শীতকাল এলেই ত্বকের শুষ্কতা বেড়ে যায়। মুখ, হাত ও পায়ের পাশাপাশি ঠোঁটেও এর প্রভাব পড়ে। অনেকের ঠোঁট শুকিয়ে যায়, চামড়া উঠতে থাকে, ঠোঁটের কোণে ফাটল দেখা দেয়, এমনকি কখনও রক্তপাতও হতে পারে। ঠান্ডা বাতাস, কম আর্দ্রতা, পর্যাপ্ত জল পান না করা এবং ঠোঁট বারবার জিভ দিয়ে ভেজানোর অভ্যাস এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ঠোঁটের ত্বক মুখের অন্যান্য অংশের তুলনায় পাতলা এবং এতে তেল তৈরির গ্রন্থি নেই বললেই চলে। তাই ঠোঁটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। তবে দামি প্রসাধনী ব্যবহার না করেও কয়েকটি সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে শীতকালে ঠোঁটকে সুস্থ রাখা সম্ভব।
১. শীতকালে ঠোঁট ফাটে কেন?
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়। ফলে ঠোঁটের উপরিভাগ থেকে আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে। বাইরে ঠান্ডা বাতাসে দীর্ঘক্ষণ থাকা, ঘরের অতিরিক্ত শুষ্ক পরিবেশ এবং ঠোঁটের যত্নে অবহেলা করলে সমস্যা আরও বাড়ে।
ঠোঁট ফাটার কয়েকটি সাধারণ কারণ হল—
- ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসের সংস্পর্শ।
- পর্যাপ্ত জল পান না করা।
- বারবার ঠোঁট চাটা বা কামড়ানোর অভ্যাস।
- সুগন্ধি বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে এমন লিপবাম ব্যবহার।
- ঠোঁটের ত্বকে অ্যালার্জি বা প্রদাহ।
- ঠোঁটের কোণে লালচে ভাব ও ফাটল, যা কখনও সংক্রমণ বা অন্য শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
শুধু ঠোঁট ফাটলেই শরীরে ভিটামিনের অভাব রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে তার কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
২. ভালো লিপবাম ব্যবহার করুন
শীতকালে ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে লিপবাম ব্যবহার করা উপকারী। এমন লিপবাম বেছে নিন যাতে পেট্রোলাটাম, সেরামাইড, ডাইমেথিকোন বা উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজিং উপাদান রয়েছে।
দিনে কয়েকবার এবং বিশেষ করে বাইরে যাওয়ার আগে ঠোঁটে লিপবাম লাগাতে পারেন। রাতে ঘুমানোর আগে একটু ঘন ময়েশ্চারাইজিং লিপবাম ব্যবহার করলেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
তবে লিপবাম লাগানোর পর ঠোঁটে জ্বালা, চুলকানি বা অস্বস্তি হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন। মেনথল, কর্পূর, সুগন্ধি, দারুচিনির স্বাদযুক্ত উপাদান বা কিছু এসেনশিয়াল অয়েল সংবেদনশীল ঠোঁটে জ্বালা বাড়াতে পারে।
ঠোঁটের শুষ্কতা কমানোর জন্য লিপবাম ব্যবহার করাই যথেষ্ট হতে পারে। বারবার বিভিন্ন প্রসাধনী বদলানোর প্রয়োজন নেই।
৩. ঠোঁট চাটা ও কামড়ানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন
শীতকালে ঠোঁট শুকিয়ে গেলে অনেকেই বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজান। সাময়িকভাবে আরাম লাগলেও লালার জল শুকিয়ে যাওয়ার সময় ঠোঁটের আর্দ্রতা আরও কমে যেতে পারে। ফলে ঠোঁট আরও শুষ্ক হয় এবং ফাটল বাড়ে।
ঠোঁটের চামড়া উঠে গেলে তা দাঁত দিয়ে টেনে তোলা বা নখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলার অভ্যাসও ক্ষতিকর। এতে ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঠোঁট শুকিয়ে গেলে জিভ দিয়ে ভেজানোর পরিবর্তে লিপবাম লাগান। ঠোঁটের চামড়া নিজে থেকে উঠতে দিন এবং ক্ষতস্থানে অযথা হাত দেবেন না।
৪. বাইরে বেরোনোর সময় ঠোঁটের সুরক্ষা
শীতের ঠান্ডা বাতাস ঠোঁটের আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে ঠোঁটে লিপবাম লাগানো ভালো।
শীতকালেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি যুক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম লিপবাম ব্যবহার করুন। বাইরে থাকার সময় পণ্যের নির্দেশ অনুযায়ী পুনরায় লাগান, বিশেষ করে খাওয়া বা পান করার পরে।
ঠান্ডা বাতাস বেশি থাকলে স্কার্ফ দিয়ে মুখের কিছুটা অংশ ঢেকে রাখা যেতে পারে। তবে ভেজা বা লালায় ভেজা কাপড় দীর্ঘক্ষণ ঠোঁটের সংস্পর্শে রাখবেন না।
৫. পর্যাপ্ত জল পান করুন
শীতকালে তৃষ্ণা কম পেলেও শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী জল পান করা জরুরি। জলশূন্যতা থাকলে মুখ শুকিয়ে যেতে পারে, যদিও শুধু ঠোঁট ফাটার কারণ হিসেবে জল কম পান করাকেই দায়ী করা যায় না।
সারাদিনে নিয়মিত জল পান করুন। স্যুপ বা অন্যান্য তরল খাবারও দৈনন্দিন তরল গ্রহণে সাহায্য করতে পারে। তবে কিডনি বা হৃদ্রোগের কারণে যাঁদের তরল গ্রহণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাঁরা চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলুন।
চা বা কফি খাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জল পান করার অভ্যাস বজায় রাখুন।
৬. ঠোঁটে কী ব্যবহার করা উচিত নয়?
ঠোঁট ফাটলে দ্রুত আরাম পাওয়ার আশায় অনেকে ঘরোয়া নানা উপাদান ব্যবহার করেন। কিন্তু সব উপাদান সবার ত্বকের জন্য উপযুক্ত নয়।
কয়েকটি বিষয় এড়িয়ে চলুন—
- লেবুর রস বা অন্যান্য অম্লীয় উপাদান সরাসরি ঠোঁটে লাগাবেন না।
- চিনি বা মোটা দানার স্ক্রাব দিয়ে ঠোঁট ঘষবেন না।
- টুথপেস্ট বা সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ঠোঁটে লাগিয়ে রাখবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম ব্যবহার করবেন না।
- ঠোঁটের ফাটা চামড়া জোর করে তুলে ফেলবেন না।
মধু বা ঘি লাগালে সবার ক্ষেত্রে উপকার হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে কোনও উপাদানে অ্যালার্জি থাকলে তা ব্যবহার করা উচিত নয়। সাধারণ, সুগন্ধিহীন পেট্রোলাটাম-ভিত্তিক লিপবাম অনেকের ক্ষেত্রে সহজ ও কার্যকর বিকল্প।
৭. ঠোঁটের কোণে ফাটল হলে কী করবেন?
শীতকালে অনেকের ঠোঁটের দুই কোণে ফাটল, লালচে ভাব বা ব্যথা দেখা দেয়। মুখ বড় করে খুললে ব্যথা বাড়তে পারে। এই সমস্যাকে অ্যাঙ্গুলার কাইলাইটিস বলা হয়। এর পেছনে লালা জমে থাকা, ত্বকের প্রদাহ, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং কখনও পুষ্টির ঘাটতি থাকতে পারে।
ঠোঁটের কোণ পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। বারবার জিভ দিয়ে ভেজাবেন না। তবে কয়েক দিনেও না কমলে, বারবার ফিরে এলে বা ক্ষত গভীর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে।
৮. খাবারের মাধ্যমে ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখুন
ঠোঁটসহ ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সুষম খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ বা উপযুক্ত বিকল্প এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখতে পারেন।
আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলেট বা অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি কখনও মুখ ও ঠোঁটের কিছু সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ঠোঁট ফাটলেই নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন বা আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করতে পারেন।
অতিরিক্ত চিনি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
৯. শিশু ও বয়স্কদের ঠোঁটের যত্ন
শিশুরা অনেক সময় ঠোঁট চাটে বা কামড়ায়। তাদের ঠোঁট শুকিয়ে গেলে শিশুদের উপযোগী সুগন্ধিহীন লিপবাম ব্যবহার করা যেতে পারে। ঠোঁটে কোনও প্রসাধনী ব্যবহার করার আগে তার উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া ভালো।
বয়স্ক ব্যক্তিদের কিছু ওষুধের কারণে মুখ শুকিয়ে যেতে পারে। তাঁদের ঠোঁট বারবার ফাটলে ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। নিজে থেকে কোনও নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
শিশু বা বয়স্ক কারও ঠোঁটের ফাটল দীর্ঘস্থায়ী হলে, ব্যথা বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
১০. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ ঠোঁট ফাটা কয়েক দিনের নিয়মিত যত্নে কমে যেতে পারে। কিন্তু নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
- দুই থেকে তিন সপ্তাহ যত্ন নেওয়ার পরও ঠোঁট না সারলে।
- বারবার রক্তপাত বা গভীর ফাটল হলে।
- ঠোঁটের এক অংশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা খসখসে দাগ থাকলে।
- ঠোঁটের কোণে বারবার ফাটল বা সংক্রমণ হলে।
- অতিরিক্ত ফোলা, পুঁজ বা তীব্র ব্যথা দেখা দিলে।
হঠাৎ ঠোঁট, জিভ বা গলা ফুলে যাওয়া এবং শ্বাস নিতে অসুবিধা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
উপসংহার
শীতকালে ঠোঁট ফাটা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত লিপবাম ব্যবহার, ঠোঁট চাটার অভ্যাস ত্যাগ, পর্যাপ্ত জল পান এবং ঠান্ডা বাতাস ও সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা ঠোঁটকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
ঠোঁটের যত্ন নিতে দামি প্রসাধনীর প্রয়োজন নেই। বরং সহজ, নিয়মিত এবং ত্বকের উপযোগী যত্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতন অভ্যাসের মাধ্যমে শীতকালেও ঠোঁটকে কোমল, আরামদায়ক ও সুস্থ রাখা সম্ভব।













Leave a Reply