সুভাষচন্দ্র বসু দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার বিখ্যাত “মাহীনগরের বসু পরিবার”-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা প্রভাবতী বসু (দত্ত) ছিলেন উত্তর কলকাতার হাটখোলা দত্ত বাড়ির কন্যা এবং পিতা জানকীনাথ বসু। সুভাষ ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত বাংলা প্রদেশের উড়িষ্যা বিভাগের (অধুনা, ভারতের ওড়িশা রাজ্য) কটকে জন্মগ্রহণ করেন। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন তার পিতা-মাতার চৌদ্দ সন্তানের নবম সন্তান তথা ষষ্ঠ পুত্র। তার বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন সফল ও সরকারি আইনজীবী। তিনি ব্রিটিশ ভারতের সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং ভাষা ও আইন সম্পর্কিত বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। প্রান্ত কলকাতার স্বপ্রতিষ্ঠিত এই মানুষটি নিজের শিকড়রের সঙ্গে সংযোগ অটুট রেখেছিলেন, প্রত্যেক দুর্গা পূজার ছুটিতে তিনি নিজের গ্রামে ফিরে যেতেন। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার কোদালিয়া (বর্তমানে সুভাষগ্রামের অন্তর্ভুক্ত)৷
১৯০২ সালে তিনি তার পাঁচ বড় ভাইয়ের সাথে কটকের প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপীয় স্কুলে (অধুনা, স্টুয়ার্ট স্কুল) ভর্তি হন। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র বসু বিদ্যালয়টিতে পঠন-পাঠন করেন। বিদ্যালয়টিতে সমস্ত শিক্ষাদানের মাধ্যম ছিল ইংরেজি, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ইউরোপীয় বা মিশ্রিত ব্রিটিশদের অ্যাংলো-ভারতীয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। পাঠ্যক্রমটিতে ইংরাজী—সঠিকভাবে লিখিত ও কথ্য—লাতিন, বাইবেল, সহবত শিক্ষা, ব্রিটিশ ভূগোল এবং ব্রিটিশ ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত ছিল; কোনও ভারতীয় ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা ছিল না। এই বিদ্যালয় তার পিতা জানকীনাথের পছন্দ ছিল, তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলেরা যেন নির্দ্বিধায় ত্রুটিহীন ইংরেজি বলতে পারে। ভারতে ব্রিটিশদের মাঝে থাকার জন্য তিনি বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। তাঁর বাড়িতে কেবলমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলা হত, ফলে বিদ্যালয়টি ছিল বাড়ির বিপরীত বৈশিষ্ট্যের। বাড়িতে, তার মা হিন্দু দেবী দুর্গা ও কালীর উপাসনা করতেন, মহাভারত ও রামায়ণ মহাকাব্য থেকে গল্প বলতেন এবং বাংলা ভক্তিগীতি গাইতেন। মায়ের কাছ থেকে সুভাষ একটি স্নেহশীল স্বভাব লাভ করেন, তিনি দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের সাহায্য করতেন ও প্রতিবেশী ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করা ও উদ্যানচর্চা পছন্দ করতেন।
তার আর পাঁচ ভাইকে অনুসরণ করে সুভাষকে ১৯০৯ সালে ১২ বছর বয়সে কটকের রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করা হয়। এখানে, বাংলা ও সংস্কৃত শেখানো হত এবং পাশাপাশি বাড়িতে সাধারণত গৃহীত না হওয়া হিন্দু ধর্মগ্রন্থ যেমন— বেদ ও উপনিষদ সম্পর্কে পাঠদান করা হত। যদিও পাশ্চাত্য শিক্ষার তৎপরতা অব্যাহত ছিল তবুও তিনি ভারতীয় পোশাক পরতেন এবং ধর্মীয় ভাবনাচিন্তার সাথে জড়িত ছিলেন। ব্যস্ততা সত্ত্বেও, সুভাষচন্দ্র বসু পড়াশোনায় মনোযোগ , প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষায় সফল হওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত ম্যাট্রিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
সুভাষচন্দ্র বসু আবারও তার পাঁচ ভাইকে অনুসরণ করে ১৯১৩ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। দর্শনকে অধ্যয়ন বিষয় হিসাবে নির্বাচিত করেন ও ক্যান্ট, হেগেল, বের্গসন ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দার্শনিকদের সম্পর্কে পড়াশোনা করেন। এর এক বছর আগে হেমন্ত কুমার সরকারের সাথে বন্ধুত্ব করেন, যিনি ছিলেন সুভাষের অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ও আধ্যাত্মিক আকুলতার সঙ্গী।সুভাষচন্দ্র ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু। কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজ পরিচালনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবধারায় সকল ধর্মাবলম্বীদের ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ধ্যানে অনেক সময় অতিবাহিত করতেন। স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ছাত্রাবস্থা থেকে তিনি তাঁর দেশপ্রেমিক সত্তার জন্য পরিচিত ছিলেন।
।।সংগৃহীত : উইকিপিডিয়া।।












Leave a Reply