
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বালুরঘাট কলেজে এক গভীর উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে। অর্থনীতি (Economics) বিষয়টি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অকারণ ভয়, যার প্রভাব পড়ছে তাদের শিক্ষাজীবনে। বিষয়টি সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. জ্যোতি কুমারী শর্মা।
তিনি বলেন, “অর্থনীতি এমন একটি বিষয়, যা সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জড়িত। এই বিষয়ের ভালো জ্ঞান থাকলে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে না, বরং বাস্তব জীবনেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারে অনেক বেশি সচেতন। কিন্তু আজ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। অনেকেই ভয় পাচ্ছে, আবার কেউ কেউ বিষয়টি বুঝতেই পারছে না।”
ভয় কোথা থেকে আসছে?
অর্থনীতি বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের এই অনীহার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
1. অঙ্কভীতি ও কঠিন ধ্যানধারণা:
অর্থনীতির সঙ্গে পরিসংখ্যান ও গণিতের সংযোগ থাকলেও বিষয়টি মূলত বিশ্লেষণধর্মী। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী বিষয়টিকে শুধুমাত্র কঠিন অঙ্কের বিষয় বলে মনে করে, যার ফলে তাদের মধ্যে আগেই একটা মানসিক বাধা তৈরি হয়ে যায়।
2. পর্যাপ্ত গাইডেন্সের অভাব:
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-জীবন থেকে বিষয়টির সঠিক ধারণা পায় না। অভিজ্ঞ শিক্ষক, সহায়ক পাঠ্যসামগ্রী, এবং সময়োপযোগী দিকনির্দেশনার অভাবে বিষয়টি জটিল বলে মনে হয়।
3. ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে অনিশ্চয়তা:
ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা অনেকেই জানেন না যে অর্থনীতি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে ব্যাংক, UPSC, গবেষণা, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বহু ক্ষেত্রে সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। এই অজ্ঞতা বিষয়টির চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে।
এর প্রভাব কী?
এই ভয় ও অনীহার কারণে প্রতি বছর অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। যারা ভর্তি হচ্ছে, তাদের অনেকেই মাঝপথে বিষয় পরিবর্তন করে নিচ্ছে। এর ফলে:
বিভাগের সার্বিক মানে প্রভাব পড়ছে
মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা অন্য বিষয়ের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হচ্ছে
সমস্যার সমাধানে সম্ভাব্য উদ্যোগ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। যেমন:
1. সচেতনতামূলক কর্মশালা ও সেমিনার:
ছাত্রছাত্রীদের অর্থনীতির গুরুত্ব বোঝাতে কলেজ ও বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত ওয়ার্কশপ আয়োজন করা দরকার। বিষয়টির বাস্তব প্রাসঙ্গিকতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরলে আগ্রহ বাড়বে।
2. সহজ পাঠ্যসামগ্রী তৈরি:
বাংলা ভাষায় সহজভাবে ব্যাখ্যা করা পাঠ্যবই, নোটস ও ভিডিও লেকচার তৈরি করা গেলে ছাত্রছাত্রীরা ভয় না পেয়ে বিষয়টি উপভোগ করতে পারবে।
3. ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও প্রাক্তনীদের মেন্টরিং:
অর্থনীতিতে সফল ব্যক্তিদের দিয়ে নিয়মিত সেশন আয়োজন করলে বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হবে। প্রাক্তন ছাত্রদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরাও খুব কার্যকরী হতে পারে।
4. ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার:
ইউটিউব, মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে বিষয়টি আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা যেতে পারে।
উপসংহার
অর্থনীতি এমন একটি বিষয়, যা কেবল একটি একাডেমিক সাবজেক্ট নয়—এটি আমাদের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা গঠনে সাহায্য করে। এই বিষয়ের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ জাগাতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বালুরঘাট কলেজ যদি এই সমস্যা নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরবে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আবারও নতুন আলোয় ফিরে আসবে।
ড. জ্যোতি কুমারী শর্মার মতো শিক্ষকদের সচেতন প্রচেষ্টা, প্রশাসনের সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অর্থনীতি বিভাগ আবারও হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় ও সাফল্যময় শিক্ষার একটি দিগন্ত।












Leave a Reply