
Oplus_131072
শৈশবের খেলাধুলার জন্য সব সময় দামি সরঞ্জাম বা বড় মাঠের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও প্রকৃতির সহজলভ্য উপকরণ দিয়েই তৈরি হয়ে ওঠে আনন্দের এক নতুন জগৎ। অসমের কিছু গ্রামীণ এলাকায় একসময় এমনই একটি অভিনব খেলার প্রচলন ছিল, যার নাম টেঙা বল (Tenga Ball)। এই খেলায় প্রচলিত ফুটবলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হতো বড় আকারের এক ধরনের লেবুজাতীয় ফল, যা অসমিয়ায় ‘ৰবাব টেঙা’ বা ‘রবাব টেঙা’ নামে পরিচিত।
এই খেলার গল্প শুধু একটি ফলকে বল হিসেবে ব্যবহার করার কাহিনি নয়। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ শৈশব, সীমিত উপকরণের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। আধুনিক খেলাধুলার সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ার আগে শিশুদের কল্পনাশক্তি কীভাবে খেলার নতুন উপায় তৈরি করত, টেঙা বল তার একটি সুন্দর উদাহরণ।
টেঙা বল কী?
টেঙা বল ছিল অসমের কিছু গ্রামের শিশুদের খেলা, যেখানে বড় গোলাকার ‘ৰবাব টেঙা’ ফলকে ফুটবলের মতো ব্যবহার করা হতো। এই ফলটি দেখতে অনেকটা বড় বাতাবি লেবুর মতো। ইংরেজিতে ফলটি পোমেলো (Pomelo) নামে পরিচিত; এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrus maxima।
অসমের সিবসাগর জেলার নামতি গ্রামের শৈশবস্মৃতির কথা তুলে ধরে The Indian Express-এর একটি প্রতিবেদনে এই খেলার উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামের ছেলেরা ফলটিকে বল হিসেবে ব্যবহার করে মাঠে খেলত। তাদের কাছে সেটিই ছিল সহজলভ্য এবং উপযুক্ত বিকল্প।
তবে টেঙা বলের কোনও একক, সর্বজনস্বীকৃত প্রতিযোগিতামূলক নিয়ম ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিভিন্ন গ্রামে শিশুরা নিজেদের সুবিধা ও খেলার পরিবেশ অনুযায়ী নিয়ম তৈরি করত। তাই এটিকে আধুনিক ফুটবলের নির্দিষ্ট নিয়মযুক্ত সংস্করণ না বলে, ফলকে বল হিসেবে ব্যবহার করে ফুটবলের মতো খেলার একটি স্থানীয় রীতি বলা বেশি যথাযথ।
‘ৰবাব টেঙা’ ফলটি কেমন?
ৰবাব টেঙা অসমের পরিচিত একটি লেবুজাতীয় ফল। আকারে এটি সাধারণ লেবু বা কমলালেবুর চেয়ে অনেক বড় হতে পারে। ফলের বাইরের খোসা বেশ পুরু এবং ভিতরে রসালো কোয়া থাকে। জাতভেদে ফলের স্বাদ মিষ্টি, হালকা টক কিংবা মিশ্র হতে পারে।
গ্রামীণ এলাকায় যে ফল সহজে পাওয়া যেত, শিশুরা সেটিকেই খেলাধুলার উপকরণ হিসেবে কাজে লাগাত। বড় ও গোলাকার হওয়ায় ফলটিকে পায়ে ঠেলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া সম্ভব হতো। অবশ্য পাকা ফলের আকার, ওজন ও নরমত্বের কারণে এর গতি একটি আধুনিক ফুটবলের মতো হতো না।
এই পার্থক্যই খেলাটিকে আলাদা মজা দিত। ফলটি কখনও সহজে গড়াত, আবার কখনও মাটির অবস্থা বা ফলের আকারের কারণে দিক পরিবর্তন করত। খেলোয়াড়দের সেই অনুযায়ী দৌড়তে ও নিজেদের অবস্থান বদলাতে হতো।
কীভাবে খেলা হতো?
টেঙা বলের নিয়ম অঞ্চল ও খেলোয়াড়দের অভ্যাস অনুযায়ী আলাদা হতে পারত। সিবসাগরের নামতি গ্রামের স্মৃতিচারণে ফলটিকে ফুটবলের মতো ব্যবহার করে মাঠে খেলার কথা পাওয়া যায়। সেই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, খেলাটির মূল আকর্ষণ ছিল ফলটিকে পায়ে ঠেলে এগিয়ে নেওয়া এবং অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা।
একটি সাধারণ অনানুষ্ঠানিক খেলার রূপ এভাবে কল্পনা করা যায়:
১. খেলার জায়গা বেছে নেওয়া: গ্রামের খোলা মাঠ, উঠোন বা ফাঁকা জমিতে শিশুরা জড়ো হতো। মাটিতে গর্ত, ধারালো পাথর বা অন্য বিপজ্জনক বস্তু আছে কি না, তা খেয়াল রাখা দরকার ছিল।
২. ফলটিকে বল হিসেবে ব্যবহার: একটি তুলনামূলক গোলাকার ও অক্ষত ৰবাব টেঙা বেছে নেওয়া হতো।
৩. খেলোয়াড়দের দল ভাগ: শিশুরা নিজেদের মধ্যে দল তৈরি করতে পারত। কতজন খেলবে, তা নির্ভর করত উপস্থিত খেলোয়াড়ের সংখ্যা ও জায়গার উপর।
৪. লক্ষ্য নির্ধারণ: খেলার সুবিধার জন্য মাঠের দুই প্রান্তকে গোলের জায়গা হিসেবে ঠিক করা যেত। তবে এটি একটি সম্ভাব্য স্থানীয় পদ্ধতি, সব গ্রামের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম নয়।
৫. ফলকে পায়ে ঠেলে এগিয়ে নেওয়া: খেলোয়াড়েরা ফলটিকে প্রতিপক্ষের দিকে বা নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে পাঠানোর চেষ্টা করত।
৬. নিজেদের নিয়মে বিজয়ী নির্ধারণ: কেউ নির্দিষ্ট সংখ্যক গোল করার নিয়ম রাখতে পারত, আবার কেউ নির্দিষ্ট সময় ধরে খেলতে পারত। এ ধরনের নিয়ম স্থানীয় শিশুদের নিজেদের তৈরি করা হতে পারে।
এখানে মনে রাখা দরকার, উপরোক্ত ধাপগুলি খেলার একটি সম্ভাব্য সহজ রূপ বোঝানোর জন্য দেওয়া হয়েছে; এগুলিকে অসমের সর্বত্র প্রচলিত ঐতিহাসিক নিয়ম হিসেবে দাবি করা যায় না।
গ্রামীণ শৈশবের সঙ্গে সম্পর্ক
একসময় বহু গ্রামের শিশুরা মাঠ, গাছপালা, ফল, কাঠের টুকরো এবং অন্যান্য সহজলভ্য জিনিসকে খেলাধুলার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করত। সব পরিবারের পক্ষে ফুটবল বা অন্য খেলনার ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু খেলাধুলার আনন্দের জন্য দামি সরঞ্জাম অপরিহার্য নয়—টেঙা বল সেই বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এ ধরনের খেলায় শিশুদের নিজেদের মধ্যে নিয়ম তৈরি করার সুযোগ ছিল। কে কোন দলে খেলবে, কোথায় গোল ধরা হবে, কতক্ষণ খেলা চলবে—এসব সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নিতে পারত। এর ফলে সহযোগিতা, আলোচনা এবং বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারত।
তবে টেঙা বলকে অসমের সব গ্রাম বা সব শিশুর পরিচিত খেলা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। এটি নির্দিষ্ট কিছু এলাকার স্মৃতিতে টিকে থাকা একটি স্থানীয় খেলার উদাহরণ।
খেলাটির বিশেষত্ব
টেঙা বলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা। এখানে তৈরি করা বলের বদলে প্রকৃতির একটি ফল ব্যবহার করা হতো। সেই ফলকে ঘিরে তৈরি হতো খেলাধুলা ও বন্ধুত্বের পরিবেশ।
এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো:
- সহজলভ্য উপকরণ: এলাকায় ফলটি পাওয়া গেলে আলাদা খেলনা কেনার প্রয়োজন হতো না।
- কল্পনাশক্তির ব্যবহার: শিশুরা একটি খাদ্যোপযোগী ফলকে খেলার সরঞ্জামে রূপান্তর করত।
- দলগত আনন্দ: বন্ধুরা মিলে খেলার মধ্য দিয়ে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠত।
- স্থানীয় পরিবেশের প্রভাব: এলাকার গাছপালা ও ফলের প্রাপ্যতা খেলার উপকরণ নির্বাচনে ভূমিকা রাখত।
- স্মৃতির মূল্য: খেলার বিবরণ থেকে অতীতের গ্রামীণ জীবন ও শৈশবের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে পার্থক্য
আধুনিক ফুটবলে নির্দিষ্ট মাপের বল, চিহ্নিত মাঠ, গোলপোস্ট এবং সুসংগঠিত নিয়ম থাকে। টেঙা বলের মতো অনানুষ্ঠানিক খেলায় এসবের সবকিছু থাকার প্রয়োজন ছিল না।
পাকা ফলের আকার একরকম হয় না। ফলে সেটি কোথায় গড়াবে বা কত দূর যাবে, তা অনুমান করা কঠিন হতে পারে। আধুনিক ফুটবলের বলের তুলনায় ফলটি ভারী বা অসমানও হতে পারে। এই কারণে টেঙা বলকে ফুটবলের সমতুল্য ক্রীড়া হিসেবে দেখা ঠিক নয়; বরং এটি ফুটবলসদৃশ একটি স্থানীয় বিনোদনের রীতি।
এই পার্থক্য সত্ত্বেও খেলাটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কমে যায় না। প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী খেলা আধুনিক প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুসরণ করতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই।
আজকের দিনে টেঙা বলের প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমানে অধিকাংশ জায়গায় শিশুদের কাছে তৈরি ফুটবল, প্লাস্টিকের বল এবং অন্যান্য খেলাধুলার সরঞ্জাম আগের তুলনায় সহজলভ্য। ফলে ফলকে বল হিসেবে ব্যবহার করার মতো রীতি অনেক এলাকায় কমে যেতে পারে। তবে এই পরিবর্তনকে শুধু খেলাটির বিলুপ্তি হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে গ্রামীণ জীবনযাত্রা, বাজারব্যবস্থা এবং শিশুদের অবসর কাটানোর পদ্ধতির পরিবর্তনও জড়িত।
টেঙা বলের মতো স্থানীয় খেলা সংরক্ষণ করতে হলে প্রবীণ মানুষদের স্মৃতি সংগ্রহ করা, স্থানীয় ভাষায় খেলার নাম ও বিবরণ লিখে রাখা এবং পুরোনো ছবির মাধ্যমে ইতিহাস নথিবদ্ধ করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, একসময় একটি ফলও কীভাবে শিশুদের আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছিল।
তবে ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করার নামে ফল নষ্ট করা বা অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে খেলা উৎসাহিত করা উচিত নয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ, নরম ও উপযুক্ত বল ব্যবহার করে একই ধরনের দলগত আনন্দের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
শিশুদের নিরাপত্তা
খাদ্যোপযোগী ফলকে খেলনা হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কয়েকটি সতর্কতা প্রয়োজন। ফলটি পচা, ফেটে যাওয়া বা পোকায় আক্রান্ত হলে ব্যবহার করা উচিত নয়। ফলের খোসা থেকে রস বেরিয়ে মাটি পিচ্ছিল হয়ে গেলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলটি শক্তভাবে ছুড়ে মারা বা কারও মুখের দিকে লাথি মেরে পাঠানোও বিপজ্জনক হতে পারে।
বর্তমানে শিশুদের এমন খেলায় অংশগ্রহণ করাতে চাইলে নরম বল ব্যবহার করাই ভালো। খেলার জায়গায় কাচ, ধারালো পাথর, গর্ত এবং যানবাহনের চলাচল থাকা উচিত নয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের তত্ত্বাবধান জরুরি।
উপসংহার
টেঙা বল অসমের গ্রামীণ শৈশবের সঙ্গে যুক্ত এক অভিনব স্থানীয় খেলার স্মৃতি। বড় আকারের ৰবাব টেঙা ফলকে ফুটবলের মতো ব্যবহার করে শিশুদের খেলার এই রীতি দেখায়, আনন্দ তৈরির জন্য সব সময় দামি উপকরণের প্রয়োজন হয় না।
খেলাটির নির্দিষ্ট নিয়ম বা সর্বভারতীয় প্রচলনের দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু অসমের কিছু এলাকার মানুষের স্মৃতিতে এর উপস্থিতি স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। টেঙা বলের মতো ছোট ছোট খেলার কাহিনি সংগ্রহ করা গেলে ভারতের বৈচিত্র্যময় লোকক্রীড়ার ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।












Leave a Reply