সীমিত সরঞ্জামেও আয়োজন সম্ভব। তবে খেলার উপকরণ যেন নিরাপদ হয় এবং নিয়মগুলি সকলের কাছে স্পষ্ট থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার

লাগোরি শুধু সাতটি পাথর সাজানোর খেলা নয়; এটি লক্ষ্যভেদ, ক্ষিপ্রতা, কৌশল এবং দলগত সহযোগিতার একটি আনন্দময় অভিজ্ঞতা। অল্প উপকরণে অনেক শিশুকে একসঙ্গে খেলায় যুক্ত করা যায় বলেই এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

আধুনিক খেলাধুলার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলিকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ এগুলি আমাদের সামাজিক স্মৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ। পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজ একসঙ্গে উদ্যোগ নিলে লাগোরির মতো খেলাগুলি নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যসূত্র: ভারতের ঐতিহ্যবাহী খেলা বিষয়ক প্রকাশিত বিবরণ এবং লাগোরি/সাতোলিয়া খেলার প্রচলিত নিয়মাবলি। স্থানীয় নিয়ম অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *